Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

জেন্ডার বাজেট ‘টেকনোক্র্যাটিক হাতিয়ারে’ পরিণত হয়েছে—রেড ফেমিনিস্ট ব্লক

খোঁজ-খবর

জেন্ডার বাজেট ‘টেকনোক্র্যাটিক হাতিয়ারে’ পরিণত হয়েছে—রেড ফেমিনিস্ট ব্লক

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ঘোষিত জেন্ডার বাজেটকে ‘লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠার কার্যকর রাজনৈতিক উপকরণ’ নয়, বরং ‘নব্যউদারনীতির টেকনোক্র্যাটিক হাতিয়ারে’ পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেছে রেড ফেমিনিস্ট ব্লক। সংগঠনটির ভাষ্য, গত দুই দশকে জেন্ডার বাজেটের আকার বাড়লেও তা কাঠামোগত লিঙ্গ ও শ্রেণিগত বৈষম্য দূর করতে পারেনি; বরং সাধারণ উন্নয়ন ব্যয়কেই জেন্ডার বাজেট হিসেবে দেখানোর প্রবণতা বেড়েছে। 
৫ জুলাই রোববার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি এ দাবি করে। এতে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার জেন্ডার বাজেট প্রস্তাব করেছে, যা মোট জাতীয় বাজেটের ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং জিডিপির ৪ দশমিক ৮ শতাংশের সমান। তবে এই বরাদ্দ বাস্তবে কতটা লিঙ্গবৈষম্য দূর করবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

‘জেন্ডার’ ধারণাই স্পষ্ট নয়

রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের মতে, বর্তমান জেন্ডার বাজেট মূলত নারী ও পুরুষ—এই দ্বৈত পরিচয়ের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। ফলে ট্রান্সজেন্ডার, আন্তঃলিঙ্গ ও অন্যান্য লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষের বাস্তবতা ও চাহিদা এতে প্রতিফলিত হয়নি। সংগঠনটির দাবি, জেন্ডার বাজেটকে শুধু নারীকেন্দ্রিক বিশেষ সুবিধার তালিকা হিসেবে না দেখে সমাজে বিদ্যমান ক্ষমতার বৈষম্য পরিবর্তনের রাজনৈতিক উপায় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত ছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন নেই।

প্রশাসনিক ব্যয়কেই জেন্ডার বাজেট হিসেবে দেখানোর অভিযোগ

ঘোষিত জেন্ডার বাজেটের প্রায় ৬১ শতাংশ বা ২ লাখ ৪০৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা মূলত বেতন, অফিস পরিচালনা, ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ে ব্যয় হবে। এগুলোকে জেন্ডার বাজেট হিসেবে দেখানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। তাদের ভাষ্য, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দের ৯২ শতাংশই প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে যাবে। উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ থাকবে মাত্র ৪২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যারও একটি অংশ সরাসরি নারী উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় হবে।
একই সঙ্গে অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন কিংবা পল্লী কর্মসংস্থানের মতো সবার জন্য উন্মুক্ত প্রকল্পগুলোও কীভাবে ‘জেন্ডার-নির্দিষ্ট’ ব্যয় হিসেবে গণ্য হচ্ছে, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি।

‘নীতিপত্র তৈরির রাষ্ট্রে’ পরিণত হওয়ার সমালোচনা

রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পের বড় একটি অংশ বিভিন্ন নীতি ও কৌশলপত্র তৈরিতে ব্যয় করা হচ্ছে। অতীতে নারী ও জেন্ডার সমতা নিয়ে বহু নীতিপত্র তৈরি হলেও বাস্তবায়ন সীমিত ছিল বলে সংগঠনটির অভিযোগ।
তাদের মতে, বাস্তব পরিবর্তনের বদলে নথি তৈরিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ায় রাষ্ট্র ক্রমেই ‘ডকুমেন্ট তৈরির কারখানায়’ পরিণত হচ্ছে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার বর্তমান পরিমাণ বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছে রেড ফেমিনিস্ট ব্লক। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধিকাংশ সুবিধা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য হওয়ায় সেগুলোকে সরাসরি জেন্ডার বৈষম্য মোকাবিলার ব্যয় হিসেবে দেখানো কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্নও তুলেছে সংগঠনটি।

জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও আইসিটি খাতে উদ্বেগ

সংগঠনটির মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নারীদের ওপর বেশি পড়ে—এ কথা বাজেট নথিতে স্বীকার করা হলেও জলবায়ুকে আলাদা থিম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু-সম্পর্কিত জেন্ডার বরাদ্দ মোট জেন্ডার বাজেটের খুবই সীমিত অংশ। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় কমে যাওয়াকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্রমবাজার ও কৃষিতে কাঠামোগত সমস্যার সমাধান নেই

কৃষি ও শ্রম খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিভিন্ন কর্মসূচির কথা থাকলেও কৃষক হিসেবে নারীর স্বীকৃতি, ন্যায্যমূল্য, বাজারে প্রবেশাধিকার, করপোরেট নির্ভরতা এবং মজুরি বৈষম্যের মতো মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপের উল্লেখ নেই। তাদের মতে, শুধু অংশগ্রহণের হার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় না।

একাধিক সুপারিশ

জেন্ডার বাজেটকে কার্যকর করতে একাধিক সুপারিশ করেছে রেড ফেমিনিস্ট ব্লক। এর মধ্যে রয়েছে—জেন্ডারের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা, নন-বাইনারি ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট ব্যয় নির্ধারণে স্বচ্ছ মানদণ্ড প্রণয়ন, প্রশাসনিক ব্যয়কে জেন্ডার বাজেটের বাইরে রাখা এবং নির্ধারিত বরাদ্দ নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে ব্যয় নিশ্চিত করা।
এছাড়া, জেলা-উপজেলায় ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ডিএনএ ফরেনসিক ল্যাব, ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার, ট্রান্সজেন্ডার ও আন্তঃলিঙ্গ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রী উৎপাদন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্টফিডিং কর্নার, কমিউনিটি কিচেন, ডে-কেয়ার সেন্টার এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে জেন্ডার বাজেটের পৃথক থিম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশও করা হয়েছে।
সংগঠনটি দাবি, কেবল বাজেটে ‘জেন্ডার’ শব্দ যুক্ত করলেই লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠিত হবে না। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য, সম্পদের অসম বণ্টন, শ্রমের অবমূল্যায়ন এবং লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্যের মতো কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে জেন্ডার বাজেটের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

মন্তব্য করুন

Logo