বোমাং রাজাকে প্রথম দেখার স্মৃতি
ক্য বা মং মারমা
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ১২:২৩ এএম
সম্ভবত তখন আমি রোয়াংছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে রাজপুণ্যাহ দেখতে বান্দরবান সদরে গিয়েছিলাম। তখন সেখানে আমার পরিচিত বলতে কেউ ছিল না। দূর সম্পর্কের কয়েকজন আত্মীয় থাকলেও তাঁদের সঙ্গে কোনো ঘনিষ্ঠতা ছিল না; কার্যত তাঁরাও আমার কাছে অপরিচিতই ছিলেন।
সেটি ছিল আমার দ্বিতীয়বার বান্দরবান সদরে যাওয়া। এর আগে একবার বান্দরবান হয়ে চট্টগ্রাম শহরে গিয়েছিলাম। আমার মেসো ও স্কুলের একজন শিক্ষক কয়েকজন সহপাঠীকে নিয়ে আমাদের চট্টগ্রাম ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। মনে আছে, আমরা হ্যাপিলজ বোর্ডিংয়ে উঠেছিলাম এবং একটি সিনেমাও দেখেছিলাম। সেই সিনেমাতেই প্রথম চিত্রনায়ক জসিম ও ওয়াসিমকে দেখি। নায়িকার নাম আজ আর মনে নেই।
সেই সময় রোয়াংছড়ি উপজেলা সদর থেকে বান্দরবান শহরে যাওয়ার দুটি পায়ে চলার পথ ছিল। একটি নদীপথ, অন্যটি পাহাড়ি পথ। নদীপথে যেতে হলে প্রথমে তারাছা খাল ধরে তারাছামুখে পৌঁছাতে হতো, যেখানে খালটি সাঙ্গু নদীতে গিয়ে মিশেছে। সেখান থেকে সাঙ্গু নদীর পাড়ঘেঁষা বালুচর ধরে হেঁটে ক্যচিংঘাটা হয়ে বান্দরবান সদরে পৌঁছাতে হতো। অন্য পথটি ছিল তারাছাখালের নিচ দিয়ে নোয়াপতং মুখপাড়া, সেখান থেকে ত্রিশটিলা ও কালাঘাটা হয়ে বান্দরবান শহরে। ত্রিশটিলার পথটি তখন ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলে গিয়েছিল।
আমরা কয়েকজন বন্ধু ভোরেই নদীপথে রওনা দিলাম। উদ্দেশ্য ছিল রাজপুণ্যাহ দেখা এবং বোমাং রাজাকে একবার স্বচক্ষে দেখা।
তখন গ্রামের মানুষের কাছে রাজাকে একনজর দেখতে পাওয়াই ছিল বিরল সৌভাগ্যের বিষয়। রাজপুণ্যাহ থেকে ফিরে এলে গ্রামের লোকজন প্রথমেই জিজ্ঞেস করত, ‘রাজাকে দেখেছ?’ উত্তর যদি ‘না’ হতো, তবে যেন পুরো যাত্রাটাই বৃথা বলে মনে করা হতো।
পথে বিভিন্ন পাড়া অতিক্রম করতে করতে খদাংওয়ার কাছে পৌঁছালাম। খদাংওয়া একটি বিখ্যাত পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে কবুতরের বাসার মতো একটি গর্ত ছিল। মারমা ভাষায় ‘খঅদাং’ অর্থ কবুতরের বাসা, আর ‘ওয়া’ অর্থ নদীর মুখ। তবে সেটি ঠিক কোন প্রজাতির কবুতরের বাসা ছিল, তা আজও আমার জানা নেই; কখনো জানার চেষ্টাও করিনি।
আলীকদম নামটির উৎপত্তিও মারমা শব্দ ‘আলে খঅদাং’ থেকে। এর অর্থ ‘মধ্যবর্তী কবুতরের বাসা’। মেরিনচর এলাকায় নাকি একসময় একজোড়া সাদা কবুতর বাস করত—এমন একটি লোককথা প্রচলিত ছিল। খদাংওয়াকে ঘিরেও নানা গল্প শুনেছি। ছোটবেলায় মা বলতেন, খদাংয়ের মুখে কান পেতে শুনলে নাকি ত্রিপুরা রাজ্যের কুকুরের ডাক শোনা যায়। তিনি আরও বলতেন, বহু আগে এই পথ দিয়েই মানুষ ত্রিপুরা রাজ্যে যাতায়াত করত। তখন আমি এসব গল্প নিঃসংকোচে বিশ্বাস করতাম।
সাঙ্গু নদীর জলে পা দিলেই মনে হতো, যেন ভেতরের কোনো অদৃশ্য দরজা খুলে যাচ্ছে। বদ্ধ ঘরের জানালা খুলে গেলে যেমন একঝলক মুক্ত বাতাস এসে লাগে, অনুভূতিটা ছিল ঠিক তেমনই। বালুচরের উত্তপ্ত বালিতে হাঁটা ছিল কষ্টকর, কিন্তু সে কষ্ট তেমন অনুভব করিনি। কারণ সামনে ছিল বান্দরবান শহর, রাজপুণ্যাহ এবং রাজাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা।
বিকেল তিনটা কিংবা চারটার দিকে আমরা বান্দরবান শহরে পৌঁছলাম।শহরে পৌঁছে সরাসরি চলে গেলাম বাজারের নাপ্পিদাইনে। নাপ্পিদাইনে রাখাইনদের দোকান ও পরিবার থাকে। তখন সেখানে নিয়ম ছিল—দোকানে ভাত খেলে বিনা খরচে রাত্রিযাপনের সুযোগ মিলত। এই ধরনের নিয়ম একসময় রেমাক্রী বাজারেও প্রচলিত ছিল। সেই দিন দোকানে জিনিসপত্র রেখে প্রথমে সাঙ্গু নদীতে গোসল করলাম। সন্ধ্যায় রাতের খাবার খেয়ে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন সকাল প্রায় নয়টার দিকে আমরা পুরোনো রাজবাড়ির মাঠে গেলাম বোমাং রাজাকে দেখার জন্য। জানা ছিল, রাজা বাহাদুর খাজনা গ্রহণের উদ্দেশ্যে প্রাসাদ থেকে দরবার হলে নেমে আসবেন। কিন্তু তিনি কখন নামবেন, তা আমরা জানতাম না।
মাঠে তখন মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। পাহাড়ের বিভিন্ন পাড়া থেকে মানুষ এসেছে রাজাকে একনজর দেখার জন্য। রাজপুণ্যাহ উপলক্ষে সেখানে পাইক-পেয়াদা, মারমা সম্প্রদায়ের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা, হেডম্যান ও কারবারিরাও উপস্থিত ছিলেন। তখন আমি ‘হেডম্যান’ শব্দটির অর্থও ভালোভাবে জানতাম না; ‘কারবারি’ শব্দটিই কেবল পরিচিত ছিল। চারদিকে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের শব্দে পরিবেশ মুখর হয়ে উঠেছিল।
আমরা শিশুরা বড়দের ভিড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে বারবার সামনে দেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো মানুষের কারণে ঠিকমতো কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। দীর্ঘ অপেক্ষার পর হঠাৎ জনতার মধ্যে শোরগোল শুরু হলো—রাজা বাহাদুর আসছেন। মারমা রাজাদের অভ্যর্থনার জন্য দীর্ঘ বাঁশির মতো একটি বাদ্যযন্ত্র বাজতে শুরু করল (নামটি এখন আর মনে নেই)। সেই সুরের আবহে রাজবাড়ির সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে একজন মানুষ নিচে নামতে শুরু করলেন।
তলোয়ারধারী প্রহরীদের বেষ্টনীতে, একটি বড় ছাতার নিচে, দীর্ঘদেহী ও ফর্সা একজন ব্যক্তি ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলেন। ভিড়ের কারণে তাঁকে স্পষ্টভাবে দেখতে পারিনি। সামনে দাঁড়ানো বড়রা আড়াল করে রেখেছিলেন। তবু যতটুকু দেখা সম্ভব, ততটুকুই দেখেছিলাম। তিনিই ছিলেন বোমাং রাজা মং শৈ প্রু চৌধুরী।
রাতে রাজপুণ্যাহ উপলক্ষে যাত্রাপালা দেখলাম। তখন মেলা ঘুরে দেখার সাহস হয়নি; মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। তাই সারারাত যাত্রার প্যান্ডেলেই বসে থাকলাম। কখনো অভিনয় দেখছিলাম, আবার কখনো ঘুমে ঢলে পড়ছিলাম। একটু পর জেগে উঠে আবার মঞ্চের দিকে তাকাতাম। তখন বাংলা ভাষা পুরোপুরি বুঝতাম না। তবু গ্রামের পাংখুম নাচের সঙ্গে তুলনা করেই যাত্রাপালাকে দেখতাম।
সেই সময় আমার মনে হতো, যাত্রাপালা আমাদের গ্রামের নাচের চেয়ে অনেক উন্নত এবং বড় ধরনের শিল্প। শহরের শিল্প-সংস্কৃতি তখন আমার কাছে এক ভিন্ন মর্যাদার প্রতীক ছিল। গ্রামে যারা বাংলা কিংবা সামান্য ইংরেজি বলতে পারত, তাঁদের আমরা জ্ঞানী ও উন্নত মানুষ বলে মনে করতাম। ভাষাজ্ঞানই যেন তখন সামাজিক মর্যাদার অন্যতম মানদণ্ড ছিল।
পরদিন সকালে নাস্তা করে আমরা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। পথে খাওয়ার জন্য থলেতে রুটি ও পরোটা নিয়ে নিলাম।
ফেরার পথে আবার সেই পরিচিত খদাংওয়া চোখে পড়ল। এবার পাহাড়, নদী আর পথ যেন আরও আপন মনে হচ্ছিল। পুরো যাত্রার ক্লান্তি সত্ত্বেও মনে হচ্ছিল, এই সফর ব্যর্থ হয়নি। বরং রাজপুণ্যাহ দেখা, শহরে থাকা এবং রাজাকে একনজর দেখার অভিজ্ঞতাই সব কষ্টকে অর্থবহ করে তুলেছে।
ছাত্রজীবনে এই পথ দিয়ে বহুবার আসা-যাওয়া করেছি। পরে যখন সড়ক তৈরি হলো, তখনও কখনো কখনো পায়ে হেঁটে বান্দরবান শহর ও নিজের বাড়ির মধ্যে যাতায়াত করেছি। ব্যাগে খাবার নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটা, পথে বসে নাস্তা করা—এসব অভিজ্ঞতা তখন খুবই আনন্দ দিত। সে সময় বনজঙ্গলও ছিল অনেক বেশি ঘন ও প্রাণবন্ত।
পরে হাইস্কুলে পড়ার জন্য বান্দরবান শহরে চলে আসি। সেখানে সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচয় বাড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে নতুন এক সামাজিক পরিসর তৈরি হয়। রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠানে আমি বেশ কয়েক বছর স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও কাজ করেছি। প্রথমবার এক রাত দায়িত্ব পালন করে তিনশ টাকা পেয়েছিলাম। তখনকার সময়ে সেটি আমার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি মনে হয়েছিল। বয়সে বড় স্বেচ্ছাসেবকেরা অবশ্য আরও বেশি সম্মানী পেতেন।
স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার সুবিধা শুধু টাকাপয়সায় সীমাবদ্ধ ছিল না। টিকিট ছাড়াই সার্কাস ও ভ্যারাইটি শো দেখার সুযোগ মিলত। সেই সঙ্গে রাজপুণ্যাহ চলাকালে নানা ধরনের অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হতে হতো।
মেলার সময় এলাকার বাইরে থেকে আসা অনেক বাঙালি পকেটমার ধরা পড়ত। একবার স্বেচ্ছাসেবক প্যান্ডেলে আমাদের পুথুইমং দাদা (ডা. পুচনুর ছোট ভাই এবং বান্দরবানের একজন বিখ্যাত গোলকিপার, বর্তমানে প্রয়াত) এক পকেটমারকে একটি বাঁশের খুঁটির সঙ্গে তার পায়ের আঙুল সুতলি দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন। লোকটি পালানোর কোনো চেষ্টা করেনি; চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
এরপর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বহুবার রাজাকে খাজনা গ্রহণ করতে দেখেছি। রাজা বাহাদুর তলোয়ারধারী প্রহরীদের বেষ্টনীতে যাত্রাদলের নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে দরবার হলে নেমে আসতেন। সেখানে নৃত্য পরিবেশিত হতো। তখন আমার মনে হতো, এটি যেন একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন, যেখানে রাজত্বের প্রতীকী রূপটি মঞ্চে উপস্থাপিত হচ্ছে।
কখনো কখনো এই দৃশ্য দেখে লজ্জাও অনুভব করেছি, যদিও তখন সেই অনুভূতি প্রকাশ করিনি।
রাজা মং শৈ প্রু চৌধুরীর মৃত্যুর পর রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরীর সময়ে আর কখনো রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠানে যাইনি, যদিও তখনও আমি বান্দরবান শহরেই ছিলাম। সে সময় ধীরে ধীরে লক্ষ করলাম, পাহাড়ি ও মারমা তরুণদের পাশাপাশি বাঙালি তরুণেরাও রাজপুণ্যাহর স্বেচ্ছাসেবক দলে যোগ দিতে শুরু করেছে।
বর্তমানে কয়েক বছর ধরে বান্দরবানে রাজপুণ্যাহ মেলা আর অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আবার শুরু হলেও আমার মনে হয়, সেই শৈশবের অনুভূতি আর ফিরে আসবে না।
আজ যখন ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—একই ব্যক্তি এবং একই অনুষ্ঠানকে মানুষ জীবনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে দেখে। দৃষ্টিভঙ্গি, আবেগ ও বিশ্বাস সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। গ্রাম থেকে দূর থেকে দেখা রাজা আর নিজের ঘরের কাছাকাছি দেখা একজন মানুষ—এই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য গভীর। সামাজিক পরিবেশ, অবস্থান ও অভিজ্ঞতা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে নীরবে গড়ে তোলে। একই জাতি, একই মানুষ; কিন্তু ভিন্ন পরিবেশে তাদের প্রতি আমাদের অনুভূতি ও বিশ্বাসও বদলে যায়। এটাই জীবনের বাস্তবতা।
আরও একটি উপলব্ধি হয়েছে—দূরত্বেরও এক ধরনের জাদু আছে। দূরত্ব মানুষকে রহস্যময় ও মহিমান্বিত করে তোলে, আর নৈকট্য তাকে বাস্তব করে দেয়। যে রাজাকে একদিন দেবতার মতো মনে হয়েছিল, কাছে এসে তিনি আর শুধু রাজা রইলেন না; হয়ে উঠলেন রক্ত-মাংসের একজন মানুষ। একই ব্যক্তি, একই অনুষ্ঠান—কিন্তু আমার দৃষ্টির ভেতর তার অর্থ বদলে গেল
আজ বহু বছর পর ফিরে তাকিয়ে বুঝি, মানুষের আবেগেরও যেন এক ধরনের ভৌগোলিক ব্যঞ্জনা রয়েছে। দূরত্ব যাকে অলৌকিক ও অপার্থিব করে তোলে, নৈকট্য তাকে সাধারণ ও পার্থিব করে দেয়। শৈশবের পাহাড়ে যে রাজা বাস করতেন, তিনি বাস্তবের রাজা ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমার কল্পনার রাজা।
রাজপুণ্যাহ হয়তো আবার কোনো একদিন অনুষ্ঠিত হবে। মানুষও আবার সেখানে যাবে। কিন্তু সেই ছোট্ট ছেলেটি, যে উত্তপ্ত বালুচর পেরিয়ে শুধু একবার রাজাকে দেখার জন্য সুদীর্ঘ পথ হেঁটেছিল, সে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। রাজাকে দ্বিতীয়বার হয়তো দেখা যায়, কিন্তু প্রথম রাজদর্শনের বিস্ময় আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না।
ক্য বা মং মারমা: পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
মন্তব্য করুন

