Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

রাষ্ট্রের ব্যর্থতা মাপার জন্য এই এক হাজারই যথেষ্ট

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

কাভার স্টোরি

রাষ্ট্রের ব্যর্থতা মাপার জন্য এই এক হাজারই যথেষ্ট

ড. লুবনা ফেরদৌসী

ড. লুবনা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম

এক হাজার। সংখ্যাটা লিখতে খুব বেশি জায়গা লাগে না। কিন্তু একটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা মাপার জন্য এই এক হাজারই যথেষ্ট।
বাংলাদেশে হামে মৃত শিশুর সরকারি সংখ্যা এখন ১,০০২। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১০০, আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৯০২। শুধু সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১,১১৯টি সন্দেহভাজন এবং ৬৯টি নিশ্চিত সংক্রমণ নথিভুক্ত হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত সংক্রমণ মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৮৭,৪৮৪।
গত এপ্রিলে সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তখনই বলেছিল, দ্রুত টিকাদানের আওতা না বাড়ালে সংক্রমণ ছড়াতে থাকবে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে।  অথচ সেপ্টেম্বরেও প্রতিদিন হাজারের কাছাকাছি বা তার বেশি রোগী আসছে। হাসপাতালগুলোতে জায়গা হচ্ছে না; রোগী মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে; শিশুদের স্যালাইনেরও ঘাটতির কথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে। রয়টার্সের বলছে, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি।
এ পর্যায়ে এই “জরুরি টিকাদান চলছে” বলাটা সরকারের পক্ষে যথেষ্ট উত্তর না। কর্মসূচি চালু করা আর মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা এক জিনিস না।
এপ্রিল-মে মাসের বিশেষ কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। অথচ জুনের ভিটামিন এ কর্মসূচিতে একই বয়সসীমার ২ কোটি ২৩ লাখের বেশি শিশুর কাছে পৌঁছানো গেছে। প্রায় ৩৯ লাখ শিশুর বাস্তব কভারেজ-ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। এর আগে লক্ষ্য-জনসংখ্যার হিসাবেই প্রায় ৫৮ লাখের অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
কোনো ছোটখাটো পরিসংখ্যানগত ভুল এটা না। আপনি যদি জানতেই না পারেন দেশে টিকা দেওয়ার উপযুক্ত শিশু কতজন, তাহলে শতভাগ টিকাদানের দাবি আসলে শতভাগ কিসের?
কাগজে লক্ষ্য ঠিক করে সেই লক্ষ্যের ১০৩ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু জুনে ভিটামিন এ কর্মসূচি যদি প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ শিশুর কাছে পৌঁছাতে পারে, অথচ হামের টিকা পৌঁছায় প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখের কাছে, তাহলে “মায়েরা সচেতন কি না” সেই এক্সকিউজ খাটে না। রাষ্ট্র কেন একই বয়সী শিশুদের এক কর্মসূচিতে খুঁজে পেল, আর জীবনরক্ষাকারী আরেক কর্মসূচিতে পেল না?
বাংলাদেশের হামের সংকটের দ্বিতীয় রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হয়েছে এখন। প্রথম অধ্যায়ের দায় অন্তর্বর্তী সরকারের। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের টিকাদান বিঘ্ন, হাম-রুবেলা কর্মসূচি স্থগিত ও বাতিল হওয়া এবং টিকা সংগ্রহনীতির পরিবর্তনের কারণে সরবরাহ সংকট তৈরির বিষয়টি এখন আর শুধু রাজনৈতিক অভিযোগ নয়। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই সংসদে বলেছেন, সংগ্রহপদ্ধতির পরিবর্তন টিকার সংকট সৃষ্টি করেছিল; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফও টিকাদানের ধারাবাহিকতা ভাঙার দিকে আঙুল তুলেছে।
কিন্তু সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ দাঁড়িয়ে কেবল অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করে বর্তমান সরকার নিজের দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকটের দায় আগের সরকারের হতে পারে; কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই সংকট নিয়ন্ত্রণের দায় বর্তমান সরকারের।
একটি সরকার বলতে পারে, “আগুন আমরা লাগাইনি।” কিন্তু পাঁচ মাস ধরে আগুন জ্বলতে থাকলে নাগরিকের পরবর্তী প্রশ্ন হবে, তাহলে আপনারা আগুন নেভাতে পারলেন না কেন?
এক হাজার শিশুর মৃত্যু পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি প্রতিদিন হাজারের বেশি নতুন সন্দেহভাজন রোগী পাওয়া যায়, যদি হাসপাতালের সক্ষমতা ভেঙে পড়ে, যদি টিকা অভিযানের পরও লক্ষ লক্ষ শিশুর কভারেজ-ব্যবধান থেকে যায়, তাহলে এটাকে আর শুধু প্রাদুর্ভাব হিসেবে পরিচালনা করা যায় না। এটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার জরুরি শাসনসংকট।
এখানে দরকার শিশুভিত্তিক নামের তালিকা তৈরি করে কে প্রথম ডোজ পেয়েছে, কে দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে, কে একটিও পায়নি, তার অনুসরণযোগ্য তথ্যব্যবস্থা; জেলা ও উপজেলা অনুযায়ী রোগপ্রতিরোধের ঘাটতির মানচিত্র; বাদ পড়া শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান; পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার সক্ষমতা; হাসপাতালের শিশু শয্যা, অক্সিজেন, স্যালাইন ও বিচ্ছিন্নকরণ সুবিধা; অপুষ্ট শিশুদের আলাদা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা; এবং প্রতিদিনের তথ্যের স্বাধীন নিরীক্ষা।
একটা জেলার ৯৭ শতাংশ কভারেজ আর অন্য জেলার ৭০ শতাংশ কভারেজকে যোগ করে সুন্দর গড় তৈরি করা যায়, কিন্তু দ্বিতীয় জেলার শিশুকে সেই গড় বাঁচাতে পারে না।
রাষ্ট্রের সঙ্গে দরিদ্র নাগরিকের সামাজিক চুক্তি খুব সরল। তার সন্তান হয়তো বেসরকারি হাসপাতালে যাবে না, বিদেশে চিকিৎসা নেবে না, ক্ষমতাবান কাউকে ফোন করতে পারবে না। কিন্তু অন্তত যে টিকাটি রাষ্ট্র বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা, সেটি সময়মতো পাবে, এই ন্যূনতম বিশ্বাসটুকু তার থাকার কথা। সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে ক্ষতি শুধু মহামারিবিদ্যার নয়; ক্ষতি রাজনৈতিকও।
সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোই এই ব্যর্থতার মূল্য সবচেয়ে বেশি দিচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে একজন গৃহকর্মী মায়ের কথা এসেছে, যিনি অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে চারটি হাসপাতালে ঘুরেও শয্যা পাননি; পরে টিকাকেন্দ্রে ফিরে গিয়ে জানতে পেরেছেন টিকা নেই।  এই এক ঘটনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবৈষম্যের পুরো রাজনৈতিক অর্থনীতিকে প্রায় সংক্ষেপে বলে দেয়। ভাইরাস শ্রেণি দেখে না; কিন্তু কে টিকা পাবে, কে শয্যা পাবে, কে চারটি হাসপাতাল ঘুরবে, সেটা শ্রেণি ঠিকই নির্ধারণ করে।
এখন সরকারের উচিত হাম-চলাকালীন জাতীয় পর্যালোচনা শুরু করা। কোথায় কত শিশু বাদ পড়েছে, কেন বাদ পড়েছে, জনসংখ্যার হিসাব এত অসামঞ্জস্যপূর্ণ কেন, কোন জেলায় টিকার প্রকৃত কভারেজ কত, হাসপাতালের সক্ষমতা কোথায় ভেঙেছে, এবং এপ্রিলের জরুরি কর্মসূচির পরও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ এত উঁচু কেন, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে দিতে হবে। মহামারি শেষ হওয়ার অপেক্ষা করার কোনো যুক্তি নেই; ভুল যদি এখনও ঘটতে থাকে, শেখাটাও এখনই দরকার।
রাজনৈতিক আনুগত্য আর জনস্বাস্থ্যের মধ্যে সীমারেখা টানতে হবে। আগের সরকারকে দায়ী করলে বর্তমান সরকারের অক্ষমতা বৈধ হয়ে যায় না; আবার বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের দায়ও মুছে যায় না। রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা যেমন থাকে, জবাবদিহিরও ধারাবাহিকতা থাকতে হয়।
বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। সেই দেশ আজকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রে। শুধু ভাইরাসের প্রত্যাবর্তন নয়, হাম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বহু দশকে তৈরি জনস্বাস্থ্য অর্জন ধ্বংস করতে খুব বেশি সময় লাগে না, কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্ত, দুর্বল নজরদারি, অসম্পূর্ণ তথ্য এবং কয়েক মাসের প্রশাসনিক আত্মতুষ্টিই যথেষ্ট।
আর এক হাজার শিশুর কবরের পরও যদি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া আগের মতোই থাকে, তাহলে সবচেয়ে ভয়ংকর রোগ হলো, প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার রাষ্ট্রীয় অভ্যাস।

মন্তব্য করুন

Logo