শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, ছবি: সংগৃহীত
সাহসের অপর নাম জাহানারা ইমাম
শামীম সিরাজ
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১১:২৫ পিএম
‘আমার মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তার মৃত্যু হবে না।’ কী সহসী, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ,আত্মবিশ্বাসী অবস্থান! আবার রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা মাথায় নিয়ে মৃত্যুর বিছানা থেকে শেষ বার্তা ’জয় আমাদের হবেই’।—স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে এমন স্পর্ধিত উচ্চারণ আমরা যাঁর কাছ থেকে শুনেছিলাম তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের প্রস্থান কোনো শূন্যতার সমাপ্তি নয়; বরং একটি জাতির বিবেকে স্থায়ী অনুপস্থিতির বেদনা হয়ে থেকে যায়। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তেমনই এক নাম। তিনি শুধু একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ন্যায়বিচারের দাবি এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার এক অবিচল প্রতীক।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল প্রাণপ্রিয় সন্তান, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শফী ইমাম রুমীকে। কিন্তু মাতৃত্বের সেই অসীম শোক তাঁকে ভাঙতে পারেনি; বরং পরিণত করেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে অদম্য সংগ্রামে। ব্যক্তিগত বেদনাকে তিনি রূপ দিয়েছিলেন জাতির ন্যায়বিচারের সংগ্রামে।
স্বাধীনতার পর একসময় যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা চলছিল, যখন যুদ্ধাপরাধী তথা মানবতাবিরোধী অপরাধধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, যখন অনেকেই ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যবহার করছিলেন, তখন জাহানারা ইমাম দাঁড়িয়েছিলেন মাথা উঁচু করে লাখো তরুণের প্রেরণা হয়ে। ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সঞ্চার হয়। সেই সময়, ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠিত হয়; যা পরে রূপ পায় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ হিসেবে। দেশজুড়ে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চের ‘গণআদালত’ ছিল সেই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতীকী অধ্যায়—যেখানে রাষ্ট্রীয় আদালতের বিকল্প নয়, বরং জাতির নৈতিক বিচারবোধের প্রকাশ ঘটেছিল।
তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বিশ্বাসযোগ্যতা। তিনি মুক্তিযুদ্ধকে কখনো ব্যক্তিগত পরিচয়ের অলংকার বানাননি, রাজনৈতিক ক্ষমতার সিঁড়ি বানাননি, কিংবা কোনো সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার করেননি। তিনি জানতেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; এটি ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত, দুই লাখেরও বেশি নির্যাতিত নারীর অশ্রু, এবং সমগ্র জাতির সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল।
এই কারণেই জাহানারা ইমামের কণ্ঠে মানুষ নিজেদের কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছিল। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল নতুন প্রজন্ম। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, তারাও তাঁর লেখনী, তাঁর বক্তৃতা, তাঁর সাহস থেকে শিখেছিল স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ—স্বাধীনতা মানে শুধু একটি পতাকা নয়; স্বাধীনতা মানে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং সত্যের পক্ষে আপসহীন অবস্থান।
একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে অবিরাম সংগ্রাম, অন্যদিকে মরণব্যাধি ক্যান্সারের নির্মম যন্ত্রণা—দুই যুদ্ধই তিনি একসঙ্গে লড়েছেন। শরীর ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তাঁর মনোবল ভাঙেনি। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, সত্যকে হয়তো সাময়িকভাবে চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না।
১৯৯৪ সালের ২৬ জুন তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু কোনো আন্দোলনের মৃত্যু ছিল না। বরং তিনি রেখে গেছেন এক নৈতিক দায়—স্বাধীনতার ইতিহাসকে সত্যের আলোয় তুলে ধরা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার সঙ্গে পরিচিত করা।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আমাদের চারপাশে আবারও নানা প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়। কখনো মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার চেষ্টা হয়, কখনো তাকে বিতর্কিত করার প্রয়াস দেখা যায়, আবার কখনো কোনো রাজনৈতিক শক্তি মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের একচেটিয়া সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। কিন্তু ইতিহাস তার চেয়ে অনেক বড়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অর্জন নয়; এটি ছিল সমগ্র জাতির সংগ্রাম। নেতৃত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি ছিল কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, নারী ও পুরুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগ। এই সত্যকে আড়াল করার প্রতিটি প্রয়াসই শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করে।
এই সময়ে তাই জাহানারা ইমামকে আরও বেশি মনে পড়ে। কারণ তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভালোবাসা মানে কোনো দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়; সত্য, ন্যায় এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। তিনি শিখিয়েছেন, ইতিহাসকে ভালোবাসতে হলে তাকে বিকৃত করা যায় না, আর দেশকে ভালোবাসতে হলে ভিন্নমতের মানুষের দেশপ্রেমকে অস্বীকার করা যায় না।
আজ তিনি যদি বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো আবারও বলতেন, "ইতিহাসকে হত্যা করা যায় না। সত্যকে নির্বাসনে পাঠানো যায় না।" হয়তো আবারও তরুণদের হাত ধরে তিনি দাঁড়াতেন স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা, হাজার বছরের সংস্কৃতি এবং আমাদের জাতিসত্তার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে।
শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করি শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে। ইতিহাসের পাতায় নয়, তিনি বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের মানুষের বিবেকে—যতদিন এই ভূখণ্ডে স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা উড়বে।
মন্তব্য করুন

