Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

কাঞ্চনজঙ্ঘা এইবার !

ছবিঃ ফিরোজ আল সাবাহ এর ফেইসবুক পেইজ থেকে সংগৃহীত

ফিচার

কাঞ্চনজঙ্ঘা এইবার !

Icon

ফিরোজ আল সাবাহ

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম

ছবিটা  দেখে মনে হতে পারে কোন সাজানো গোছানো ছবি।ভোর বেলা, দুইটা ছোট্ট ছেলে দুজনের পড়নের লাল গেঞ্জি।একজনের আবার জুতাও লাল। একজন আরেক জনের কাঁধে হাত দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখাচ্ছে!! সাজানো মনে হওয়াই স্বাভাবিক। আমার নিজের ও কেমন জানি লাগছিলো। কিন্তু এটা একেবারেই সাজানো ছবি নয়। এটা নিখাদ দৈবাৎ ছবি। সাজানো ছবি আমার কম পছন্দ।প্রাণ থাকে না। এজন্য আমার ছবি অনেক কম। লাঙ্গল কাঁধে যে ছবিটা আছে কাঞ্চনজঙ্ঘার সেটাও আচমকা তোলা, এমন ছবি ছবি বছরে দুই একটা হয়। 

 ওরা দুইজন আপন সহোদর। কলের পাখির শব্দ পেয়ে এসেছে। একজন মক্তব যাওয়ার জন্য বের হয়েছিলো। সে শব্দ পেয়ে তার ভাইকে ঘুম থেকে টেনে উঠিয়ে  উড়ুক্কু দেখাতে নিয়ে এসেছে। গল্পটা তাহলে শুরু থেকেই শুরু করা যাক।
 
শুরুটা হলো গত পরশু রাত আড়াইটায় ! পুরো পঞ্চগড় শহর ঘুমে তলিয়ে গেছে, অফিসের পাশে একটা লক্ষ্মীপেঁচা ক্রমাগত ডাকছে। প্রায়ই শুনি তার ডাক।মাঝেমধ্যে উড়ে যেতে দেখি। আশেপাশে কোন বিল্ডিং এ তার বাস। তাই তেমন আগ্রহ দেখাইনা। বিল্ডিং এর কার্নিশে বসে থাকা পাখি মোটে দেখার বিষয় নয়। পাখি থাকবে গাছের ডালে, বিশেষ করে পেঁচা। কিন্তু প্রাচীন সব গাছ আমাদের পেটে চালান হয়ে গেছে। পেঁচা বেচারা আর কই থাকবে? 

পেঁচার ডাক শুনতে শুনতে আমরা চারজন রাতজাগা শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে রাস্তায় বের হলাম।পেটে রাজ্যের ক্ষিদে! একটা কাজের ডেডলাইন ছিল। সন্ধ্যা থেকে চলছিলো সম্পাদনা।শেষ হতে হতে আড়াইটা। আপাতত হাফ ছেড়ে বাঁচা গেলো।এখন অর্থবাহক চর্ম বটুয়ার স্বাস্থ্যের উন্নতির অপেক্ষা। খেয়ে দেয়ে ঊর্ধ্বাকাশে তাকাতে একটা রোমাঞ্চের গন্ধ পাওয়া গেলো। মাথার উপরে আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার! কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলীর সব সদস্যকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রাতের আকাশের উজ্জলতম নক্ষত্র লুব্ধক মনে হচ্ছে পৃথিবীর একদম কাছে চলে এসেছে। ঠান্ডা হাওয়ায় মিলল এক আশ্চর্য রোমাঞ্চের সুবাস। তাপমাত্রাও অনেক নেমেছে। এটা আরও বড় চাঞ্চল্যের কারন। আমার হাবভাব দেখে সঙ্গী সাথীরা বুঝে গেছে আমার মতিগতি। সাথে আবার ক্যামেরা ব্যাগ ও আছে। সবার চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু। আমার অবস্থাও তাই।  আমার কাছে দুটো অপশন এক বাড়ি গিয়ে ঘুম দেয়া, যে ঘুম ভাঙবে পরদিন দুপুরে। অপশন দুই হলো ঘুমকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তেঁতুলিয়ার দিকে রওয়ানা দেয়া। স্বভাবতই আমি অপশন দুই বেছে নিলাম। গরু মাংসের যেমন কোন বিকল্প নেই এটার ও তেমন বিকল্প নেই। 

কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে, সবাইকে বিদায় দিয়ে আমি একা রওয়ানা দিলাম তেঁতুলিয়ার উদ্দেশ্যে! ঘড়িতে তখন সময় ভোর সাড়ে চারটা। হাতে সময় দেড় ঘণ্টা! একদম ফাকা হাইওয়ে।শেয়াল ছাড়া আর কোন চিন্তার কারন নেই। ঠাণ্ডায় অবস্থা শোচনীয় হয়ে যেত যদি জাম্পার সাথে না নিতাম।  নতুন বাহনকে খুব একটা চাপ না দিয়েই সময়মত পৌঁছে গেলাম তেঁতুলিয়া। 

যেতে যেতে গ্রীক সুন্দরী ভেনাসের রূপের যা অবস্থা দেখলাম। তাতে আর তেমন উচ্চাশা করলাম না। আকাশ মাথার উপর পরিষ্কার কিন্তু দিগন্তে প্রচুর জলীয়বাষ্প,ধূলিকণা,পলুট্যান্টস।কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেলেও খুব একটা পরিষ্কার দেখা যাবেনা। তাতে অবশ্য তেমন কিছু যায় আসেনা। তেঁতুলিয়ার সকালগুলো এমনিতেই দেখার মত। জুয়েল দশ মিনিটে রেডি হয়ে বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। এটা কম আশ্চর্যের বিষয় নয়।

তখন ফজরের আযান হচ্ছে!! আমরা ছুটে চলেছি... পুর্বাকাশ রক্তিম। বিস্তৃত চা বাগান এর উপরে কুয়াশার আস্তরণ। যেন কেও সাদা চাঁদর বিছিয়ে দিয়েছে! এত ঠান্ডা লাগবে জুয়েল বুঝেনাই। গাড়ির পিছনে গুটিসুটি হয়ে বসে রইলো। উত্তরাকাশ তখনো ঘোলাটে। কার্শিয়াং শহরের আলোও দেখা যাচ্ছেনা। ধীরে ধীরে গাড়ির গতি আপনা থেকেই কমে গেলো! এত দ্রুত গিয়ে লাভ নেই। এর চেয়ে বরং সকালটা উপভোগ করি! কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা দিলো! কুয়াশামাখা!! 

দিগন্তে হয়ত জলিয় বাষ্প আর ধূলিকণার পর্দা ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘার ঝলক আমাদের চোখে সেভাবে পৌঁছায়নি কিন্তু মেঠো পথের ঠাণ্ডা বাতাস আর স্নিগ্ধ স্ফটিকের মত তেঁতুলিয়ার সকাল যেন সব ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে দিলো। আজ ছবির দিন নয় !! মন ভরে দেখলাম। ছোট এক বাজারে গিয়ে ডিম পরোটা খাওয়ার পরে মনে হলো এবার কুম্ভকর্ণের মত একটা ঘুম দিতে হবে । তেঁতুলিয়া থেকে মাউন্ট ফুজি দেখা গেলেও আর জেগে থাকা যাবেনা। সেই যে ঘুমালাম সকাল দুপুর হয়ে গেলো। বিকেলটা এদিক সেদিক করে হুমায়ুন ভাই , কবির ভাইরা সহ সন্ধ্যাটা কাটল ভরপুর আড্ডায়। এরপর রাতে খেয়ে আবার ঘুম। আবার প্রতীক্ষা আরেকটা সকালের। সকাল প্রতিদিন ঘুম ভাঙলেই হয়। কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে এমন সকাল বছরে কয়েক দিন ই হয়। এবং সে সকাল মিস করতে চাইনা।

এবারের এলার্ম  টা বাজলো জুয়েলের বাসায়। তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে বের হলাম। আজ ঠাণ্ডা গতকালের চেয়ে তীব্র। জুয়েল আর ভুল করেনি। ভারী কাপড় ও হেলমেট নিয়ে নিয়েছে। আধাঘণ্টা বাইক চালিয়ে পৌছালাম জায়গামত। উষালোকে দেখা যাচ্ছে রুপালী কাঞ্চনজঙ্ঘা!! এ যে কি এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য যা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না। সেই রুপালী কাঞ্চনজঙ্ঘায় যখন সুর্যের প্রথম কিরণ এসে পড়লো। পুরো রূপার পর্বত সোনায় পরিণত হয়ে গেলো। মাটির উপরের কুয়াশার চাঁদর কে পাশ কাটিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘায় প্রথম আলো ধরতে আগেই ফ্লাই করেছি। কুয়াশা কাটিয়ে সে এক অভূতপুর্ব দৃশ্য। কলের পাখির জান্তব শব্দে ছুটে এসেছে ছোট্ট দুই বন্ধু।কলের পাখি যখন দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো। তখন তাদের বললাম পর্বত  দেখো। 

 তারা দুই ভাই শিশির স্নাত মেঠো পথ ধরে এদিক সেদিক হাটতে লাগলো। পর্বতে তাদের মন নেই। তারা ঐ উড়ুক্কু জিনিষটা আবার দেখতে চায়। সেই জিনিষ তো আর ফিরে আসেনা। অন্তত চল্লিশ মিনিট তো উড়বেই।  

দুই ভাই একসময় আনমনে হয়ে তাকিয়ে রইলো হিমালয়ের প্রতি। ছোট্ট কোমল মন ও এই অপার সৌন্দর্যে তলিয়ে গেছে... ভুলে গেছে উড়ুক্কুর  কথা। ঠিক এমন সময় দেখি দুজনে হেঁটে আসছে একটা আল ধরে, পিছনে সোনা মোড়ানো কাঞ্চনজঙ্ঘা। রিমোট ধান ক্ষেতে ফেলে ক্যামেরা বের করে ছবি তোলা শুরু করলাম। এই ছবিটা তুলে এমন এক ভালো লাগা কাজ করলো!! ছবি তো কত তুলেছি। কিন্তু চিন্তা ভাবনা ছাড়া  হুট করে এমন ছবি হলে সোনায় সোহাগা। 

হিমালয়ের সেই চিরন্তন রূপের সামনে দাঁড়িয়ে দুই ভাই যেন আজ আত্মহারা, মায়াবিষ্ট। এমন অতল বিস্ময়ে হয়তো এর আগে কখনো তারা তাকায়নি ওই শুভ্র তুষারমৌলির দিকে। কখনো নিবিড় বিশ্বাসে পরস্পর হাত ধরাধরি করে, আবার কখনো গভীর ভালোবাসায় একে অপরের গলা জড়িয়ে তারা হেঁটে বেড়াচ্ছে চড়াই উতরাইয়ে। হঠাৎই একজন চঞ্চল পায়ে ছুটে গেল শ্বেতশুভ্র কাশফুলের ঝোপে, সেখান থেকে ডাক দিল অনুজকে। দুই ভাইয়ের এই নিখাদ, প্রাণবন্ত মেলবন্ধন আমি দূর থেকে দেখছিলাম। জীবনের ক্যানভাসে এত স্নিগ্ধ,এত জীবন্ত দৃশ্যপট আমি খুব কমই দেখেছি। ছবি তোলার মত এমন বিষয় বস্তুও কম পেয়েছি। 

মন্তব্য করুন

Logo