Logo

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

আমার মা

নূরজাহান সিরাজী

দিন-প্রতিদিন

মা দিবস

আমার মা

জাহীদ রেজা নূর

Icon

জাহীদ রেজা নূর, লেখক ও সাংবাদিক

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম

মা চলে যাওয়ার আগে বুঝতে পারিনি, মা শব্দটির মানে। যেদিন তিনি চলে গেলেন, সেদিন মনের ভেতর যে শূন্যতা জন্ম নিয়েছিল, তা বর্ণনা করার সাধ্য আমার নেই। পৃথিবীটা বদলে গিয়েছিল সেদিন।

বাবাকে যখন হত্যা করল বর্বর পাকিস্তানি আর এদেশের আলবদর বাহিনী ১৯৭১ সালে, তখন আমার বয়স পাঁচের কোঠায় হওয়ায় মৃত্যু কী, তা বোঝার ক্ষমতা ছিল না। একটি দেশ যখন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হলো, তখন থেকেই আমরা পিতৃহারা। জাতি গঠন শুরু হলো এবং শুরু হলো আমাদের বাবাকে ছাড়া জীবন সংগ্রাম। শত কষ্ট সহ্য করে সেই সংগ্রামটি চালিয়ে গেছেন যিনি, তিনি আমার মা। 

জাহীদ রেজা নূর


ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তানি শাসন আর বাংলাদেশী শাসন দেখেছেন তিনি। শৈশবে মাতৃহারা হয়ে গ্রামের পথে ঘাটে প্রকৃতির ভালোবাসায় বেড়ে উঠছিলেন যিনি, তাঁরই বিয়ে হয়ে গেল এগার বছর বয়সে। ফরিদপুরের সদরদী গ্রামের মেয়েটির বিয়ে হলো যশোরের মাগুরার শরুশুনা গ্রামের এক ছেলের সঙ্গে। দুজনেরই কাঁচা বয়স। ছেলেটি ছাত্রজীবন থেকেই বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে। পড়াশোনা চালানোর মতো অর্থ ছিল না বলে বিএ পড়ার সময়ই দৈনিক আজাদে সাংবাদিকতা শুরু করেছে। আর সেইসঙ্গে দেশভাগের সেই উত্তাল সময়টা পার করেছে। দেশভাগের পর যখন ছেলেটি ঢাকায় এসে আজাদ পত্রিকায়ই কাজ করেছে, তখন সেই ছোট্ট মেয়েটা সংসার করতে চলে এসেছে ঢাকায়। 

নিরক্ষর মেয়েটা সাক্ষর হয়েছে। নিজেই একটু একটু লিখতে পারে, পড়তে পারে। কখনো সিনেমা দেখতে যায়, কখনো পার্কে যায় ঘুরতে। আর রান্নাঘরে চলে নতুন নতুন রান্নাবান্নার পরীক্ষা-নীরিক্ষা। শাশুড়ী খুব ভালো রান্না করেন। তিনি শিখিয়ে দেন যশোর অঞ্চলের রান্না। 

সংসারে সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হতে থাকে। পাকিস্তান নামক দেশটিতে বঞ্চিত হতে থাকে বাংলার মানুষ। তার আঁচ লাগে রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে। বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতি আর ধর্ম নিয়ে একটা দোটানায় পড়ে যায়। পশ্চিমারা ধর্মকে পুঁজি করে শোষণ চালাতে থাকে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের পর, আরো ষ্পষ্ট করে বললে, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে এই ধর্মবাদী রাজনীতির মোহ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে থাকে বাংলা। তাঁর স্বামী ইত্তেফাকের পাতায় লিখে লিখে বাঙালির পক্ষে জনমত তৈরি করতে থাকেন। আর আমার মা হয়ে থাকেন এই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ঘটনার সাক্ষী।

সে সময়কার তরুণ রাজনীতিবিদদের দেশভাবনাও তিনি আত্মস্থ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন স্বামী সিরাজুদ্দীন হোসেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ছিলেন বন্ধু। সাংবাদিকদের মধ্যে তাঁর ছিল একটি দৃঢ় অবস্থান। বাড়িতে যখন বন্ধুরা আসতেন, তুমুল রাজনৈতিক আলাপ, তর্ক-বিতর্ক হতো, তখন মা সেগুলো শুনতেন, নিজের মনেই গড়ে নিতেন রাজনীতির অবয়ব।

এবং ১৯৬৬ সালের ৬ দফার পর থেকে দেশ যখন স্বাধীকারের দাবিতে সোচ্চার হলো, তখনও আমার মা সে সময়ের রাজনীতির প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে ৫ নং চামেলীবাগের বাড়িতে সংসার চালাচ্ছেন। ততদিনে তাঁর সংসারে ৭ ছেলের জন্ম হয়েছে। দুবছর পর আরো এক ছেলের জন্ম হলো।

বাংলার মানুষ পাকিস্তানের শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলো। পাকিস্তানিরা ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে বাঙালি নিধন শুরু করলে একসঙ্গে থাকার আর কোনো পথ খোলা থাকল না। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করল বাংলার মানুষ।

রাজনৈতিক এই পথপরিক্রমার কথা কে না জানে? তাহলে মায়ের কথা বলতে গিয়ে কেন বিচ্ছিন্ন এই ঘটনাগুলোর বর্ণনা করা? সেটাই বলব অল্প কথায়। একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষকে চোখের সামনে থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর একটি স্বাধীন দেশে মা নূরজাহান সিরাজী যখন বিধবা, তখন ৮ ছেলেকে নিয়ে জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। হাতে নেই টাকা-কড়ি, পাশে নেই নির্ভরযোগ্য কেউ। তখন আমাদের পরিবারটি ধ্বংস হয়ে যেতে পারত। যে কোনো চোরা পথে পা বাড়াতে পারত পরিবারের কোনো ছেলে। কেন সেই ভয়ঙ্কর পথে না গিয়ে পরিবারটি বেছে নিলো কষ্ট করে বেঁচে থাকার পথ, সে কথা বুঝতে হলে মায়ের জীবনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাটুকু বুঝতে হবে। 

যার বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেন, সে কখনো খারাপ পথে যেতে পারে না—এই কথা খুব সহজভাবে আমাদের চেতনায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন মা। জেনোসাইডের বিরুদ্ধে নিজে দাঁড়িয়েছেন, আমাদের দাঁড় করিয়েছেন। ঘাতকদের বিচার দাবি করেছেন। ২৫ মার্চ রাতে মোমবাতি হাতে শহীদ মিনার থেকে জগন্নাথ হল পর্যন্ত মিছিল করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন, চারিত্রিক দৃঢ়তার জন্য অর্থশালী হতে হয় না, জীবনটাকে অর্থবহ করে তুলতে হয়।

সংগ্রাম ছিল তাঁর জীবনজুড়েই। কিন্তু সেটা পার করেছেন অনায়াসে, সব গরলটুকু নিজের মাঝে ধারন করে অন্যকে অমৃত বিলিয়ে দিয়ে। তাই ২০১২ সালের ডিসেম্বরে যেদিন তিনি চলে গেলেন, সেদিনই কেবল অনুভব করলাম, কী হারিয়েছি।

সেই শূন্যতা কোনোদিন কাটবে না। কিন্তু তাঁর সেই অনমনীয় দৃঢ়তা ধারন করব আজীবন।

জাহীদ রেজা নূর, লেখক ও সাংবাদিক

মন্তব্য করুন

Logo