দীপু মাহমুদ ও মা
দীপু মাহমুদ, কথাসাহিত্যিক
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম
শুক্রবার। ২০ মার্চ। শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ উঠেছে। আগামীকাল ঈদ। কুষ্টিয়া- আমাদের বাড়ি স্নেহময়ীতে গ্রান্ড ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে। মা সবার সাথে ইফতার করলেন। মাগরিবের নামাজ পড়লেন। এশার নামাজের আগে পানি ছুঁয়ে নিজেকে পবিত্র করেছেন। বিছানায় শুয়ে বললেন, “আমার অস্থির লাগছে।”
আমরা ভাইবোন, আমাদের ছেলেমেয়ে, স্ত্রীসকল, আত্মীয়স্বজন মায়ের ঘরে, মায়ের খাটের ওপর, আশপাশে মাকে ছুঁয়ে আছি। মায়ের কী হয়েছে!
আমার আচমকা অনেক কথা মনে পড়ছে। হুড়মুড় করে এখন কেন এসব কথা মনে আসছে বুঝতে পারছি না। আমি গল্প লিখি। মনের মতো হয় না। লেখা কাগজ ফেলে দিই। সিনেমায় ওরকম দেখাত। সিনেমা দেখে শিখেছি। লিখে সেই লেখা ঘর এলোমেলো করে ফেলে দিতে হয়। তখন কলেজে পড়ি। মা যত্ন করে মুচড়ানো কাগজগুলো তুলতেন। হাত বুলিয়ে সেগুলো সমান করে গুছিয়ে রেখে দিতেন।
একদিন বললাম, “তুমি এসব কী করো? ওসব হাবিজাবি লেখা!”
মায়ের হাতে আমার ফেলে দেওয়া কাগজ। মা কুঁচড়ে যাওয়া কাগজ শাড়ির আঁচল দিয়ে ঝেড়ে সমান করলেন। মমতামাখানো চোখে তাকিয়ে বললেন, “তোর লেখা!”
আমার লেখা গল্প ছাপা হয় দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী পাতায়। মা আনন্দে জনেজনে সেই খবর জানাতে শুরু করেন টেলিফোনে। বই প্রকাশ হলে মায়ের কাছে কপি পাঠাই। মা আগ্রহ নিয়ে সেই বই পড়েন। বাড়িতে তাঁর পছন্দের কেউ এলে তাকে বইটা দিয়ে দেন। তাতে তিনি আনন্দ পান বুঝতে পারি। মা আমাকে ফোন করে কাতর গলায় বলেন, “আমাকে এবার যে বইটা দিয়েছিলি তোকে জিজ্ঞেস না করে ওটা একজনকে দিয়ে দিয়েছি। আমার তো পড়া হয়ে গেছে।”
লেখক জীবনের প্রাপ্তি সামান্য নয়, আমি অতিসামান্য লেখক সেই তুলনায়। তবে সবচেয়ে বড় পাওয়া যখন দেখেছি মা আমার লেখা বই পড়ছেন। আদর নিয়ে বইয়ের পাতায় হাত বুলাচ্ছেন। আপনাআপনি চোখ ভিজে এসেছে। মায়ের গলা শুনতে পাই, “তোর লেখা!”
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে বন্ধুর সাথে চট্টগ্রামে বেড়াতে গেছি। শুরু হলো পাহাড়ি ঢল। মুষলধারে একটানা পাহাড়ি ঝমঝম বৃষ্টি। চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ খবর হয়ে গেছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল দেখাচ্ছে বিটিভি। ভেসে যাচ্ছে চট্টগ্রাম শহর। বাবা-মা আতঙ্ক নিয়ে টেলিভিশনে সেই খবর দেখছেন। তাঁরা আছেন কুষ্টিয়াতে। আমার বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতে পারছি না। যাতায়াতের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। মোবাইল ফোন ছিল না তখন। বাড়ির সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না।
সাতদিন পর বাড়ি ফিরলাম। ভোররাত। দরজা খুলে দিয়ে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলেন। জড়ানো গলায় শুধু বলে যাচ্ছেন, “তোর আব্বা, তোর আব্বা....” আর কিছু বলতে পারছেন না। আমার মনে হলো আব্বা মনে হয় আর নেই। চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। কান্নার দমকে মা কিছুতেই বলতে পারছেন না, “তোর আব্বা অস্থির হয়ে গেছে। তোর কোনো খবর পাচ্ছে না!”
ঘূর্ণিঝড় আম্পানের শুরুতে কুষ্টিয়ার বটতৈলে পাওয়ার গ্রীডে আগুন লেগেছে। দুদিন হলো কুষ্টিয়াতে বিদ্যুৎ নেই। কারও মোবাইল ফোনে চার্জ নেই। নেটওয়ার্কের অবস্থাও নাজুক হয়ে আছে। আব্বা বা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। তখন দেশে কোভিডের জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক দিন বাড়ি যেতে পারিনি। মোবাইল ফোনেই আব্বা এবং মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তখন আর যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না।
আমি যখন চট্টগ্রামে পাহাড়ি ঢলে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম তখন নিশ্চয়চ আব্বা আর মায়ের এরকম ভয়াবহ অস্থিরতা বোধ হয়েছিল, যেমন সেই লকডাউনের সময় আমার হচ্ছিল! বুঝতে পারছিলাম মনে কী প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গিয়েছিল তাঁদের! কেমন করে পার করেছিলেন তাঁরা সেই কয়টা দিন! সন্তানের খবর না পেয়ে মায়ের বুকটা নিশ্চয় ফেটে যাচ্ছিল!
একদিন খুব সকালে মা ফোন করেছেন। ঘুমভাঙা সকালে ফোন। মা বললেন, “যুবরাজ খুব শুকিয়ে গেছে।”
মাথার ভেতর তালগোল পাকিয়ে গেল। কে যুবরাজ! মনে করতে পারছি না। মনে করার চেষ্টা করছি। যুবরাজ নামের এই পরমজন কত দিন পরে এসেছে? এতদিন কোথায় ছিল? কার জন্য মা বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন? সে অবশ্যই আমাদের অতিনিকট আত্মীয়! ঘুমঘুম মাথায় তালগোল পাকানো অবস্থায় কথা বলা ঠিক না। কথা উলটাপালটা হয়ে যেতে পারে। চুপ করে আছি।
মা বললেন, “রান্নাঘরের চালের ওপর ঠিক সেই জায়গায় এসে বসল। রুটি দিলাম। নেমে এসে রুটি নিয়ে গাছে চলে গেল।”
আমার ঘুম তখন পুরোপুরি ছুটে গেছে। এক হনুমান আসে আমাদের বাড়িতে। মা তার নাম রেখেছেন যুবরাজ। তাকে যত্ন করে খেতে দেন। দুদিন না এলে মা অস্থির হয়ে পড়েন।
সকালে বাড়ির উঠোনে খাবার ছিটিয়ে রাখেন মা। দল ধরে শালিক, বুলবুলি, চড়ুই, দোয়েল এসে উঠোন ভরে যায়। কোনোদিন খাবার পেতে দেরি হলে তারস্বরে কিচিরমিচির জুড়ে দেয় তারা।
মা আবার ফোন করেছেন রাতে। গলার আওয়াজ খলবলানো। কীসে মা এত আনন্দিত হয়েছেন বুঝতে পারছি না। আমি তাঁর আনন্দের কারণ জানার জন্য ফোন কানে চেপে ধরে চুপ করে আছি।
মা বললেন, “শেয়ালের বাচ্চা হয়েছে পাঁচটা!”
শেয়াল থাকে আমাদের বাড়িতে। মা তাদের খাবার দেন। এখন খাবার আরও বাড়িয়ে দিতে হচ্ছে। পাঁচ সন্তান নিয়ে মা-বাবা শেয়াল। তারা আমার মায়ের কাছে থাকে। হনুমান, শেয়াল, কুকুর, বিড়াল, শালিক, বুলবুলি, চড়ুই, দোয়েল সবাই থাকে মায়ের কাছে।
মা ফোনে কথা বলেন গলায় আনন্দ নিয়ে। কথা শেষ হলে কাঁদেন। শাড়ির আঁচল দিয়ে চুপচাপ চোখের পানি মুছে ফেলে্ন। যেন ছেলেমেয়ে বুঝতে না পারে।
ফোন করেই মা খলবল করে কথা বলেন, “ও-দীপু, ওই ঝড়বৃষ্টির ভেতর শেয়ালের বাচ্চাটার মরা মরা অবস্থা। উঠোনের ওপর পড়েছিল। কী করব! চট দিয়ে জড়িয়ে ঘরে নিয়ে বসে আছি সারারাত। তোর আব্বা হারিকেন জ্বালিয়ে শেয়ালের ঘাড়ে-গলায় গরম শেক দিচ্ছে। গতকাল থেকে কুষ্টিয়ায় কারেন্ট নেই।”
করোনাকালের এক ঈদের আগে ফোন করে মা খলবল করলেন না। তাঁর গলা ভিজে আছে। বুজে আসা আধাভাঙা গলায় মা বললেন, “ও-দীপু, তোরা এবার আর বাড়ি আসিস না। তোর আব্বা সারাদিন টেলিভিশনে খবর দেখে। বলছে রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। মানুষ গিজগিজ করছে। তোরা ভালো থাকিস। আমরা ভালো আছি।”
শেষের কথা ভালোমতো বোঝা গেল না। শেয়ালের বাচ্চাটার কথা জিজ্ঞেস করা হলো না। বুলবুলি পাখির বাসা ঝড়ে উড়ে গেল কিনা! ঝড়ে আমগুলো সব পড়ে গেছে মনে হয়! মা পাকা বেল গাছে রেখে দিয়েছিলেন। আমরা গেলে পাড়বেন। ঝড়ে মনে হয় সব বেল পড়ে গেছে। কিছুই তো শোনা হলো না। মা কাঁদছিলেন।
পাড়া দাপিয়ে গ্রাম মাড়িয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতাম। নানার বাড়ি। নানির কড়া হুকুম, বাইরে থেকে ফিরে ভালোমতো হাতমুখ ধুতে হবে। এরকম অনেক অভ্যাস নানি করিয়েছেন আমাদের ছোটবেলায়।
নানি কোল পেতে গোল হয়ে বসতেন। ধবল জোছনায় ভেসে যেত উঠোন। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতাম নানির মুখের দিকে। মুরগির ডিমে ওমভরা তা দেওয়ার মতো কোলের ভেতর বসিয়ে নানি গল্প শোনাতেন।
আমার সদ্য তারুণ্য ছোঁয়া মা তখন ঘরের দাওয়ায় বসে বোনদের সঙ্গে গল্প করতেন। ফিসফাস গল্প, পাহাড় বেয়ে নেমে আসা ঝরনার মতো মায়ের হাসি। রাত বাড়ত। নানির কোলে ঘুমে ঢলে পড়তাম। নাইয়র আসা আমার কৈশোর পেরুনো মায়ের গল্প ফুরাত না। উঠোন থেকে জোছনার ঢেউ এসে উছলে পড়ত মায়ের মুখে। আহা কিশোরী মা আমার!
বিছানায় শুয়ে আছেন মা। আঁকড়ে ধরে আছি আমরা মাকে। ঘরের ভেতর মায়ের পাশে আমরা ভাইবোন, আমাদের ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন সকলে মাকে ছুঁয়ে আছি। মা কেন সহসা এমন শান্ত হয়ে গেলেন বুঝতে পারছি না।
বাবা শুয়ে আছেন ঘরের আরেক বিছানায়। মা কাঁধ নিচু করে বাবার দিকে তাকানোর চেষ্টা করলেন। শান্ত চোখে সবার দিকে তাকালেন। নরম গলায় বললেন, “আমাকে ডান দিকে কাত করে দাও।”
মা শুয়ে আছেন উত্তর-দক্ষিণ হয়ে। মায়ের মাথা উত্তরে। মাকে ডান দিকে কাত করে শোয়ানো হলো। মায়ের মুখ পশ্চিমে সোজা হয়ে আছে। মা দুই ঠোঁট খুলে কিছু বলছেন। আমরা মায়ের মুখের কাছে ঝুঁকে এলাম। মা বললেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)।”
নীরব নিস্তব্ধ স্থির হয়ে এল চারপাশ। ঘড়ির সময় থমকে গেল। তখন সময় রাত আটটা বেজে বিশ মিনিট। মা আমাদের ছেড়ে দূর আকাশের তারা হয়ে গেলেন। জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল এক তারা। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাহি রাজিয়ুন। রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।
মা ছাড়া আমাদের পৃথিবী শূন্য হয়ে গেছে। আব্বা আছেন, যদিও কিছু বুঝতে পারেন না, আছেন আমাদের ভেতর। আমরা ভাইবোন, ছেলেমেয়ে তাদের মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, বুলবুলি, চড়ুই, ঘুঘু, শালিক, বিড়াল, শেয়াল, কাঠবিড়ালি যে যেখানে ছিলে সকলেই আছে। তবু চারপাশে এক গহিন শূন্যতা। মা ছাড়া প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছে নিকষকালো ঘন অন্ধকারে দিঘল শূন্যতায় হারিয়ে যাচ্ছি। যখন নিশ্চিতভাবে মাকে ডেকে ওঠার কথা, তখন থমকে যাচ্ছি। মায়ের ডাক শুনব বলে অধীর অবস্থায় সমস্ত শব্দ অবশ হয়ে জমাট নিস্তব্ধতা নেমে আসছে। যতদিন মা কাছে আছেন, ততদিন মাকে জড়িয়ে ধরে থাকা, তার হাসিমুখ বহমান রাখা খুব দরকার। মা না থাকলে আর কোথাও যাওয়ার থাকে না, কিছু ছুঁয়ে থাকা যায় না। সমস্ত কিছু শূন্য হয়ে যায়।
কিশোরী মা আমার, সারাজীবন শুধু দিয়েই গেছেন, নিয়ে তো গেলেন না কিছুই। ভালোবাসা সবটুকু রইল মায়ের জন্য। মা তুমি আকাশের উজ্জ্বল তারা হয়ে ভালো থাকো। সন্ধ্যারাতে তোমার পাগল ছেলে চোখ ভরা পানি নিয়ে আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে থাকে। তোমাকে দেখে মা।
মন্তব্য করুন

