ভাস্করদা’র দিন অবসানে
ইমতিয়ার শামীম
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম
কারও মৃত্যুসংবাদ নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া যে কী কষ্টকর, ভাস্করদা চলে যাওয়ার পর আবারও সেই অসহনীয় উপলব্ধির মুখোমুখি হতে হলো। তিনি চলে গেলেন ২৮ জুনের সন্ধ্যারাতে, খবরটা আমি জানতে পারলাম, রাত ১২ টা পেরিয়ে যাওয়ার পরে, তাও লেখক মোজাফ্ফর হোসেন তার ফেসবুক পোস্টে আমাকে ট্যাগ করেছিলেন বলে। মুহূর্তে আমার মনে পড়ে গেল, চার-পাঁচ বছর আগেকার এক দুপুরের কথা যেদিন ভাস্করদা, মোজাফ্ফর হোসেন আর আমি নূরজাহান রোডের এক কফিশপে বসে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম; আশা করেছিলাম, খুব দ্রুতই নিশ্চয়ই আমরা ফের আড্ডা দেব। কিন্তু তার পর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কথাবার্তা হলেও আমাদের আর একত্রে বসা হয়নি। গত শনিবার এই ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে গেছে যে, আমাদের আর কখনোই দেখা হবে না।
বইপড়া আর লেখালেখির সুবাদে যে মানুষটির সঙ্গে পরিচয় দীর্ঘদিনের, যাঁর মাত্র এক দুপুরের সঙ্গই আমার জীবনের অব্যক্ত এক জীয়নকাঠি, সাহিত্যের জগতে অনালোচিত থাকাতেই যার লেখালেখি হয়ে উঠেছে আলোচিত, সেই মানুষটি তাঁর প্রথম জন্মদিনেই দেয়া অপরিহার্য শর্তটি পালন করেছেন; কিন্তু যেন-বা সেই শর্ত পূরণের মধ্যে দিয়েই তাঁর পুনর্জীবন ঘটেছে।
অনালোচিত ছিলেন, কিন্তু অপঠিত ছিলেন বলে মনে হয় না। ভাস্করদা—মানে ভাস্কর চৌধুরীর সেই ‘আমার বন্ধু নিরঞ্জনে’র কথা কে না জানে! এ কবিতার এই লাইনগুলো তো মনে হয় রীতিমতো দৈববাণীর মতো
‘মানুষকে এত ক্ষুদ্রার্থে নেবেন না,
মানুষ এত বড় যে,
আপনি যদি ‘মানুষ’ শব্দটি
একবার উচ্চারণ করেন
যদি অন্তর থেকে করেন উচ্চারণ
যদি বোঝেন এবং উচ্চারণ করেন ‘মানুষ’
তো আপনি কাঁদবেন।
আমি মানুষের পক্ষে,
মানুষের সঙ্গে এবং মানুষের জন্যে।’
আব্রাহাম লিংকন যেভাবে গণতন্ত্রের একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা তুলে ধরেছিলেন তাঁর ভাষণে, ভাস্কর চৌধুরীকেও দেখি এ কবিতায় মানবসত্বা সম্পর্কে একটি সর্বজনগ্রহণীয় কাব্যিক ব্যাখা উপস্থাপন করতে ‘মানুষের পক্ষে, মানুষের সঙ্গে, মানুষের জন্যে।’ সাহিত্যের সঙ্গে তিনি মানুষের সম্পৃক্ততা খুঁজেছেন, সম্পৃক্ততা চেয়েছেন, তাই তাঁর সাহিত্যতত্ত্বের আলোচনায় গিয়েও তাঁর পক্ষে লেখা সম্ভব হয়েছে এমন কথা :
‘… হালের তনু হত্যার ব্যাপারে খুব বিস্তারিত কিছু লেখা যায় না। লিমনের পা নিয়ে জোরালো সাহিত্য হয় না। কারণ সেগুলি পোষা বুদ্ধিজীবী, আমলা ও পুঁজিবাদী পুরস্কারদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে আবর্জনা হয়ে যায়। লিমন ও তনুরা একদিন সাহিত্যের পাতা থেকে হারিয়ে যায়। আসে নবাবজাদীর কিসসা কাহিনি। সেগুলো সসম্মানে গৃহীত ও পুরস্কৃত হয়।...’

যেসব বিষয় আমরা কোনওদিন জানবার প্রয়োজন বোধ করিনি আড্ডার আরও অনেক কথায় কথায়, মৃত্যুর সুবাদে ভাস্কর চৌধুরীর সেসব জানা হচ্ছে আমাদের। জানতে পারছি, তাঁর আনুষ্ঠানিক নাম ছিল আশরাফুল ইসলাম। বয়স তাঁর ৭৩ হয়ে গিয়েছিল, তিনি জন্ম নিয়েছেন ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর চাপাই নবাবগঞ্জের রাজারামপুরের ভবানীপুরে। জানতে পারছি, চল্লিশটিরও বেশি বই লিখে গেছেন তিনি। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, শেষের দিকে চলাফেরা করতে হতো হুইল চেয়ারে। কিন্তু জানতে পারছি না, একসময় এই মহানগরের সাহিত্যআড্ডার প্রাণ হয়ে ওঠার পরও ভাস্কর চৌধুরী কী করে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। অথচ এই নিঃসঙ্গতা নিয়ে বলতে গেলে ঘরেই তাকে আটকে থাকতে হলো শেষের কয়েক বছর।

উত্তরবঙ্গ যেমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত, তেমনি অবহেলিত ছিল গল্প-উপন্যাসের পটভূমি হিসেবেও। ভাস্কর চৌধুরীর বড় কৃতিত্ব, বরেন্দ্রভূমিকে তিনি তার লেখালেখির পটভূমি করে তোলার মধ্যে দিয়ে আমাদের নিয়ে গেছেন অনালোচিত জনগোষ্ঠীর কাছে, তাদের জীবনযাপনের কাছে; আমাদের তিনি দেখিয়েছেন রুক্ষ্ম হওয়ার পরও বরেন্দ্র ভূমি কত সৌন্দর্যময়। লাল মৃত্তিকাময় কালো মানুষের এই জনপদকে হাসান আজিজুল হক ও আবুবকর সিদ্দিকের পর আমাদের অনুভবের জগতে, পাঠতৃষার জগতে নিয়ে আসেন ভাস্কর চৌধুরী। অনেক বই-ই তো লিখেছেন তিনি, কিন্তু আমার মনে হয়, তাঁর সবচেয়ে বড় সুকৃতি হলো ‘ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ’ নামের উপন্যাস। একবারের সেই দেখায় তিনি নিজে বইটি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন পড়বার জন্যে। বইটি নিয়ে কিছু লিখব-লিখব করেও লেখা আর হয়ে ওঠেনি বেঁচে থাকার জন্যে অহেতুক ছোটাছুটি করা এই জীবনে। হয়তো একদিন তা লেখা হবে না, কিন্তু দুর্ভাগ্য ভাস্করদা’ তা জানতে পারবেন না। এই সুযোগে লিখে রাখি, বরেন্দ্রভূমির বিশাল পটভূমিতে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীকে নিয়ে রচিত এ উপন্যাস বারবার পাঠ করতে হবে হবে, কেবল ওই বরেন্দ্রভূমিকে চেনার জন্যে নয়, বরং আমাদের এই আবাসভূমে এক জনগোষ্ঠীর পত্তন ঘটানোর সুখদুঃখময়, সংগ্রামময়, প্রেম-জিঘাংসাময় স্রোতধারা অবলোকনের জন্যে—কথাসাহিত্যের শৈল্পিক সৌন্দর্যের সীমাহীনতা উপলব্ধির জন্যেও। জাতিসত্বা হিসেবে বিকশিত হওয়ার জন্যে আমরা রক্তপাতময় সংগ্রাম ও যুদ্ধ করেছি, কিন্তু আমাদের সাঁওতালদের সংগ্রামও কম দিনের নয়—এই জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার দীর্ঘ সংগ্রাম ও জীবনযাপনের কথাই ভাস্কর চৌধুরী বলেছেন তাঁর এ উপন্যাসে। ধনসা মাতি চিরজীবী মানুষ, প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরেরও পূর্বপুরুষ, কী রহস্যময় কারণে তিনি বেঁচে থাকেন, তা কেউ জানে না। তবে ধনসা মাতি যখন হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় তখন আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাঁওতালদের ছুটে আসতে দেখি তার কাছে; কেননা তারা জানতে পারে, তাদের এই পূর্বপুরুষ দীর্ঘজীবী মানুষ যে এখন মৃত্যুশয্যাতে, তারা তাই তার কাছে দলে দলে আসতে থাকে, নিজেদের অতীতকে জানবে বলে।

অতীতকে জানতে হবে, সত্যিকারের অতীতকে জানতে না পারলে ভবিষ্যতের দিকে এগুনো যাবে না—এমন গুরুত্বপূর্ণ কথাটি অবশ্য এখন অনেকের কাছে পছন্দ নাও হতে পারে। কিন্তু এই সূত্রেই জানিয়ে রাখি, ভাস্কর চৌধুরীর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বই ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’। স্মৃতিচারণমূলক এ গ্রন্থে শুধু তাঁর নিজের অতীতই নয়—রয়েছে বাংলাদেশেরও অতীত। ১৯৫২ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি চোখের সামনে দেখেছেন আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আন্দোলন—৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফার আন্দোলন, ১৯৬৮-৬৯ সালের গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান, দেখেছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। শুধু নিজের আশপাশের মানুষ বা জনজীবন নয়, একটি রাষ্ট্রের উত্থান ও তার পরের অস্থির এক উত্তাল সময়ের যাত্রাপথে তিনি যেসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’ তাঁর অক্ষরপাত।

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে অনেক সময়ই দেখেছি কথায় কথায় ভাস্করদা’র প্রসঙ্গ তুলতে। সাপ্তাহিক ২০০০-এ যখন মঈনুল আহসান সাহেবের সঙ্গে কাজ করেছি তখন, মনে আছে, প্রতিবারই ঈদসংখ্যার প্রস্তুতির সময় তিনি মনে করিয়ে দিতেন ভাস্করদা’র কাছ থেকে লেখা নিতে হবে। মনে আছে, আমি যে বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, বোধকরি সেই ১৯৮৪ সালেই প্রকাশ পেলো তাঁর প্রথম বই গল্পের বই রক্তপাতের ব্যাকরণ। সে বই নিয়েও তুমুল আগ্রহ দেখেছি ক্যাম্পাসের সাহিত্যপ্রেমিদের মধ্যে।
ভাস্করদার সব বই সঙ্গত কারণেই পড়া হয়ে ওঠেনি। তবে এখানে, এই লেখায় টুকে রাখতে চাই, বিভিন্ন সংবাদপত্রের সংবাদ, ফেসবুকের স্ট্যাটাস ও তাঁর বইয়ের ফ্ল্যাপের সুবাদে পাওয়া বিভিন্ন গ্রন্থের নাম। যাতে ভবিষ্যতে পড়ার চেষ্টা করতে পারি।
ভাস্কর চৌধুরীর গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, ‘রক্তপাতের ব্যাকরণ’ (১৯৮৪), ‘বাষট্টি বিঘা নদী’ (১৯৮৭), ‘কোথায় নিবাস’ (১৯৮৭), ‘পতনের সময়’ (১৯৮৮), ‘শনিবারের বৃষ্টি’ (১৯৯৯), ‘গল্পের বনসাই’ (২০১৬)।

তাঁর উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে, 'লাল মাটি কালো মানুষ’ (১৯৯৮), ‘স্বপ্নপুরুষ’ (১৯৯৮), ‘মীমাংসা পর্ব’ (১৯৯৮), ‘আষাঢ়ুর জীবনদর্শন’ (১৯৯৯), ‘ভূমি’ (২০১১), ‘কৃষ্ণপুরাণ’ (২০১১), ‘কখনও কখনও এরকম ঘটে’ (২০১২), ‘যুদ্ধে যাবার সময়’ (২০১৩), ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’ (২০১৫), ‘গন্তব্যহীন যাত্রা’ (২০১৫), ঘোরলাগা ঘোর (২০১৫), টান (২০১৫), ‘ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ’ (২০১৬), চার্জশিট (২০১৬), ময়নাবিলাস (২০২০) ‘স্বপ্নজাল’ (২০২৩)।
একাধিক কবিতার বই-ও রয়েছে ভাস্কর চৌধুরীর,—‘আমার কেবলই সমর্পণ” (১৯৮৬), ‘নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম’ (২০১২), ‘আমার ভেতরে আঁধার’ (২০১২), ‘তোর বড় কষ্ট রে’ (২০১২), ‘পরানের গহীন’ (২০১২), ‘গেরিলার মুখ’ (২০১৩), ‘আমার যতো ভালোবাসা’ (২০১৩), ‘ভোরের কবিতা’ (২০১৩), ‘আঁধার নেমে আসে’ (২০১৩), ‘এলোমেলো’ (২০১৩), কবিতা সমগ্র (২০১৫), ‘হেমন্ত কাব্য’ (২০১৬), ‘আমার মা কবি ছিলেন’ (২০১৬), ‘এ কোনো সুখের সময় নয়’ (২০১৭), ‘শব্দের সারি শব্দের বাড়ি’ (২০১৮), ‘হাফপকেটে সন্ধ্যা বুকপকেটে তুমি’ (২০১৯), ‘আইশোলেশন’ (২০২০), ‘তুমি আমার অবেলা’ (২০২১)।
একটি স্মৃতিকথা এবং দুটো গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের বইও রয়েছে তাঁর,—‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’ (২০১৫) ‘সাহিত্য তত্ত্ব ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ (২০১৯) এবং ‘সাহিত্য প্রসঙ্গ’ (২০২৩)।

আমি যখন ‘গোপন রাজনীতির গল্প’ সম্পাদনা করছি, তখন একাধিকবার কথা হয়েছে তাঁর সঙ্গে, প্রতিবারই আমরা আশা করেছি, অচিরেই দেখা হবে; কিন্তু তা তো আর হলো না। হয়তো এই দীর্ঘ তালিকার সব বই-ও কোনওদিন পড়া হবে না। কিন্তু আমরা যে আশা প্রকাশ করি, সে-ও তো এক বড় ব্যাপার। আমি পড়তে পারি বা না পারি, নতুন যুগের, নতুন সময়ের পড়ুয়ারা নিশ্চয়ই এ তালিকা ধরে সব বই পড়ে ফেলবে, ভাস্করদা। আমি নিজে বরং আরেকবার আপনার সেই মাকে নিয়ে লেখা ‘আমার মা’ কবিতাটি মনে করি :
‘আমার মা কবি ছিলেন
তিনি আমায় আঁধার রাতে ফুটিয়েছিলেন
তিনি এমন করে ফুল ফোটাতেন
তিনি আমায় ধানের মাঠে ছায়ায় চলা দেখিয়ে বলেছিলেন
ঐ দ্যাখ রোদ্রে মেঘগুলো মাটিতে ভাসে ।
জলে ভাসে
ধানের উপর দিয়ে ছায়া উড়ে যায়
কিশোরী কলায়
আমার মা আমাকে আগুনের ছায়া চিনিয়েছিলেন
আগুনের আঁচে
তিনি আমায় ধান সিদ্ধ শেখালেন
তিনি ধান থেকে ঢেঁকির ছন্দে ধান ও তুষ আলাদা করলেন
আমার মা চাল বানালেন
ভাত ফোটালেন
সাদা বেলী কুঁড়ির মতো ভাতে সালুন দিলেন
আমার মা আম থেকে আচার বানাতে পারতেন।’
এই কবিতা পড়তে পড়তে আমরা আমাদের নিজেদের শ্রমময়ী শ্রমজীবী মা’কে খুঁজে পাই—আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত করে তুলতে, বিত্তসন্ধানী মধ্যবিত্ত করে তুলতে যাকে জীবনের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে ফেলতে হয়। ভাস্কর চৌধুরী তাকে চিনতে পেরেছিলেন, চিনতে পারার উদ্ভাসনে আমাদেরও উদ্ভাসিত করেছেন; চলে গেলেও তিনি রয়েছেন আমাদের হৃদয়ের নিতল নীল গহীনে।
১৬ আষাঢ় ১৪৩৩, ৩০ জুন ২০২৬ মঙ্গলবার
মন্তব্য করুন

