Logo

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

×

Follow Us

সিন্ধু পানি চুক্তি ইস্যুতে পাকিস্তানের পক্ষে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়

পাকিস্তানের হায়দরাবাদে কোটরি ব্যারাজের কাছে সিন্ধু নদী, ২২ জুলাই ২০২৫। ছবিঃ এএফপি

দশদিগন্ত

সিন্ধু পানি চুক্তি ইস্যুতে পাকিস্তানের পক্ষে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়

সাঈদ হাসান

সাঈদ হাসান

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম

নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিসি আদালত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ৬ দশকের পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছে। আদালতের রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ভারত একতরফাভাবে এই চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করতে পারে না এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী নদীর পানি বণ্টন ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ পরিচালনায় ভারতকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। 

গত বছর ভারত একতরফাভাবে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিল। ৩১শে আগস্ট ২০২৬ এর রায়ে আন্তর্জাতিক আদালত বলেছে, চুক্তির ধারা অনুযায়ী এভাবে চুক্তি স্থগিত করার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।

এ রায়ে ভারতশাসিত কাশ্মীরের বিতর্কিত রাটল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রকল্পের জলাধারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাঁধের কিছু নির্দিষ্ট অংশ নির্মাণের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক নিযুক্ত একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ২০২৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যে পুরো বিষয়টি মূল্যায়ন না করা পর্যন্ত এই সংক্রান্ত অতিরিক্ত নির্মাণ বন্ধ থাকবে বলে আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক এই আদালতের রায়ের জবাবে ভারত বলেছে, যে তারা এই রায় মানবে না। ভারত বলেছে, "এই আদালতের কোনো এখতিয়ার নেই ভারতের সার্বভৌম কোনো সিদ্ধান্তের ওপর রায় দেওয়ার।" ফলে ভবিষ্যৎ বা বর্তমান কোনো রায়ই ভারতের প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলবে না বলে দাবি দিল্লির।

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত 

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং ভূ-রাজনীতিতে সিন্ধু পানি চুক্তি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় মোট ৬টি নদীর পানি ভাগ করা হয়:
পূর্বাঞ্চলীয় ৩টি নদী (রবি, বিয়াস ও সতলেজ) -- এই তিনটি নদীর ওপর একচ্ছত্র অধিকার পায় ভারত।
পশ্চিমাঞ্চলীয় ৩টি নদী (সিন্ধু, ঝেলম ও চেনাব) -- এই ৩টি নদীর পানির সিংহভাগ বা ব্যবহারের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় পাকিস্তানকে।

পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষি জমি এবং একটি বড় অংশের সুপেয় পানির প্রধান উৎস এই পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলো। ফলে এটি পাকিস্তানের জন্য একটি 'লাইফলাইন'। ১৯৬০ সালের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ৩টি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এবং একাধিক সীমান্ত সংঘাত (যেমন কারগিল যুদ্ধ বা পুলওয়ামা হামলা) হলেও এই চুক্তিটি এতদিন পর্যন্ত সুচারুভাবে বজায় ছিল। এমনকি যেকোনো সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও পানি সরবরাহ ব্যাহত হয়নি।

২০২৫ সালেৎভারত এই চুক্তি স্থগিত করে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়াতে কাজ শুরু করেছিল। পাকিস্তানের অভিযোগ ছিল—এতে করে তারা খরা বা পানি সংকটের মুখে পড়তে পারে, যা প্রকারান্তরে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

হেগের এই আদালতের রায়ে পাকিস্তান সাময়িক কূটনৈতিক স্বস্তি পেলেও ভারত যদি আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ার অস্বীকার করে নিজেদের কাজ চালিয়ে যায়, তবে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত ও সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে দক্ষিণ এশিয়ায় রিভার-ডিপ্লোমেসি বা পানির অস্ত্রায়ন নিয়ে আলোচনা এখন বিশ্বরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রে চলে এসেছে।

মন্তব্য করুন

Logo