শৈশবের সবুজ ও একলা বিকেলের কাঠবাদাম
মানছুরা আক্তার
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০১:২৮ পিএম
সেই ছোটোকাল থেকে আমি নেশাগ্রস্ত। একেক বয়স একেক নেশায় কেটেছে। ছোটো থাকতে গাছ লাগাতাম আর গল্পের বই পড়তাম। বৃক্ষমেলা টার্গেট করে দশ-বিশ টাকা যা পারতাম, জমাতাম। যখন স্কুলে পড়তাম, তখন আব্বা রিক্সাভাড়া দিতো, কিন্তু আমি হেঁটে আসা-যাওয়া করতাম। বাগেরহাটে দুইটা নামকরা দোকান ছিলো। একটা হলো হারুন ভাইয়ের শুভেচ্ছা, আরেকটা হলো শফি মার্কেটে সুব্রতদার দোকান। এই দুই দোকান থেকে সর্বনিম্ন দুই টাকা, সর্বোচ্চ ষাট টাকা দামের কানের দুল কিনতাম সেই বয়সে। কখনো স্টিকার জমাতাম, কখনো টিকেট। ডায়েরি লিখতাম, চিঠি লিখতাম।
কলেজে উঠে হলো বন্ধু-বান্ধবের নেশা। আঠারো জনের বিশাল দল। নিজেরে বাদ দিলে বাকি সতেরোটা জন্মদিন উইশ করতে যে চান্দা দেওয়া লাগতো, তাতেই বাঁচানো রিক্সাভাড়ার নব্বই পার্সেন্ট খরচ হয়ে যেতো। বাকি দশ পার্সেন্ট আবার লাগতো নিজের জন্মদিনের ট্রিটের পয়সা জোগাড় করতে।
এরপরে ইউনিভার্সিটিতে ফোর্থ ইয়ার পর্যন্ত আইনের মোটা মোটা বই কিনতে যেয়ে অন্য নেশার সুযোগ গেলো কমে। ফাইনাল ইয়ারে একটা নেশা হইছিলো, সেইটা বলা যাবেনা। তারপর মাস্টার্স পাশ করেই দেড় আংগুল এক মেয়ে আমি, হয়ে গেলাম ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। নিজের গায়ের ওজন নিজেই বুঝতাম না। তখনো পুতুল কিনতাম, ফুটপাতে পাওয়া কাগজের মাগুর মাছও কিনে নিয়ে ঘরে বসে স্প্রিং টেনে তার দৌড় দেখতাম।
একটা বয়স গেছে হিজাব আর হিজাবের পিন কিনে।
আরেকটা বয়সে আংটি আর নাকফুল জমাতাম।
একটা সময় খালি কলম আর পেন্সিল জমালাম।
একবার কাঁচের জারে মাছ পুষলাম কিছুদিন।
একটা সময় লিপস্টিক কেনার নেশা ছিলো।
একটা বয়সে হাড়ি-কড়াই কিনতে ভালো লাগতো।
কখনো ছিলো শাড়ির নেশা, কখনো কাপের নেশা, কখনো চিঠি লেখার নেশা, কখনো কবিতা পড়ার নেশা....
একটা বয়সে শুধু রাস্তা দিয়ে হাঁটতাম আর মানুষ দেখতাম। হরেক রঙ্গের মানুষ।
আমার একটা মজার জীবন।
এখন আবার পুরো নেশা গাছপালার দিকে। একটা জায়গায় একটু চুপ করে বসলে মাথার মধ্যে ইনডোর প্ল্যান্টের চিন্তা ঘোরে। কোন্ কোন্ গাছ আমার নেই, কোন্ গাছটার পট পাল্টানোর দরকার, কোথায় একটা ডেকোরেটিভ টব দিলে ভালো লাগবে, কিম্বা সুন্দর গাছটার যদি অসুখ হয় তাইলে কিভাবে সারাবো, এইসব নানান চিন্তা।
ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ার সময় আমি এইরকমভাবে আমার গাছগুলোর কথা ভাবতাম। তখন খুব অল্প গাছ কিনতে পারতাম। বেশিরভাগই অন্যের কাছ থেকে কাটিং নিয়ে আসতাম। টব কেনারও পয়সা হতোনা। পুকুরপাড় থেকে মাটি নিয়ে মই বেয়ে ছাদে উঠতাম। পলিথিন ব্যাগে, আর নয়তো বাতিল বোতল-বয়ামে গাছ লাগাতাম। একবার খালের পাড় থেকে একটা কাঠবাদামের চারা এনে লাগালাম। সেই চারা এখন আমাদের বাড়ির ছাদের চেয়ে অনেক উঁচু।
মাঝেমধ্যে একেকটা বিকেলে মন উদাস হয়। হারিয়ে যাওয়া অনেক মানুষের কথা মনে পড়ে। সাথে আমার কাঠবাদামের গাছটার কথা মনে পড়ে।
মন্তব্য করুন

