ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
‘বড়ো-মানুষ’ শব্দটি
আজকাল বাঙালির অভিধান থেকে প্রায় উধাও। শব্দটি শুনলে এখন আমরা সাধারণত টাকার অঙ্ক,
গাড়ির মডেল, বাড়ির আয়তন কিংবা পদ-পদবির কথা ভাবি। কে কত বড় অফিসার, কার কত কোটি
টাকার ব্যবসা, কে কত দামি স্যুট পরেন, কার গাড়ির সামনে-পেছনে কতগুলো গাড়ি থাকে,
এসব দিয়েই যেন বড়ো হওয়ার মাপজোক হয়। সবাই এখন সম্মাননীয়, মাননীয়, বিশিষ্ট,
বরেণ্য। শুধু মানুষ হওয়াটা যেন একটু কঠিন হয়ে গেছে।
আজকাল কেউ সামান্য দান
করলেও তার ছবি ওঠে, পোস্ট হয়, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বেরোয়। ডান হাত দিয়ে দান করে বাঁ
হাত দিয়ে তার প্রচার না করলে যেন দানের পূর্ণতা আসে না। অথচ একসময় এমন একজন মানুষ
ছিলেন, যিনি অন্যের উপকার করতে গিয়ে নিজের ঘটিবাটিও বিক্রি করতে দ্বিধা করতেন না।
প্রচারের তো প্রশ্নই নেই, উপকার পাওয়া মানুষটি যেন তাঁর নামটুকুও জানতে না পারেন,
সেটাই ছিল তাঁর আনন্দ।
তিনি ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগর।
‘সিম্পল লিভিং অ্যান্ড
হাই থিঙ্কিং’ কথাটি আজ আমাদের কাছে মোটামুটি সাজসজ্জাহীন জীবনযাপনের একটি সুন্দর
ইংরেজি বাক্য। কিন্তু বিদ্যাসাগরের জীবনে এটি ছিল কোনো নীতিবাক্য নয়, ছিল
জীবনযাপনের স্বাভাবিক পদ্ধতি। নিজের জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ, অথচ অন্যের জন্য
তাঁর হৃদয় এবং হাত দুটিই ছিল অসাধারণ রকমের উদার।
সরকারি চাকরি করেছেন,
বই লিখে অর্থ উপার্জন করেছেন। কিন্তু সেই অর্থ নিজের বিলাসে খরচ করেননি। মানুষের
প্রয়োজনেই তার বড়ো অংশ ব্যয় করেছেন। পরোপকার করতে গিয়ে বহুবার ঠকেছেন। তবু স্বভাব
বদলাননি। কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করলে কেন বারবার মানুষের জন্য টাকা দিয়ে ঠকছেন, তিনি
নাকি বলতেন, লোকের উপকার করতে গেলে দু-একবার ঠকতেই হয়।
এই কথাটির মধ্যে
বিদ্যাসাগরের মানুষটিকে পাওয়া যায়।
একবার প্যারীচরণ
সরকারের হরিতকী বাগানের বাড়িতে গিয়ে বিদ্যাসাগর তিন হাজার টাকা চাইলেন। প্যারীচরণ
অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, এত টাকা হঠাৎ কী কাজে লাগবে। বিদ্যাসাগর জানালেন, একটি
লোককে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তিনি তার জামিনদার হয়েছিলেন। লোকটি কোম্পানির তিন
হাজার টাকা নিয়ে পালিয়েছে। এখন সেই টাকা তাঁকেই শোধ করতে হবে। অথচ তাঁর নিজের কাছে
তখন এত টাকা নেই।
প্যারীচরণ নায়েবকে
ডেকে জানতে চাইলেন, তহবিলে কত টাকা আছে। নায়েব জানালেন, দুই হাজার টাকা। বাকি এক
হাজার টাকা প্যারীচরণ তাঁর মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে বন্ধুকে তিন হাজার টাকা
দিলেন।
পরে নায়েব জিজ্ঞেস
করেছিলেন, এই তিন হাজার টাকা কোন খাতে খরচ দেখানো হবে। প্যারীচরণ এক মুহূর্তও না
ভেবে বলেছিলেন, তাঁর নামে ‘বাজে খরচের খাতায়’ লিখে রাখতে।
আজকের হিসাবরক্ষকরা
শুনলে হয়তো মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন। কিন্তু সেই ‘বাজে খরচের’ মধ্যেই যে কতটা মহৎ
মানুষের হিসাব লুকিয়ে থাকতে পারে, বিদ্যাসাগরের জীবন তারই প্রমাণ। অন্যের জন্য হাজার
হাজার টাকা খরচ করলেও নিজের জন্য বিদ্যাসাগরের প্রয়োজন ছিল সামান্য। তাঁর পোশাকের
গল্পটি এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
একবার হুগলি জেলার
কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলে বিদ্যাসাগরের যাওয়ার কথা। সকাল থেকেই গ্রামের
মানুষ তাঁকে দেখার জন্য ভিড় করে অপেক্ষা করছেন। সময় যায়, রোদ বাড়ে, মানুষ ঘামে,
কিন্তু বিদ্যাসাগরের দেখা নেই। অবশেষে খবর এল, তিনি আসছেন।
এক বৃদ্ধা ভিড় ঠেলে
সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাগো, কোথায় তোমাদের বিদ্যাসাগর?’
একজন তাঁকে দেখিয়ে
বললেন, ‘এই তো, ইনি বিদ্যাসাগর।’
বৃদ্ধা কিছুক্ষণ
বিদ্যাসাগরের দিকে তাকিয়ে থেকে বিস্ময়ে বলে উঠলেন, ‘হা আমার পোড়া কপাল! এই মোটা
চাদর গায়ে উড়ে বেড়ানো বেয়ারা দেখবার জন্য এতক্ষণ ধরে রোদে ভাজা ভাজা হলাম! না আছে
গাড়ি, না আছে ঘোড়া, না আছে চোগা-চাপকান!’
বৃদ্ধার চোখে
বিদ্যাসাগর তখন কোনো রাজকীয় ব্যক্তিত্ব নন। কারণ তাঁর পোশাকে রাজকীয়তার কোনো
চিহ্নই ছিল না। মোটা চাদর, সাধারণ ধুতি, পায়ে চটি। এই পোশাকেই তিনি সারা জীবন
কাটিয়েছেন।
কবি নবীনচন্দ্র সেন
বিদ্যাসাগরকে প্রথম দেখার স্মৃতি লিখতে গিয়ে বিস্ময়ে বলেছিলেন, ‘ও হরি, এই কি
খ্যাতনামা বিদ্যাসাগর!’ তারপর তিনি যে মানুষটির বর্ণনা দিয়েছেন, তাঁর চেহারায় ছিল
খর্বাকৃতি শরীর, চক্রাকারে মুণ্ডিত মস্তক, তীক্ষ্ণ চোখ, প্রশস্ত ললাট, বলিষ্ঠ
শরীর, পায়ে চটি, সাধারণ ধুতি, হাতে ছোট হুঁকা। কিন্তু মুখে হাসি, মূর্তিতে শান্তি
এবং হৃদয়ে অমৃতরাশি।
এমন বিদ্বান মানুষকে
দেখে অবাক হওয়ার কারণ ছিল একটাই: তাঁর বিদ্যার সঙ্গে তাঁর জীবনযাপনের কোনো বাহুল্য
ছিল না। বিদ্যাসাগর অনেক দিন শুধু নুন দিয়ে ভাত খেতেন। অর্থের অভাবে নয়। তাঁকে
জিজ্ঞেস করা হলে কেন এমন করেন, তিনি বলতেন, বাল্যকালে বহুদিন নুন দিয়ে ভাত মেখে
খেয়েছেন। সেই অভ্যাস এখনও আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা দরকার। কারণ মানুষের দশা
চিরকাল এক থাকে না। আবার যদি আগের দশায় ফিরতে হয়, তাহলে শুধু ভাত খাওয়ার
অভ্যাসটুকু যেন নষ্ট না হয়।
কথাটির মধ্যে রসিকতা
আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড়ো আছে জীবনের অনিশ্চয়তা সম্পর্কে এক গভীর বোধ। নিজের জন্য এত
সামান্য, অথচ অন্যের জন্য এত উদার। একবার হেদুয়ার কাছে বন্ধুর সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে
দেখলেন, এক ব্রাহ্মণ গঙ্গাস্নান সেরে কাঁদতে কাঁদতে ফিরছেন। বিদ্যাসাগর তাঁকে ডেকে
কারণ জানতে চাইলেন। প্রথমে লোকটি কিছু বলতে চাননি। বিদ্যাসাগরের গায়ে মোটা চাদর,
পায়ে চটি, চেহারায় সাধারণত্ব। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, এই মানুষটির কাছে বলেই বা কী
লাভ!
কিন্তু বিদ্যাসাগর
ছাড়ার পাত্র নন। বারবার জিজ্ঞেস করায় ব্রাহ্মণ জানালেন, মেয়ের বিয়ের জন্য ধার
করেছিলেন। সেই টাকা শোধ করতে না পারায় পাওনাদার মামলা করেছেন। পরশুদিন মামলার শুনানি। বিদ্যাসাগর মামলার
নম্বর, নাম-ঠিকানা সব জেনে নিলেন। পরে বন্ধুকে দিয়ে খোঁজ করিয়ে জানলেন, সুদে-আসলে
দেনার পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার টাকা। সেই টাকা তিনি নিজের পকেট থেকে আদালতে জমা
দিলেন। শুধু তাই নয়, আদালতের উকিল ও আমলাদের বলে দিলেন, তাঁর নাম যেন ওই ব্রাহ্মণ
জানতে না পারেন।
আজকের দিনে দান করার
পর কে কত ছবি তুললেন, কতটি পোস্ট হলো, কতজন ট্যাগ হলেন, তার হিসাব রাখা হয়।
বিদ্যাসাগর সেখানে এমন এক ব্যবস্থা করে গেলেন, যেখানে উপকার পেলেন যিনি, তিনিই
জানলেন না উপকারটি কে করলেন।
এটাই হয়তো দানের
সবচেয়ে কঠিন রূপ। বিদ্যাসাগরের পরোপকারে
ধর্ম, বর্ণ, জাতের কোনো দেওয়াল ছিল না। বর্ধমানে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ দেখা দিলে
নিজের খরচে ডাক্তার নিয়ে গিয়ে তিনি মানুষের চিকিৎসা করিয়েছেন। হাড়ি, শুঁড়ি, জেলে,
মালো, মুসলমান, হিন্দু—মানুষের পরিচয়ই ছিল তাঁর কাছে যথেষ্ট। এমনও দেখা গেছে, তিনি
গাড়িতে বসে আছেন আর একটি মুসলমান বালক তাঁর কোলে খেলছে।
মানুষের মর্যাদার
প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল একই রকম দৃঢ়। রাজনীতির ক্ষেত্রেও তিনি আপসহীন ছিলেন।
কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনের পর একদল প্রতিনিধি তাঁকে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার অনুরোধ
করলে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোমরা প্রয়োজনে তলোয়ার ধরতে পারবে তো?’
প্রশ্নটি শুনে তাঁরা
নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। তখন বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘আমাকে বাদ দিয়েই তোমরা এই কাজে
এগোও।’
তিনি কোনো দল, সংগঠন
কিংবা স্লোগানের মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ একজন
মানুষ।
তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে
বড়ো শক্তি সম্ভবত এখানেই। তিনি মানুষের উপকার করতেন কারণ মানুষকে ভালোবাসতেন,
নিজের মহত্ত্ব প্রদর্শনের জন্য নয়। তিনি বিদ্বান ছিলেন, কিন্তু বিদ্যার অহংকার ছিল
না। অর্থ উপার্জন করেছিলেন, কিন্তু অর্থের কাছে নিজেকে বিক্রি করেননি। খ্যাতি
পেয়েছিলেন, কিন্তু খ্যাতির পোশাক পরেননি।
শিবনাথ শাস্ত্রী
বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তাঁহার মনুষ্যত্বের প্রভাব এত অধিক ছিল যে, তিনি
সেই প্রভাবে স্বদেশ ও স্বজাতির অনেক উপরে উঠিয়াছিলেন।’
এই ‘মনুষ্যত্ব’
শব্দটিই হয়তো বিদ্যাসাগরকে বোঝার সবচেয়ে সহজ চাবিকাঠি। বড়ো মানুষ হওয়া আর বড়ো পদে
থাকা এক জিনিস নয়। বড়ো বাড়িতে থাকা, বড়ো গাড়িতে চলা, বড়ো ব্যাংক-ব্যালান্স থাকা
কিংবা নিজের নামের আগে দশটি বিশেষণ বসানোও বড়ো হওয়ার প্রমাণ নয়।
বড়ো মানুষ হওয়ার
মাপকাঠি অন্য জায়গায়। আপনি নিজের জন্য কতটা কম নিয়ে অন্যের জন্য কতটা দিতে পারেন।
আপনার ক্ষমতা কতটা, তার চেয়ে আপনি ক্ষমতাকে কীভাবে ব্যবহার করেন। আপনার পরিচয় কত
বড়ো, তার চেয়ে আপনার কাছে অন্য একজন সাধারণ মানুষের কষ্ট কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যাসাগর তাই শুধু
একজন পণ্ডিত নন, শুধু সমাজসংস্কারকও নন। তিনি একটি জীবনযাপনের আদর্শ। তাঁর মোটা
চাদর আমাদের আজকের ঝলমলে পোশাকের সামনে দাঁড়িয়ে যেন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে: আমরা
এত কিছু অর্জন করেও আসলে কতটা বড়ো হয়েছি?
সম্ভবত এই প্রশ্নের
উত্তর দেওয়ার জন্যই বিদ্যাসাগর আজও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
চটি পায়ে। মোটা চাদর
গায়ে। আর দুই হাতে মানুষের জন্য দরজা খুলে।
মন্তব্য করুন

