Logo

৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

×

Follow Us

ব্যঙ্গ থেকে বিক্ষোভ, ভারতের নতুন যুব-প্রতিবাদের প্রতীক

দশদিগন্ত

ককরোচ জনতা পার্টি

ব্যঙ্গ থেকে বিক্ষোভ, ভারতের নতুন যুব-প্রতিবাদের প্রতীক

Icon

অরূপ রতন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১১:০৮ পিএম

ভারতের রাজনীতিতে নানা সময় অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। কিন্তু গত মে মাসে যে আন্দোলনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে, তার নাম শুনলে প্রথমেই অনেকে বিস্মিত হন—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।
নামটি যেমন অদ্ভুত, এর উত্থানের গল্পও তেমনি নাটকীয়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে লাখো তরুণ-তরুণী এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হন। কয়েক সপ্তাহের মাথায় ইনস্টাগ্রামে এর অনুসারীর সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যায়। অনেক প্রচলিত রাজনৈতিক দলকেও জনপ্রিয়তার দিক থেকে ছাড়িয়ে যায় এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন। এখন কথা হলো—কীভাবে একটি অনলাইন রসিকতা ভারতের সবচেয়ে আলোচিত যুব আন্দোলনে পরিণত হলো?

‘ককরোচ’ শব্দ থেকেই আন্দোলনের জন্ম
ঘটনার সূত্রপাত ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে। বেকারত্ব, পরীক্ষা জালিয়াতি এবং চাকরির সংকট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষুব্ধ তরুণদের একাংশকে ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বলে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। যদিও পরে এ মন্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, কিন্তু ততক্ষণে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে তরুণদের মধ্যে।
ঠিক তখনই আবির্ভূত হন অভিজিৎ দিপকে।তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, যদি বেকার তরুণদের ‘ককরোচ’ বলা হয়, তাহলে সেই ‘ককরোচরাই’ নিজেদের একটি দল গঠন করবে। ১৬ মে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ চালু করেন। শুরুতে এটি ছিল নিছক বিদ্রূপ। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি লাখো বঞ্চিত যুবকের অভিন্ন কণ্ঠে পরিণত হয়।

কে এই অভিজিৎ দিপকে?
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ভারতের মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা। তিনি পুনেতে সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়শোনা শুরু করেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় এর আগে তিনি অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল আম আদমি পার্টির সোশ্যাল মিডিয়া টিমের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও কাজ করেছেন। যেহেতু দিপকের রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ডিজিটাল ক্যাম্পেইন পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল, ফলে তিনি খুব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল একটি বয়ান তৈরি করতে সক্ষম হন।

কেন এত দ্রুত জনপ্রিয় হলো
এখন প্রশ্ন আসতে পারে অভিজিৎ দিপকের ক্যারিশমেটিক উপস্থিতি আর ভাইরাল বয়ানই দ্রুত জনপ্রিয়তার কারণ? বিষয়টি এতটা সরলও নয়। ককরোচ জনতা পার্টির দ্রুত জনপ্রিয়তার কারণ কাজ করেছে বেশ কিছু অনুসঙ্গ। সেগুলো হলো—
এক. বেকারত্বের ক্ষোভ: ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যুব জনগোষ্ঠীর দেশ। কিন্তু একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বও সেখানে একটি বড় সমস্যা। বহু তরুণ বছরের পর বছর বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু পরীক্ষাপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। সিজেপি এই ক্ষোভকে সরাসরি ভাষা দিয়েছে।
দুই. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তি: পুরো আন্দোলনটি জন্ম নিয়েছে ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েক লাখ নিবন্ধন এবং লক্ষাধিক অনুসারী যোগ দেয়। পরে অনুসারীর সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে যায়। ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম দাবি করে কিছু সময়ের জন্য তা ভারতের ক্ষমতাসীন দলের ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যাকেও অতিক্রম করে যায়।
তিন. ব্যঙ্গাত্মক ভাষা: সিজেপির অন্যতম শক্তি হলো রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার পরিবর্তে মিম, হাস্যরস, কার্টুন এবং বিদ্রূপ ব্যবহার করে তারা তরুণদের আকৃষ্ট করেছে। এবং
চার. ‘জেন-জি’ পরিচয়ের ব্যবহার: বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং নেপালের সাম্প্রতিক যুব আন্দোলনের প্রভাব ভারতীয় তরুণদের মধ্যেও রয়েছে। সিজেপি নিজেদেরকে ‘জেন-জি’ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

আন্দোলনের মূল দাবি
যদিও শুরুতে এটি ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ ছিল, ধীরে ধীরে কিছু নির্দিষ্ট দাবি সামনে আসে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—পরীক্ষা জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা, যুব বেকারত্ব কমানোর উদ্যোগ, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি জবাবদিহিতা বৃদ্ধি। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তারা আন্দোলন শুরু করে। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লি ও পুনেতে বিক্ষোভ কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। নিটসহ বিভিন্ন সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জুন রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকরা। কর্মসূচির সমন্বয়ক ও সংগঠক অভিজিৎ দীপকের ডাকে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

অনলাইন থেকে রাস্তায়
অনেকেই ভেবেছিলেন, এটি কেবল একটি ইন্টারনেট ট্রেন্ড। কিন্তু ৬ জুন শুরুতে অভিজিৎ দিপকে ভারতে ফিরে প্রথম প্রকাশ্য বিক্ষোভে অংশ নেন। যন্তর মন্তরের সেই সমাবেশে শত শত মানুষ অংশগ্রহণ করে। আন্দোলনকারীরা গোলাপ ফুল ও সংবিধানের কপি হাতে নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের বার্তা দেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, সিজেপি শুধু ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না।

রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া
সিজেপির উত্থান ভারতের রাজনৈতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী শিবিরের কিছু নেতা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করলেও কংগ্রেস নেতারা এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নীরব রয়েছেন। দলীয় কয়েকটি সূত্রের মতে, কংগ্রেসের সন্দেহ, সিজেপি আম আদমি পার্টির (এএপি) সমর্থনপুষ্ট, তাই দলটি আপাতত ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পদক্ষেপ গ্রহণের’ নীতি অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবার ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন, এটি একটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত প্রচারণা। এমনকি আন্দোলনের কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট সীমিত বা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

ভবিষ্যৎ কী?
সিজেপি কি সত্যিই রাজনৈতিক দলে রূপ নেবে? —ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান সময়ের মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন এটি। আর উত্তর এখনও অস্পষ্ট।
অস্পষ্টতার কারণ হলো—
প্রথমত, এটি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়।
দ্বিতীয়ত, কোটি কোটি অনুসারী থাকলেও বাস্তব মাঠপর্যায়ে সংগঠন কতটা শক্তিশালী, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তৃতীয়ত, অনেকেই মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা সবসময় রাজনৈতিক প্রভাবের সমান নয়।
অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি, আন্দোলনের আসল শক্তি ভোট নয়, বরং জনমত গঠন।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ভারতের তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ, হতাশা এবং বঞ্চনার অনুভূতি জমে আছে, সিজেপি সেই আবেগকে দৃশ্যমান করেছে।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ককরোচ জনতা পার্টির সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো নির্বাচন জেতা নয়; বরং তরুণদের মনে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, তাদের হতাশা ও ক্ষোভ একক নয়। বরং এটি একটি বৃহৎ সামাজিক বাস্তবতার অংশ।
ককরোচ জনতা পার্টি হয়তো আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে। আবার এটিও সম্ভব, এটি ভারতের যুব রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। কিন্তু ইতিহাসে এর স্থান ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। কারণ এটি দেখিয়েছে—একটি ব্যঙ্গাত্মক নাম, একটি ভাইরাল পোস্ট এবং তরুণদের মধ্য জমে থাকা ক্ষোভ মিলেই কখনো কখনো একটি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করতে পারে। যার ডেউ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আছড়ে পড়ছে। ভারতের কোটি কোটি তরুণের কাছে ‘ককরোচ’ শব্দটি অপমানের প্রতীক থেকে পরিণত হয়েছে প্রতিবাদের প্রতীকে। আর সেখানেই ককরোচ জনতা পার্টির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য।

মন্তব্য করুন

Logo