Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

কাবুলের মসনদে কী চিড় ধরছে?

আফগানিস্তানে তালেবান শাসন (ছবিঃ BBC News বাংলা)

দশদিগন্ত

কাবুলের মসনদে কী চিড় ধরছে?

Icon

সুমিত রায়

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম

ক্ষমতা জিনিসটা দূর থেকে দেখতে একরকম, ভেতর থেকে দেখলে সম্পূর্ণ অন্যরকম। বাইরে থেকে যে প্রাসাদকে নিরেট পাথরের তৈরি দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে মনে হয়, কাছে গিয়ে সাবধানে হাত রাখলে অনেক সময় বোঝা যায় তার পলেস্তারা খসে পড়ছে। ভেতরের দেয়ালে তৈরি হয়েছে সূক্ষ্ম ফাটল।

আফগানিস্তানের দৃশ্যপট গত কয়েক বছর ধরে ছিল ঠিক তেমনই-আপাতদৃষ্টিতে শান্ত উপত্যকার মতো। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে মার্কিন সেনারা বিশ বছরের উপস্থিতির ইতি টেনে বিমানে চেপে বিদায় নিয়েছিল। তারপর আশরাফ ঘানির সরকারের পতন ঘটিয়ে বিদ্যুৎগতিতে কাবুলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে তালেবান। তখন মনে হয়েছিল, এই কট্টরপন্থী পাহাড়ি যোদ্ধাদের কর্তৃত্ব হয়তো পাথরে খোদাই করা এক অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা। তাদের কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার মতো দৃশ্যমান কোনো শক্তি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের মাটিতে অবশিষ্ট ছিল না।

চারপাশের প্রতিবেশী দেশগুলোও সেই বাস্তবতাকে নিঃশব্দে মেনে নিতে শুরু করেছিল। ইরান, চীন, রাশিয়া কিংবা মধ্য এশিয়ার প্রজাতন্ত্রগুলো তাদের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলানোর পথ খুঁজছিল। তাদের কূটনৈতিক হিসাবটা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট - তালেবান সরকার সহসা কোথাও যাচ্ছে না। সুতরাং তাদের সাথে একটি স্থিতিশীল বোঝাপড়ায় পৌঁছানোই আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য লাভজনক।

কিন্তু গত এক বা দুই মাসের ঘটনাপ্রবাহ সেই জমাট বাঁধা ধারণায় তীব্র এক দোলা দিয়েছে। আফগানিস্তানের পাহাড়ি খাঁদ ও প্রাচীন দুর্গগুলো থেকে হঠাৎ করেই এমন কিছু প্রতিরোধের ধোঁয়া উঠছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। হঠাৎ করেই তালেবানবিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধ দলগুলোর তৎপরতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-
এই ঘটনাগুলো কি কাবুলের মসনদ উল্টে দেওয়ার মতো শক্তিশালী, নাকি এগুলো নিছকই কিছু বিপথগামী বন্দুকধারীর বিচ্ছিন্ন আক্রমণ? আফগানিস্তানের রাজনীতি বুঝতে হলে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া তিনটি বিশেষ ঘটনার দিকে গভীর মনোযোগ দিতে হবে। এই তিনটি ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভেতরে ভেতরে কোথাও একটা বড় পরিবর্তনের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে।

তুষারাবৃত গিরিখাত ও বাদাখশানের আকস্মিক আঘাত
প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল গত ১৭ জুলাই। দিনটি আর দশটি শান্ত সকালের মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্তু উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানের সুউচ্চ হিন্দুকুশ পর্বতমালার কোলে অবস্থিত বাদাখশান প্রদেশের সুফলা জেলায় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক নাটকীয়তা মঞ্চস্থ হলো। ইয়াফারালি সুফলা।

সেখানে অতর্কিতে আবির্ভূত হলো সম্পূর্ণ অপরিচিত এক সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী। নিজেদের তারা পরিচয় দেয় সেপাহিয়ানে মিহান নামে, যার অর্থ 'মাতৃভূমির সৈনিক ফ্রন্ট'। মাত্র পঁচিশ জনের মতো একদল ক্ষিপ্রগতির গেরিলা যোদ্ধা পাহাড়ের আড়াল থেকে নেমে এসে অতর্কিতে আক্রমণ চালাল। কয়েক ঘণ্টার গোলাগুলির পর তারা জেলাটির মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি এবং সরকারি দপ্তরগুলো সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল।

ঘটনাটি তালেবান হাইকমান্ডের জন্য ছিল এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পর তালেবান অতিরিক্ত ভারী অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী ও বিশেষ কমান্ডো পাঠিয়ে তীব্র সংঘর্ষের পর এলাকাটি পুনর্দখল করে ঠিকই, কিন্তু যা হারানোর তা ততক্ষণে হারিয়ে গেছে।

২০২১ সালে পুনরায় দেশের ক্ষমতা দখল করার পর এই প্রথম তালেবান সরকারকে প্রকাশ্যে এই সত্য স্বীকার করতে হলো যে, দেশের কোনো একটি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ তারা সাময়িকভাবে হলেও হাতছাড়া করেছিল। আফগান মনস্তত্ত্বে ভূখণ্ডের দখল হারানোর প্রতীকী তাৎপর্য অপরিসীম। মাত্র এক দিনের জন্য হলেও এই পরাজয় প্রমাণ করে দিল যে, তালেবানের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে মারাত্মক ছিদ্র রয়েছে এবং চাইলে দুর্গম গিরিখাতের সুযোগ নিয়ে তাদের ওপর সরাসরি সামরিক আঘাত হানা সম্ভব।

জেনারেল সামি সাদাতের ছায়া ও কান্দাহারের রক্তপাত
দ্বিতীয় অধ্যায়টি আরও অনেক বেশি বিস্তৃত, রক্তক্ষয়ী এবং সুপরিকল্পিত। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে দৃশ্যপটে হাজির হয় আরেকটি সুসংগঠিত প্রতিরোধ বাহিনী - আফগানিস্তান ইউনাইটেড ফ্রন্ট, সংক্ষেপে এইউএফ। এই দলটির পেছনে যে লোকটি কলকাঠি নাড়ছেন, সামরিক মহলে তার নাম বেশ পরিচিত। তিনি হলেন সাবেক জেনারেল সামি সাদাত। আফগান ন্যাশনাল আর্মির এই দক্ষ সেনাপতি ২০০৭ সাল থেকে তৎকালীন পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের প্রতিরক্ষাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সততা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসিকতার কারণে তিনি দ্রুত পদোন্নতি পান এবং ২০২১ সালে তিনি আফগান জাতীয় সেনাবাহিনীর উপপ্রধান পদে আসীন হন। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস দেখুন, তিনি যখন সেনাবাহিনীর উপপ্রধানের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন, তার ঠিক এক মাসের মাথায় আমেরিকানরা আফগানিস্তান ত্যাগ করে এবং পুরো আফগান সামরিক কাঠামো তাসের ঘরের মতো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে।

তালেবান কাবুলে প্রবেশ করার পর জেনারেল সাদাত দেশ ছেড়ে পালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। সেখানে বসেই ২০২৩ সালে তিনি এইউএফ গঠন করেন। প্রথমদিকে এই সংগঠনটি কেবল একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট এবং আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক দেনদরবার করার একটি লবিং গ্রুপ হিসেবে কাজ করছিল। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। কিন্তু দৃশ্যপট রাতারাতি বদলে গেল গত ১ আগস্ট। জেনারেল সাদাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করলেন। সেখানে শান্ত গলায় তিনি ঘোষণা করলেন যে, তিনি তালেবানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করার জন্য তার সংগঠনের যোদ্ধাদের নির্দেশ দিয়েছেন। সেই বার্তার রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হলো ধারাবাহিক আক্রমণ। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে খোদ তালেবানের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত কান্দাহারে অতর্কিত হামলায় দুই তালেবান যোদ্ধা প্রাণ হারাল। একই দিনে দক্ষিণের উত্তপ্ত হেলমান্দ প্রদেশেও আরেকটি সফল আক্রমণ চালানো হলো।

এরপর যেন বাঁধভাঙা জলের মতো একের পর এক আক্রমণ আসতে লাগল। ২ আগস্ট ঘোর প্রদেশে বিস্ফোরণ ঘটল, ৩ আগস্ট আবার কান্দাহারে তালেবান টহল দলের ওপর আক্রমণ হলো, ৪ আগস্ট ফারিয়াব প্রদেশে রক্ত ঝরল এবং ৬ আগস্ট খোদ কান্দাহার শহরেই আরও দুটি পৃথক ও সমন্বিত হামলা চালানো হলো। এই আক্রমণগুলোর লক্ষ্যবস্তু ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। যেসব তালেবান কর্মকর্তা অতীতে পশ্চিমা সরকারের সঙ্গে কাজ করা সাধারণ আফগানদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজে বের করে শাস্তি দিয়েছিলেন, তাদেরকেই খুঁজে বের করে গুলি করা হচ্ছিল। মাঝে কয়েক দিনের একটি সংক্ষিপ্ত বিরতি ছিল। কিন্তু ১৩ আগস্ট থেকে আবারও নতুন উদ্যমে হামলা শুরু হয় এবং তা নিয়মিত বিরতিতে চলতে থাকে।

সবচেয়ে ভাবনার বিষয় হলো, এইউএফ কিন্তু কোনো এলাকা দখল করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে না। তারা নিখুঁত গেরিলা রণকৌশল বেছে নিয়েছে - অতর্কিত হামলা চালাও, লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করো এবং পাহাড়ের আনাচে-কানাচে গা ঢাকা দাও। যে কান্দাহার প্রদেশকে তালেবানের সবচেয়ে সুরক্ষিত ক্ষমতার দুর্গ এবং নিরাপদ আশ্রয় ভাবা হতো, সেই কান্দাহারের বুকেই যখন এমন একের পর এক সফল অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তখন কাবুলের নীতিনির্ধারকদের কপালে দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে ওঠা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

ঘরের শত্রু: বাদাখশানের সোনার খনি ও সেনাপতি ফাতাহ
তৃতীয় ঘটনাটি কোনো বাইরের প্রতিপক্ষের আক্রমণ নয়। এটি হলো খোদ তালেবানের ভেতরের আত্মঘাতী গৃহদাহ। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে আবারও সেই বাদাখশান প্রদেশে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। তবে এবার লড়াইটি কোনো প্রতিরোধ দলের সঙ্গে ছিল না। লড়াইটি বেঁধেছিল তালেবান সরকারের কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং তাদেরই একজন প্রভাবশালী তাজিক বংশোদ্ভূত স্থানীয় কমান্ডার জুম্মা খান ফাতাহ-এর অনুগত যোদ্ধাদের মধ্যে।

পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে, এই সংঘাত থামাতে তালেবানকে সেখানে বিমান ও ভারী কামান মোতায়েন করতে হয়। টানা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র লড়াইয়ে উভয় পক্ষের বহু যোদ্ধা নিহত ও আহত হয়। শেষ পর্যন্ত চরম রক্তপাতের বিনিময়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাদাখশানের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এই লড়াইয়ের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ফাতাহর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে থাকা ভারী সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টা। কিন্তু সংকটের শিকড় ছিল আরও গভীরে, আফগানিস্তানের ধূসর পাহাড়ের গর্ভে।

গত মে মাস থেকেই তালেবান কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাদাখশানের স্থানীয় সোনার খনিগুলোর কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত করে দিয়েছিল। এর আসল উদ্দেশ্য ছিল কমান্ডার ফাতাহ যেন এই মূল্যবান খনিগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে না পারেন। তালেবান শীর্ষ মহল ভালো করেই জানে, পর্যাপ্ত নগদ অর্থ এবং স্থানীয় অস্ত্রভাণ্ডার যদি কোনো আঞ্চলিক কমান্ডারের হাতে থাকে, তবে সে যেকোনো সময় নিজস্ব স্বাধীন দুর্গ গড়ে তুলতে পারে।

আফগানিস্তানের অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে দেশটির স্থানীয় যুদ্ধবাজ নেতারা নিজ নিজ ভূখণ্ডে সমান্তরাল সরকার পরিচালনা করতে শুরু করে। তালেবান এতদিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখার সুবিধার্থে স্থানীয় নেতাদের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছে যে, স্থানীয় কমান্ডারদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা ও অর্থ থাকা কাবুলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য এক বিরাট হুমকি। তাই তারা মরিয়া হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ চাইছে। কিন্তু সেই কেন্দ্রমুখী প্রশাসনিক সংস্কার করতে গিয়েই তারা নিজেদের মিত্র ও পুরনো সহযোদ্ধাদের প্রবল বাধার মুখে পড়ছে। ফাতাহর বিদ্রোহ দমন করার পর প্রদেশটির ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ দখল প্রতিষ্ঠা করতে তালেবান বাদাখশানের গভর্নরকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করে এবং কাবুলের বিশ্বস্ত কট্টর অনুগতদের প্রাদেশিক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসিয়ে দেয়।

বাস্তবতার নিক্তি ও প্রতিবেশীদের কূটচাল
এখন প্রশ্ন হলো, এই তিনটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে কি আমরা ধরে নিতে পারি যে তালেবানের মসনদ ভেঙে পড়ার মুখে? কাবুলে তাদের রাজত্ব কি সত্যিই শেষ হতে চলেছে? বাস্তবতার জমিন সবসময় অনেক বেশি রুক্ষ ও জটিল হয়। এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই সমীচীন হবে না। এই সহিংস ঘটনাগুলো নিঃসন্দেহে চাঞ্চল্যকর, কিন্তু এগুলো সবই অত্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ এবং ক্ষণস্থায়ী। পুরো দেশজুড়ে কোনো গণঅভ্যুত্থান তৈরি হয়নি, কোনো সাধারণ বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ দেখা যায়নি।

আফগানিস্তানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তালেবানকে ভালোবাসুক বা অপছন্দ করুক, তারা ভালো করেই জানে যে এই কট্টরপন্থী সরকার হঠাৎ ভেঙে পড়লে পুরো দেশে এক বিশৃঙ্খল ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে। আর সেই অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের আঁচ প্রতিবেশীদের ঘরের ভেতরেও লাগবে। কোনো শক্তিশালী বিদেশি রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক ও কোটি কোটি ডলারের আর্থিক মদদ ছাড়া বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গেরিলা দলের পক্ষে তালেবান শাসনের পতন ঘটানো অসম্ভব। তাছাড়া, সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো প্রধানত ঘটেছে বাদাখশান কিংবা হেরাতের মতো প্রদেশগুলোতে। এই অঞ্চলগুলো ইতিহাসের শুরু থেকেই যেকোনো কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি বিদ্রোহী ও অবাধ্য হিসেবে পরিচিত ছিল।

পরিসংখ্যানের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় সার্বিক রাজনৈতিক সহিংসতার হার আফগানিস্তানে বাস্তবে সামান্য হলেও কমেছে। তবে বাহ্যিক এই শান্ত ভাব দেখে তালেবানের নির্ভার থাকার কোনো সুযোগ নেই। দুটি গভীর সংকট তাদের চোখের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।

প্রথম সংকটটি হলো রাষ্ট্রের ভেতরকার প্রশাসনিক কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব। আফগানিস্তানের মতো জটিল পাহাড়ি ভূখণ্ডে একক কোনো কেন্দ্র থেকে শাসন চালানো প্রায় অসম্ভব। অতীতে সীমিত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার কারণে তালেবান স্থানীয় যুদ্ধবাজ ও দলপতিদের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিল। সেই স্বাধীনতার বিনিময়েই স্থানীয় নেতারা এতদিন তালেবানের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছিল। কিন্তু এখন কাবুলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যখন সেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সবকিছু নিজেদের মুঠোয় আনতে চাইছে, তখনই স্থানীয় সেনাপতিদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। বাদাখশানের সোনার খনি ও অস্ত্র নিয়ে ঘটা সংঘাত সেই সুপ্ত অসন্তোষেরই একটি ভয়াবহ প্রকাশ। এই প্রবণতা চলতে থাকলে তালেবানের নিজস্ব কাঠামোর ভেতরে আরও বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে।

দ্বিতীয় বিপদটি ডুরান্ড লাইনের ওপারে ওত পেতে বসে আছে। আফগানিস্তানের কোনো কোনো প্রতিবেশী দেশ কাবুলের এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। এই ক্ষেত্রে সবার আগে নাম আসে পাকিস্তানের। গত দুই বছর ধরে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যকার সম্পর্ক চরম তিক্ততার রূপ নিয়েছে। তারা প্রায় এক প্রকার অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ হলো, আফগানিস্তানের মাটিকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানে নিয়মিত আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী বালুচ লিবারেশন আর্মি। পাকিস্তানের প্রকাশ্য অভিযোগ, তালেবান এই গোষ্ঠীগুলোকে দমন করতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক, অথবা পাহাড়ি অঞ্চলের জটিলতায় তাদের থামাতে গিয়ে তারা বারবার হিমশিম খাচ্ছে।

এই অচলাবস্থার মধ্যে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আফগানিস্তানের তালেবানবিরোধী প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে প্রলুব্ধ হতে পারে। তালেবান ইতিমধ্যে সেপাহিয়ানে মিহানকে মদদ দেওয়ার জন্য পাকিস্তানকে সরাসরি অভিযুক্ত করেছে। এই কৌশলের মাধ্যমে পাকিস্তান তালেবানকে ঘরে চাপে রাখতে পারে, যাতে কাবুলের শাসকরা বাধ্য হয়ে দেশের ভেতরের অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও সাঁড়াশি অভিযানে নামে।

উপত্যকার ভবিষ্যৎ ও ক্ষমতার নির্মম সমীকরণ
পাহাড়ের বাঁকে যখন বন্দুকের নল চকচক করে ওঠে, তখন বুঝতে হবে শান্তির আবরণটি আসলে কতটা পাতলা। তালেবান হয়তো আজ বা কালই ক্ষমতাচ্যুত হচ্ছে না। তাদের হাতে রয়েছে হাজার হাজার অভিজ্ঞ যোদ্ধা, কঠোর গোপনীয়তা এবং বিরোধীদের নির্মমভাবে দমন করার রক্তচক্ষু। কিন্তু বাদাখশানের সোনার খনি থেকে শুরু করে কান্দাহারের ধূলিমলিন সড়ক পর্যন্ত যে অসন্তোষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলতে শুরু করেছে, তাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। এই বিচ্ছিন্ন আক্রমণগুলো হয়তো কাবুলের মসনদ গুঁড়িয়ে দিতে পারবে না, তবে তা কাবুলের শাসকদের নিজেদের শক্তিমত্তা সম্পর্কে বাড়তি আত্মবিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি তালেবানের ভেতরের সেই মধ্যপন্থী অংশটির অবস্থানকে দলীয় নীতিনির্ধারণে কিছুটা জোরদার করতে পারে, যারা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছিলেন যে কঠোর বলপ্রয়োগ ও অবদমন দিয়ে একটি জাতিকে অনন্তকাল ধরে শাসন করা যায় না।

আফগানিস্তানের মাটি কোনো চিরস্থায়ী শাসককে দীর্ঘদিন বরণ করে নেয়নি। যখন নিজের ঘরের যোদ্ধারাই বিদ্রোহ করতে শুরু করে এবং বাইরের পাহাড়গুলো থেকে গুলির শব্দ ধেয়ে আসে, তখন কাবুলের মসনদে বসে থাকা মানুষগুলোর পক্ষে দীর্ঘ শান্তির স্বপ্ন দেখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

মন্তব্য করুন

Logo