Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

নিরাপত্তার চিরায়ত ধারণা ও খনিজ সম্পদের সংযোগ

দশদিগন্ত

জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পদ

নিরাপত্তার চিরায়ত ধারণা ও খনিজ সম্পদের সংযোগ

Icon

সুমিত রায়

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার আদিমতম ধারণাটি মূলত ভৌগোলিক সীমানা এবং সামরিক বাহিনীর আকারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রাচীন বা মধ্যযুগে একটি রাষ্ট্রের শক্তি মাপা হতো তার দুর্গের দেয়াল কতটা চওড়া কিংবা পদাতিক সৈন্যের সংখ্যা কত, তার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে নিরাপত্তার এই চিরায়ত ব্যাকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন কোনো দেশের আকাশসীমা বা জলসীমা সুরক্ষিত রাখলেই রাষ্ট্র নিরাপদ থাকে না, বরং তার শিল্পকারখানা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাটা সবচেয়ে জরুরি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে নয়া-বাস্তববাদ নামক তাত্ত্বিক কাঠামোর মাধ্যমে চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত তাত্ত্বিক কেনেথ ওয়াল্টজ তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রগুলো সবসময় নিজেদের আপেক্ষিক ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করে। আর বর্তমান বিশ্বে এই ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রধানতম উপায় হলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, যার একেবারে গোড়ায় রয়েছে কৌশলগত খনিজ সম্পদ। মাটির নিচের এই উপাদানগুলো ছাড়া একটি রাষ্ট্রের বিশাল সেনাবাহিনীও নিমিষে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। তাই খনিজ সম্পদের সুরক্ষাকে এখন আর নিছক অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি সরাসরি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার সমীকরণে পরিণত হয়েছে।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে সামরিক কৌশলবিদরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে, যুদ্ধের ময়দানে জয়-পরাজয় কেবল সেনাপতির দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। একটি দেশের পেছনের শিল্প কাঠামো কতটা মজবুত, সেটাই আসল নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে রাষ্ট্রগুলোর কাছে ইস্পাত, টাংস্টেন বা অ্যালুমিনিয়ামের বিশাল মজুদ ছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে পেরেছিল। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পারে যে, খনিজ সরবরাহের চেইন যদি একবার ভেঙে পড়ে, তবে শত্রুর কোনো গুলি ছোঁড়ার আগেই পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। মূলত এই ভীতি থেকেই উন্নত দেশগুলো তাদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সাথে সম্পদ সংগ্রহ নীতিকে একীভূত করতে বাধ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ, স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর বিশাল রাষ্ট্রীয় মজুদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি প্রমাণ করে যে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভিত্তি কোনো বায়বীয় আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, বরং তা দাঁড়িয়ে থাকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং পরিমাপযোগ্য কিছু ধাতব উপাদানের ওপর।

বর্তমানের জটিল বিশ্বায়িত ব্যবস্থায় নিরাপত্তার ধারণাটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। একটি দেশের সীমানা হয়তো সুরক্ষিত, কিন্তু হাজার মাইল দূরের কোনো খনিতে শ্রমিক ধর্মঘট হলে সেই দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরাসরি হুমকির মুখে পড়তে পারে। আধুনিক সামরিক বাহিনী অত্যন্ত জটিল এবং সূক্ষ্ম প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধবিমানের রাডার থেকে শুরু করে সাবমেরিনের সোনার সিস্টেম - সবকিছুই নির্দিষ্ট কিছু খনিজের অভাবে পুরোপুরি বিকল হয়ে যেতে পারে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তার নীতিনির্ধারকদের এখন শুধু মানচিত্রের দিকে তাকালে চলে না, তাদের চোখ রাখতে হয় বৈশ্বিক খনিজ উত্তোলনের পরিসংখ্যান এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ছোটখাটো পরিবর্তনের দিকে। এই আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থায় খনিজ সম্পদ হয়ে উঠেছে একটি অদৃশ্য বর্ম, যা ছাড়া রাষ্ট্রের সার্বভৌমিকতা নিতান্তই একটি ফাঁকা বুলি। খনিজ সম্পদের এই কৌশলগত গুরুত্ব রাষ্ট্রগুলোকে এক নতুন ধরনের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ করেছে, যেখানে মিত্র খোঁজার চেয়ে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী খোঁজাটা বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। 

সামরিক প্রযুক্তি ও আধুনিক সমরাস্ত্রের কাঁচামাল

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকালে মনে হতে পারে এটি কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট এবং সফটওয়্যারের খেলা। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো যখন আকাশে উড়ে কিংবা মিসাইলগুলো যখন নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানে, তখন এর পেছনের সফটওয়্যার প্রকৌশলীদেরই বেশি কৃতিত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই দেখা যাবে, এই পুরো সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ভৌত ভিত্তি লুকিয়ে আছে অত্যন্ত বিরল কিছু খনিজ উপাদানের ভেতরে। আমেরিকার তৈরি এফ-৩৫ ফাইটার জেটের কথা ধরা যাক, যা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। এই একটি মাত্র যুদ্ধবিমান তৈরি করতে প্রায় চারশ কিলোগ্রাম বিরল মৃত্তিকা মৌল বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট প্রয়োজন হয়। এই বিমানের নেভিগেশন সিস্টেম, লেজার টার্গেটিং এবং রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তিতে ইট্রিয়াম, টার্বিয়াম এবং নিওডাইমিয়ামের মতো ধাতুগুলো অপরিহার্য। এই ধাতুগুলো ছাড়া এফ-৩৫ কেবল একটি সাধারণ এবং অত্যন্ত দামি ধাতব কাঠামো ছাড়া আর কিছুই নয়। সামরিক প্রযুক্তির এই চরম নির্ভরতাকে অনেক বিশ্লেষক প্রযুক্তিগত নির্ধারণবাদ এর দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু ভৌত উপাদান যুদ্ধের ধরন এবং রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নির্ধারণ করে দেয়।

যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি আধুনিক নৌবাহিনী এবং মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও কৌশলগত খনিজের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোর যে সাইরেন বা সোনার সিস্টেম জলের নিচে শত্রুর গতিবিধি শনাক্ত করে, তার কার্যকারিতা নির্ভর করে নির্দিষ্ট ধরনের চৌম্বকীয় ধাতুর ওপর। আবার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো যখন বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করে, তখন প্রচণ্ড তাপে যেন সেগুলো গলে না যায়, তার জন্য টাইটানিয়াম এবং টাংস্টেনের অত্যন্ত মজবুত আবরণ ব্যবহার করা হয়। রাতের অন্ধকারে শত্রুকে দেখার জন্য ব্যবহৃত নাইট ভিশন গগলস কিংবা থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরায় জার্মেনিয়ামের মতো বিরল উপাদান ব্যবহৃত হয়। সোজা কথায়, এই ধাতুগুলো আধুনিক সমরাস্ত্রের চোখ, কান এবং স্নায়ুতন্ত্র হিসেবে কাজ করে। কোনো রাষ্ট্র যদি তার সামরিক বাহিনীর জন্য এই কাঁচামালগুলোর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগেই তারা কৌশলগতভাবে অন্ধ এবং বধির হয়ে পড়বে। সামরিক আধিপত্য ধরে রাখার এই লড়াইয়ে খনিজ সম্পদের গুণগত মান এবং বিশুদ্ধতা হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক।

সমস্যা হলো, এই অতি-গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খল অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ। উন্নত দেশগুলোর সামরিক শিল্প কাঠামো বা ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেস অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি সরবরাহের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলা যায়, যাদের নিজস্ব উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও সামরিক সমরাস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজের প্রায় সিংহভাগই আমদানি করতে হয়। এই নির্ভরতা এক ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করে। যদি কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং সরবরাহকারী প্রতিপক্ষ দেশ হঠাৎ করে এই খনিজগুলোর রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তবে উন্নত দেশগুলোর সমরাস্ত্র কারখানাগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্থবির হয়ে পড়বে। এই ভয়ংকর বাস্তবতার কারণেই বিশ্বের পরাশক্তিগুলো এখন সামরিক গবেষণার পাশাপাশি বিকল্প খনিজ উৎস সন্ধানের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে 

অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল

জাতীয় নিরাপত্তা বলতে একসময় কেবল বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়াকেই বোঝানো হতো। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া সামরিক শক্তির কোনো মূল্য নেই। একটি দেশের অর্থনীতি যদি ভেতর থেকে ধসে পড়ে, তবে সেই রাষ্ট্রকে পরাজিত করার জন্য কোনো গোলাগুলির প্রয়োজন হয় না। আধুনিক অর্থনীতি পুরোপুরিভাবে উচ্চপ্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিল্পোৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল, আর এই প্রতিটি খাতের প্রাণভোমরা হলো কৌশলগত খনিজ। যদি কোনো কারণে বাজারে লিথিয়াম, কোবাল্ট বা সেমিকন্ডাক্টর তৈরির কাঁচামালের ঘাটতি দেখা দেয়, তবে রাতারাতি শেয়ারবাজারে ধস নামতে পারে, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং লাখ লাখ মানুষ বেকার হতে পারে। এই কারণে নীতিনির্ধারকরা এখন মনে করেন যে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই হলো জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় স্তম্ভ।

কৌশলগত খনিজের ওপর এই পরম নির্ভরতা বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন ধরনের জিম্মি দশার জন্ম দিয়েছে। যে রাষ্ট্রগুলোর হাতে এই খনিজগুলোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তারা খুব সহজেই সরবরাহ শৃঙ্খলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পণ্ডিতরা একে অস্ত্রায়িত আন্তঃনির্ভরতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিশ্বায়নের ফলে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সাথে বাণিজ্যিকভাবে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু এই যুক্ততার ভেতরে কিছু নির্দিষ্ট 'চোকপয়েন্ট' বা নিয়ন্ত্রণের জায়গা তৈরি হয়েছে। ২০১০ সালে পূর্ব চীন সাগরে সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যখন জাপান এবং চীনের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়, তখন চীন জাপানের ওপর বিরল মৃত্তিকা মৌল রপ্তানিতে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে জাপানের হাই-টেক শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উপক্রম হয় এবং শেষ পর্যন্ত জাপান কূটনৈতিকভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়। কোনো সামরিক সংঘাত ছাড়াই কেবল একটি নির্দিষ্ট খনিজের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে প্রতিপক্ষকে কাবু করার এই ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

খনিজ সরবরাহকে ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এই প্রবণতা রাষ্ট্রগুলোকে এক স্থায়ী দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কোনো রাষ্ট্রই এখন আর মুক্ত বাজারের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছে না। কারণ খনিজ সম্পদ কোনো কারখানার উৎপাদিত পণ্য নয় যে চাইলেই রাতারাতি এর উৎপাদন বাড়িয়ে দেওয়া যাবে। এটি সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির খেয়ালের ওপর নির্ভরশীল। ভৌগোলিকভাবে যে অঞ্চলে খনি আছে, সেখান থেকেই তা উত্তোলন করতে হবে। রাজনীতি বা কূটনীতি দিয়ে ভূতত্ত্বকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ফলে রাষ্ট্রগুলো এখন বাধ্য হয়ে সম্পদ কূটনীতির দিকে ঝুঁকছে। তারা বিভিন্ন দেশের সাথে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত চুক্তি করছে, খনি প্রকল্পগুলোতে সরাসরি বিনিয়োগ করছে এবং প্রয়োজনে প্রতিকূল দেশের সরকারের পতন ঘটিয়ে নিজেদের অনুগত সরকার বসানোর চেষ্টা করছে। জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার এই মরিয়া চেষ্টা বিশ্বজুড়ে এক নতুন ধরনের প্রক্সি সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।

প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও সাইবার স্পেসের খনিজ নির্ভরতা

একবিংশ শতাব্দীতে জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে সংবেদনশীল ফ্রন্ট হলো সাইবার স্পেস। আধুনিক যুদ্ধ শুধু আর স্থল, নৌ বা আকাশপথে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সম্প্রসারিত হয়েছে ডিজিটাল জগতে। হ্যাকিং, সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং ডেটা ম্যানিপুলেশন এখন রাষ্ট্রগুলোর দৈনন্দিন লড়াইয়ের অংশ। কিন্তু এই ডিজিটাল জগৎ কোনো বায়বীয় বা অদৃশ্য শূন্যস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। ইন্টারনেটের ক্লাউড ব্যবস্থা আসলে মাটিতে স্থাপিত বিশাল বিশাল ডেটা সেন্টার, অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভারের সমষ্টি। আর এই পুরো ভৌত অবকাঠামোটি তৈরি হয়েছে গ্যালিয়াম, ইন্ডিয়াম, সিলিকন এবং গ্রাফাইটের মতো কৌশলগত খনিজ দিয়ে। সাইবার স্পেসে একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা কতটুকু হবে, তা নির্ভর করে তাদের কাছে থাকা কম্পিউটিং পাওয়ার বা সুপারকম্পিউটারগুলোর গতির ওপর। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর উত্থান এই প্রতিযোগিতাকে আরও বহুগুণ তীব্র করেছে। ভবিষ্যতে যে রাষ্ট্র সবচেয়ে উন্নত এআই নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই বিশ্ব শাসন করবে - এমন একটি অলিখিত নিয়ম আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এআই অ্যালগরিদমগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ। এই চিপগুলো সিলিকন ওয়েফারের ওপর অত্যন্ত বিরল এবং বিশুদ্ধ খনিজের প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হয়। চিপের আকার যত ছোট হচ্ছে এবং এর কার্যক্ষমতা যত বাড়ছে, এর কাঁচামালের বিশুদ্ধতার ওপর নির্ভরতা ততটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো পরাশক্তিগুলো এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিচ্ছে নিজস্ব ভূখণ্ডে চিপ তৈরির কারখানা স্থাপনের জন্য। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে যে, যদি কোনো কারণে চিপ তৈরির কাঁচামালের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে তাদের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে এবং তারা প্রযুক্তিগতভাবে পঙ্গু হয়ে যাবে। মেধা এবং অ্যালগরিদমের পাশাপাশি অতি-বিশুদ্ধ খনিজের এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহই এখন সাইবার শ্রেষ্ঠত্বের মূল চাবিকাঠি।

পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশেও এখন জাতীয় নিরাপত্তার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আধুনিক সামরিক এবং বেসামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। জিপিএস নেভিগেশন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মিসাইল ট্র‍্যাক করা বা শত্রুর গতিবিধির ওপর নজর রাখা - সবকিছুর জন্যই মহাকাশে চোখ রাখতে হয়। কিন্তু মহাকাশের চরম বৈরী পরিবেশে, যেখানে প্রচণ্ড বিকিরণ এবং তাপমাত্রার ব্যাপক ওঠানামা থাকে, সেখানে স্যাটেলাইটের যন্ত্রপাতিগুলোকে সচল রাখার জন্য সাধারণ ধাতু ব্যবহার করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন হয় প্ল্যাটিনাম গ্রুপের ধাতু এবং উন্নত সংকর উপাদান, যা স্যাটেলাইটের সার্কিটগুলোকে বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। যদি কোনো রাষ্ট্র এই বিশেষ খনিজগুলোর সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তারা নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে পারবে না এবং ধীরে ধীরে মহাকাশে তাদের চোখ-কান বন্ধ হয়ে যাবে। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি আর কিছু হতে পারে না। তাই প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার এই লড়াই শেষ পর্যন্ত খনি খুঁড়ে বিরল পাথর বের করার আদিম লড়াইয়ের সাথেই যুক্ত হয়ে আছে।

ভবিষ্যৎ সংঘাতের রূপরেখা ও সম্পদ সুরক্ষার কৌশল

ভবিষ্যতের যুদ্ধগুলোর রূপরেখা কেমন হবে, তা বোঝার জন্য খনিজ সম্পদের বৈশ্বিক মানচিত্রের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। আগামী দিনের সংঘাতগুলো হয়তো সীমানা দখল বা আদর্শিক বিস্তারের জন্য হবে না, বরং তা হবে অত্যন্ত জরুরি কিছু সরবরাহ লাইন এবং খনি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণের জন্য। দক্ষিণ চীন সাগর, আফ্রিকার খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল কিংবা বরফে ঢাকা আর্কটিক অঞ্চল - এগুলোই হতে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতির প্রধান রণক্ষেত্র। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন হার্জ দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যখন একটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তার জন্য সম্পদ বা অস্ত্র বৃদ্ধি করে, তখন অন্য রাষ্ট্রগুলো তা নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এবং তারাও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বর্তমানে কৌশলগত খনিজের ক্ষেত্রে ঠিক একই ঘটনা ঘটছে। এক দেশ যখন আফ্রিকার কোনো খনির ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে, তখন অন্য দেশ বাধ্য হয়ে নৌপথে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করছে সেই খনিজের পরিবহন লাইন সুরক্ষিত রাখার জন্য। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস পুরো বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে এক অস্থিতিশীল অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখার জন্য রাষ্ট্রগুলো এখন বিচিত্র সব কৌশল গ্রহণ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কৌশলটি হলো 'ফ্রেন্ড-শোরিং'। এই প্রক্রিয়ায় উন্নত দেশগুলো তাদের খনিজ সরবরাহ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের কারখানাগুলো বৈরী দেশ থেকে সরিয়ে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক মিত্রদের দেশে স্থাপন করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এখন আর কেবল সস্তা শ্রম বা কম খরচের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না, বরং রাজনৈতিক মিত্রতা এবং নির্ভরতার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি পরাশক্তি তাদের নিজস্ব 'জাতীয় প্রতিরক্ষা মজুদ' বা ন্যাশনাল ডিফেন্স স্টকপাইল নতুন করে সাজাচ্ছে। জরুরি মুহূর্তে বা যুদ্ধের সময় যাতে কারখানার উৎপাদন বন্ধ না হয়ে যায়, তার জন্য সরকারগুলো হাজার হাজার টন বিরল ধাতু, লিথিয়াম এবং টাইটানিয়াম কিনে গুদামজাত করে রাখছে। এই প্রবণতা অনেকখানি সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীর বাণিজ্যিকতাবাদী চিন্তাধারার আধুনিক রূপ, যেখানে রাষ্ট্রগুলো মনে করত যে কোষাগারে যত বেশি সম্পদ মজুত থাকবে, রাষ্ট্র তত বেশি শক্তিশালী হবে।

পরিশেষে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রকৃত পরিমাপ হলো তার সম্পদ স্বাধীনতা অথবা সরবরাহ শৃঙ্খলকে নিরবচ্ছিন্ন রাখার ক্ষমতা। যে রাষ্ট্র অন্য দেশের খনিজের ওপর যত বেশি নির্ভরশীল, কৌশলগতভাবে সে তত বেশি দুর্বল। সামরিক আস্ফালন বা কূটনৈতিক বাগাড়ম্বর দিয়ে এই কাঠামোগত দুর্বলতা ঢাকা সম্ভব নয়। এ কারণেই বিশ্বের বড় বড় শক্তিগুলো তাদের সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক নীতিগুলোকে একটিমাত্র বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করছে - আর তা হলো কৌশলগত সম্পদের নিরঙ্কুশ সুরক্ষা। মানবসভ্যতা যতই আধুনিক হোক না কেন, প্রযুক্তি যতই আকাশচুম্বী হোক না কেন, রাষ্ট্রের টিকে থাকার মূল ভিত্তি এখনো সেই মাটির নিচেই প্রোথিত রয়ে গেছে। জাতীয় নিরাপত্তার এই চরম সত্যটি নীতিনির্ধারকদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার আসল উৎস কোনো কাল্পনিক চুক্তিতে নেই, বরং তা লুকিয়ে আছে বিরল সব খনিজ উপাদানের অণু-পরমাণুর নিজস্ব বুননে।

মন্তব্য করুন

Logo