কাভার স্টোরি ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম
মে দিবস শুধুই আনুষ্ঠানিকতা
শ্রমিকের রক্ত, ঘাম আর সংগ্রামের প্রতীক মহান মে দিবস। আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও আট ঘণ্টা ব্যক্তিগত জীবনের জন্য যে শ্রমিকেরা রক্ত ঝরিয়েছিল ১৮৮৬ সালের এই দিনে—সেটি আজও বহু শ্রমিকের কাছে অধরা। সময় বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে, অর্থনীতির কাঠামো বদলেছে, কিন্তু শ্রমিকের বাস্তবতা কতটা বদলেছে—এই প্রশ্ন আজও তীব্রভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে শ্রমিকের কাঁধে ভর করেই। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি—সবখানেই শ্রমিকই মূল শক্তি। কিন্তু এই শক্তির পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর বৈপরীত্য। একদিকে রপ্তানি আয় বাড়ছে, উন্নয়নের গল্প লেখা হচ্ছে; অন্যদিকে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, নিরাপত্তা ও জীবনমান নিয়ে থেকে যাচ্ছে অসংখ্য প্রশ্ন। বিপুল সংখ্যক শ্রমিক এখনো এমন মজুরি পান, যা দিয়ে তার ন্যূনতম জীবনযাপনও কঠিন। ঘরভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের জীবন পরিণত হয় টিকে থাকার এক নিরন্তর যুদ্ধে।
নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের বড় বড় দুর্ঘটনা আমাদের শিখিয়েছে—নিয়মকানুন কাগজে থাকলেই যথেষ্ট নয়, তার কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা মানা হয় না বা মানলেও তা পর্যাপ্ত নয়। শ্রমিকের জীবন যেন নিতান্তই সস্তা—একটি দুর্ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা, তারপর আবার সব আগের মতো।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও শ্রমিকদের অবস্থানকে প্রভাবিত করে। শ্রমিক সংগঠনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল বা নিয়ন্ত্রিত। ফলে, শ্রমিকের কণ্ঠস্বর শক্তভাবে উঠে আসে সুযোগ থাকেন না বললেই চলে। যে দাবি তোলার কথা সংগঠনের, তা অনেক সময়ই ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়। অন্যদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করা বিপুল সংখ্যক শ্রমিক থেকে যান আইনি সুরক্ষার বাইরে। রিকশাচালক, গৃহকর্মী, দিনমজুর—তাদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই সামাজিক নিরাপত্তা।
নারী শ্রমিকদের বাস্তবতা আরও জটিল। তারা একই সঙ্গে শ্রমের শোষণ ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন। কর্মক্ষেত্রে কম মজুরি, অনিরাপদ পরিবেশ, আর ঘরে ফিরে গৃহস্থালির দায়িত্ব—সব মিলিয়ে তাদের সংগ্রাম বহুমাত্রিক।
আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি ও নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও শ্রমবাজারকে বদলে দিচ্ছে। অস্থায়ী কাজ, অনিশ্চিত আয়, কাজের নিরাপত্তাহীনতা—এসব নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসছে। বিশ্বজুড়ে চুক্তিভিত্তিক কাজের প্রচলন শ্রমিকের আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও আট ঘণ্টা ব্যক্তিগত জীবননের নিশ্চয়তাকে আরও বেশি চ্যালেঞ্জর মুখে ফেলে দিয়েছে। ফলে মে দিবসের চেতনা কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের লড়াইয়ের দিকনির্দেশনাও।
দুঃখজনক হলেও সত্য বর্তমান কর্পোরেট দুনিয়া প্রায়স মে দিবসকে একদিনের ছুটির বিনিময়ে উৎসবে রূপান্তর করে শ্রমিককে মূল বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সফলও। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—মে দিবস কি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা? যদি শ্রমিক ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়, যদি তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত না হয় এবং জীবনমান উন্নত না হয়, তবে উন্নয়নের যে গল্প আমরা বলি, তা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকের অধিকার কোনো দয়া নয়, এটি তার প্রাপ্য। আর সেই প্রাপ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের।
১ মে-এর উল্লেখযোগ্য ঘটনা
১৭৫১: আমেরিকায় প্রথম ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হয়।
১৭৫৩: কার্ল লিনিয়াস রচিত 'স্পেসিস প্লান্টারাম' প্রকাশিত হয়।
১৮৪০: যুক্তরাজ্যে বিশ্বের প্রথম আঠালো ডাকটিকিট (পেনি ব্ল্যাক) ইস্যু করা হয়।
১৯৩১: নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং উদ্বোধন করা হয়।
১৯৪৫: নাৎসি বাহিনীর প্রধান অ্যাডলফ হিটলারের মৃত্যুর খবর জার্মান রেডিওতে প্রচার করা হয়।
১৯৬১: ফিদেল কাস্ত্রো কিউবাকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা করেন।
২০১১: মার্কিন নেভি সিলস কর্তৃক ওসামা বিন লাদেন অ্যাবোটাবাদে নিহত হন।
১৮৮৬: শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকদের মিছিলে পুলিশের হামলা, গুলি ও শ্রমিক মৃত্যু হয় ।
মন্তব্য করুন

