“সিকিমে পাহাড়ধসের পর তিস্তা নদীর প্রবাহে বাধা—প্রকৃতির বিপদ সীমান্ত মানে না।” ছবিঃ ইন্ডিয়া টুডে
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম
উত্তর সিকিমের পাহাড়ে গভীর রাতে কয়েক মুহূর্তের একটি ঘটনা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের ঘুম কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মাঝখানে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আছে, দুই দেশের প্রশাসনিক কাঠামো আছে, শত শত কিলোমিটার পথ আছে। নদীর কাছে এসব বিভাজনের অর্থ সামান্য। পাহাড় থেকে নেমে আসা জল শেষ পর্যন্ত নিজের পথ ধরেই এগোয়। সেই পথের এক প্রান্তে সিকিমের মঙ্গন, অন্য প্রান্তে বাংলাদেশের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রামের জনপদ। ফলে উত্তর সিকিমের সাম্প্রতিক ভূমিধসকে ভারতের একটি স্থানীয় দুর্যোগ হিসেবে পড়ার সুযোগ খুব কম।
৫ ও ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে উত্তর সিকিমের মঙ্গন জেলার নাগা বনাঞ্চলে থেং টানেলের বিপরীতে বড় ধরনের ভূমিধস ঘটে। সিকিম রাজ্য সরকারের তথ্য অনুসারে, নাগা–তোসা সড়কের নতুন করে কাটা পাহাড়ি ঢালের বড় অংশ ধসে পড়ে তিস্তা ও চ্যাকুং নদীর মিলনস্থলের কাছে। বিপুল মাটি ও পাথর নদীর প্রবাহ আংশিক আটকে দেয়। উজানে পানি জমতে শুরু করে। প্রথম দিকে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, জমে থাকা পানি হঠাৎ বেরিয়ে এলে নিচের দিকে প্রবল ঢল নামতে পারে।
পরের সরকারি পর্যবেক্ষণে স্বস্তির খবর আসে। আটকে পড়া প্রাকৃতিক প্রবাহপথ আরও খুলে যায় এবং পানি স্বাভাবিক গতিতে নামতে শুরু করে। আকস্মিক প্রবল ঢলের আশঙ্কাও অনেকটা কমে আসে। তারপরও মঙ্গন জেলা প্রশাসন নদীতীরের মানুষকে সতর্ক থাকতে, নদীর কাছ থেকে দূরে থাকতে এবং প্রয়োজন হলে উঁচু জায়গায় সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে বলেছে। পুলিশ ও জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নদীর পানির উচ্চতা এবং পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
ছবিঃ ইন্ডিয়া টুডেএখানেই ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। পাহাড়ধসের স্থানটির দিকে তাকালে মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। সরকারি বিবরণেই বলা হয়েছে, ধসটি ঘটেছে নতুন নাগা–তোসা সড়কের জন্য কাটা পাহাড়ি ঢালে। সংবাদমাধ্যমেও একই তথ্য এসেছে। ফলে প্রবল বৃষ্টি, পাহাড়ের স্বাভাবিক ভঙ্গুরতা, মাটির পানি ধারণক্ষমতার পাশাপাশি পাহাড় কাটার প্রভাব কতটা ছিল, তার বিজ্ঞানসম্মত অনুসন্ধান প্রয়োজন।
হিমালয়ের পাহাড় স্বভাবতই নবীন ও ভঙ্গুর। তিস্তা অববাহিকা নিয়ে ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় খাড়া ঢাল, অস্থিতিশীল শিলা, প্রবল বর্ষণ, ভূমিকম্পপ্রবণতা, হিমবাহের পরিবর্তন এবং মানুষের নির্মাণ কর্মকাণ্ডকে ভূমিধসের ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাহাড়ের একটি অংশ কাটা মানে কেবল কিছু মাটি সরিয়ে সড়ক নির্মাণ করা নয়। ঢালের ভারসাম্য, পানি নিষ্কাশন, শিলাস্তরের স্থিতি এবং নিচে প্রবাহিত নদীর সঙ্গে সেই পরিবর্তনের সম্পর্কও বিবেচনায় নিতে হয়।
তিস্তার সাম্প্রতিক ঘটনা তাই ‘ভূমিধস হয়েছে, পানি আটকে গেছে, পরে নেমে গেছে’ এমন সরল বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বড় শিক্ষা হারিয়ে যাবে। হিমালয়ের একটি দুর্যোগ অনেকগুলো বিপদকে পরপর সক্রিয় করতে পারে। পাহাড় ধসে নদী আটকে যেতে পারে, জমে থাকা পানি অস্থায়ী জলাধার তৈরি করতে পারে, সেই বাধা হঠাৎ ভেঙে প্রবল ঢল নামতে পারে, ঢলের সঙ্গে বিপুল পলি ও পাথর নেমে আসতে পারে, সেতু, সড়ক, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বসতি আক্রান্ত হতে পারে। নদীর নিচের অংশে পৌঁছে একই ঢল কৃষিজমি, চর এবং জনপদের জন্য নতুন বিপদ তৈরি করতে পারে।
তিস্তার মানুষ এর ভয়াবহতা মাত্র তিন বছর আগেই দেখেছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ লোনাক হিমবাহ হ্রদে বিপর্যয়ের পর সৃষ্ট আকস্মিক ঢল তিস্তা উপত্যকায় ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনে। পরবর্তী আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পাওয়া তথ্য আরও উদ্বেগজনক। প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ঘনমিটার হিমায়িত মোরেইন পদার্থ দক্ষিণ লোনাক হ্রদে ধসে পড়েছিল। তাতে প্রায় ২০ মিটার উঁচু ঢেউ তৈরি হয় এবং প্রায় পাঁচ কোটি ঘনমিটার পানি বেরিয়ে আসে। প্রবল স্রোত পথে প্রায় ২৭ কোটি ঘনমিটার পলি ও ধ্বংসাবশেষ ক্ষয় করে নিয়ে যায়। তিস্তা–৩ জলবিদ্যুৎ বাঁধও সেই বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়। গবেষকেরা জলবায়ু পরিবর্তন, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া, অস্থিতিশীল পাহাড়ি অংশ এবং ভারী বৃষ্টির সম্মিলিত প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, ২০২৩ সালের সেই বিপর্যয়ের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। অর্থাৎ সিকিমের হিমবাহ, পাহাড়, জলাধার, ভূমিধস আর বাংলাদেশের তিস্তার চরবাসীর জীবন আলাদা দুটি বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ ক্রমেই কমছে। একটি নদী পুরো অববাহিকাকে একই জলপ্রবাহের মধ্যে যুক্ত করে রেখেছে।
বাংলাদেশের অংশে ঝুঁকির চরিত্র আরও মানবিক। তিস্তার তীরবর্তী বহু মানুষের বসতভিটা, ফসল, গবাদিপশু, মাছ ধরা, দিনমজুরি ও স্থানীয় অর্থনীতি নদীর আচরণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। চলতি বছরের জুনেই উজানের ঢলে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার সাত সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। তখন তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয় এবং নিচু এলাকার মানুষকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় বাংলাদেশের নিম্ন তিস্তা অববাহিকার নীলফামারী, রংপুর ও লালমনিরহাটের বিস্তৃত অঞ্চলকে বন্যা ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকা হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নদীর ভঙ্গুর তীর, সমতল নিচু ভূমি এবং বর্ষাকালের প্রবল প্রবাহ সেখানে ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
এই বাস্তবতায় আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও উজানমুখী হতে হবে। বাংলাদেশের সীমান্তে পানি পৌঁছানোর পর উচ্চতা মাপা যথেষ্ট নয়। সিকিমের হিমবাহ হ্রদ, ভূমিধস, বৃষ্টিপাত, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানি ছাড়ার তথ্য, নদীতে তৈরি অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পয়েন্টের প্রবাহ সংক্রান্ত তথ্য যত দ্রুত বাংলাদেশের কাছে পৌঁছাবে, মানুষের হাতে প্রস্তুতির সময় তত বাড়বে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তা নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন প্রধানত শুষ্ক মৌসুমের পানি বণ্টন ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে আলোচনার পরিসর বড় করা জরুরি। পানি ভাগাভাগির পাশাপাশি বন্যা, আকস্মিক ঢল, হিমবাহ হ্রদ, ভূমিধস, পলি, নদীভাঙন এবং আগাম সতর্কীকরণকে একই আন্তঃসীমান্ত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা দরকার। উজানের একটি পাহাড় কখন ভাঙছে, কোথায় নদী আটকে যাচ্ছে, কত পানি জমছে, কোন বাঁধ থেকে কত পানি ছাড়া হচ্ছে, সম্ভাব্য ঢল সীমান্তে পৌঁছাতে কত সময় লাগতে পারে, এসব তথ্য দ্রুত বিনিময়ের স্থায়ী ব্যবস্থা মানুষের জীবন রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আগাম সতর্কবার্তাও শুধু সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তিস্তার চরাঞ্চলের একজন কৃষক, জেলে, বৃদ্ধ মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী কিংবা শিশুদের নিয়ে বসবাসকারী একটি পরিবার কত দ্রুত খবর পাবেন, সেটাই কার্যকারিতার আসল পরীক্ষা। মোবাইল বার্তা, মসজিদের মাইক, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল, ইউনিয়ন পরিষদ, বিদ্যালয়, কমিউনিটি রেডিও এবং স্থানীয় প্রশাসনকে যুক্ত করে শেষ মানুষ পর্যন্ত সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, গবাদিপশু কোথায় সরানো যাবে, জরুরি ওষুধ ও কাগজপত্র কীভাবে রক্ষা করতে হবে, তার পূর্ব প্রস্তুতি থাকতে হবে।
উত্তর সিকিমের এবারের বিপদ আপাতত অনেকটাই কমেছে। তাই ঘটনাটিকে শেষ হয়ে যাওয়া একটি সংবাদ হিসেবে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিপর্যয় না ঘটার সময়টাই পরবর্তী বিপদের প্রস্তুতির সবচেয়ে মূল্যবান সময়। ২০২৩ সালের তিস্তা বিপর্যয় আমাদের সামনে রয়েছে, সাম্প্রতিক ভূমিধস আবার একই নদীপথে সতর্ক ঘণ্টা বাজিয়েছে।
তিস্তার পানি বাংলাদেশের সীমান্তে ঢোকার আগে পাসপোর্ট চায় না। পাহাড়ধসও রাষ্ট্রের সীমানা মেনে তার অভিঘাত নির্ধারণ করে না। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে তাই নদীকে কেবল পানি বণ্টনের হিসাব দিয়ে বোঝা কঠিন। পুরো অববাহিকাকে একটি জীবন্ত ও পরস্পরনির্ভর ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সিকিমের পাহাড়ে শুরু হওয়া বিপদের সংবাদ যত দ্রুত লালমনিরহাটের চর পর্যন্ত পৌঁছাবে, তত বেশি মানুষ নিজের পরিবার, ফসল ও জীবিকা রক্ষার সময় পাবেন। দুর্যোগ ঠেকানো সব সময় মানুষের হাতে থাকে না; দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কতটা কমানো যাবে, তার বড় অংশই নির্ভর করে জ্ঞান, প্রস্তুতি, তথ্যের দ্রুত প্রবাহ এবং সীমান্তের দুই পাশের সমন্বয়ের ওপর।
মন্তব্য করুন

