ছবিঃ নানা পাটেকর, অনলাইন থেকে সংগৃহীত
নানা পাটেকর প্রমাণ করে গেছেন, বড় অভিনেতা হওয়ার আগে বড় মানুষ হতে হয়
নাজমুল হাসান দারাশিকো
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১১ পিএম
আজ ভোর ৫টা ২০ মিনিটে থেমে গেল সেই সিংহগর্জন। ভারতীয় সিনেমার বাঘ, তিনবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা নানা পাটেকর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে চলে গেলেন।
অনেকেই তাকে চেনে তার রাগী চোখ, ভরাট কণ্ঠ আর তীব্র অভিনয়ের জন্য। কিন্তু আমার কাছে নানা পাটেকর মানে দুটো গল্প। একটা পর্দার, আরেকটা পর্দার বাইরের। আর দুটো গল্পই আমাদের এই বাংলাদেশের জন্য একটা আয়না।
২০০৪ সাল। একটা সিনেমা মুক্তি পেল যেখানে কোনো হিরো নেই। আছে একজন পুলিশ, সাধু আগাসে। যার কাজ অপরাধীকে গ্রেফতার করা নয়, সরাসরি কপালে গুলি করা। ৫৬টা এনকাউন্টার শেষ। সিনেমাটা দেখিয়েছিল কীভাবে পুলিশ অপরাধীকে ধরে, রাস্তায় ফেলে, পকেটে নিজের পিস্তল গুঁজে দিয়ে বলে - "পালাচ্ছিল"।
আমরা সিনেমা হিসেবে দেখেছিলাম। মুগ্ধ হয়েছিলাম নানা পাটেকরের অভিনয়ে।
কিন্তু কয়েক বছর পর সেই সিনেমাটাই আমাদের জাতীয় বাস্তবতা হয়ে গেল।
মনে আছে পিচ্চি হান্নানের কথা? শীর্ষ সন্ত্রাসী। র্যাব তাকে জীবিত গ্রেফতার করলো। পরদিন পত্রিকার হেডলাইন - ক্রসফায়ারে নিহত। তারপর আরও অনেকে। গ্রেফতার, তারপর গল্প - "অস্ত্র উদ্ধারে গেলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত"।
'আব তাক ছাপ্পান' না দেখলে হয়তো আমরাও বিশ্বাস করতাম। কিন্তু নানা পাটেকর আমাদের আগেই শিখিয়ে গিয়েছিলেন, এই গল্প কীভাবে সাজানো হয়। বুঝিয়ে গিয়েছিলেন, যখন বিচার বিভাগকে পাশ কাটিয়ে বন্দুকই বিচারক হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকে না। অপারেশন ক্লিন হার্ট থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যে শত শত বিনা বিচারে হত্যা হলো, তার প্রতিটি লাশের পেছনে ওই একই স্ক্রিপ্ট।
পর্দার নানা পাটেকর যতটা কঠিন, বাস্তবের নানা পাটেকর ততটাই নরম ছিলেন।
২০১৫ সাল। মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়া আর বিদর্ভ অঞ্চল তখন মরুভূমি। খরার পর খরা। বৃষ্টি নেই, ফসল নেই। ঋণের দায়ে একের পর এক কৃষক গলায় দড়ি দিচ্ছে। সরকার তখন পরিসংখ্যান দিচ্ছে, আর বলিউডের অন্য তারকারা তখন দুবাইয়ে ছুটি কাটাচ্ছে।
ঠিক তখন, নানা পাটেকর আর তার বন্ধু মকরন্দ অনাসপুরে মিলে একটা ফাউন্ডেশন করলেন - নাম ফাউন্ডেশন (NAAM Foundation)।
কোনো বড় প্রেস কনফারেন্স না, কোনো ফটোসেশন না। তিনি সরাসরি চলে গেলেন সেই সব গ্রামে, যেখানে কৃষক আত্মহত্যা করেছে। যে ঘরে স্বামী মারা গেছে, সেই বিধবা স্ত্রীর হাতে তিনি টাকা তুলে দিলেন। বললেন, "এটা ভিক্ষা না, এটা আপনার অধিকার।"
তার কাজ শুধু টাকা দেওয়া ছিল না। তিনি বুঝেছিলেন, এই আত্মহত্যার মূল কারণ পানি। পানি নেই বলেই ফসল নেই, ফসল নেই বলেই ঋণ। তাই তার ফাউন্ডেশন শুরু করলো পানি সংরক্ষণের কাজ - নদী খনন, পুকুর খনন, জলাধার তৈরি। হাজার হাজার গ্রামে আজ তার তৈরি করা জলাধারে পানি আছে।
তিনি সেই সব কৃষকের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিলেন, যারা বাবাকে হারিয়েছে। একবার ১.৫ কোটি টাকা দামের গাড়ি কেনার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে সেই টাকা তিনি কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
এই হলো নানা পাটেকর। পর্দায় তিনি সিস্টেমের নিষ্ঠুরতাকে উন্মোচন করেছেন, আর পর্দার বাইরে সিস্টেম যাদের ফেলে দিয়েছে, তাদের হাত ধরে টেনে তুলেছেন। সরকারের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করার সাহস তার ছিল।
এখানেই আমাদের দেশের অভিনেতাদের সাথে তার আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আমাদের অভিনেতারা সরকারি দলের অনুষ্ঠানে গিয়ে তেল মেরে একটা প্লটের জন্য নিজের বিবেক বিক্রি করে দেন। তারা জনগণের শিল্পী হতে পারেন না, তারা হয়ে যান ক্ষমতার শিল্পী। তারা কখনো কৃষকের জন্য, গুম হওয়া মানুষের জন্য, ক্রসফায়ারে মারা যাওয়া মানুষের জন্য একটা শব্দও বলেন না।
নানা পাটেকর প্রমাণ করে গেছেন, বড় অভিনেতা হওয়ার আগে বড় মানুষ হতে হয়।
আজ তিনি নেই। কিন্তু তার দুটো শিক্ষা রয়ে গেল। এক, রাষ্ট্র যখন বিচারের নামে হত্যা করে, তখন চুপ থাকবেন না। দুই, শিল্পীর আসল মঞ্চ সিনেমা হল নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
বিদায়, সাধু আগাসে। আপনার কণ্ঠটা আজীবন কানে বাজবে।
মন্তব্য করুন

