Logo

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

অদ্বিতার জন্য চিঠি

'এই সেই মাটির ঘর যেখানে তোমার গ্রেটগ্রান্ডমা আর গ্রান্ডপা ভূমিষ্ঠ হয়েছিল'

দিন-প্রতিদিন

মা দিবস

অদ্বিতার জন্য চিঠি

জাহিদ হোসাইন

Icon

জাহিদ হোসাইন

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১২:২১ পিএম

প্রিয় অদ্বিতা, 

আজ তোমাকে একটি মেয়ের গল্প শোনাব। তুমি বড় হয়ে তাঁকে আর দেখতে পাবে না। তবে এই গল্প প’ড়ে একদিন হয়ত তাঁকে বুঝতে চেষ্টা করবে। 

বহু বছর আগে মেয়েটির জন্ম হয়েছিল আজকের বাংলাদেশের অতি প্রত্যন্ত এক গ্রামে। সেই গ্রামের দশ মাইলের মধ্যে কোন পাকা রাস্তা ছিল না। তাঁদের ঘরটি ছিল ছনের ছাউনি দেওয়া কুঁড়ে ঘর। মেয়েটি ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, মালিথাদের একমাত্র কন্যা, চাচাত ভাইদের নয়নের মনি। মেয়েটির মাথায় হাটু অব্দি লম্বা ঘন চুল ছিল। আর চোখ ছিলো, তোমার মত, মায়াবী। বাড়ির কাছেই ছিল নীলকর সাহেবদের কুঠিবাড়িতে বৃটিশদের বানানো স্কুল। তবু ক্লাস ফাইভ পাশ করার পর আর তাঁর পড়া হলো না। বিয়ে হয়ে গেল। 

বাংলাদেশের কত মেয়েরই তো শিশুবেলায় বিয়ে হয়ে যেত সেই সময়ে। আজও হয়। কত মেয়েরই পড়া হতো না স্কুলে। আজও কত মেয়ে পড়তে পায় না। তাহলে আলাদা করে তাঁর গল্প কেন আজ শোনাতে বসেছি জানো? কারন, সেই মেয়েটির জন্ম না হলে তোমার জন্ম হতো না। মেয়েটি আমার মা। তোমার প্রমাতামহী। তোমরা আমেরিকানরা যাকে বলো, গ্রেট গ্রান্ডমাদার। 

তুমি যেমন তোমার মায়ের পেটে ছিলে, আমিও ছিলাম তাঁর পেটে। তবে তুমি মাত্র একজন ছিলে আর আমরা ছিলাম মোট দশ জন। আমি ছিলাম তাঁর চতুর্থ সন্তান। প্রথম দুটি বাঁচেনি। 

মনের চোখে দেখে নাও … তোমাদের আমেরিকার ঠিক উল্টো পিঠের একটা দেশ। সেই দেশের যশোহর জেলার হরিণাকুণ্ডু থানার জোড়াদহ নামে একটা গ্রাম। সেই গ্রামে তৃতীয় সন্তানটাকে নিয়ে মেয়েটি তাঁর বাপের বাড়ি থাকে। তাঁর স্বামী শহরের মেসবাড়িতে থেকে চাকরি করে। মাঝে মধ্যে বাইসাইকেলে চেপে তাঁকে দেখতে আসে। এই সময়ের কোন এক অগ্রহায়ন বা পৌষ মাসে আমি তাঁর গর্ভস্থ হই। এরপর আশ্বিনের এক ভোরে আমি ভূমিষ্ঠ হই।  জানো তো, মানুষের জন্ম হয় দুইবার। মৃত্যু একবার। প্রথম জন্মে মাতাপিতার মিলনের ফলে সে গর্ভে স্থিত হয়। দ্বিতীয় জন্মে সে মায়ের গর্ভ থেকে মাটিতে অবতীর্ণ হয়। 

যাহোক মেয়েটির গল্পে ফিরি।  

তখনকার দিনের পাড়াগাঁয় সন্তান জন্মদানের সাথে আজকের কোন মিল নেই। আমাদের মায়েরা যখন কনসিভ করতেন, ডেলিভারি দিতেন, একই সাথে তাঁরা মৃত্যুকেও আমন্ত্রণ জানাতেন। তখন গ্রামে কোন ডাক্তার ছিলো না। তাই, ১৯৬৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভোরে যখন ১৮ বছরের মায়ের গর্ভ থেকে আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম, তখন হয় মা, নয় আমি বা হয়ত দুজনেই, মারা যেতে পারতাম। ভাবো তো, আমাদের দুজনের কেউ একজন সেদিন মারা গেলে আজ তুমি কোথায় থাকতে ! 

একটা মজার কথা বলি। তোমাকে এই গল্প বলতে গিয়েই ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। গত বছর লুইসভিল হাসপাতালে তুমি যখন জন্মালে কিংবা তারও তিরিশ বছর আগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তোমার মা যখন জন্মালো, জন্মের পর তোমাদের দুজনকেই আমি যেমন গভীর ভাবে একেবারে ক্লোজ ডিস্টেন্স থেকে দেখেছি, তোমাদের নাক মুখ চোখ থুতনি ভ্রু যেমন মুখস্থ করার চেষ্টা করেছি, এই ষাট বছরের জীবনে নিজের মাকে আমি কখনো তেমন ভাবে দেখিনি। আসলে অমন করে দেখার প্রয়োজনই অনুভব করিনি। কী আশ্চর্য ! অথচ তিনি আমাকে জন্ম দিয়েছেন! 


সকালে মা ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে বিছানা বালিশ গুছাতে শুরু করেছে আমি তাঁর দিকে না তাকিয়েই নলার ডাল ভেঙ্গে দাঁতন করতে করতে কলপাড়ে গিয়েছি। তারপর পড়তে বসেছি আর মা এসে হয় রুটি ডাল না হয় পান্তা পিঁয়াজ দিয়ে গেছে। ওদিকে আব্বা হয়ত তখন ডাক দিচ্ছে, ‘কই রে, আমার লাল জামাটা কেউ দিয়ে যা।“ বস্তুত বাসায় কোন লাল জামা নেই তাই আমরা কেউ সেই ডাকে সাড়া দিচ্ছি না। কিন্তু মা ঠিক বুঝে নিয়েছে কোন জামাটা আব্বা চাচ্ছে। নিয়ে দৌড়ে গেছেন অফিসগামী স্বামীর দিকে। তখনই হয়ত কেঁদে উঠছে ছয় মাসের ছোট বোনটি। মা এসে এক হাতে তাকে তুলে নিয়ে আরেক হাতে আরেকজনের মাথা আঁচড়ে দিয়েছে। সাত ভাই বোনের কেউ কলম খুঁজে পাচ্ছে না, কেউ স্যান্ডেল খুঁজে পাচ্ছে না, সবাই মাকে ডাকছে। একই সময়ে কেউ হয়ত কলপাড় থেকে ভেজা গায়ে চিৎকার করছে “মা, গামছা দাও।“ 

মাকে আমি কখনো বিশ্রামরত ঘুমন্ত দেখেছি কি না মনে পড়ে না। আমি ঘুমাবার পরেই মা ঘুমিয়েছে। আবার প্রতি সকালে মার কোরান পাঠ শুনেই আমার ঘুম ভেঙ্গেছে। আমাদের বাড়িতে কখনো ‘কাজের লোক’ ছিলো না। ফ্রিজ ছিলো না। মাকে তিনবেলা রাঁধতে হতো। 

তাকে কখনো সাজতে দেখিনি। তাঁর কোন প্রসাধন সামগ্রীও দেখিনি বাড়িতে। আলতা স্নো পাউডার, কিছুই কখনো তিনি ব্যবহার করেননি। কেবল হাটু অব্দি খোলা চুলে বকুল ফুল আর কমলার শুকনো খোসা ডুবানো নারকেল তেল দিতে দেখেছি। ও হ্যা, প্রতি শীতে একটা তিব্বতের হলুদাভ রঙের ভেসেলিন কেনা হতো। সেটাই আমরা সবাই গোসলের পর মুখে ঠোঁটে মাখতাম। সেকালে শীতে আমাদের খুব ঠোঁট ফাটতো। 

উড়ন্ত প্রজাপতির মতো, দশভূজা দুর্গার মতো মা সবাইকে দেখেছে, কিন্তু আমরা কেউ মাকে দেখিনি। কেবল তাঁর কাছে দাবি করেছি, অভিমান-অভিযোগ করেছি, প্রশ্রয়-সমর্থন চেয়েছি। এইসব ভাবতে ভাবতেই মনে হলো, স্নেহ বড় অন্যায়রকম ভাবে নিম্নগামী! কি জানি, সৃষ্টির ধারাবাহিকতা রক্ষায় হয়ত এটাই প্রকৃতির বিধান। মানুষ যেমন প্রতিমুহুর্তে নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে কিন্তু আলাদা করে নিঃশ্বাসকে দেখে না। আমিও তেমন প্রতিমুহুর্তে মাকে আশ্রয় করে বেঁচে ছিলাম কিন্তু তাঁকে কখনো গভীর ভাবে দেখিনি। মা ছিল আমার ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড।‘

খুব কাছে থেকেও তাঁকে কাছ থেকে দেখিনি বলেই আজকাল বার্ডস আই ভিউ দিয়ে তাঁকে দেখি। আর ভাবি, এই মানুষটার কাছে আমি কেবল জীবনই পেয়েছি, তা নয়। কোন বিদ্যালয় উচ্চ বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় যা শেখাতে পারেনি, এই মানুষটার কাছ থেকে আমি তাও শিখেছি। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি মিথ্যা বলা, অন্যের জিনিস না বলে নেওয়া, কারোর খাওয়ার বা গোসল করার সময় তাকিয়ে থাকা খারাপ। অতিথির পাতে বড় টুকরোটা তুলে দেওয়া ভালো। পোষা হাঁসের মৃত্যুতে মানুষ কাঁদতে পারে, শিশুকালের পোষা কুকুরটার কথা মনে করে বৃদ্ধকালেও মানুষের চোখ ভিজে যায়, ভালোবাসলে বুনো পাখিরাও উড়ে এসে হাতের তালুতে বসে খায়, পুজোর পাপড় খেলে পাপ হয় না, যোগেন কাকাও আমাদের কাকা। আমার ফাইভ পাশ মাকে তাই অনেক শিক্ষিত বলে মনে হয়।

আজ মা দিবসে মার কাছে খুব ক্ষমা চাইতে ইচ্ছা করছে। তাঁর আঁচলের মধ্যে গুটিশুটি শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে। এই একটাই তো স্থান, যেখানে এখনো আমি শিশু। আর তোমাকে অনুরোধ করতে ইচ্ছা করছে, যার জন্ম না হলে আমি তোমার মা এমনকি তুমি, কেউ জন্মাতাম না, কখনো অবসর পেলে তাঁর কথা ভেবো, বাংলাদেশটার কথা ভেবো। 

ভালো থেকো অদ্বিতা। 


জাহিদ হোসাইন

মন্তব্য করুন

Logo