উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বায়াররা পণ্যের দাম বাড়াতে বা অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে আগ্রহী নন।
কাভার স্টোরি ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম
মাত্র কিছু দিন আগে বাংলাদেশের অন্যতম পোশাক রপ্তানী কারক প্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একে আজাদ জানিয়েছিলেন তিনি ১০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছেন। গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কর্মী ছাঁটাই পরিকল্পনার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বায়াররা পণ্যের দাম বাড়াতে বা অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে আগ্রহী নন। বরং তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছেন এবং কম জনবল দিয়ে কাজ পরিচালনার পরামর্শ দিচ্ছেন। এ অবস্থায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে ৭৫ হাজার কর্মীর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কর্মী কমানোর পরিকল্পনা করতে হচ্ছে তাকে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তিনি ব্যয় সমন্বয়ের কথা ভাবছিলেন। এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশের হা-মীম গ্রুপের নয়, বিশ্বের প্রায় সব নামি-দামি কোম্পানি থেকে শুরু করে ছোট-খাটো উদ্যোক্তারও।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন তুমুল এই উচ্ছ্বাস, ঠিক তখন সেই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে মার্কিন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ড। উৎপাদন খরচ কমানো ও কাজের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে যেসব অভিজ্ঞ কর্মীকে ছাঁটাই করে এআইনির্ভর ব্যবস্থা চালু করেছিল কোম্পানিটি, তাদেরই একটি অংশকে আবার ফিরিয়ে আনতে হয়েছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাড়ির মান যাচাই (কোয়ালিটি ইন্সপেকশন) ব্যবস্থায় এআই প্রত্যাশিত ফল দিতে না পারায় সম্প্রতি প্রায় ৩০০ অভিজ্ঞ কোয়ালিটি ইন্সপেক্টরকে পুনরায় নিয়োগ দিয়েছে ফোর্ড। এতে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, বহু বছরের অভিজ্ঞতা, বাস্তব পর্যবেক্ষণ এবং মানবিক বিচার-বিবেচনার বিকল্প এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
গত কয়েক বছরে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়তা বাড়াতে বিভিন্ন বিভাগে এআইয়ের ব্যবহার শুরু করে ফোর্ড। বিশেষ করে গাড়ির ত্রুটি শনাক্ত, মান নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই অনেক অভিজ্ঞ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এআই বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারলেও সূক্ষ্ম ত্রুটি শনাক্ত করা, দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা জটিল উৎপাদন সমস্যার প্রেক্ষাপট বুঝতে মানুষের মতো দক্ষ নয়।
ফোর্ডের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস পুন বলেন, বহু বছর ধরে কাজ করে আসা প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও কর্মীদের জ্ঞানকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাঁরা একটি পণ্যের ধারণা থেকে উৎপাদনের শেষ ধাপ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কাজ করেছেন। কিন্তু ভুল করে মনে করা হয়েছিল, শুধু এআই সিস্টেমে নকশা ও ডিজাইনসংক্রান্ত তথ্য দিলেই মানুষের অভিজ্ঞতার সমতুল্য ফল পাওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, পুরোনো কর্মীদের দক্ষতা, বিচারক্ষমতা ও প্রশিক্ষণের সমপর্যায়ে এখনো এআই পৌঁছাতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, "এআই দিয়ে মান যাচাইয়ের পরিকল্পনা প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হয়নি।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবল ফোর্ডের নয়; বরং এআই ব্যবহারের বর্তমান বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে মানুষের বিকল্প হিসেবে এখনো নির্ভরযোগ্য নয়। বিশেষ করে উৎপাদন শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো খাতে অভিজ্ঞ কর্মীদের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব এখনো অপরিসীম।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করে কর্মীসংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করলেও সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, সবচেয়ে কার্যকর মডেল হতে পারে মানুষ ও প্রযুক্তির সমন্বয়। যেখানে এআই তথ্য বিশ্লেষণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করবে, আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, মান যাচাই ও জটিল সমস্যা সমাধানে নেতৃত্ব দেবেন অভিজ্ঞ মানবকর্মীরা।
ফোর্ডের এই সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি কোম্পানির নীতিগত পরিবর্তন নয়; বরং এটি প্রযুক্তি ও মানবদক্ষতার সম্পর্ক নিয়ে চলমান বৈশ্বিক বিতর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এআই যত দ্রুতই এগিয়ে যাক না কেন, অভিজ্ঞতা, অন্তর্দৃষ্টি ও বাস্তব বিচারক্ষমতার মূল্য যে এখনো অক্ষুণ্ন—ফোর্ডের এই অভিজ্ঞতা সেই বার্তাই আবার দিল।
একে আজাদের বক্তব্যে হা-মীম গ্রুপসহ আমাদের দেশের অনেক শ্রমঘন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যেই ছাঁটাই আতঙ্ক দেখা দেয়। এখন বিশ্বখ্যাত ফোর্ড কোম্পানির এই অভিজ্ঞতা থেকে একে আজাদ কি তার পরিকল্পনা আবার বিবেচনা করবেন? সেটা অবশ্য সময়ই বলে দিবে।
মন্তব্য করুন

