Logo

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

মা

সুমন্ত আসলাম

দিন-প্রতিদিন

মা দিবস

মা

সুমন্ত আসলাম

Icon

সুমন্ত আসলাম, লেখক

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম

মায়ের প্রতি ভীষন একটা অভিযোগ ছিল আমার, একটা কষ্টও।

০২

মা একদিন ফোন দিল আমাকে। তখন ল্যান্ডফোনের যুগ। আমি যে বাসায় থাকি, ফোন ছিল না সেই বাসায়। নিচতলায় এক বাসায় ফোন। ফোন এলেই খুব আন্তরিকতার তারা ডেকে দিতেন আমাকে। 

হন্তদন্ত হয়ে ফোন রিসিভ করলাম আমি। কোনোরকম কূশল বিনিময়ের আগেই মা বলল, ‘তুমি আমাকে পনের শ টাকা পাঠাও।’

‘পাঠাব।’

‘কাইলক্যাই পাঠাও।’

‘পাঠাব।’

‘ভ্ইুল্যা যাইও না কিন্তু।’

‘ভুলব না।’

‘রাখি।’

ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে আমি বললাম, ‘তুমি এই টাকার জন্য ফোন দিয়েছো?’

‘হ।’

‘আজ তো বললে না-আমি ভাত খেয়েছি কি-না?’

‘ভাত খাইছো?’

‘খেয়েছি।’ আমি একটু চুপ থেকে বলি, ‘জিজ্ঞেস করলে না তো-কী দিয়ে খেয়েছি?’

‘কী দিয়া খাইছো?’

গলার তরঙ্গ বুঝে ফেলি আমি মায়ের। কোথাও ওঠা-নামা নেই। গুমোট, অথচ ঠাণ্ডা। খুব নরম গলায় আমি বলি, ‘মা, তোমার শরীর ভালো আছে তো?’

‘আছে।’

‘পা দুটোর কী অবস্থা?’

‘ভালো আছে।’

‘এতো ছোট ছোট করে জবাব দিচ্ছো! তুমি তো এতো ছোট ছোট করে জবাব দাও না।’ মায়ের নিঃশ্বাস গতি শুনি আমি এপাশে, ‘কিছু হয়েছে, মা?’

‘জমিলার মা তার বড় মাইয়াটাকে বিয়া দিতে পারতাছে না।’ মায়ের গলা তীব্র হয়ে উঠল হঠাৎ, ‘এইট্যা শোনার পর আমার মন ভালো নাই। আমি কষ্ট পাইতাছি।’

‘কেন বিয়ে দিতে পারছে না, মা?’

‘জামাই পক্ষ যৌতুক চায়। একটা সাইকেল কিন্যা দিতে হইব তাদের।’

‘পনের শ টাকা দিয়ে সাইকেল হবে?’

‘হইব। কী যেন সাইকেলটার নাম—।’ মনে করার জন্য মা থামে। তারপর কিছুটা উৎফুল্ল হয়ে বলল, ‘ফনি সাইকেল।’

নামের ভুল সংশোধন করার সামান্য চেষ্টা না করে আমি বলি, ‘অ, ফনিক্স সাইকেল?’

‘হ।’ মায়ের গলায় শংকা, ‘এই সাইকেলটা কি ভালো?’

‘জি মা, খুব ভালো সাইকেল।’

‘তুমি তাইলে টাকা পাঠাও। আমি জমিলার মায়েরে একটা সাইকেল কিন্যা দিমু। আমার গ্রামের, আমার বাড়ির পাশের একটা বিয়ার উপযুক্ত মাইয়ার বিয়া হইতেছে না, মাত্র একটা সাইকেলের জন্য, এটা গুনা। আমার গুনা হইতাছে। তুমি টাকা পাঠাও, আমি সাইকেল কিন্যা দিয়া মাইয়াটার বিয়া দিমু।’

মায়ের শাশ্বত রূপটা ফুটে উঠল আমার চোখে। বড় বোনের বিয়ের সময় আমি ছোট ছিলাম, কোনো কিছু মনে নেই আমার। মেঝ বোনের বিয়ের দিন মায়ের কান্না দেখেছি আমি। প্রায়ই অসুস্থ থাকা সংসারের হাল ধরা মেঝ বোন চলে যাবে আজ এই সংসার ছেড়ে, মা মানতে পারছিল না কিছুতেই।

০৩

মাসে অন্তত একবার ফোন দিত মা আমাকে, নিজের প্রয়োজনে নয়, অন্যের জন্যে। একদিন ফোন দিয়ে বলল, ‘রোজার ঈদে একটা শাড়ি কিন্যা দিছালা আমারে। ওরকম শাড়ি কি আরো আছে?’

‘নিউ মার্কেট থেকে কিনেছিলাম। এখন আছে কি-না, তাতে বলতে পারব না।’

‘তুমি কাইল যাইয়া দেখবা, আছে কি-না।’

‘যদি থাকে।’

‘একটা কিইন্যা ফেইলবা।’

‘কার জন্য—তোমার জন্য?’

‘আমার জন্য না, আমারটা তো আছে।’

মায়ের এই শাড়ি কেনার ইতিহাস আছে একটা। বাবা নেই আমার, মা বিধবা। প্রচলিত একটা ধারনা বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা সেই আদিকাল থেকে—বিধবাদের সাদা শাড়ি পরতে হয়। বিয়ে করেছি তখন। বউকে নিয়ে প্রথম ঈদের শপিংয়ে যাওয়া। বউ বলল, ‘না, মার জন্য সাদা শাড়ি কিনব না আমি। একটু কাজ করা শাড়ি কিনব।’

‘মা সম্ভবত পরবে না।’

‘ওটা আমার দায়িত্ব।’

গাউছিয়া-নিউমার্কেট ঘুরে একটা শাড়ি পছন্দ হলো আমাদের। সাদার উপর সোনালি সুতোর কারুকাজ, চোখ ফেরানো যায় না। আল্লার নাম নিয়ে কিনে ফেললাম শাড়িটা। 

বাড়ি এলাম ঈদে। খুব আগ্রহ নিয়ে প্যাকেট থেকে শাড়ি বের করল বউ। মায়ের সামনে মেলে ধরতেই চেহারাটা কেমন গম্ভীর করে ফেলল মা। বিছানায় পাশে বসল বউ। ব্যথায় ছেয়ে যাওয়া নীল রক্তনালীর যত্রতত্র জেগে ওঠা একটা হাত ধরল সে। তারপর কাতর গলায় বলল, ‘মা, শাড়িটা পছন্দ হয়নি আপনার?’

বউয়ের চোখ আর মুখে হাত বুলাতে বুলাতে মা বলল, ‘খুব পছন্দ হইছে। তোমার শ্বশুর মইর‌্যা গেছে, এরকম সাজগোজওয়ালা শাড়ি পইরলে কবরে তিনি কষ্ট পাইব।’

বুঝানোর অপূর্ব ক্ষমতা আছে বউয়ের। মিনিট পাঁচেক মাকে বুঝালো সে। মা বুঝল। বিছানায় পড়ে থাকা শাড়িটা নিজের কোলে নিল। কিছুটা আদর করার মতো বুকেও জড়িয়ে ধরল।

শাড়িটা পরানো হলো মাকে ঈদের দিন। আশপাশের মানুষজন দ্রুত জেনে গেল-সারাদিন তবসী জপা, ওম্মের (আমার বড় বোনের নাম উম্মে সালমা) মাও চকবকা একটা শাড়ি পরেছে আজ ঈদের দিন। কী গুনাহ, কী অমঙ্গল!

একে একে অনেকে দেখতে এলেন মাকে। কিন্তু মায়ের ঘরে ঢুকেই তাদের চোখ রসগোল্লা—ও ভাবী, শাড়িটা কী সুন্দর, আপনাকে মানাইছে খুব। ও ফুপু, আপনার তো বয়স কমে গেছে! সবার মন্তব্য শোনে, আর আলতো শাড়ির আঁচলটা তুলে একবার দেখে নেয় মা। তারপর স্বগর্বে বলতে থাকে-আছলামের বউ কিইন্যা দিছে।

মাকে আরো নয়টা শাড়ি কিনে দিতে পেরেছিলাম আমরা। সবগুলো শাড়িই পাল্লা দিয়ে আগের চেয়ে চকচকা ছিল। আমরা আট ভাইবোন, সারা বছর শাড়ি কিনে দেওয়ার পাশাপাশি ঈদে অন্তত ছয়টা শাড়ি কিনে দেওয়া হতো মাকে। মা মারা যাওয়ার পর অন্তত দু ডজন শাড়ির তার কাঠের আলমারিতে দেখেছি আমি, যেগুলোর ভাঁজই খোলা হয়নি। কিছু কিছু শাড়ি মা চুপি চুপি একে ওকে দিয়ে দিতেন।

মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার জন্য না তো, কার জন্য?’

‘খাড়ুয়া (মায়ের বাপের বাড়ি) থাইক্যা আমার এক ফুপু আইছে, ঊর্মির কিন্যা দেওয়া শাড়িটা দেইখছে। মনে অয় ফুপুর খুব পছন্দ হইছে। এটা তো পুরান হয়া গ্যাছে, তুমি এরকম একটা শাড়ি কিন্যা পাঠাও, ফুপুরে দিমু।’

০৪

বছরে অন্তত দুবার বাড়ি যেতাম আমি-আমরা। ভালো বাস ছিল না, যমুনা ব্রিজও হয়নি। মহাখালি থেকে ভাঙা চোরা বাস, টাঙ্গাইল হয়ে এলেঙ্গা, যমুনা ঘাট, লঞ্চ, তারপর বাড়ি। এখনকার তিন ঘণ্টার রাস্তার সাত-আট ঘণ্টার যন্ত্রণা পেরিয়ে তখন বাড়ি পৌঁছতাম, তারপর সোজা মায়ের ঘর। কোনো কথা নেই, সবার কোলাহল, আনন্দ-চিৎকার, আমি শুয়ে যাই বিছনায়, মায়ের পাশে। ঘুমিয়ে যাই। মা পরম মমতায় একটা হাত চেপে রাখে বাহুতে; কখনো কপাল আর চুলেতে বিলি, সন্ধ্যার আগে ঘুম ভাঙতেই মার প্রথম প্রশ্ন—তুমি এতো শুকায়া গ্যাছো ক্যা!

ঢাকায় আসার এগার বছর পর প্রতি বছরের মতো মায়ের ওই একই প্রশ্ন। অথচ বিয়ের পর ওজন বেড়েছে আমার আট কেজি!

০৫

মায়ের প্রতি আমার চরম অভিযোগ—কোনো দিন মা তার নিজের জন্য কিছু চায়নি আমার কাছে। সারা বছর হামিদার মা, কলাওয়ালী (মায়ের কাছে প্রতি সপ্তাহে গ্রাম থেকে কলাএনে বেচতেন এই মহিলা), ফাতেমার ফুপু, গোল বানু, চামেলী ফুপু (মায়ের গ্রামের দূর সম্পর্কের এক ফুপু, খুবই ধুরন্ধর ছিলেন), জয়নালের বাপ, খা-পাড়ার চম্পা, তেলকুপির ভানুর নানী, ধানগড়ার তছলিমা—এদের আবদার মেটাতে মেটাতে নিজের আবদার ভুলে যেত, কিংবা তাদের আবদারকেই নিজের আবদার মনে করত মা।

০৬

কষ্টটা হচ্ছে—মাকে আমি বিদেশ নিয়ে যেতে পারিনি। ২০০১ সালে প্রথম মালয়েশিয়া ভ্রমণ করি, মালয়েশিযার পর্যটন কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে। একে তো প্রথম বিদেশ ভ্রমণ, তার উপর সত্যি সুন্দর আবহাওয়ার চমৎকার একটা দেশে।

খুব ইচ্ছে ছিল—একটু সামর্থ হলেই মাকে নিয়ে বেড়াতে যাবো মালয়েশিয়াতে।

সামর্থ হলো, কিন্তু মা চলে গেল ওপারে!


সুমন্ত আসলাম, লেখক

মন্তব্য করুন

Logo