ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
কৃষ্ণাস বাটারবল: ২৫০ টন পাথর, তবু নড়ে না একচুল
কে এম তাহছিন (মুগ্ধ)
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম
খাড়া পাহাড়ের ঢালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থির বিশাল গ্রানাইট পাথরটি আজও রহস্য আর বিস্ময়ের কেন্দ্র
ভারতের তামিলনাড়ুর ঐতিহাসিক শহর মামাল্লাপুরামে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশাল গোলাকার পাথর বছরের পর বছর ধরে পর্যটকদের বিস্মিত করে আসছে। প্রায় ২৫০ টন ওজনের এই গ্রানাইট পাথরটি এমন এক ঢালে অবস্থান করছে, যেখান থেকে দেখলে মনে হয় যেকোনো মুহূর্তে এটি গড়িয়ে নিচে পড়তে পারে। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে একই জায়গায় স্থির রয়েছে এটি। পরিচিতি পেয়েছে ‘কৃষ্ণাস বাটারবল’ নামে।
আকাশ থেকে পড়া মাখনের গল্প
পাথরটির স্থানীয় প্রাচীন নাম ‘ভান ইরাই কাল’ (Vaan Irai Kal)। পরবর্তীতে কৃষ্ণকে ঘিরে প্রচলিত লোককথার কারণে এটি ‘কৃষ্ণাস বাটারবল’ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
হিন্দু পুরাণে শিশু কৃষ্ণের মাখন চুরির গল্প বহুল প্রচলিত। পাহাড়ের ওপর গোলাকার এই বিশাল পাথরটিকে দেখতে অনেকটা মাখনের বড় টুকরোর মতো হওয়ায় এর সঙ্গে সেই গল্পের যোগ তৈরি হয়েছে। তবে নামটির পেছনে মূলত রয়েছে লোকবিশ্বাস ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাব।
সরানোর চেষ্টা, সফল হয়নি কেউ
পাথরটিকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো—এটি সরানোর বিভিন্ন প্রচেষ্টা।
স্থানীয় কিংবদন্তিতে পল্লব আমলের রাজা নরসিংহবর্মণের সময় পাথরটি সরানোর উদ্যোগের কথা বলা হয়। তবে সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি। আরও নির্ভরযোগ্যভাবে নথিভুক্ত একটি ঘটনা ঘটে ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৯০৮ সালে তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির গভর্নর লর্ড আর্থার ললি পাথরটির অবস্থান নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। কথিত আছে, সাতটি হাতি ব্যবহার করেও পাথরটি সরানো সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা কী?
দৃশ্যটি রহস্যময় হলেও এর পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়ম। পাথরটির ভরকেন্দ্র (Center of Mass), পাহাড়ের ঢালের সঙ্গে এর সংস্পর্শ এবং পাথর ও শিলার মধ্যকার ঘর্ষণ—সব মিলিয়ে একটি স্থিতিশীল ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ দেখতে অস্থিতিশীল মনে হলেও পাথরটির ওপর কাজ করা বলগুলো এমনভাবে ভারসাম্যপূর্ণ যে, এটি সহজে নিচে গড়িয়ে পড়ছে না।
ইতিহাসের সাক্ষী কৃষ্ণাস বাটারবল
প্রায় ২০ ফুট উঁচু ও ১৬ ফুট প্রশস্ত এই পাথর মামাল্লাপুরামের ঐতিহাসিক ভূদৃশ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শহরের প্রাচীন মন্দির ও পাথরখোদাই স্থাপত্যের পাশাপাশি এটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
২০১৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মামাল্লাপুরাম সফরের সময়ও শহরটির ঐতিহাসিক স্থানগুলো আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে আলোচনায় আসে।
প্রকৃতি, বিজ্ঞান, ইতিহাস আর লোককথার এই অদ্ভুত সমন্বয়ই কৃষ্ণাস বাটারবলকে আলাদা করে তুলেছে। পাহাড়ের ঢালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থির থাকা এই পাথর আজও মানুষকে একই প্রশ্ন করতে বাধ্য করে—এত বড় একটি পাথর এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে কীভাবে?
মন্তব্য করুন

