Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় আস্থা ফিরবে কি?

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট নিরসনের দাবিতে ২০ দিন ধরে অনশন করছেন সোনম ওয়াংচুক

দশদিগন্ত

২০ তম দিনে ওয়াংচুকের অনশন

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় আস্থা ফিরবে কি?

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:২৭ এএম

দিল্লির যন্তর মন্তরে বসে আছেন তিনি। এটা কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়, ক্ষমতার লড়াই নয়; নেই কোনো নির্বাচনী স্লোগান। আছে শুধু একটি মাদুর, পানির গ্লাস, চিকিৎসকদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ আর অনশনে ক্ষয় হতে থাকা একটি শরীর।
২০ দিন ধরে এমনটাই চলছে—অনশন করছেন লাদাখের প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ, উদ্ভাবক ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। যে মানুষটির জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বলিউডের বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর ‘ফুনসুখ ওয়াংডু’ বা ‘র‌্যাঞ্চো’ চরিত্র তৈরি হয়েছিল, তিনি আজ ভারতের কোটি কোটি শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীর হতাশা, ক্ষোভ এবং বঞ্চনার প্রতীক।
 
তার ওজন কমেছে প্রায় ৯ কেজি। চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘ অনশনের কারণে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। দিল্লি হাইকোর্টও তার স্বাস্থ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করতে বলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শিক্ষাবিদ আজ কেন অনশনে? সোনম ওয়াংচুকের আমরণ অনশন পারবে কি এ সমস্যার সমাধান এনে দিতে?
 
প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে আস্থাহীনতার সংকট
 
এটি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের সংকটের গল্প। গত কয়েক বছরে ভারতে সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষাগুলো বারবার বিতর্কের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নিট (NEET)-কে ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং তদন্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
 
প্রতিটি পরীক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লাখো তরুণের ভবিষ্যৎ। একটি প্রশ্নপত্র ফাঁস মানে শুধু একটি পরীক্ষা বাতিল নয়; বহু শিক্ষার্থীর অনেক দিনের শ্রম, পরিবারের অর্থনৈতিক ত্যাগ এবং মানসিক স্থিতি ভেঙে পড়া। এই বাস্তবতায় আন্দোলনকারীদের দাবি—এটি আর কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। আর এই ন্যায়বিচারের লক্ষ্যেই সোনম ওয়াংচুকের আমরণ অনশন।
 
‘ককরোচ জনতা পার্টি’—অপমানকে প্রতিবাদের প্রতীকে রূপ দেওয়া
 
এই আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ককরোচ জনতা পার্টি। এটি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়। বরং শিক্ষার্থী ও তরুণদের একটি ব্যঙ্গাত্মক নাগরিক আন্দোলন। এর পেছনের ঘটনাটিও প্রতীকী। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি শুনানিতে কিছু বেকার তরুণকে ‘ককরোচ’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বলে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। সেই অপমানজনক উপমাকেই নিজেদের পরিচয়ে পরিণত করেন আন্দোলনের উদ্যোক্তারা। তাদের বক্তব্য—রাষ্ট্র যদি তরুণদের ‘ককরোচ’ মনে করে, তবে সেই ‘ককরোচ’রাই গণতান্ত্রিক উপায়ে জবাবদিহির দাবি তুলবে।
 
এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অভিজিৎ দিপকে। জুন মাস থেকে যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি। পরে ২৮ জুন সেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে আমরণ অনশন শুরু করেন সোনম ওয়াংচুক। ওয়াংচুক স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের আন্দোলন নয়। এটি শিক্ষা, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের আন্দোলন।
 
কী আছে দাবিতে
 
আন্দোলনকারীরা কতগুলো নির্দিষ্ট দাবি সামনে রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চান কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পরীক্ষায় অনিয়মের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জাতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য দায়ীদের কঠোর শাস্তি এবং পরীক্ষাজনিত মানসিক চাপে আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ। তাদের যুক্তি, কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরীক্ষা পরিচালনা, তথ্য নিরাপত্তা এবং জবাবদিহির পুরো কাঠামো পুনর্গঠন করতে হবে।
 
বাড়ছে মানুষের সমর্থন
 
এই আন্দোলন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করেছে। বিরোধী দলের নেতারা যেমন সংহতি জানিয়েছেন, তেমনি অভিনেতা, লেখক, শিক্ষাবিদ, কৌতুকশিল্পী ও সামাজিক কর্মীরাও অনশনস্থলে গিয়েছেন।
থ্রি ইডিয়টস-এ ‘চতুর রামালিঙ্গম’ চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা ওমি বৈদ্য ভিডিও বার্তায় বলেছেন, তিনি চান না ‘ফুনসুখ ওয়াংডু’ এভাবে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ুন। পরে অভিনেতা অতুল কুলকার্নিও এক দিনের প্রতীকী অনশনের ঘোষণা দেন এবং সরকারের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানান। সমর্থন জানিয়েছেন অভিনেত্রী সোনাক্ষি সিনহা।
 
আদালতের নির্দেশ এবং ২০ জুলাইয়ের পদযাত্রা
 
তবে, এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো সারা নেই। আন্দোলনের মূল দাবিগুলো নিয়ে এখনো সরকারের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। ওয়াংচুকের অনশন দীর্ঘায়িত হওয়ায় বরং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। দিল্লি হাইকোর্ট স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণেই আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ আরও বাড়ছে। এর মধ্যেই ২০ জুলাই শুরু হচ্ছে ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। সেদিন যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পদযাত্রার ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। ওয়াংচুকও দেশবাসীকে অনশন ভাঙার আহ্বান না জানিয়ে বরং সেই পদযাত্রায় অংশ নেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
 
ওয়াংচুক এখন প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি
 
সোনম ওয়াংচুকের অনশনকে কেবল একজন শিক্ষাবিদ বা পরিবেশকর্মীর ব্যক্তিগত প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন এক সময় ঘটছে, যখন বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রিক দেশগুলোর একটিতে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি তরুণদের আস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিটি ঘটনা কেবল পরীক্ষার ফল বদলে দেয় না; বদলে দেয় একজন শিক্ষার্থীর জীবন, একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং একটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের বিশ্বাস।
সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে যন্তর মন্তরের ছোট্ট অনশনমঞ্চ ভারতের সবচেয়ে বড় শ্রেণিকক্ষে পরিণত হয়েছে। সেখানে শিক্ষক একজনই—সোনম ওয়াংচুক। আর পাঠ একটাই—শিক্ষা ব্যবস্থায় আস্থা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া কোনো দেশের ভবিষ্যৎ টেকসই হতে পারে না।

মন্তব্য করুন

Logo