ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
কিছু কিছু নাম অভিধানে থাকে না।
থাকে শুধু জিভের ডগায়, মায়ের হাঁকডাকে, হাটের কোলাহলে অথবা দূরের কোনো গ্রামের মেঠোপথে। যে পথে কুয়াশার ভোরে ঘাসের সাথে শিশিরের ফোটাফোটা জল মিশে থাকে। মাধাই নামের গ্রামটিও তেমনই এক নাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের বুকের ভেতর সেঁধিয়ে থাকা একটুকরো ধুলো ও ধানক্ষেতে ঘেরা সেই গ্রাম। যার নাম উচ্চারণ করলে ঢাকার মানুষ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে— কোথায় সেটা! কোন জেলায় পড়ে! অথচ এই মাধাইয়ের মাটিতেই একদিন এক শিশু হামাগুড়ি দিয়েছিল। যার নাম হবে কাজল এবং যে শিশুর জাত হবে ‘তুরি’।
তুরি এটি এমন এক জনগোষ্ঠী যাদের নাম বাংলাদেশের আদমশুমারির পাতার কোনো এক কোণে সংকুচিত হয়ে বসে থাকে। যেমন করে শীতের রাতে কুকুর গুটিসুটি মেরে বসে থাকে চালার নিচে।
‘তুরি’রা কারা! এই প্রশ্নের উত্তর অধিকাংশ বাঙালিরই জানা নেই। জানার দরকারও পড়ে না। ইতিহাস তো লেখা হয় যারা জমি রাখে, যারা মহল রাখে, যারা কলম রাখে তাদের হাতে। যারা কেবল বাঁশ কাটে, বেত চাঁছে, অন্যের জমিতে দিনমজুরি খাটে, তাদের কথা ইতিহাসের পাদটীকাতেও জায়গা পায় না। অথচ এই তুরিরাই একদিন ছোটনাগপুরের মালভূমি থেকে হেঁটে হেঁটে অথবা রেলগাড়ির কয়লার গন্ধমাখা কামরায় গাদাগাদি হয়ে পূর্ববঙ্গের চা-বাগানে এসে নেমেছিল ব্রিটিশের হুকুমে, খিদের তাড়নায় অথবা নিয়তির অদ্ভুত রসিকতায়। তারপর চা-বাগানে কাজের সুযোগ ফুরালে তারা ছড়িয়ে পড়েছিল রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী,নওগাঁ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ কিম্বা জয়পুরহাটের কোনো কোনো প্রান্তরে। নিজেদের ভাষা মুণ্ডারির টুকরো টুকরো স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে এসছিল তারা। যে ভাষার কোনো হরফ নেই। যে ভাষা শুধু মুখে মুখে বাঁচে। মায়ের ঘুমপাড়ানি গানে বাঁচে। আর প্রতিটি প্রজন্মে একটু একটু করে সেই ভাষা বাংলার জলে গলে যায়। যেমন বরফ গলে যায় রোদের তলায়।
এই গল্প সেই গলে যাওয়া জাতির এক অগলা সন্তানের গল্প। নাম তার কাজল পাঁড়ে।
মাধাই গ্রামের একেবারে পুবের মাথায়, যেখানে বাঁশঝাড় নুয়ে পড়ে ডোবার জলে মুখ দেখে, সেখানে একটা মাটির দাওয়ায় বসে থাকতেন নরেশ পাঁড়ে। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। চোখে ছানি পড়ার আগেই যেন মনের ভেতরে এক গভীর ছানি পড়ে গিয়েছিল তাঁর অতীতের ওপর। নরেশকে গ্রামের মানুষ ঠাকুর নামেই ডাকত। যদিও তিনি কোনো পুরোহিত ছিলেন না, ছিলেন কেবল এক বৃদ্ধ। যাঁর স্মৃতিতে জমা ছিল পাঁচ দশকের খরা, বন্যা, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ আর অপমানের হিসাব।
নরেশ বলতেন, বাবা রে, আমরা তো মানুষ হিসাবেই গণ্য হইনি কোনোদিন। জমিদার আমলে জমিদারের ছেলে আমাদের বাচ্চাদের ঢিল মারত খেলার ছলে। আমরা কিছু কইতে পারতাম না। পাকিস্তান আমলে থানার দারোগা আমাদের দেখলে নাক সিটকাত। বলত, ওই ‘তুরি’গুলা আবার হাটে ঢুকছে ক্যানে। স্বাধীনতার পরও তেমন কিছু বদলায় নাই বাপ। খালি সরকার বদলাইছে। আমাদের ভাগ্য বদলায় নাই।
নরেশের কথায় এক আশ্চর্য ছন্দ ছিল। বাংলা আর মুণ্ডারির মিশেলে গড়া এক ভাষার সুর। যা শুনলে মনে হতো কোনো পুরনো নদীর স্রোত কথা বলছে। তিনি বলতেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা ইশকুলে গেলেও বেশিদূর যাইতে পারত না। মাস্টাররা বলত, তোদের তো লেখাপড়া শিখেই বা কী হবে, বাপ-দাদার মতো বাঁশের কাজ করবি। নয়তো মানুষের ক্ষেতে দিন খাটবি। এই কথা শুনতে শুনতে আমাদের ছেলেরাও নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছিল। বড় স্বপ্ন তো দেখার সাহসটাই যেন কোথাও হারিয়ে গেছিল।
তবু নরেশের চোখে একটা আলো ছিল। যেটা তিনি নিজেও ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারতেন না। তিনি বলতেন, বাবা, মানুষ যত অভাবেই থাকুক, স্বপ্নটা কিন্তু কেউ কাইড়া নিতে পারে না। ওইটা মনের ভেতর জোনাকির মতো জ্বলে।কখনো তা নিভে, আবার জ্বলে। কাজলের বাবা নরেশও তেমনই এক জোনাকি বুকে নিয়ে হাঁটত।
নরেশ পাঁড়ের কোনো জমি ছিল না। ভিটেটুকু বাদে, যেটুকু মাটি তার নিজের বলে দাবি করার অধিকার ছিল, তা এক চিলতে উঠোন আর একখানা মাটির ঘর। যার চালে খড়ের বদলে টিনের টুকরো। বৃষ্টি এলে যে টিনের ফুটো দিয়ে জল পড়ত টুপটাপ আর নরেশের বউ পঞ্চমী সেই জলের নিচে হাঁড়ি পাতিল বসিয়ে রাখত। যাতে বিছানা না ভেজে।
নরেশ পরের জমিতে খাটত। ধান কাটার মরসুমে দিনে দুইবেলা কাজ পেত। বাকি সময় হাটে বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে বসত। যদিও প্লাস্টিকের ঝুড়ির যুগে বাঁশের ঝুড়ির খদ্দের দিনকে দিন কমে যাচ্ছিল। এমনই এক শীতের রাতে যখন কুয়াশা এসে উঠোনের নিমগাছটাকে ঢেকে ফেলেছিল তখন পঞ্চমীর কোল আলো করে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। ধাত্রী বলেছিল ছেলের চোখ দুটো বড় বড়,। কালো কাজলের মতো টানা টানা। পঞ্চমী তখনই ঠিক করে ফেলে ছেলের নাম। ওর নাম হবে কাজল।
নরেশ সেই রাতে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখেছিল। আকাশে তারা ছিল অসংখ্য। কিন্তু নরেশের মনে হয়েছিল একটা তারা যেন তার ছেলের জন্য আলাদা হয়ে জ্বলছে! সে মনে মনে বলেছিল বেটা, তুই বড় হইয়া কিছু একটা হইস। আমার মতো সারাজীবন মাটির সাথে যুদ্ধ করিস না। যদিও সেই মুহূর্তে নরেশ নিজেও জানত না কী হওয়া সম্ভব আর কী অসম্ভব। তার কল্পনার সীমানাও তো ছিল তার নিজের জীবনের সীমানার মতোই সংকীর্ণ।
কাজলের শৈশব কেটেছে দারিদ্রের এক নিরবচ্ছিন্ন পাঠশালায়। সকালে পান্তা ভাত জুটলে দুপুরে জুটত না। দুপুরে জুটলে রাতে জুটত না। মায়ের হাতে যেদিন সামান্য মুড়ি থাকত সেদিনই ছিল উৎসবের দিন। কাজল মনে করতে পারে ছোটবেলায় একবার তার জ্বর হয়েছিল। আর মা পাশের বাড়ি থেকে এক টুকরো আদা ধার করে এনেছিল। কারণ ঘরে নিজের কোনো আদা ছিল না।
গ্রামের অন্য শিশুরা যখন খেলত কাজল তখন প্রায়ই পরের জমিতে কাজ করতো অথবা বাবার সাথে হাটে যেয়ে ঝুড়ি সাজিয়ে দিত। তার সমবয়সী এক বন্ধু একদিন তাকে বলেছিল তুই তো তুরি তোরা নাকি ঐ পশু খাস! তোদের ছোঁয়া লাগলে নাকি আমরা অপবিত্র হয়ে যাই। কাজল সেদিন কিছু বলেনি। শুধু মাটির দিকে তাকিয়ে থেকেছিল। বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল মা, আমরা কি খারাপ মানুষ? পঞ্চমী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল না রে বাপ, আমরা খারাপ না। আমরা গরিব। এইটাই আমাদের একমাত্র দোষ। মানুষ গরিবরে দেখলে খারাপ ভাবে। এইটাই দুনিয়ার নিয়ম। তুই বড় হইয়া দেখাইয়া দিস তুরিরাও মানুষ।
এই একটি বাক্য ‘তুই বড় হইয়া দেখাইয়া দিস’—কাজলের মনে গেঁথে গিয়েছিল এক বীজের মতো। যে বীজ অনেক বছর ধরে মাটির নিচে চুপচাপ থেকে একদিন অঙ্কুরিত হবে।
মাধাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাজল যখন ভর্তি হয় তখন তার বয়স সাত। ক্লাসের অন্য ছেলেমেয়েরা তার সাথে বসতে চাইত না প্রথম প্রথম। কারণ কাজলের পরিচয় জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। ও তুরির ছেলে। শিক্ষকরাও তেমন মনোযোগ দিতেন না। একজন মাস্টার একবার বলেছিলেন তুরিদের ছেলেমেয়েরা বেশিদূর পড়ে না। ওদের মাথায় বিদ্যা ঢোকে না।
কিন্তু কাজলের রোল নাম্বার যখন ডাকা হয় ক্লাস থ্রিতে, তখন সেই মাস্টারও অবাক হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন তুই তো ভালোই পড়িস রে। কাজল সেদিন প্রথমবার নিজের ভেতর একটা অন্যরকম শক্তি অনুভব করেছিল।যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর একটা অধিকার সে অর্জন করেছে।
তবে সেই অধিকার প্রতিদিন প্রমাণ করতে হতো। প্রতিটি পরীক্ষায় ভারো ফল না হলে যেন তার জাতটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেত। এক সহপাঠীর মা একবার বলেছিলেন ওই তুরির ছেলে তো আমার ছেলের চেয়ে ভালো নম্বর পায়। তাহলে আমার ছেলে কি করে? এই কথাটা কাজলের কানে এসেছিল ঘুরে ঘুরে। আর সে তখন বুঝেছিল তার সাফল্য কারো কারো কাছে একটা অস্বস্তির নাম।
হাইস্কুলে ওঠার পর কাজলের বইয়ের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে। কিন্তু বই কেনার টাকা কোথায়? সে পুরনো বই খুঁজে বেড়াত। বড় ভাইদের কাছ থেকে ধার নিত। কখনো কখনো স্কুলের লাইব্রেরিতে বসে বসেই পড়ে ফেলত পুরো একটা অধ্যায়। রাতে যখন ঘরে বিদ্যুৎ থাকত না তখন সে হারিকেনের আলোয় বই পড়ত। এসময় তার চোখ জ্বালা করত। কিন্তু কাজল সেসময়েও বই বন্ধ করত না।
একবার পরীক্ষার আগের রাতে হারিকেনের তেল ফুরিয়ে গিয়েছিল। কাজল সেই রাতে জানালার পাশে বসে চাঁদের আলোয় বই পড়ার চেষ্টা করেছিল। যদিও চাঁদের আলোয় অক্ষর ঠিকমতো বোঝা যেত না। পঞ্চমী সেই দৃশ্য দেখে পাশের ঘরের এক মাসির কাছ থেকে এক টাকার তেল ধার করে এনেছিল। কাজল এই ঘটনাটা কখনো ভুলতে পারেনি। সে বুঝেছিল তার প্রতিটি পরীক্ষার পেছনে তার মায়ের এমন বহু নিঃশব্দ ত্যাগ জমা হয়ে আছে। যেগুলোর হিসাব কোনোদিন কেউ রাখেনি।
দশম শ্রেণির শিক্ষক একদিন ক্লাসে বলেছিলেন তোমাদের মধ্যে কেউ যদি সত্যিই স্বপ্ন দেখতে চাও, তাহলে জেনে রাখো, স্বপ্নের কোনো জাত নেই, কোনো শ্রেণি নেই। কাজল সেদিনই প্রথমবার বুঝতে পেরেছিল স্বপ্ন জিনিসটা আসলে কেমন।তাহলে বিচারক হওয়ার স্বপ্নটা তার মনে কীভাবে জন্ম নিয়েছিল! আসলে তার নিজের জীবনের প্রতিটি অন্যায়, প্রতিটি অবহেলা, প্রতিটি বৈষম্যের অভিজ্ঞতাই তাকে ন্যায়ের প্রতি এক গভীর আকাঙ্ক্ষায় ঠেলে দিয়েছিল। যে ছেলে নিজের জীবনে বিচার পায়নি বারবার, সেই ছেলেই হয়তো একদিন বিচার দেওয়ার আসনে বসতে চেয়েছিল সবচেয়ে বেশি।
এসএসসি আর এইচএসসি পার করে যখন কাজল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল তখন গ্রামে এক অদ্ভুত শোরগোল উঠেছিল। কেউ কেউ বলেছিল ছেলেটা তো সত্যিই মেধাবী। আবার কেউ কেউ বলেছিল, তুরির ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে! খাওয়াবে কে! থাকবে কোথায়?
নরেশ সেই সময় নিজের একমাত্র সম্বল একটা বাছুর বিক্রি করে দিয়েছিল ছেলের ভর্তির টাকা জোগাড় করতে। পঞ্চমী নিজের বিয়ের সময়ের সোনার নাকফুলটাও বিক্রি করেছিল। কাজল এই কথা জানত। সে যখন প্রথমবার রাজশাহী শহরে যাবার বাসে উঠল তখন তার পকেটে ছিল মাত্র কয়েকশো টাকা। তবে বুকের ভেতর ছিল এক পাহাড়সমান দায়িত্ববোধ।
শহরে এসে কাজল প্রথম যে জিনিসটা বুঝেছিল তা হলো সবার জীবনযাত্রার মান সমান নয়। তার সহপাঠীরা মোবাইল ফোন নিয়ে ঘুরত। রেস্তোরাঁয় খেত। নতুন জামা কিনত। কাজলের কাছে একটা পুরনো ব্যাগ ছিল। যার চেইন ভাঙা। আর জামা ছিল হাতে গোনা মাত্র দুইটা । তবু সে কখনো নিজেকে ছোট ভাবেনি। বরং প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে নিজেকে মনে করিয়ে দিত তুই এখানে এসেছিস পড়াশোনা করতে। প্রতিযোগিতা করতে। ফ্যাশন করতে নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার খরচ চালাতে কাজল টিউশনি শুরু করে দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই। সকালে ক্লাস। বিকেলে টিউশনি। রাতে নিজের পড়াশোনা। এই তিনভাগে বিভক্ত জীবনে ঘুমের জন্য বরাদ্দ থাকত মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টা। একদিন এক ছাত্রকে পড়াতে পড়াতে কাজলের ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছিল। তখন সেই ছাত্রের মা এসে বলেছিলেন স্যার আপনি কি ঘুমিয়ে যাচ্ছেন? কাজল লজ্জায় সোজা হয়ে বসেছিল। সেই রাতে হোস্টেলে ফিরে সে নিজের ওপর রাগ করেছিল। নিজেকে বলেছিল আর এমন হবে না।
টিউশনির টাকা দিয়ে সে নিজের খরচ চালাত। আবার মাসে মাসে বাড়িতেও কিছু টাকা বাড়িতে পাঠাত। নিজের জন্য নতুন জামা কেনার কথা কখনো ভাবত না। কিন্তু বাবার জন্য একবার একটা লুঙ্গি কিনে পাঠিয়েছিল। আর মায়ের জন্য একটা শাড়ি। সেই শাড়ি হাতে পেয়ে পঞ্চমী কেঁদেছিল। কারণ এই প্রথম তার ছেলে তাকে নিজের রোজগারের টাকায় কিছু কিনে দিয়েছিল।
রাতের পর রাত জেগে বই পড়ার অভ্যাসে কাজলের চোখের নিচে কালো হয়ে গিয়েছিল দ্বিতীয় বর্ষেই। বন্ধুরা মজা করে বলত তুই তো পড়াশোনার পোকা হয়ে গেলি রে। কাজল হাসত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানত তার কাছে পড়াশোনা শুধু পাসের বিষয় নয়। এটাই তার একমাত্র অস্ত্র। যা দিয়ে সে নিজের এবং নিজের জাতির জন্য একটা জায়গা তৈরি করবে।
আইন পড়তে গিয়ে কাজল প্রথমবার বুঝেছিল তার নিজের জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা কীভাবে আইনের বইয়ের পাতায় লেখা তত্ত্বের সাথে মিলে যায়। সংবিধানের সমতার অধিকার নিয়ে যখন ক্লাসে পড়ানো হতো কাজল মনে মনে ভাবত আমার গ্রামে তো এই সমতার প্রয়োগ কোনোদিন দেখিনি। যখন ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা হতো তখন তার মনে পড়ত সেই ছোটবেলার দিনগুলোর কথা। যখন তার জাত পরিচয়ের কারণে তাকে ছোট চোখে দেখা হতো।
তাঁর শিক্ষক চন্দন স্যার একদিন ক্লাসে বলেছিলেন আইন হলো এমন একটা কাঠামো যা সবাইকে সমান চোখে দেখার প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও বাস্তবে তার প্রয়োগ সবসময় সমান হয় না। এই দায়িত্ব তোমাদের। যারা আইন শিখছ তাদেরই এই দায়িত্ব নিতে হবে। যাতে সেই প্রতিশ্রুতি একদিন বাস্তবে রূপ নেয়। কাজলের সেই কথাটা মনে গেঁথে নিয়েছিল। এইসব কারণে চন্দন স্যারকে সে খুবই পছন্দ করতো। ডিপার্টমেন্টের অন্য স্যাররাও কাজলকে স্নেহ করতেন।
২০১৭ সালে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিনই কাজল নিজেই মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল। সে বিচারক হবে। সেই প্রতিজ্ঞা তখন অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হয়েছিল। কারণ তুরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তখনও কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় ভর্তি হয়নি। বিচার বিভাগের কথা তো দূরের কথা!
স্নাতক শেষ করার পর কাজল বিসিএস এবং বিজেএস দুই পরীক্ষার জন্যই প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। প্রস্তুতির এই বছরগুলো ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। একদিকে রোজগারের চাপ অন্যদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি। রাতে পড়াশোনা, দিনে টিউশনি, আর মাঝেমধ্যে নিজের ভেতরে জমতে থাকা হতাশাকে সামলাত একা একা।
একবার এক বন্ধু তাকে বলেছিল এত কষ্ট করে কী লাভ! তোদের মধ্যে কেউ তো কোনোদিন এই পর্যায়ে যেতে পারেনি। তুইও পারবি না। কাজল সেই রাতে ঘুমাতে পারেনি। সে জানালার পাশে বসে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল যদি আমি হাল ছেড়ে দিই তাহলে আমার পরে যে ছেলেটা স্বপ্ন দেখবে সে-ও হয়তো হাল ছেড়ে দেবে। এই ভাবনাটাই তাকে আবার বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে এনেছিল।
পরীক্ষায় প্রথমবার সে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। দ্বিতীয়বারও না। তৃতীয়বার যখন পরীক্ষায় বসল তখন তার মনে একটা অদ্ভুত শান্তি এসেছিল। যেন সে জানত, পরাজয়ে ডরেনা বীর। এবার তার জয় হবেই হবে। এই বিশ্বাসের পেছনে কোনো যুক্তি ছিল না। ছিল শুধু আট বছরের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের এক অন্তর্গত আত্মবিশ্বাস।
একটা বুধবারের সন্ধ্যা। কাজল তখন রাজশাহীতে নিজের মেসে বসে ছিল। একটা পুরনো বই হাতে ছিল। ম্যাক্সিম গোর্কির লেখা ‘মা’ উপন্যাস। যদিও পড়ায় মন বসছিল না। হঠাৎ এক বন্ধুর ফোন এলো সেসময়।জুডিসিয়িারীর ফল বেরিয়েছে। কাজলের হাত কাঁপছিল ওয়েবসাইট খুলতে। যখন সে নিজের রোল নম্বরের পাশে সিভিল জজ পদের জন্য সুপারিশপ্রাপ্তদের তালিকায় নিজের নাম দেখল তখন সে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেনি। দুইশো জনের মধ্যে তার অবস্থান একশো চল্লিশতম। নম্বরটা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ ছিল শুধু তার সম্প্রদায়ের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা স্বপ্নকে ডাল-পালা মেলে ছড়িয়ে দেয়া। সেটা সে পেরছে।
সে প্রথমে ফোন করেছিল মাকে। পঞ্চমী প্রথমে বুঝতে পারেনি কী বলছে ছেলে! যখন বুঝল তখন সে ফোনের ওপারে কাঁদতে শুরু করেছিল। এ ছিল আনন্দের কান্না। নরেশ তখন মাঠ থেকে ফিরছিল। স্ত্রীর কান্নার আওয়াজ শুনে দৌড়ে এসেছিল। ভেবেছিল কোনো দুঃসংবাদ। যখন জানল তার ছেলে বিচারক হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে গেছে তখন সে উঠোনে বসে পড়েছিল মাটিতে হাত রেখে। তার মনে হয়েছিল এই মাটিই তো তাকে এতদিন খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর আজ এই একই মাটির সন্তান দেশের ন্যায়বিচারের অংশ হতে চলেছে।
কাজল যেদিন রাজশাহী থেকে গ্রামে ফিরল সেদিন মাধাই গ্রামের চেহারাটাই যেন বদলে গিয়েছিল। স্কুলের ছেলেমেয়েরা ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তার মাথায়। বাড়ির উঠোনে ভিড় জমে গিয়েছিল।প্রতিবেশী, আত্মীয়, এমনকি পাশের গ্রামের মানুষও এসেছিল একনজর দেখতে সেই ছেলেকে। যে তুরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম বিচারক হতে চলেছে।
কাজলের বড় বোন কল্পনা তার হাত ধরে বলেছিল- তুই তো আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করে দিলি রে। পঞ্চমী শুধু ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছিল। কোনো কথা বলতে পারছিল না। নরেশ সেদিন প্রতিবেশীদের বলেছিল হামাদের কী যে আনন্দ হোইছে, কহিতে পারবো না। হামাদের বেটা যানি অনেক বড় হয়, গরিবের উপকারে লাগে।
গ্রামের মোড়ল নিরঞ্জন তিরকি সেদিন বলেছিলেন কাজলকে দেখে এখন থেকে আদিবাসী ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় উৎসাহ পাবে। এই একটা কথা যেন গোটা গ্রামের ভবিষ্যতের একটা রূপরেখা এঁকে দিয়েছিল।
সবচেয়ে গভীর দৃশ্যটা ঘটেছিল সন্ধ্যার দিকে। যখন তাদের গ্রামের জরাধন পাঁড়ে নিজের দাওয়া থেকে উঠে ধীর পায়ে হেঁটে এসেছিলেন কাজলদের উঠোনে। তাঁর হাতে ছিল একটা লাঠি। যেটা ছাড়া তিনি সাধারণত ঘরের বাইরে বেরই হতেন না। কাজলকে দেখে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর তার হাত ধরে বলেছিলেন, আনন্দেতে কান্দন আসছে রে ভাই। এ রকম জাগাতে হামাদের জাতিগোষ্ঠীর আর কেহু যাইতে পারিনি।
জরাধনের চোখের জল কাজলের হাতে পড়েছিল। আর সেই মুহূর্তে কাজলের মনে হয়েছিল এই একটা ফোঁটা জল যেন গোটা তুরি জনগোষ্ঠীর কয়েক দশকের নীরব সংগ্রামের সারাংশ। জরাধন সেদিন আরও বলেছিলেন আমি তো ভাবছিলাম আমার জীবদ্দশায় এমন দিন দেখতে পারব না। তুই দেখাইয়া দিলি বাবা, আমরাও পারি।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের এক প্রতিনিধি সেই সন্ধ্যায় গ্রামে এসে বলেছিলেন, উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র নৃ আদিবাসীদের মধ্যেও কাজলই প্রথম বিচার বিভাগে সুপারিশপ্রাপ্ত হলো। এই তথ্যটা যেন গোটা ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল। এটা শুধু একটা পরিবারের নয় একটা সমগ্র জাতিসত্তার ইতিহাসে একটা মাইলফলক।
সেই রাতে যখন উৎসবের কোলাহল থেমে এসেছিল কাজল একা বসেছিল উঠোনের সেই পুরনো নিমগাছের নিচে। যেখানে সে ছোটবেলায় বসে বই পড়ত। সে ভাবছিল তার নিজের যাত্রার কথা। ক্ষুধা,দারিদ্র, ক্লান্তি, একাকীত্ব আর তার মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠা সেই ছোট্ট আশার আলো দেখেছিল মনে মনে। যেটা কখনো সম্পূর্ণ নিভে যায়নি। আজ সেটার দেখা পেয়েছে সে।
কাজল জানে বিচারক হওয়ার সুপারিশ পাওয়া মানেই যাত্রার শেষ নয়। বরং এটা একটা নতুন দায়িত্বের শুরু। একজন বিচারকের আসনে বসে তাকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। আইনের প্রতি অনুগত থাকতে হবে। ব্যক্তিগত রাগ-অনুরাগকে বিচারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে দেওয়া যাবে না। সে মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল। আমি যেখানেই যাই যত বড় হই আমি আমার শিকড়কে ভুলব না। এই মাটি, এই গ্রাম, এই মানুষগুলো আমাকে যা শিখিয়েছে তা আমি সারাজীবন মনে রাখব।
কাজল পাঁড়ের গল্প কোনো রূপকথা নয়। এতে কোনো জাদুর কাঠি নেই। কোনো আকস্মিক সৌভাগ্যের ছোঁয়া নেই। আছে শুধু একটানা পরিশ্রম, ধৈর্য আর নিজের প্রতি এক অবিচল বিশ্বাস। আছে একজন বাবার বাছুর বিক্রি করে দেওয়ার আত্মত্যাগ, একজন মায়ের নাকফুল বিক্রি করে দেওয়ার নীরব কষ্ট, একজন প্রবীণের চোখের জলে জমে থাকা কয়েক দশকের অপেক্ষা।
তুরি জনগোষ্ঠীর মতো একটা প্রান্তিক জাতিসত্তার একটা সন্তান যখন ন্যায়বিচারের আসনের দিকে এগিয়ে যায় তখন সেটা শুধু একটা ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প থাকে না্। সেটা হয়ে ওঠে একটা সামাজিক বার্তা। এই বার্তাটা হলো মানুষের জন্মপরিচয় তার সম্ভাবনার সীমা নির্ধারণ করতে পারে না। একটা ভূমিহীন পরিবারের সন্তানও ন্যায়ের আসনে বসার স্বপ্ন দেখতে পারে। আর তার সেই স্বপ্নকে সে বাস্তবে রূপও দিতে পারে। যদি তাকে সুযোগ দেওয়া হয় আর সে নিজে সেই সুযোগের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে।
তবে এই গল্প আমাদের একটা প্রশ্নও রেখে যায়।বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তিক শিশুকে কি এমন সুযোগ দেওয়া সম্ভব? যদি একজন কাজল পারে তাহলে আরও হাজার কাজল কেন নয়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটাই এখন আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
মাধাই গ্রামের সেই মাটির ঘর থেকে ন্যায়ের আসনের দিকে যাত্রা করা কাজল পাঁড়ে আজ শুধু একটা নাম নয়—তিনি একটা প্রতীক, একটা সম্ভাবনার নাম, একটা জাতিসত্তার নীরব সংগ্রামের পর দেখা পাওয়া এক বিমূর্ত উদাহরণ । আবার হয়তো কোনো একদিন মাধাইয়ের মতো আরও কোনো গ্রামের কোনো অন্ধকার ঘরে বসে থাকা কোনো শিশু এই গল্প শুনে নিজের মুঠো শক্ত করে বলবে—আমিও পারব। সেই দিনই কাজল পাঁড়ের বিজয় সত্যিকার অর্থে সম্পূর্ণ হবে।
তোমাকে অভিবাদন, কাজল! তোমাকে অভিবাদন—
মন্তব্য করুন

