সিরাজুল ইসলাম আবেদ
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:২২ পিএম
আজ ১৫ জুলাই। বাংলা সাহিত্যের নিরহংকার সাধক, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির অনন্য প্রহরী, কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও সম্পাদক রশীদ হায়দারের জন্মদিন। কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের চলে যাওয়া কখনোই ঠিক যাওয়া হয় না। তাঁরা থেকে যান তাঁদের সৃষ্টিতে, চিন্তায়, ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে, মানুষের স্মৃতিতে। রশীদ হায়দার ছিলেন তেমনই একজন—যিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন শব্দ, সাহিত্য এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার কাজে।
গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও সম্পাদনা—সব মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা সত্তরেরও বেশি। কিন্তু এই সংখ্যাই বড় কথা নয়। তাঁর প্রকৃত পরিচয় নিহিত রয়েছে সেই সাহিত্যবোধে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা এবং সমাজবাস্তবতা একাকার হয়ে গেছে। তিনি এমন এক সাহিত্যভুবন নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে ইতিহাস কেবল তথ্য নয়, মানুষের জীবন; স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক অর্জন নয়, একটি জাতির আত্মপরিচয়।
রশীদ হায়দার জানতেন, একটি জাতি শুধু স্বাধীনতা অর্জন করলেই বেঁচে থাকে না; বেঁচে থাকে তার স্মৃতি, তার আত্মত্যাগ এবং সত্যকে ধারণ করার মধ্য দিয়ে। তাই তিনি শুধু গল্প বা উপন্যাস লেখেননি; তিনি সংগ্রহ করেছেন হারিয়ে যেতে বসা কণ্ঠস্বর, সংরক্ষণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের স্মৃতি, অজানা দলিল, বিজয়ের অন্তরঙ্গ ইতিহাস। তাঁর সম্পাদিত 'স্মৃতি: ১৯৭১'–এর ১৩ খণ্ড, 'শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ', '১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা'—এসব শুধু গ্রন্থ নয়; এগুলো আমাদের অমূল্য স্মৃতির ভাণ্ডার।
১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ 'নানকুর বোধি'। আর ১৯৭১ সালে, যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যেই ধানমন্ডিতে গৃহবন্দি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা শুরু করেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘খাঁচায়’। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ির পাশের সেই বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা তিনি রূপ দিয়েছিলেন এমন এক সাহিত্যে, যেখানে যুদ্ধ, ভয়, প্রতিরোধ এবং মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা একাকার হয়ে গেছে। পরে তিনি লিখেছেন ‘অসহযোগ আন্দোলন: একাত্তর’, ‘যুদ্ধ ও জীবন’, ‘শোভনের স্বাধীনতা’—যে রচনাগুলো নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের গভীরতর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
নাট্যজগতেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্যধারাকে সমৃদ্ধ করতে তিনি লিখেছেন একাধিক নাটক, নাট্যরূপ দিয়েছেন জনপ্রিয় নাটক ‘তৈল সংকট’। তাঁর গল্পসংকলন ‘বৃহন্নলা ও অন্যান্য গল্প’ ভারতের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বাংলা ভাষার সীমানা পেরিয়ে তাঁর সাহিত্য পৌঁছে গেছে বহুভাষিক পাঠকের কাছে।
তিনি আত্মজীবনী লেখেননি। কিন্তু ‘এবেলা ওবেলা’, ‘স্মৃতির দখিন দুয়ার’ কিংবা ‘আমার স্কুল’ পড়লে মনে হয়, একজন লেখকের শৈশব, বেড়ে ওঠা এবং জীবনবোধ কী অসাধারণ মমতায় শব্দের শরীরে ধরা দিতে পারে।
বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা তাঁর ঝুলিতে এসেছে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার সম্ভবত মানুষের ভালোবাসা এবং গবেষকদের আস্থা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অসংখ্য মানুষ তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থে ফিরে গেছেন, নতুন করে আবিষ্কার করেছেন স্বাধীনতার ইতিহাস। তরুণ্যে তাঁর সম্পাদিত ‘স্মৃতি: ১৯৭১’ আমাকে এবং আমার মতো অনেককেই ধাবিত করেছে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি। ইতিহাসকে শুধু পড়ার নয়, সংরক্ষণ করার দায়ও যে আছে—সেই শিক্ষা দিয়েছেন রশীদ হায়দার।
সুযোগ হয়েছিল তাঁর সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার। সেটাও অন্তত দুই দশক আগের কথা। তখন আমি দৈনিক যুগান্তরের পাঠক সংগঠন ‘স্বজন সমাবেশ’ পরিচালনা করি। তরুণ লেখক, কবিদের নিয়ে আড্ডা হয় মাঝে মধ্যেই। হয় লেখালেখি বিষয়ক কর্মশালা। এমনি এক আসরে তরুণ আমি ফোনেই রশীদ হায়দারকে আমন্ত্রণ জানালাম তরুণদের আসরে মধ্যমনি হতে। কি আশ্চর্য! কোনো ভনিতা ছাড়াই রাজি হয়ে গেলেন এবং অনুষ্ঠানের দিন নির্ধারিত সময়ের একটু আগেই কাঁধে ঝোলাব্যাগ ঝুলিয়ে চলে এলেন যুগান্তর অফিসে। তরুণ লেখকদের শোনালেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংগ্রহের গল্প। কী এক বিকেল ছিল সেদিন!
এরপরও অনেক বার দেখা হয়েছে কথা হয়েছে অল্প-স্বল্প। প্রতিবারই শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বেড়ে গেছে। ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর তিনি চলে গেলেন—এমন এক যাত্রায়, যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসে না।
তাঁর প্রয়াণে আমরা হারাই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি খুঁজে ফেরা এক নিরহংকার সাধককে। যিনি নীরবে, নিভৃতে একটি জাতির ইতিহাসকে সংরক্ষণ করে গেছেন।
আজ রশীদ হায়দারের জন্মদিনে মনে হয়, তিনি আসলে কোথাও হারিয়ে যাননি। যতদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়া হবে, যতদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার গল্প বলা হবে, যতদিন কোনো তরুণ গবেষক ইতিহাসের সূত্র খুঁজতে ‘স্মৃতি: ১৯৭১’–এর পাতা উল্টে দেখবে, যতদিন কোনো পাঠক ‘খাঁচায়’ পড়ে যুদ্ধের ভেতরের মানুষের আর্তনাদ শুনবে—ততদিন রশীদ হায়দার বেঁচে থাকবেন।
মন্তব্য করুন

