এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত দিনব্যাপী জাতীয় কনভেনশনে সারা হোসেন
কাউকে জামিন দেবেন কি না, তা বিচারককে ১০ বার ভাবতে হয়: সারা হোসেন
কাভার স্টোরি ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ১০:১১ এএম
এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে কাউকে জামিন দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে বিচারকদের বারবার ভাবতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন।
তিনি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক হত্যা মামলাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে জামিন না দেওয়ার প্রবণতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, নতুন বাংলাদেশ গঠনের আকাঙ্ক্ষা এবং অবিচার দূর করার লক্ষ্যেই জুলাই অভ্যুত্থান ঘটেছিল। কিন্তু বাস্তবে এখন এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে যে একজন বিচারপতি বা বিচারকের ১০ বার চিন্তা করতে হচ্ছে, তিনি কাউকে জামিন দেবেন কি না।
রোববার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)-এ এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত দিনব্যাপী জাতীয় কনভেনশনের তৃতীয় পর্বের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, সংস্কার ও গণভোটবিষয়ক জাতীয় কনভেনশন’-এর এই পর্বের আলোচনার বিষয় ছিল ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার: বর্তমান ঝুঁকি ও করণীয়’।
আলোচনায় সারা হোসেন প্রশ্ন তোলেন—মানবাধিকার কি শুধু নির্দিষ্ট মতাদর্শ, দল, গোষ্ঠী, লিঙ্গ বা ধর্মের মানুষের জন্য, নাকি সবার জন্য? তিনি বলেন, যারা ভিন্ন মতাদর্শের, তাদের মানবাধিকারকে আমরা কতটা সম্মান করি—এটাই মূল প্রশ্ন। মানবাধিকার সর্বজনীন, অবিচ্ছেদ্য এবং অবিভাজ্য। এটি শুধু বাক্স্বাধীনতা নয়; জীবনের অধিকার, গুম ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। এসব অধিকার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা, এখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ কোনো বিষয় হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখছি।
সারা হোসেনের আগে সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে সারা হোসেন বলেন, অতীতে অনেককে দীর্ঘদিন পর আদালতে হাজির করা হতো এবং তারা জামিন পেতেন, কিন্তু সেখান থেকেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের নতুন অধ্যায় শুরু হতো, যার শেষ ছিল না। অথচ বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে জামিনের প্রক্রিয়াই শুরু হচ্ছে না।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, কারও কারও ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যারা ভিন্ন মতাদর্শের, তাদের জামিনই দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে কি সবাই একমত হতে পারেন?
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে বলছেন—চার্জশিট হয়ে যাবে, তদন্ত শেষ হলে প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাই এখনই কাউকে মুক্তি দেওয়া যাবে না। সারা হোসেন প্রশ্ন তোলেন, এসব যুক্তি জনগণের নামেই উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না।
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার ন্যায়বিচার সবাই চায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তদন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, কোনো স্পষ্ট প্রমাণ সামনে আসছে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এটি কি শহীদদের প্রতি সুবিচার, নাকি তাদের নাম ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় মানুষকে আটক রাখার প্রক্রিয়া?
সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিলের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ অংশ নিতে না পারার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। সারা হোসেন বলেন, যাঁরা নিয়মিত আইন পেশায় নিয়োজিত, যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ নেই, শুধু অতীতে রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—সেই কারণে তাঁদের নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এটি কি তাঁদের বাক্স্বাধীনতা ও পেশাগত অধিকারকে সীমিত করছে না—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া সভাপতিত্ব এই পর্বের আলোচনা সঞ্চালনা করেন এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন । অন্যান্য আলোচকদের মধ্যে ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, জাইমা ইসলাম, এনসিপির যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম এবং ফ্যাক্ট চেকার ও মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ আমান।
মন্তব্য করুন

