তুর্কির ওপর আরোপিত কাটসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প
ভূরাজনীতিতে তুরস্কের বড় জয়!
সাঈদ হাসান
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:২৩ এএম
তুর্কির ওপর আরোপিত কাটসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প। এতে করে তুর্কির জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং পাশাপাশি নিজস্ব সমরাস্ত্র শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়ার পথ খুলে গেল। পাশাপাশি অন্যান্য দেশের জন্যও তুর্কির সঙ্গে অস্ত্র বেচাকেনা আরও সহজ হলো।
কাটসা (CAATSA) নিষেধাজ্ঞা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত কঠোর আইন, যার পূর্ণ রূপ ‘কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভারসারিস থ্রু স্যাঙ্কশনস অ্যাক্ট’। সহজ কথায়, আমেরিকার শত্রু ভাবাপন্ন দেশগুলোর (যেমন রাশিয়া, ইরান বা উত্তর কোরিয়া) সাথে কোনো রাষ্ট্র যদি বড় ধরনের সামরিক বা প্রতিরক্ষা চুক্তি করে, তবে সেই রাষ্ট্রের ওপর ওয়াশিংটন এই আইনের অধীনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তুর্কির জন্য এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের খবর এতো স্বস্তিকর যে এরদোয়ান নিজেও হয়তো মিনিট বিশেক আগে ট্রাম্পের মুখ থেকে শুনে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, যে কারণে নিজের ট্রান্সলেটর ফাতিমা গুলহামকে তিনি কথাগুলো ভালোভাবে শোনার জন্য ইশারা করছিলেন।
তুর্কির ওপর কাটসা আরোপের ঘটনা ঘটেছিল ২০১৯-২০২০ সালের দিকে, যখন ন্যাটো মিত্র হওয়া সত্ত্বেও আঙ্কারা রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যাধুনিক এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এর শাস্তিস্বরূপ আমেরিকা তুর্কির প্রধান প্রতিরক্ষা ক্রয় সংস্থা ‘এসএসবি’-র ওপর কাটসা নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং তাদেরকে আমেরিকার পঞ্চম প্রজন্মের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ প্রোগ্রাম থেকে সম্পূর্ণ বের করে দেয়। এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রভাব তুর্কির সামরিক সক্ষমতা, সমরাস্ত্র শিল্প ও অর্থনীতির পাশাপাশি তুর্কি-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে।
কাটসা নিষেধাজ্ঞার কারণে তুর্কির নিজস্ব বেশকিছু সামরিক প্রজেক্ট বড় ধাক্কা খেয়েছিল। আমেরিকা থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তির লাইসেন্স পাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের অনেক দেশীয় অস্ত্র তৈরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। এই নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে নিজস্ব যুদ্ধবিমান ‘কান’ (KAAN)-এর জন্য আমেরিকার তৈরি এফ১১০ ইঞ্জিন আমদানি সহজ হবে। ফলে তুর্কির সামরিক সক্ষমতা ও আধুনিকায়ন এক লাফে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সরাসরি অর্থ হলো তুর্কি আবারও আমেরিকার এফ-৩৫ ব্ল্যাকহক বা স্টিলথ ফাইটার জেটের ক্রেতা তালিকায় ঢুকতে পারবে। পূর্বে ডেলিভারি আটকে থাকা যুদ্ধবিমান পাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার হবে, যা তুর্কির বিমান বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আকাশসীমার আধিপত্য ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
প্রতিরক্ষা খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে তুর্কির অর্থনীতি ও বিদেশি বিনিয়োগে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ ছিল। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং আঙ্কারার প্রতিরক্ষা রপ্তানি বাণিজ্য আবার চাঙা হবে।
আমেরিকা ও তুর্কি দুই দেশই ন্যাটোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী তুর্কির। কিন্তু রাশিয়ার থেকে অস্ত্র কেনা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই মিত্রের সম্পর্কে যে অভূতপূর্ব বরফ জমেছিল, তা এখন গলতে শুরু করবে। ন্যাটোর দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে আঙ্কারা এবং ওয়াশিংটনের কৌশলগত সহযোগিতা আবার জোরদার হবে।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জন্য এটি একটি বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জয়। আঙ্কারা সবসময় দাবি করে এসেছে যে, সার্বভৌম দেশ হিসেবে যেকোনো উৎস থেকে অস্ত্র কেনার অধিকার তাদের আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আজকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার ঘোষণা দেওয়ায় প্রমাণিত হলো যে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত আঙ্কারার ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে অবহেলা করতে পারেনি।
মধ্যপ্রাচ্য, কৃষ্ণসাগর এবং ইউক্রেন যুদ্ধের এই উত্তাল সময়ে তুর্কিকে পাশে পাওয়া আমেরিকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মাধ্যমে আমেরিকা আঙ্কারাকে রাশিয়ার প্রভাব বলয় থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিজেদের ক্যাম্পে শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করছে হয়তো, এমন ধারণা করা যায়।
তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে মার্কিন কংগ্রেস থেকে আইনগত ও রাজনৈতিক বাধা আসতে পারে, কারণ মার্কিন আইন প্রণেতাদের একটি অংশ এখনো ইজরায়েলের প্রতি ভীষণ অনুগত এবং তারা তুর্কিকে শক্তিশালী হতে দেওয়ার তীব্র বিরোধী। এমনকি গতরাতেও ইজরায়েলের একাধিক মন্ত্রী তুর্কির হাতে অত্যাধুনিক মার্কিন জেট পৌঁছলে ওই অঞ্চলের আকাশে শক্তিসাম্য নষ্ট হবে এবং ইজরায়েল পিছিয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছে। এই সবকিছু সত্ত্বেও, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কাটসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার এই ঘোষণা ট্রাম্পের তরফ থেকে যেহেতু এসেই গেছে, বুঝা যাচ্ছে ওয়াশিংটন এখন আঙ্কারার সঙ্গে দীর্ঘদিনের শীতলতা দূর করে এক নতুন সমীকরণের সূচনা করতে যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন

