ট্রাম্প ইরানকে দুর্বল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইরান সেই চাপকেই ব্যবহার করেছে নিজেকে পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে।
ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি কি ইরানের পাতা ফাঁদে আটকে গেল?
রাজিক হাসান
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক ফাঁদে পা দিয়েছেন, যা ডেমোক্র্যাটরা তৈরি করেনি, মিডিয়া তৈরি করেনি, এমনকি তাঁর কোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীও তৈরি করেনি। এই ফাঁদ পেতেছিল তেহরান।
আর ট্রাম্প প্রতিটি সতর্কবার্তা, প্রতিটি গোয়েন্দা ব্রিফিং এবং তাঁকে থামতে বলা ইতিহাসের প্রতিটি নজির উপেক্ষা করে সরাসরি সেই ফাঁদে হেঁটে গেছেন। এখন তিনি সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।
কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নিজের শক্তি প্রদর্শন করে আসছিলেন। সর্বোচ্চ চাপ, সর্বোচ্চ বাগাড়ম্বর, সর্বোচ্চ হুমকি—প্রতিটি প্রকাশ্য বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল একটি বার্তা দেওয়া: ‘আমাকে পরীক্ষা করতে এসো না।’
এই সময়জুড়ে মনে হচ্ছিল, ইরান যেন পিছু হটছে। ট্রাম্পের চারপাশের যুদ্ধবাজ বা ‘হক’ (Hawks) এই দৃশ্যের দিকে আঙুল তুলে বলছিলেন, ‘দেখলেন তো? শক্তি প্রদর্শন কাজ করে। ইরান ভয় পেয়েছে।’
কিন্তু ইরান ভয় পায়নি। তারা আসলে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছিল। কারণ ওয়াশিংটনের যুদ্ধবাজরা ইরানের কৌশলগত সংস্কৃতি সম্পর্কে যে বিষয়টি কখনোই পুরোপুরি বুঝতে পারেনি, তা হলো—পার্সিয়ান দাবায়, যার উৎপত্তিও পারস্যে, সবচেয়ে শক্তিশালী চালটি সব সময় আক্রমণ নয়। সবচেয়ে শক্তিশালী চাল হলো এমন একটি আত্মত্যাগ, যা এমন এক আক্রমণের ভিত্তি তৈরি করে, যার আভাস প্রতিপক্ষ অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগে বুঝতেই পারে না।
ইরান নিজেদের দৃশ্যমানতা বিসর্জন দিয়েছিল। তারা শক্তির প্রকাশকে আড়ালে রেখেছিল। বিশ্বকে বিশ্বাস করতে দিয়েছিল যে তারা পিছু হটছে। অথচ সেই সময়েই তারা এমন এক কৌশলগত ফাঁদের স্থাপত্য নির্মাণ করছিল, যা একবার সক্রিয় হলে প্রতিপক্ষের নিরাপদে ফিরে যাওয়ার মতো কোনো চাল আর অবশিষ্ট থাকে না।
ইরান সুপরিকল্পিতভাবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিকল্প তেল রপ্তানি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সক্ষম। ওয়াশিংটন যখন ইরানের আনুষ্ঠানিক তেল রপ্তানি কমে যাওয়াকে সাফল্য হিসেবে দেখছিল, তখন ইরানের প্রকৃত তেল-রাজস্ব, এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বরং বেড়েছে। কারণ ইরানের গড়ে তোলা এই ‘শ্যাডো ইকোনমি’ নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বড়, অনেক বেশি পরিশীলিত এবং অনেক বেশি কার্যকর।
একই সময়ে উস্কানিমূলক সামরিক কর্মকাণ্ড কমানোর আড়ালে ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনও ত্বরান্বিত করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আর সেই পুরোনো শাহাব সিরিজের নয়, যেগুলো পশ্চিমা গোয়েন্দারা কয়েক দশক ধরে পর্যবেক্ষণ করে আসছে। বরং এগুলো সলিড-ফুয়েল, রোড-মোবাইল এবং উন্নত গাইডেন্স প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন প্রজন্মের ব্যবস্থা, যা নির্ভুলতার ক্ষেত্রে এক বড় অগ্রগতি বলে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে, আমেরিকার অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রায় প্রতিটি দেশের সঙ্গে ইরান নীরবে সম্পর্ক জোরদার করেছে। রাশিয়া, চীন, ভারত, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল—তালিকাটি দীর্ঘ, এবং সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ট্রাম্প যখন ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নিয়ে টুইট করছিলেন, তখন ইরান গড়ে তুলছিল ‘সর্বোচ্চ স্থিতিস্থাপকতা’। এবং এখন, এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফাঁদটি কার্যকর হয়েছে।
কারণ ট্রাম্প আমেরিকার জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর ইরাননীতি ফল দেবে। তিনি বলেছিলেন, চাপের মুখে ইরান আমেরিকার শর্তে আলোচনার টেবিলে ফিরবে। তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর করা চুক্তি আগের যেকোনো প্রেসিডেন্টের অর্জনকে ছাড়িয়ে যাবে।
কিন্তু তার কোনোটিই ঘটেনি। আর এখন, সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।
এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের আর আলোচনায় বসার তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তারা এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যা ডলারনির্ভর ব্যবস্থার বাইরে কাজ করতে পারে। তারা এমন একটি সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করেছে, যা সংঘাতের সম্ভাব্য খরচকে আমেরিকার জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল করে তোলে। একই সঙ্গে তারা এমন এক কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে, যাতে ওয়াশিংটন যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবে তাদের আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা আর সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে ট্রাম্প এখন তাঁর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মাঝখানে আটকে গেছেন। তিনি যদি সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ান, তাহলে এমন একটি যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা তাঁর প্রেসিডেন্সিকে বিপর্যয়ের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। তিনি যদি পিছু হটেন, তাহলে কার্যত স্বীকার করতে হবে যে তাঁর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। আর যদি আলোচনার পথে এগোতে চান, তাহলে ইরান এমন শর্ত সামনে আনতে পারে, যা ট্রাম্পের পক্ষে গ্রহণ করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
অর্থাৎ, ট্রাম্প ইরানকে দুর্বল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইরান সেই চাপকেই ব্যবহার করেছে নিজেকে পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে। ফলে যে রাষ্ট্রকে ভাঙার চেষ্টা হয়েছিল, সেটি এখন আগের চেয়ে আরও শক্ত, আরও স্থিতিশীল এবং ভাঙা আরও কঠিন।
মন্তব্য করুন

