Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

সংগ্রাহক আসলাম হোসেন মৃধা ও তাঁর ‘প্রতিধ্বনি শিক্ষা কেন্দ্র’

ছবিঃ মো. আসলাম হোসেন মৃধা

ফিচার

আত্রাইয়ের নিভৃত পল্লীতে ইতিহাস ও শিক্ষার অপূর্ব মেলবন্ধন

সংগ্রাহক আসলাম হোসেন মৃধা ও তাঁর ‘প্রতিধ্বনি শিক্ষা কেন্দ্র’

Icon

মাহমুদ মোস্তফা

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম

বান্দাইখাড়া গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে গেলে আজও হয়তো সেই শৈশবের দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া যায়, যেখানে একসময় চিঠি লেখার শখ থেকে শুরু হয়েছিল এক স্বপ্নের বুনন। নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার বান্দাইখাড়ার বুকে গড়ে ওঠা এক পরম বিস্ময়—‘প্রতিধ্বনি শিক্ষা কেন্দ্র’। এর প্রতিষ্ঠাতা মো. আসলাম হোসেন মৃধা আজ শুধুই একটি নাম নন; তিনি নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার নিভৃত পল্লীর বুকে গড়ে ওঠা এক অনন্য স্বপ্নসারথি। নিজের শখ, দীর্ঘদিনের ডাকটিকিট সংগ্রাহক জীবন এবং শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন এই ব্যতিক্রমী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

১৯৮২ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার দিনগুলোতে আমাদের আর দশটা সাধারণ কিশোরের মতোই শুরু হয়েছিল তাঁর কলমি বন্ধু বানানোর শখ। তবে আসলামের সেই শখ শুধু চিঠির খামেই আটকে থাকেনি। খামের কোণে লেগে থাকা ছোট্ট ডাকটিকিটগুলোকে তিনি বানিয়ে নিয়েছিলেন বিশ্বকে জানার এক পরম জানালা। একে একে দেশ-বিদেশের স্মারক ডাকটিকিট, দুষ্প্রাপ্য মুদ্রা, মানচিত্র, ক্যাসেট, পেপার কাটিং এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিবন্ধ সংগ্রহ করতে থাকেন তিনি। সংগ্রাহক হিসেবে নিজের এই আত্মপ্রকাশের পাশাপাশি নিজ গ্রামে তিনি গড়ে তোলেন ‘DX-ক্লাব’ ও ‘অগ্রগামী ভিডিও ফ্যান ক্লাব’।

পরবর্তীতে ১৯৯০ ও ১৯৯১ সালে বান্দাইখাড়াতে স্থানীয়ভাবে একক ডাকটিকিট প্রদর্শনী আয়োজন করে তিনি বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের নজর কাড়েন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালের ২৬ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত ৫ দিনব্যাপী ‘জাতীয় ডাকটিকিট প্রদর্শনী ’৯২’-এ অংশ নেন। জাতীয় প্রদর্শনীতে বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশের স্মারক ও দুষ্প্রাপ্য ডাকটিকিট প্রদর্শন করে তিনি বেশ প্রশংসা অর্জন করেন।

আসলামের জীবনপথ অবশ্য নানা বৈচিত্র্যে ভরা। ১৯৮৪ সালে দাদার বার্ধক্যের কারণে তাঁকে বান্দাইখাড়া ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসের দায়িত্ব সামলাতে হয়। এরপর ১৯৯৬ সালে এক মালয়েশীয় কলম বন্ধুর সহায়তায় তিনি মালয়েশিয়ায় যান এবং সেখানে পেট্রোল পাম্পে কম্পিউটার অপারেটর ও ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে প্রবাসের জীবন কিংবা নানা কর্মব্যস্ততা, কোনো কিছুই আসলামকে তাঁর শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে তাঁর প্রাণ সর্বদা পড়ে থাকত নিজের জন্মমাটিতেই।

সেই গভীর টান থেকেই ২০০০ সালে মাত্র ৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে নিজ বাড়িতে তিনি শুরু করেন তাঁর জীবনের সেরা সৃষ্টি, 'প্রতিধ্বনি শিক্ষা কেন্দ্র'। ১ম থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের এই কেন্দ্রে গতানুগতিক পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি যুক্ত করেছেন আধুনিক ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা। প্রতি বছর ঐতিহাসিক স্থানসমূহে শিক্ষা সফর, অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে বিজ্ঞান চর্চা এবং বাধ্যতামূলক কম্পিউটার শিক্ষার পাশাপাশি নিজ সংগ্রহশালা থেকে ডাকটিকিট, মুদ্রা, মানচিত্র ও পেপার কাটিং নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক শিক্ষা-সহায়ক মিনি জাদুঘর, যা শিশুদের মনের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।

আসলামের এই উদ্যোগ সময়ের সাথে সাথে কুড়িয়েছে নানা সরকারি ও স্থানীয় স্বীকৃতি। স্ত্রী, অভিভাবক ও পুরো গ্রামের ভালোবাসাকে সঙ্গী করে আসলাম এখন এই উদ্যোগকে একটি “উপকরণ ভিত্তিক মডেল শিক্ষা কেন্দ্র” হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নে এগিয়ে চলছেন।

মন্তব্য করুন

Logo