Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পেছনের অন্ধকার জগৎ

খোঁজ-খবর

আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পেছনের অন্ধকার জগৎ

Icon

সাঈদ হাসান

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম

আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (AFA) পেছনের অন্ধকার জগৎ নিয়ে ফরাসি অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোমাঁ মলিনা (Romain Molina) তাঁর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এক বিস্ফোরক তদন্ত সামনে এনেছেন। মাঠের ফুটবলে মেসি-ডি মারিয়াদের বিশ্বজয় বা কোপা আমেরিকার চোখধাঁধানো সাফল্যের আড়ালে কীভাবে এক বিশাল মাফিয়াতন্ত্র জেঁকে বসেছে, সেটিই উঠে এসেছে এই তদন্তে।

​ভিডিওর সূত্র ধরে এই পুরো অন্ধকার অধ্যায়কে দুটি বড় ভাগে ভাগ করা যায়: এক দিকে ভয়ংকর যৌন নিপীড়নের ঘটনা আড়াল করা, আর অন্য দিকে ৩০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের এক বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারি।

​অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৭ আর্জেন্টিনার নারী দলের কোচ ডিয়েগো গুয়াচির বিরুদ্ধে গুরুতর মানসিক ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী ফুটবলার খেলোয়াড়দের বৈশ্বিক সংগঠন ফিফপ্রোর (FIFPRO) সহায়তায় ফিফার এথিক্স কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয়। তাদের মূল শর্ত ছিল একটাই—নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন (anonymous) রাখতে হবে।

​অভিযোগে জানা যায়, ম্যাচ বা অনুশীলনের মাঝে এই কোচ মেয়েদের বলতেন যে তারা যদি জাতীয় দলে টিকতে চায় বা ভালো সুযোগ পেতে চায়, তবে তাদের শারীরিক সম্পর্ক করতে হবে। এমনকি ১৬-১৭ বছরের মেয়েদের ফোনে নোংরা ছবি ও বার্তা পাঠানোর প্রমাণও ছিল। এত কিছুর পরেও ফিফা রহস্যজনকভাবে জানায় যে গুয়াচির বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ নেই এবং তারা তাকে খালাস দেয়। সবচেয়ে বড় অপরাধটি ফিফা করে তখন, যখন তারা অভিযোগকারী মেয়েদের নাম জনসমক্ষে ফাঁস করে দেয়। এর ফলে মেয়েগুলোর ফুটবল ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যায়, অনেকে ভয়ে খেলাটাই ছেড়ে দেয়। বর্তমানে আটজন ভুক্তভোগী নারী এই কোচের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার বিচারব্যবস্থার ওপর তারা আস্থা পাচ্ছেন না।

​অন্য দিকে, মাঠের ফুটবলে আর্জেন্টিনার বিশাল আর্থিক সাফল্যের সুযোগ নিয়ে এক চতুর ফাঁদ পাতা হয়। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের মাত্র ৯ দিন আগে, আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লাউদিও তাপিয়া (Chikitapia) তাড়াহুড়ো করে মিয়ামিতে অবস্থিত 'ট্যুর প্রডিউটার' (Tour Prodenter) নামের একদম নতুন এক কোম্পানির সাথে একটি একচেটিয়া চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই কোম্পানিটি বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে আর্জেন্টিনার এক থিয়েটার প্রযোজক ও রাজনীতিকের স্ত্রী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যাদের ফুটবলের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা লাইসেন্সই ছিল না।

​চুক্তি অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার বাইরে হওয়া সমস্ত আন্তর্জাতিক ম্যাচ, টিভি স্বত্ব ও স্পনসরশিপের মতো সব আয়ের ৩০% কমিশন সরাসরি এই কোম্পানির পকেটে যাবে। বাকি ৭০% অর্থও বিভিন্ন শেল কোম্পানি (fake companies) ও ট্যাক্স হ্যাভেন বা কর ফাঁকির স্বর্গরাজ্যে (যেমন: ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, ডেলাওয়্যার, ওয়াইওমিং) পাচার করা হয়। ফিফা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাকাউন্টে টাকা না পাঠিয়ে সরাসরি মিয়ামির এই নতুন কোম্পানির অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি ডলার পাঠায়।

​এই অর্থ দিয়ে ফুটবলারদের কোনো উন্নয়ন হয়নি, বরং কর্মকর্তারা নিজেদের ব্যক্তিগত বিলাসবহুল জীবন নিশ্চিত করেছেন। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দামি প্রাইভেট জেটে (Gulfstream 400) চড়ে ঘুরেছেন, মোনাকোর মতো জায়গায় বিলাসবহুল ইয়ট কিনেছেন, এমনকি কোষাধ্যক্ষের ছেলের কার্টিং রেসিংয়ের সমস্ত খরচও মেটানো হয়েছে এই টাকা দিয়ে। এই চক্রটি এমনকি ইতালির ফুটবল ক্লাব 'পেরুজা' (Perugia) কেনার পেছনেও এই অবৈধ অর্থ ব্যবহার করেছে।

​সমর্থকদের কাছে মাঠের ট্রফিটাই সব হতে পারে, কিন্তু রোমাঁ মলিনার এই তদন্ত বিশ্ববাসীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে সুন্দর ফুটবলের আড়ালে ফিফা এবং ল্যাটিন আমেরিকান ফুটবল কর্তারা কতটা নোংরা রাজনীতি ও অপরাধের অংশীদার হয়ে পড়েছেন।

মন্তব্য করুন

Logo