Logo

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

এই দিনে

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

সাহস আর আত্মমর্যাদের প্রতীক

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম

বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে যে নামগুলো অমর হয়ে আছে, উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা আর গর্ব নিয়ে, সেই তালিকার একেবারে শুরুর দিকেই আছেন বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের। তিনি শুধু বিপ্লবী নন—তিনি সাহসের প্রতীক হয়ে আছেন। যিনি প্রমাণ করেছিলেন নারীরাও অস্ত্র হাতে ইতিহাস লিখতে পারে।

১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের ধলঘাটে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন প্রীতিলতা। পিতা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন পৌরসভার চাকুরে। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও আত্মপ্রত্যয়ী এই নারী পড়াশোনায় যেমন এগিয়ে ছিলেন, তেমনি ছিল তাঁর গভীর মানবিকতা।

চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তাঁর চিন্তার জগতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ‘ঝাঁসির রাণী’-র মতো বই এবং বিপ্লবীদের গল্প তাঁর মনে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তখনই বীজ বপন হয় এক ভবিষ্যৎ বিপ্লবীর।

ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন এবং উচ্চ মাধ্যমিকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি তিনি যুক্ত হন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে, যেখানে নারী জাগরণ ও দেশপ্রেমের চেতনা আরও শক্তিশালী হয়। ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাকালে প্রীতিলতা  লীলা নাগের নেতৃত্বাধীন দীপালি সংঘের অন্তর্ভুক্ত শ্রীসংঘের সদস্য এবং কলকাতার বেথুন কলেজের ছাত্রী থাকাকালে কল্যাণী দাসের নেতৃত্বাধীন ছাত্রীসংঘের সদস্য হন। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের নন্দনকানন গার্লস স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব নেন। শিক্ষকতার এই পরিচয়ের আড়ালেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল এক বিপ্লবী নেতৃত্ব।

সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক তখন ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার আকাশে। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে সংগঠিত হচ্ছিল বিপ্লবী দল। প্রথমদিকে নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দ্বিধা থাকলেও প্রীতিলতার দৃঢ়তা ও সাহসিকতা তাঁকে জায়গা করে দেয় এই দলে। তিনি শুধু সদস্য হিসেবেই নন, বরং পরিকল্পনা, সংগঠন ও বিভিন্ন অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে ছদ্মবেশে দেখা করা কিংবা বিপ্লবীদের গোপন কাজে অংশ নেওয়া—সবকিছুতেই তাঁর সাহসিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর—বাংলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবে প্রীতিলতার নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এক সাহসী অভিযান। পুরুষের বেশে, হাতে অস্ত্র নিয়ে তিনি নেতৃত্ব দেন আক্রমণের। পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান সফলও হয়। কিন্তু ফিরে আসার পথে গুলিবিদ্ধ হন প্রীতিলতা। ধরা পড়লে ভয়াবহ নির্যাতনের আশঙ্কা ছিল। তাই কোনো দ্বিধা না করে সঙ্গে থাকা পটাসিয়াম সায়ানাইড পান করেন তিনি। মাত্র ২১ বছর বয়সে এভাবেই ইতিহাসে নিজের নাম অমর করে দেন এই বীরকন্যা।

প্রীতিলতার মৃত্যু কোনো পরাজয় নয়—বরং এক জাগরণের সূচনা। তাঁর আত্মদান বিপ্লবীদের আরও উজ্জীবিত করে, বৃটিশবিরোধী আন্দোলনকে দেয় নতুন গতি। তিনি দেখিয়ে গেছেন, দেশের জন্য লড়াই শুধু পুরুষের কাজ নয়। নারীরাও পারে নেতৃত্ব দিতে, পারে জীবন উৎসর্গ করতে। তাই, আজও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার শুধুই একটি নাম নয়—তিনি এক চেতনা—শিক্ষিকা, বিপ্লবী, শহীদ—সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন আমদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সাহস আর আত্মমর্যাদার প্রতীক।

মন্তব্য করুন

Logo