Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

দ্রোহ, প্রেম ও বেদনার অনিঃশেষ নাম রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

এই দিনে

দ্রোহ, প্রেম ও বেদনার অনিঃশেষ নাম রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

Icon

রেজাউল করিম

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ এএম

বাংলা কবিতার আকাশে কিছু নক্ষত্র আছে, যাদের দীপ্তি সময়ের সীমা অতিক্রম করে যুগ থেকে যুগে ছড়িয়ে পড়ে। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তেমনই এক নক্ষত্র। মাত্র ৩৪ বছরের ক্ষণস্থায়ী জীবনে তিনি যে আলো ছড়িয়েছেন, তা আজও বাংলা কবিতার পাঠককে আলোড়িত করে। তাঁর কবিতা, গান, প্রেম, দ্রোহ, স্বপ্ন ও বেদনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মৃত্যুর ৩৫ বছর পরেও রুদ্র যেন সমকালীন বাংলাদেশের এক জীবন্ত কণ্ঠস্বর।

২১ জুন, সমসাময়িক বাংলা কবিতার জন্য এক বেদনাময় দিন। ১৯৯১ সালের এই দিনে নিভে যায় এক অগ্নিমদির কবির জীবনপ্রদীপ। কিন্তু কবির মৃত্যু হলেও তাঁর শব্দের মৃত্যু হয়নি। বরং সময় যত এগিয়েছে, রুদ্রের কবিতা ততই নতুন অর্থে ফিরে এসেছে মানুষের কাছে।

যে কবি বাতাসে লাশের গন্ধ পেয়েছিলেন

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী বাস্তবতা, স্বপ্নভঙ্গ, রাজনৈতিক হতাশা এবং মানুষের বঞ্চনা নিয়ে লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী কবিতা ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’; যে কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা আজও শিহরণ জাগায়—

“আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই

আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,

ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে...”

স্বাধীনতার পর যে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার কথা ছিল, সেই স্বপ্ন ভাঙার যন্ত্রণা রুদ্র অনুভব করেছিলেন গভীরভাবে। তাই তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—

“স্বাধীনতা—এ কি হবে নষ্ট জন্ম?

এ কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল?”

কবিতাটি শুধু একটি সময়ের দলিল নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও বিবেকের প্রতি এক অনবরত প্রশ্ন। তাই চার দশক পরেও যখন অন্যায়, সহিংসতা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর আসে, তখন মানুষ আবারও রুদ্রের এই কবিতার কাছে ফিরে যায়।

জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে স্বাধীনতা-পূর্ব ও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের মধ্যে। সেই বাস্তবতা তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন সমাদৃত। ১৯৭৪ সালে ঢাকা সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় চার বিষয়ে লেটার নম্বরসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

কিন্তু রুদ্র কেবল মেধাবী ছাত্র ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক অস্থির, বোহেমিয়ান, জীবনমুখী তরুণ। কোঁকড়ানো চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, জিন্স পরা এক স্বপ্নবাজ যুবক—বন্ধুদের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র ছিলেন তিনি।

কবি সৈয়দ শামসুল হক একবার বলেছিলেন—

“তার মধ্যে যে বাউন্ডুলেপনা ছিল, তা তাকে সুস্থির হতে দেয়নি।”

এই অস্থিরতাই হয়তো তাঁকে দিয়েছিল ভিন্ন চোখে পৃথিবীকে দেখার ক্ষমতা।

কবিতার পাশাপাশি আন্দোলনের মানুষ

রুদ্র শুধু কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও একজন সক্রিয় কর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্ররাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল থেকে সাহিত্য সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। নির্বাচনে পরাজিত হলেও সাংস্কৃতিক জগতে তাঁর নেতৃত্ব ও প্রভাব ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে।

বন্ধু আলী রীয়াজ, মঈনুল আহসান সাবের, আবিদ রহমান, সলিমুল্লাহ খান, কামাল চৌধুরী, জাফর ওয়াজেদ, রেজা সেলিম, মোহন রায়হান, বদরুল হুদাসহ অনেক তরুণ লেখককে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘রাখাল’ নামে সাহিত্য প্রকাশনা সংস্থা। এই সংস্থার উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ‘সাহস’ নামের কবিতাপত্র। তরুণ কবি-লেখকদের জন্য এটি হয়ে উঠেছিল এক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য মঞ্চ।

প্রেম, ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত জীবন

রুদ্রের জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর প্রেম অনিবার্যভাবে চলে আসে। ১৯৮১ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি বিয়ে করেন কবি ও লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে। সমসাময়িক সাহিত্যাঙ্গনে দুজনই ছিলেন তুমুল আলোচিত। তাদের সম্পর্ক যেমন আলোচিত ছিল, বিচ্ছেদও তেমনি আলোড়ন তুলেছিল সাহিত্যজগতে। ১৯৮৬ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।

অনেকের মতে, বিচ্ছেদের বেদনাই রুদ্রর প্রেমের কবিতা ও গানে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে—

“ভালো আছো, ভালো থেকো

আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো...”

গানটি আজও মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। প্রেম ভেঙে যাওয়ার পরও ভালোবাসার মানুষকে ভালো থাকার প্রার্থনা—বাংলা গানের ইতিহাসে এটি এক অনন্য অনুভূতির প্রকাশ।

প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি

রুদ্রকে শুধু দ্রোহের কবি বললে ভুল হবে, আবার শুধু প্রেমের কবি বললেও তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। তিনি একই সঙ্গে প্রেম, দ্রোহ, প্রতিবাদ, মানবতা ও স্বপ্নের কবি। তাঁর কবিতায় যেমন প্রেমিকার জন্য আকুলতা আছে, তেমনি আছে শোষিত মানুষের পক্ষে উচ্চারিত প্রতিবাদ।

তিনি লিখেছিলেন—

“জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরোনো শকুন।”

এই একটি পঙ্‌ক্তিই তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বোধের পরিচয় বহন করে। অন্যদিকে তাঁর প্রেমের কবিতায় দেখা যায় এক অসহায়, কোমল, সংবেদনশীল মানুষকে। এই দুই সত্তার সমন্বয়ই রুদ্রকে তাঁর সময়ের অন্যান্য কবিদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। 

কাব্যগ্রন্থের ভুবন

রুদ্রের সাহিত্যকর্মের পরিমাণ খুব বেশি নয়। কিন্তু প্রতিটি গ্রন্থই পাঠকের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো— উপদ্রুত উপকূল (১৯৭৯), ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম (১৯৮১), মানুষের মানচিত্র (১৯৮৬), ছোবল (১৯৮৬), গল্প (১৯৮৭), দিয়েছিলে সকল আকাশ (১৯৮৮), মৌলিক মুখোশ (১৯৯০), খুঁটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯১), এক গ্লাস অন্ধকার (মরণোত্তর, ১৯৯২)

এই গ্রন্থগুলোতে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, প্রেম, রাজনৈতিক সংকট, মানুষের স্বপ্ন ও হতাশার বহুমাত্রিক প্রতিফলন ঘটেছে।

গণমানুষের কবি হয়ে ওঠার গল্প

কবিতা, গান কিংবা গল্প—এসবের জন্ম হয় একজন স্রষ্টার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি থেকে। কিন্তু যখন সেই অনুভূতি সমাজের অসংখ্য মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিশে যায়, তখন সেই সৃষ্টি হয়ে ওঠে জনমানুষের সম্পদ। রুদ্রের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছে। তিনি যে ভাষায় লিখেছেন, তা ছিল সহজ, সরল, অথচ গভীর। তাঁর কবিতা বুঝতে পাঠকের অভিধান লাগে না; লাগে কেবল একটি সংবেদনশীল হৃদয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষ পর্যন্ত সবাই তাঁর কবিতার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে। জীবনের শেষ লগ্নে রুদ্র ফিলেছিলেন জন্মভিটায়। মিঠেখালিতে ফিরে গড়ে ছিলেন এক গানের দল— ‘অন্তর বাজাও’। নামটা শুনলেই বুকের ভিতরটা ঝনাৎ করে বেজে ওঠে। আহা, সবার অন্তর যদি এমন করে বেজে উঠতো!

রুদ্র আজও প্রাসঙ্গিক 

রুদ্রের কবিতা যেন আজকের বাংলাদেশকেই বিবৃত করছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, সামাজিক বৈষম্য, নারীর প্রতি সহিংসতা, রাজনৈতিক হতাশা কিংবা মানুষের স্বপ্নভঙ্গ—এতো আমাদের আজকের বাস্তবতাতেও একইভাবে প্রাসঙ্গিক। আর সে জন্যই রুদ্রের কবিতা কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বর্তমানেরও ভাষ্য। তাঁর কবিতার শক্তি এখানেই—সময় বদলায়, প্রেক্ষাপট বদলায়, কিন্তু তাঁর উচ্চারিত প্রশ্নগুলো বদলায় না।

আজ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। স্মরণ করি সেই কবিকে, যিনি বাতাসে লাশের গন্ধ পেয়েছিলেন, প্রেমের ব্যথাকে গানে রূপ দিয়েছিলেন এবং স্বাধীনতার অপূর্ণ স্বপ্নকে কবিতায় উচ্চারণ করেছিলেন।

রুদ্র নেই, কিন্তু তাঁর কবিতা আছে; আছে গান এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্ন। আর যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ থাকবে, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা থাকবে—ততদিন বাংলা সাহিত্যে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এক অম্লান, জাগ্রত নাম হয়ে থাকবেন।

মন্তব্য করুন

Logo