ধারা ৬২২ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানকে প্রাতিষ্ঠানিক ও বাধ্যতামূলক রূপ দেওয়ার পথ তৈরি করছে। ছবি: সংগৃহীত
সাঈদ হাসান
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:১০ পিএম
মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত একটি বিল নিয়ে সম্প্রতি কিছু আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী অংশগুলো নিয়ে জনপরিসরে তুলনামূলকভাবে কম কথা হচ্ছে। আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত ছিল যে প্রশ্নটি, সেটি হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক কি কেবল মিত্রতার পর্যায়ে আছে, নাকি ধীরে ধীরে এমন এক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে যেখানে দুই রাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা স্বার্থ প্রায় অভিন্ন হয়ে উঠবে?
প্রস্তাবিত আইনের ধারা ২২৪ দুই দেশের সামরিক সমন্বয়কে আরও গভীর করার কথা বলে। একই সঙ্গে ধারা ৬২২ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানকে প্রাতিষ্ঠানিক ও বাধ্যতামূলক রূপ দেওয়ার পথ তৈরি করছে বলে সমালোচকদের দাবি। এই দুই ধারাকে পাশাপাশি রাখলে একটি বড় চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করে—দুই দেশের সম্পর্ককে এমন এক স্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে, যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন বা জনমতের ওঠানামা সহজে সেই সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারবে না।
ধারা ৬২২-এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতিগত স্বাধীনতার ওপর নতুন ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। কোনো প্রেসিডেন্ট যদি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় সীমিত করতে চান, তাহলে তাকে কংগ্রেসের কাছে তার সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। অর্থাৎ, যে ক্ষমতাটি এতদিন নির্বাহী বিভাগের হাতে ছিল, তা এখন রাজনৈতিকভাবে আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন হলো, কেন এই উদ্যোগ?
সম্ভবত এর উত্তর খুঁজতে হবে মার্কিন জনমতের পরিবর্তনের মধ্যে। গত কয়েক বছরে ইসরায়েলকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের জনমতের দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং মানবাধিকারকেন্দ্রিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ইসরায়েল নীতির সমালোচনা বেড়েছে। ফলে যে সম্পর্ক একসময় প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে পরিচালিত হতো, তা এখন ধীরে ধীরে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার মতো অপেক্ষাকৃত অদৃশ্য ক্ষেত্রের দিকে সরে যাচ্ছে বলে মনে হয়।
আর্থিক সহায়তা জনগণ দেখতে পায়। বাজেট বরাদ্দ নিয়ে বিতর্ক হয়। কংগ্রেসে ভোটাভুটি হয়। সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়। কিন্তু গোয়েন্দা সহযোগিতা সাধারণত অন্ধকারেই পরিচালিত হয়। সেখানে না থাকে প্রকাশ্য বিতর্ক, না থাকে দৃশ্যমান জবাবদিহি। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে জনপর্যবেক্ষণের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য গোয়েন্দা সহযোগিতার চেয়ে কার্যকর মাধ্যম খুব কমই আছে।
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত ‘ফাইভ আইজ’ জোটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিনিময় হয়। যদি ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও গভীর ও বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে সেই তথ্য প্রবাহের ওপর এর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব পড়বে কি না—সেটিও ভবিষ্যতে আলোচনার বিষয় হতে পারে।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন নিরাপত্তা মহলের কিছু মূল্যায়নে ইসরায়েলকে গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উদ্বেগের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যদি এমন উদ্বেগ বাস্তব হয়ে থাকে, তাহলে একই সময়ে তথ্য বিনিময় আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নীতিগতভাবে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অবশ্যই, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে দুই দেশের সহযোগিতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কতটা জননিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির আওতায় থাকবে?এ কটি সম্পর্ক যখন প্রকাশ্য সহায়তা থেকে সামরিক সমন্বয়ে, আর সেখান থেকে গোয়েন্দা কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করে, তখন সেটি আর কেবল পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন থাকে না; সেটি গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত হয়।
আজকের বিতর্ক তাই কেবল ইসরায়েলকে ঘিরে নয়। বরং এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাষ্ট্র কি তার গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সিদ্ধান্তগুলো জনগণের নজরদারির মধ্যে রাখবে, নাকি সেগুলো ধীরে ধীরে এমন এক কাঠামোয় স্থানান্তরিত হবে, যেখানে সিদ্ধান্ত থাকবে, প্রভাব থাকবে, কিন্তু জনসমক্ষে তার উপস্থিতি থাকবে না?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
সাঈদ হাসান: সাংবাদিক
মন্তব্য করুন

