Logo

১ আষাঢ় ১৪৩৩

×

Follow Us

ইরানের পানিযুদ্ধ: টার্গেট কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে ইরানের বিশুদ্ধ পানির রিজার্ভ, ছবি: ইন্টারনেট

দশদিগন্ত

ইরানের পানিযুদ্ধ: টার্গেট কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা

Icon

সাঈদ হাসান

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০১:১০ পিএম

পানি হলো জীবনের স্পন্দন — এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানি জনগণের জীবনশক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

ইরানের বিরুদ্ধে তাদের আগ্রাসনের অংশ হিসেবে, মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজগানের সিরিকে বেসামরিক জনগণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানি অবকাঠামোতে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত হেনেছে, যার ফলে সম্মিলিতভাবে ২,৫০০ ঘনমিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন দুটি জলাধার ধ্বংস হয়ে গেছে।

এই স্থাপনাগুলো দশটি গ্রামের ২০,০০০ এরও বেশি বাসিন্দাকে পানের পানি সরবরাহ করতো।

এটি কোনো আনুষঙ্গিক ক্ষতি নয়—এটি একটি পরিকল্পিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের একটি চরম লঙ্ঘন।

বেসামরিক জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য অবকাঠামোর ওপর এমন পদ্ধতিগত ও নির্মম হামলা চালানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।"—কথাগুলো বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগেয়ী ।

প্রশ্ন হচ্ছে, ইরানের টক্সিক রেইন ঘটানোর মার্কিন-ইসরায়েলি অপপ্রয়াসের কারণ কি?

ইরানের শত্রুরা ইরানকে তেল-গ্যাস রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি হিসেবে চিহ্নিত করলেও প্রকৃতপক্ষে ইরান হলো মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় শিল্প, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তি শক্তি।

এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় কৃষি খাত রয়েছে ইরানের, যা থেকে বছরে ৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় হয়। ইরানের প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান জোগায় কৃষি। বেশ কিছু প্রধান ফসল ও গবাদিপশু উৎপাদনে বিশ্বব্যাপী শীর্ষ দশের মধ্যে অবস্থান করছে দেশটি।

বলা জরুরি যে ইরানের মোট ভূমির মাত্র ১০ শতাংশ আবাদযোগ্য। পানির প্রাপ্যতাও বেশি নয়। পাশাপাশি ইজরায়েল+যুক্তরাষ্ট্র+আরব আমিরাতের সন্দেহভাজন আবহাওয়া যুদ্ধের কারণে দেশটিতে পানির সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

তারপরও ইরান জাফরান, ক্যাভিয়ার, পেস্তা, আখরোট, ডালিম, খেজুর, খুবানি ও মধু উৎপাদনে বিশ্বে এক থেকে তিন নম্বরে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। কাঠবাদাম, চেরি, তরমুজ এবং কিউই ফল উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে রয়েছে ইরান। কমলা, টমেটো ও পেঁয়াজের মতো প্রধান ফল ও শাকসবজি এবং সেই সঙ্গে হাঁস-মুরগি ও ডিম উৎপাদনে শীর্ষ দশের মধ্যে রয়েছে দেশটি। গম, চা ও বার্লি এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন টমেটো সস ও পেস্ট, টিনজাত শাকসবজি, ফলের রস, শুকনো খাবার, তেল, মশলা এবং গোলাপ জল ও ভেষজ নির্যাসের মতো বিশেষ পণ্যের প্রধান আঞ্চলিক উৎপাদক ইরান।

প্রতিকূল জলবায়ু সত্ত্বেও ইরান গমের মতো প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রায় সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করেছে। ইরানের প্রতিরোধ অর্থনীতি বিশেষভাবে তৈরিই হয়েছে চরম বাহ্যিক চাপ মোকাবেলা করে টিকে থাকার জন্য।

ইরানি ফসলের সবচেয়ে ভালো দিক হলো - নাইট্রেট, জিএমও এবং কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর মানদণ্ড, তৃতীয় পক্ষের শংসাপত্র (থার্ড পার্টি সার্টিফিকেশন) এবং ঐতিহ্যবাহী চাষ পদ্ধতি, যার মধ্যে জৈব, কেঁচো সার ও বায়ো-অর্গানিক সারের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত। রক্ষণশীল রন্ধনসংস্কৃতি এবং কঠোরভাবে হালাল-হারাম বাছবিচার ও লা দরার (ক্ষতিহীন) নীতিমালা অনুসরণের কারণে ইরানে কখনো থ্রি ডি গোশত, ডব্লিউইএফ-স্টাইলের পোকার প্রোটিন ও তেলাপোকার দুধ (যা ইসলামিক খাদ্যশৈলী আইনে নিষিদ্ধ) বা অন্যান্য বিতর্কজনক উদ্ভাবন প্রবেশ করতে পারেনি।

খুব সম্ভবত এটাই ইরানের তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি ডিপোগুলোকে লক্ষ্য করে মার্কিন-ইজরায়েলি আক্রমণের ব্যাপকতা ও নৃশংসতার কারণ ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে – যার উদ্দেশ্য ইরানের মাটি দূষিত করা, পুষ্টি উপাদান হ্রাস করা এবং ফসল ও মূল্যবান ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে ধ্বংস ও বিষাক্ত করা।

মন্তব্য করুন

Logo