Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

শহীদুল জহিরের গল্প ‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’

শিল্প-সংস্কৃতি

গল্প আলোচনা

শহীদুল জহিরের গল্প ‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’

Icon

মহসিনুল হক

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারায় শহীদুল জহির এমন এক কথাশিল্পী যিনি বাস্তবতা ও অবাস্তবতার সূক্ষ্ম সীমারেখাকে ভেঙে মানুষের জীবন,স্মৃতি ও ইতিহাসকে এক অনন্য ভাষায় প্রকাশ করেছেন। “মহল্লায় বান্দর,আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা” গল্পটি তার সেই স্বতন্ত্র শিল্পরীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এই গল্পটি পড়লে মনে হয় যেন আমরা শুধু একটি কাহিনী পড়ছি না। বরং একটি জীবন্ত মহল্লার ভেতর দিয়ে হাঁটছি। মানুষের কথা শুনছি। তাদের ভয়, বিভ্রান্তি, হাসি, কান্না— সবকিছু খুব কাছ থেকে অনুভব করছি।

গল্পটির গঠনশৈলী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে কোনো সরলরৈখিক বর্ণনা নেই। বরং স্মৃতি, গুজব, কথোপকথন এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমন্বয়ে একটি জটিল কিন্তু জীবন্ত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। মহল্লার লোকেরা যেমনভাবে ঘটনাগুলো মনে করে-এবং বলে,পরে আবার ভুলে যায়— গল্পটিও ঠিক তেমনভাবেই এগোয়। এই ভাঙা-গড়া বয়ানের ভেতর দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন যে- ইতিহাস কখনো সরল নয়। এটি মানুষের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তৈরি এক বহুমাত্রিক নির্মাণ।

গল্পের অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রতীক হলো ‘বানর’। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ প্রাণী। কিন্তু গল্পের গভীরে গেলে বোঝা যায়— এটি কেবল প্রাণী নয়। রূপক অর্থে গল্পে এটি আনা হয়েছে।বানরের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতিতার রহস্যময় আচরণ জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যাওয়া— এসব যেন মানুষের অচেতন মন বা অজানা ভয় এবং বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার প্রতিফলন। মহল্লার লোকেরা যখন জিনিস হারায় তখন তারা প্রথমে মানুষকে সন্দেহ করে। কাজের লোক,গরিব মানুষকে সন্দেহ করা হয়। কিন্তু পরে যখন বোঝা যায় যে- বানরই এসব করেছে তখন তাদের ভুল ধারণা প্রকাশ পায়। এখানে লেখক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সামাজিক পূর্বধারণা ও শ্রেণিগত অবিশ্বাসের সমালোচনা করেছেন।

এই গল্পের পটভূমিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ অত্যন্ত গভীরভাবে কাজ করে। কিন্তু লেখক যুদ্ধকে সরাসরি বর্ণনা করেননি।বরং যুদ্ধের অভিঘাত মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা দেখিয়েছেন। রাতের কারফিউ, গুলির শব্দ,আগুনের লেলিহান শিখা,মানুষের আতঙ্ক— এসব বর্ণনা গল্পটিকে এক ভীতিকর অথচ বাস্তব আবহ দেয়। বিশেষ করে জিঞ্জিরার ঘটনাগুলো— যেখানে মৃত্যু, নির্যাতন এবং অনিশ্চয়তা একসঙ্গে মিশে যায়— তা পাঠকের মনে গভীর দাগ ফেলে।

আব্দুল হালিম চরিত্রটি এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হলেও তিনি একেবারেই নীরব এবং সংযত। তার ভেতরের অনুভূতি সরাসরি প্রকাশ পায় না। কিন্তু তার কাজ ও আচরণের মাধ্যমে আমরা তার গভীর মানবিকতা উপলব্ধি করি। ঝর্ণার প্রতি তার অনুরাগ তাকে নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং পরবর্তীতে তার চুলের ফিতা স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করা— এসব তার সংবেদনশীলতা ও ভালোবাসার প্রমাণ। সে যেন সেইসব অসংখ্য তরুণের প্রতিনিধি। যারা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নামহীন থেকে যায়।কিন্তু তাদের অনুভূতি ও ত্যাগ মানবিকতার এক চিরন্তন নিদর্শন হয়ে থাকে।

ঝর্ণা চরিত্রটি গল্পে সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও তার উপস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী। তার সম্ভাব্য পরিণতি— যা কখনো নিশ্চিতভাবে বলা হয় না— গল্পটিকে এক গভীর ট্র্যাজিক মাত্রা দেয়। এই অনিশ্চয়তাই গল্পের শক্তি। কারণ এটি পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে আর কল্পনা করতে বাধ্য করে এবং সেই সময়ের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ঝর্ণা এখানে শুধু একটি চরিত্র নয়। সে সেইসব অসংখ্য নারীর প্রতীক। যারা যুদ্ধের সময় ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।

আমেনা বেগমের চরিত্র গল্পটির আবেগঘন কেন্দ্র। একজন মায়ের নিঃশব্দ কষ্ট তার সন্তানের জন্য অপেক্ষা এবং তার স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা— এসব অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে ফুটে উঠেছে। লাল ফিতাটি এখানে একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে কাজ করে। এটি শুধু ঝর্ণার স্মৃতি নয়। এটি আব্দুল হালিমের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ এবং আমেনা বেগমের মাতৃত্বের এক গভীর চিহ্ন। এই ফিতাকে যত্ন করে রেখে দেওয়া ভবিষ্যতের এক আশায় তা সংরক্ষণ করা— এসবের মধ্যে এক ধরনের নীরব ভালোবাসা ও আশাবাদ লুকিয়ে আছে।

মহল্লার লোকজন এই গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তারা একদিকে সাধারণ মানুষ— তাদের ছোট ছোট চিন্তা,আড্ডা,গুজব,হাসি— সবকিছু খুব পরিচিত। কিন্তু অন্যদিকে তাদের আচরণের মধ্য দিয়ে সমাজের গভীর বাস্তবতা প্রকাশ পায়। তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। ভুল করে। আবার সেই ভুল বুঝতেও পারে। তাদের এই মানবিক দুর্বলতাই গল্পটিকে বাস্তবসম্মত করে তোলে। একই সঙ্গে তাদের সম্মিলিত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা গল্পটিকে একটি সামাজিক দলিলের রূপ দেয়।

গল্পটির ভাষা ও শৈলীও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কথ্য ভাষার ব্যবহার, আঞ্চলিক টান এবং সংলাপভিত্তিক বর্ণনা গল্পটিকে জীবন্ত করে তুলেছে। মনে হয় যেন আমরা নিজেরাই সেই মহল্লার একজন বাসিন্দা। সবকিছু চোখের সামনে দেখছি। এই ভাষা শুধু গল্প বলার মাধ্যম নয়।এটি একটি পরিবেশ,একটি সংস্কৃতি,একটি সময়কে ধারণ করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এই গল্পটি আমাদের বাস্তবতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। আমরা অনেক সময় ঘটনাকে সরলভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই।কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে চাই অথবা সত্যকে এড়িয়ে যেতে চাই। কিন্তু এই গল্প দেখায় যে- সত্য অনেক জটিল এবং তা বুঝতে হলে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।অনুভব করতে হবে।

শহীদুল জহিরের ‘মহল্লায় বান্দর,আব্দুল হালিমের মা এবং আমরা’ একটি ছোট গল্প হলেও এটি বহুমাত্রিক সাহিত্যকর্ম। যেখানে ইতিহাস, স্মৃতি, প্রতীক এবং মানবিকতা একসঙ্গে মিশে গেছে। গল্পকার আমাদের কেবল অতীতের কথা মনে করিয়ে দেন না। একই সাথে এই গল্প বর্তমানকে বোঝার এবং ভবিষ্যতে সচেতন হওয়ার শিক্ষা দেয়। লেখক খুব সচেতনভাবে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন— মানুষের জীবনে যতই অন্ধকার নেমে আসুক না কেন তার ভেতরেও কিছু মানুষের ভালোবাসা,স্মৃতি এবং সহমর্মিতা কখনো সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ হয়ে যায় না। এই মানবিক আলোই আমাদের এগিয়ে যেতে শক্তি দেয়।এবং তা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।

মহসিনুল হক: প্রবন্ধকার এবং গ্রন্থ সমালোচক

মন্তব্য করুন

Logo