শহীদ জননী জাহানারা ইমাম (১৯২৯-১৯৯৪)
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যেগুলো শুধু ব্যক্তির পরিচয় বহন করে না—একটি যুগ, একটি চেতনা, একটি সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে। জাহানারা ইমাম তেমনই এক নাম। আজ তাঁর ৯৭তম জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন মাকে স্মরণ করা নয়, বরং একটি জাতির বিবেক, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের এক অনির্বাণ শিখাকে নতুন করে চিনে নেওয়া।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ অসংখ্য মায়ের বুক খালি করেছে। কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে যিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘শহীদ জননী’—তিনি জাহানারা ইমাম। তাঁর বড় ছেলে শাফী ইমাম রুমী দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। ব্যক্তিগত সেই শোকের সীমানা পেরিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সমগ্র মুক্তিযোদ্ধাদের মা, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিটি সংগ্রামীর মা।
রুমীর শহীদ হওয়ার পর তাঁর কলম, কণ্ঠ, অবস্থান—সবকিছুই পরিণত হয় মুক্তির সংগ্রামে এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর। জাহানারা ইমামের লেখা একাত্তরের দিনগুলি শুধু একটি বই নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের এক প্রামণ্য দলিল। ১৯৭১ সালের উত্তাল সময়কে তিনি যেভাবে দিনলিপির আকারে লিপিবদ্ধ করেছেন, তা ইতিহাসের অনন্য আকরগ্রন্থ হিসেবে সংযুক্ত হয়েছে।
এই বইয়ে আমরা দেখি—একজন মায়ের দুশ্চিন্তা, একজন নাগরিকের ক্ষোভ, একজন দেশপ্রেমিকের দৃঢ়তা এবং এক সংগ্রামী নারীর অবিচল মানসিকতা। যুদ্ধের ভয়াবহতা, গেরিলা তৎপরতা, পরিবারের উপর নেমে আসা নির্মমতা—সবকিছুই সেখানে ধরা পড়েছে নির্মোহ অথচ গভীর আবেগে।
স্বাধীনতার আগে তিনি ছিলেন একজন শিক্ষিকা, একজন গৃহিণী, একজন লেখক। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে দাঁড় করায় অন্য এক ভূমিকায়। স্বাধীনতার পর যখন দেখা গেল, যুদ্ধাপরাধীরা পুনর্বাসিত হচ্ছে, তখন তাঁর নীরব থাকা সম্ভব হয়নি। ১৯৯২ সালে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এই উদ্যোগ ছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক সাহসী এবং প্রায় অকল্পনীয় পদক্ষেপ।
১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান-এ অনুষ্ঠিত ‘গণআদালত’ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক প্রতীকী কিন্তু যুগান্তকারী ঘটনা। সেখানে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত গোলাম আযম-এর বিচার অনুষ্ঠিত হয়। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে এই গণআদালত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে হলেও, জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। তিনি স্পষ্ট করে দেন—ন্যায়বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু তা অস্বীকার করা যায় না।
এই ঘটনার পর তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়, লাঠিচার্জে আহত হন, শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন—কিন্তু নৈতিক অবস্থান থেকে একচুলও সরে যাননি।
আশির দশক থেকেই তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু অসুস্থতা তাঁকে থামাতে পারেনি। সভা-সমাবেশ, গণস্বাক্ষর অভিযান, দেশজুড়ে আন্দোলন—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সক্রিয়। মৃত্যুর আগে তাঁর সেই বিখ্যাত আহ্বান আজও প্রতিধ্বনিত হয়—‘আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি… আপনারাও আপনাদের অঙ্গীকার পূরণ করবেন।’
এই বাক্য শুধু একটি বিদায়বার্তা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক ম্যানিফেস্টো। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যা অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যেও বাস্তবতা পেয়েছিল—তার বীজ বপন করেছিলেন জাহানারা ইমাম। তাঁর আন্দোলন প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্র যদি দেরি করে, জনগণ তখনও ইতিহাসের দায় বহন করতে পারে। তিনি দেখিয়ে গেছেন—একজন মানুষও ইতিহাস বদলাতে পারে, যদি তার অবস্থান স্পষ্ট হয়, সংকল্প অটল হয়।
জাহানারা ইমাম কেবল একজন মা নন, তিনি এক অনির্বাণ শিখা—যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে জ্বলে, অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করে এবং নতুন প্রজন্মকে পথ দেখায়। বাংলার মাটিতে তাঁর পদচিহ্ন আর পড়বে না, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলোর পথ—অবিনাশী।
ইতিহাসের এই দিনে
১৪৯৪ - কলম্বাস জ্যামাইকা আবিষ্কার করেন।
১৫১৫ - পর্তুগিজ নৌসেনারা ইরানের হরমুজ দ্বীপ দখল করে।
১৭৬৫ - রবার্ট ক্লাইভ বাংলার গভর্নর পদে নিযুক্ত হন।
১৭৬৫ - ব্রিটিশদের সঙ্গে মারাঠাদের তুমুল সংঘর্ষ হয়।
১৭৮৮ - লন্ডনে প্রথম সান্ধ্য দৈনিক ‘দি স্টার’ প্রকাশিত হয়।
১৮৩৭ - অ্যাথেন্স বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় গ্রিসে।
১৯১৩ - প্রথম ভারতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রাজা হরিশচন্দ্র মুক্তি পায়।
১৯৩৯ - সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস ত্যাগ করে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেন।
১৯৫৩ - ডয়চে ভেলে জার্মানির জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জার্মানির বন্ শহরে স্থাপিত হয়।
১৯২৯ – বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত শহীদজননী জাহানারা ইমাম-এর জন্মদিন।
১৯৭১ - পিরোজপুর পতন হয় এবং পাক হানাদার বাহিনী ৬২ জনকে হত্যা করে
১৯৭৩ - বাঙালি স্থাপত্যবিদ এফ আর খান -এর ডিজাইনে নির্মিত তৎকালীন পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবন সিয়ার্স টাওয়ার (বর্তমান উইলিস টাওয়ার) -এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন।
১৯৭৬ - বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয় এবং সংশোধনে বলা হয়, বাংলাদেশে ধর্ম ভিত্তিক দল গঠন করা যাবে।
১৯৭৯ - রক্ষণশীল দলের মার্গারেট থ্যাচার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ইউরোপের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
২০০১ - যুক্তরাষ্ট্র প্রথম জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের পদ হারায়।
মন্তব্য করুন

