যুক্তরাজ্যের প্রাইম মিনিস্টারের পদ যেন মিউজিক্যাল চেয়ার
শুভ্র মিসির
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১০:৫৮ পিএম
একটা সময় বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উচ্চারিত হতো যুক্তরাজ্যের নাম। দেশটিতে ক্ষমতার পালাবদল হতো নির্বাচনের মাধ্যমে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করতেন বহু বছর ধরে। কিন্তু গত এক দশকে সেই চিত্র বদলে গেছে চরম নাটকীয়ভাবে। ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন প্রধানমন্ত্রীর আসা-যাওয়া যেন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। প্রধানমন্ত্রীর হট সিটটি যেন মিউজিক্যাল চেয়ারে পরিণত হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্যের মানুষ একটি দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন—১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের অর্জনের কথা বলেন, সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান, তারপর স্বীকার করেন যে তার সময় শেষ হয়ে এসেছে। সবশেষে আবেগঘন পরিবেশে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে তিনি সরকারি বাসভবনের ভেতরে চলে যান। এরপর শুরু হয় নতুন নেতৃত্বের সন্ধান।
সম্প্রতি এই দৃশ্যটি নতুন করে বাস্তবায়ন করলেন যুক্তরাজ্যের সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির হতাশাজনক ফলাফলের কয়েক সপ্তাহ পর তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। যার মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্য গত এক যুগে সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে।
স্টারমারের উত্থান-স্টারমারের পতন
খ্যাতনামা মানবাধিকার আইনজীবী কিয়ার স্টারমার ২০১৫ সালে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর দ্রুতই লেবার পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। দীর্ঘদিনের কনজারভেটিভ শাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি লেবার পার্টিকে ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে আনেন।
তার কাছে প্রত্যাশাও ছিল বেশি। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভেবেছিলেন—স্টারমারের হাত ধরেই দেশের অর্থনীতিকে নতুন করে গড়ে উঠবে এবং তিনি ব্রেক্সিট ও কোভিড-পরবর্তী সংকট কাটিয়ে তুলবেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর সেই প্রত্যাশা তিনি পূরণ করতে পারেননি। দেশের দুর্বল উৎপাদনশীলতা, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবার সংকট এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় কোনো সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা দিতে ব্যর্থ হন তিনি। ফলে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তার জনপ্রিয়তা তীব্রভাবে কমে যায়। শেষ পর্যন্ত তার নিজ দলের ভেতর থেকেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের চাপ তৈরি হয়।
এক দশকে সাত প্রধানমন্ত্রী
যুক্তরাজ্যের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক এই সংকটকে বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে। ১৯৭৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৩১ বছরে যুক্তরাজ্যে মাত্র চারজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেন। তারা হলেন—মার্গারেট থ্যাচার, জন মেজর, টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউন। অর্থাৎ ওই সময়কালে তাদের নেতৃত্বে ছিল দীর্ঘস্থায়ী এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছিল স্থিতিশীলতা।
কিন্তু ২০১০ সালের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রথমে ডেভিড ক্যামেরন। ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া তথা ব্রেক্সিটের প্রশ্নে তিনি গণভোট আয়োজন করেন। কিন্তু ব্রেক্সিটের পক্ষে ফলাফল আসার পর রাজনৈতিকভাবে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তিনি পদত্যাগ করেন।
তার উত্তরসূরি থেরেসা মে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে গিয়ে পার্লামেন্টে বারবার বাধার মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত তিনি ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করেন। এরপর বরিস জনসন ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। শুরুতে জনপ্রিয়তা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারি এবং পরবর্তীতে ডাউনিং স্ট্রিটে লকডাউন চলাকালে পার্টি আয়োজনের কেলেঙ্কারি তার রাজনৈতিক পতন ডেকে আনে। তার স্থলাভিষিক্ত লিজ ট্রাস ব্রিটের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেকর্ড গড়েন। মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা আর্থিক বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং তাকে সরে যেতে হয়।
এরপর রিশি সুনাক কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং জনঅসন্তোষের কারণে তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে বড় পরাজয়ের মুখে পড়েন। তারপর ক্ষমতায় আসেন কিয়ার স্টারমার—যিনি পদত্যাগ পত্র জমা দিয়ে বিদায়ের দিন গুনছেন।
এত দ্রুত কেন বদল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, ব্রেক্সিটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পর বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শ্রমবাজারে নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এছাড়াও কোভিড-১৯ মহামারি সরকারের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। পাশাপাশি বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে জনগণ দ্রুত ফলাফল দেখতে চায়। রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি ধৈর্য কমে গিয়েছে সবার। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ সংকুচিত হয়ে গেছে। এছাড়াও তরুণ প্রজন্মের হতাশাও একটি গুরুত্বপূণ কারণ। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণ বিশ্বাস করেন যে তারা তাদের বাবা-মায়ের তুলনায় কম সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। যুক্তরাজ্যে চাকরির বাজার অনিশ্চিত, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে এবং সামাজিক গতিশীলতাও কমে যাচ্ছে। যা তাদের দিনকে দিন হতাশায় নিমজ্জ্বিত করছে।
সর্বশেষ বিষয়টি হলো—ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই। তিনি যতদিন নিজের দলের সংসদ সদস্যদের আস্থা ধরে রাখতে পারবেন, ততদিনই ক্ষমতায় থাকবেন। ফলে জনপ্রিয়তা কমলেই এমপিরা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন এবং নতুন নেতৃত্বের দাবি তোলেন।
রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যান্থনি সেলডনের মতে, সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী তুলনামূলক কম বয়স এবং পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছাড়াই দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসেছেন। যার ফলে তারা ১০ ডাউনিং স্ট্রিট তথা যুক্তরাজ্যের মতো রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও জটিলতা সামাল দিতে পারেননি।
তিনি মনে করেন, বরিস জনসন ভেবেছিলেন লন্ডনের মেয়র হিসেবে যেভাবে কাজ করেছেন, সেভাবেই দেশ চালাতে পারবেন। থেরেসা মে’ও ধারণা করেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীত্বের চ্যালেঞ্জ অনেক বড়।
সামনে কী?
স্টারমারের পদত্যাগের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহাম। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা যতই উজ্জ্বল হোক, তার সামনে অপেক্ষা করছে এক কঠিন বাস্তবতা। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, বিশেষ করে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS), দীর্ঘদিনের অর্থসংকটে ভুগছে। রেলপথ, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। একই সময়ে জনসেবার চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো প্রধানমন্ত্রীকে একদিকে ব্যয় বাড়াতে হবে, অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে—যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন কাজ।
এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সমস্যা কোনো একক নেতা নন। বরং সমস্যাটি কাঠামোগত। অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে যে সংকট জমে আছে, তা সমাধান না হলে নতুন প্রধানমন্ত্রীও তাঁর পূর্বসূরিদের মতো একই চক্রে আটকে যেতে পারেন।
একসময় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক ছিল যে দেশ, আজ সেই যুক্তরাজ্যই নেতৃত্বের ঘন ঘন পরিবর্তনের এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। আর সেই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে কি না, সেটাই এখন ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মন্তব্য করুন

