Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

মঞ্চে ঐতিহাসিক নাটক—নবাব সিরাজউদ্দৌলা

নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন নাট্যকার ও নির্দেশক নজরুল সৈয়দ

শিল্প-সংস্কৃতি

মঞ্চে ঐতিহাসিক নাটক—নবাব সিরাজউদ্দৌলা

Icon

মহসিনুল হক

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম

২৩ জুন। বাংলার ইতিহাসে এই তারিখটি কেবল একটি দিন নয়! এটি একটি দীর্ঘশ্বাস, একটি রক্তক্ষরণ, একটি জাতির অন্তরের গভীরে গেঁথে থাকা অপূরণীয় ক্ষত! ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর প্রান্তরে যা ঘটেছিল তা কোনো সাধারণ যুদ্ধের পরাজয় ছিল না। ছিল একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের নির্মম পরিণতি! যেখানে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল এই ভূখণ্ডেরই কিছু বিশ্বাসঘাতক-দেশদ্রোহী। সেই পরাজয়ের ২৬৯ বছর পর ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও যখন আমরা সেই অধ্যায়ের কথা ভাবি তখন বুকের ভেতরে একটি দীর্ঘ হাহাকার জেগে ওঠে!

এই হাহাকারকেই শিল্পের ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন নাট্যকার ও নির্দেশক নজরুল সৈয়দ। রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Tagore University of Creative Arts) থিয়েটার বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় গত ১৯ জুন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হয়েছে তাঁর রচিত ও নির্দেশিত মঞ্চনাটক 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা'।এই নাটকটি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমি বলতে চাই—এটি নিছক একটি ঐতিহাসিক নাটকের মঞ্চায়ন ছিল না! এটি ছিল একটি জাতির আত্মদর্শন, একটি সতর্কবার্তা এবং সর্বোপরি একটি শিল্পিত প্রতিরোধের ঘোষণা। 

ছবি ১ নাটকের  একটি দৃশ্য

নাটকটির যথার্থ মূল্যায়নের আগে ইতিহাসের পাতায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রকৃত পরিচয়টি আরেকবার স্মরণ করা দরকার। কারণ দীর্ঘকাল ধরে উপনিবেশবাদী শক্তি এবং তাদের এদেশীয় দোসররা মিলে এই মহান শাসকের ভাবমূর্তি কলুষিত করার জন্য নিরলস অপপ্রচার চালিয়ে গেছে।

অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ 'সিরাজদ্দৌলা'য় লিখেছেন যে, ‘সিংহাসনে আরোহণের পর সিরাজউদ্দৌলা তাঁর মাতামহ আলিবর্দি খানের অনুরোধে কোরআন স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—তিনি আর কোনো দিন মদ্যপান করবেন না। এই প্রতিজ্ঞা তিনি আমৃত্যু রক্ষা করেছিলেন। এমনকি তাঁর শত্রুপক্ষের ইংরেজরাও এই সত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। এই একটি তথ্যই প্রমাণ করে যে সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে যে অসংযমী, বিলাসী এবং দুশ্চরিত্র শাসকের যে মিথ্যা গল্প ছড়ানো হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার [সূত্র: গ্রন্থ 'সিরাজদ্দৌলা' অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় রচিত, দিব্য প্রকাশ, ঢাকা-২০০৩, পৃষ্ঠা ২০৪]।

ইতিহাসবিদ সিরাজুল ইসলাম তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাঁর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে (১৭৫৬-১৭৫৭) বাংলার অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সদা সচেষ্ট ছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবৈধ বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়ার বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ আক্রমণের পেছনে ছিল কোম্পানির চুক্তি লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়া। এটি কখনোই ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ছিলনা।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ নিখিলনাথ রায় তাঁর 'মুর্শিদাবাদ কাহিনী' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর দায়বোধ অনুভব করতেন। তিনি কৃষক ও তাঁতিদের উপর অত্যধিক করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ পি. জে. মার্শালের গবেষণায় স্বীকার করা হয়েছে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল তার অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলাই ছিলেন ভারত উপমহাদেশের প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধের নেতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে- কোম্পানির বাণিজ্যিক উপস্থিতি ক্রমশ রাজনৈতিক আধিপত্যে রূপ নিচ্ছে। 

এছাড়াও বিশ্বের বিখ্যাত বিভিন্ন লেখকের রচনায় পলাশীর যুদ্ধকে একটি 'প্রতারণার যুদ্ধ' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যার মাধ্যমে এটা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে যে- সিরাজউদ্দৌলা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলেন, পরাজিত হননি।

রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর 'History of Bengal' গ্রন্থে লিখেছেন, সিরাজউদ্দৌলার মধ্যে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার একটি গভীর তাড়না ছিল। তিনি বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে বাংলাকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টাই তাঁকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রধান শত্রুতে পরিণত করেছিল।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় আসলে ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতার ফলাফল। মীর জাফর ও তার সহযোগীরা যুদ্ধের মাঠে সৈন্য মোতায়েন করে নিষ্ক্রিয় থেকেছিলেন। এটি কোনো সামরিক পরাজয় ছিল না, ছিল ষড়যন্ত্রমূলক আত্মসমর্পণ।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ কালিকা-রঞ্জন কানুনগো তাঁর 'Dupleix' গ্রন্থে লিখেছেন যে সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন একজন তরুণ, উৎসাহী এবং স্বাধীনতামনস্ক শাসক। যিনি তাঁর রাজ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপোস করতে রাজি ছিলেন না। তাঁর প্রধান 'দোষ' ছিল এটাই যে তিনি বিদেশি বণিকদের নিজ ভূখণ্ডে দুর্গ নির্মাণ ও অবৈধ ব্যণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিতে অস্বীকার করেছিলেন।

নজরুল সৈয়দ 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা' নাটকটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার মঞ্চ-পুনর্নির্মাণ নয়!এটি একটি সুগভীর শিল্পিত কারুকাজ। যেখানে অতীত ও বর্তমান একই সুতোয় বাঁধা পড়েছে।

ছবি ২ নাটকের  একটি দৃশ্য

নাটকের শুরুতেই নির্দেশক যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তা একটি সাধারণ ভূমিকার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এই নাটক ইতিহাসের 'অবিকল পুনর্নির্মাণ' নয়!এটি একটি 'আবহ', একটি 'অনুভূতি', একটি 'হাহাকার'। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাসের অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বস্ত থেকে নাটক রচনা করা যতটা কঠিন, তার চেয়ে বেশি কঠিন হলো ইতিহাসের আত্মাকে ধারণ করে বর্তমানের সঙ্গে তাকে সংযুক্ত করা। নজরুল সৈয়দ সেই কঠিনতর পথটিই বেছে নিয়েছেন এবং সাফল্যের সাথে পার হয়েছেন।

তাঁর এই পদ্ধতি ব্রেখটীয় এপিক থিয়েটারের কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে দর্শককে শুধু আবেগময় অভিজ্ঞতা দেওয়া নয় বরং তাঁকে চিন্তা করতে বাধ্য করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। একজন সচেতন দর্শক হিসেবে এই নাটক দেখার সময় বারবার মনে হয়েছে যে- মঞ্চের ঘটনা শুধু ১৭৫৭ সালে সীমাবদ্ধ নয়! তা আমাদের সময়ের কথাও বলছে।

সিরাজউদ্দৌলার চরিত্র এই প্রযোজনায় বহুমাত্রিক। সিরাজউদ্দৌলাকে কেবল একজন বীর নায়ক হিসেবে নয়-একইসঙ্গে তাঁকে একজন প্রজা বান্ধব, মানবিক, আবেগপ্রবণ আবার কখনো কখনো অসহায় তরুণ শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যিনি আসলে চারদিক থেকে ষড়যন্ত্রে ঘেরা। এই বহুমাত্রিকতাই চরিত্রটিকে মহৎ করে তোলে। কারণ মানবিক দুর্বলতাসহ একজন মানুষ যখন মহৎ উদ্দেশ্যে লড়াই করেন এবং পরাজিত হন তখন সেই ট্র্যাজেডি আরও গভীর হয়। নজরুল সৈয়দের ধীরস্থির অভিনয় চরিত্রটির সাথে বেশ মানানসই বলেই বিষয়টি চোখে পড়েছে। তবে তিনি যদি শুধু নির্দেশনার সাথে এবং নাটক রচনার সাথে থাকেন তবে ভবিষ্যতে দর্শকরা তাঁর কাছে থেকে অনেক অনেক ভালো নাটক উপহার পাবেন।

রবার্ট ক্লাইভের চরিত্র এই প্রযোজনার একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ক্লাইভকে এখানে প্রচলিত ভিলেনের ছাঁচে না ফেলে বরং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির একটি সুচতুর ও হিসেবি প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যে অভিনেতা এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি এতটাই বিশ্বাসযোগ্যভাবে ক্লাইভের নিষ্ঠুরতা ও ধূর্ততা ফুটিয়ে তুলেছেন যে- দর্শকরা তাঁর প্রতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘৃণা প্রদর্শন করেছেন। এটি একটি অভূতপূর্ব অভিনয়শিল্পের দৃষ্টান্ত। একজন অভিনেতার পক্ষে দর্শকের মধ্যে এতটা তীব্র আবেগীয় প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তোলা সত্যিই অসাধারণ কৃতিত্বের। এই চরিত্রটি দেখিয়ে দেয় যে- বিশ্বাসঘাতকতা কখনো শুধু একজনের কাজ নয়!এটি একটি চেইন রিঅ্যাকশন। যেখানে লোভ, ক্ষমতার মোহ ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা একসঙ্গে কাজ করে। আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই চরিত্রগুলো অবিশ্বাস্যরকম প্রাসঙ্গিক।

এই নাটকের সবচেয়ে উদ্ভাবনী দিক হলো সিরাজ ও লুৎফার কথোপকথনের মাধ্যমে বর্তমান সময়ের উপাদান যুক্ত করা। এই কৌশলটি আপাতদৃষ্টিতে অনৈতিহাসিক মনে হলেও নাট্যশিল্পের বিচারে এটি অত্যন্ত মেধাবী একটি পদক্ষেপ। নাট্যকার বোঝাতে চেয়েছেন যে- মানুষের আবেগীয় ও রাজনৈতিক চরিত্র আড়াই শতাব্দীতে বদলায়নি। সুবিধাবাদ, লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা এবং সাম্রাজ্যবাদের মুখে নতি স্বীকার- এই প্রবণতাগুলো মানব সমাজের এক চিরন্তন দুর্বলতা। 

এই মিশ্রণ-কৌশল পিটার ব্রুকের 'মহাভারত'-এর নাট্যরূপকের কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে প্রাচীন আখ্যানকে সমসাময়িক প্রেক্ষিতে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সৈয়দ নজরুলের এই পদ্ধতি প্রমাণ করে যে- তিনি কেবল একজন ইতিহাস-বর্ণনাকারী নন- তিনি একজন সত্যিকার নাট্যশিল্পী। যিনি শিল্পকে সামাজিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে জানেন।

নাটকের শুরুতে আবহসঙ্গীতের সঙ্গে নির্দেশকের বক্তব্য পরিবেশনের যে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে তা দর্শকদের মানসিকভাবে নাটকের জন্য প্রস্তুত করার একটি চমৎকার উপায়। এই প্রারম্ভিক মুহূর্তটি একটি 'ওভারচার'-এর ভূমিকা পালন করেছে। যেখানে সঙ্গীত ও কথা একসঙ্গে দর্শকের হৃদয়ে নাটকের কেন্দ্রীয় আবেগটি প্রতিষ্ঠিত করেছে। শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলের সীমাবদ্ধ পরিসরেও এই পরিবেশটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

একটি মঞ্চ নাটকের সত্যিকারের সাফল্য পরিমাপ করা হয় দর্শকের প্রতিক্রিয়ায়। এই বিচারে 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা' নাটকটি অসাধারণভাবে সফল। হল কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। অনেক দর্শক দাঁড়িয়ে থেকে গভীর মনোযোগে নাটকটি অনুভব করেছেন। নির্দেশকের প্রারম্ভিক বক্তব্যে দর্শকরা আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। রবার্ট ক্লাইভের চরিত্রে অভিনয়কারীর প্রতি দর্শকরা স্বতঃস্ফূর্ত ঘৃণা প্রদর্শন করেছেন।

এই প্রতিক্রিয়াগুলো প্রমাণ করে যে নাটকটি কেবল বিনোদন প্রদান করেনি।এটি দর্শকের মনে ও হৃদয়ে একটি গভীর নাড়া দিয়েছে। একটি নাটক যখন দর্শককে নিষ্ক্রিয় দর্শক থেকে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীতে রূপান্তরিত করে তখনই সেটি শিল্পের সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায়। এই নাটক সেই মাত্রা স্পর্শ করেছে।

নজরুল সৈয়দ তাঁর নাটকে যে প্রশ্নটি তুলেছেন ‘একটি জাতি কীভাবে নিজের ভেতর থেকেই নিজের পতনের শেকড় তৈরি করে’—এটি আজকের বিশ্বপ্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি একটি প্রশ্ন।

ছবি ৩ নাটকের  একটি দৃশ্য

আজকের নব্য-উপনিবেশবাদ কামান-বন্দুকে আসে না। আসে অর্থনৈতিক নির্ভরতার শৃঙ্খলে, সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বেসাতিতে, তথ্য ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম কৌশলে এবং প্রযুক্তি ও বাজারের একচেটিয়া দখলে। এই সত্যটি নাট্যকার অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তাঁর নাটকে উচ্চারণ করেছেন।

আজকের মীরজাফরেরা পোশাক পরিবর্তন করে নতুন নামে হাজির। আজকের পলাশীর ষড়যন্ত্র হয় নব্য সৃষ্ট নতুন নতুন কাশিমবাজার কুঠিতে, বোর্ডরুমে, মিডিয়া হাউসে। এই সংযোগটি দর্শকের মনে তৈরি করতে পারা এই নাটকের সবচেয়ে বড় অর্জন।

রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার বিভাগের এই তরুণ শিক্ষার্থীরা এমন একটি মহাকাব্যিক ও সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন- যা একজন পরিণত অভিনয়শিল্পীর জন্যও চ্যালেঞ্জিং। তবুও তাঁরা যে গভীর নিষ্ঠা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে এই নাটকটি পরিবেশন করেছেন তা প্রশংসার দাবিদার। তরুণ প্রজন্মের এই উদ্যম ও সৃজনশীলতা বাংলাদেশের থিয়েটার আন্দোলনের ভবিষ্যৎকে আশাব্যঞ্জক করে তোলে।

একটি নাটকের প্রকৃত সমালোচনা কেবল প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকলে নির্মাতার কোনো উপকার হয় না। তাই এই আলোচনায় কিছু গঠনমূলক পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করা প্রয়োজন। যা পরবর্তী মঞ্চায়নকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

এক. ক্লাইভের একটি সংলাপ দুইবার আসার বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে। মঞ্চনাটকে সংলাপের প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত মূল্যবান এবং ইচ্ছাকৃত পুনরাবৃত্তি না হলে এটি দর্শকের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করে। পরবর্তী মঞ্চায়নে এই সমস্যাটি সংশোধন করা উচিত।

দুই. লুৎফার এবং ঘসেটি বেগমের মতো শক্তিশালী নারী চরিত্রগুলো পলাশীর ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যৎ মঞ্চায়নে এই চরিত্রগুলোকে আরও বিস্তৃত পরিসরে এবং গভীরভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ রয়েছে।

তিন. স্টুডিও থিয়েটারের সীমাবদ্ধ পরিসরে নাট্যকার আলো ও শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে নাটকের দৃশ্যগুলো আরও নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন। বিশেষত পলাশীর যুদ্ধের দৃশ্যে আলো-আঁধারির খেলা এবং ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসা আলোর মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার অস্তমিত হওয়ার রূপক তৈরি করা যেতে পারতো।

ছবি ৪ নাটকের  একটি দৃশ্য

চার. মোহনলাল, মীর মদন, রায় দুর্লভ প্রমুখ চরিত্রগুলো ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মীর মদন ও মোহনলালের মতো বিশ্বস্ত সেনাপতিরা শেষ পর্যন্ত সিরাজের পক্ষে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছিলেন। এই চরিত্রগুলো পরবর্তী মঞ্চায়নে যুক্ত করা হলে নাটকটি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

পাঁচ. পোস্ট-শো ডিসকাশন বা 'টকব্যাক' সেশনের ব্যবস্থায় দর্শকদের অংশগ্রহন থাকলে দর্শক নাটক শেষে তাঁদের অনুভূতি ও প্রশ্ন নাট্যদলের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি ভাগ করে নিতে পারতেন। এটি নাটকের সামাজিক প্রভাবকে আরও বিস্তৃত করত।

ছয়. পরবর্তীতে নাটক চলাকালে হলের বাইরে বা লবিতে সিরাজউদ্দৌলা সংক্রান্ত প্রামাণিক ঐতিহাসিক গ্রন্থের একটি ছোট প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটি দর্শকদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানবার বিষয়কে আরও সমৃদ্ধ করত।

সাত. মঞ্চনাটকে সংগীতের ব্যবহার একটি অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য অংশ। পলাশী-পূর্ববর্তী ও পলাশী-পরবর্তী দৃশ্যগুলোতে সংগীতের মেজাজে স্পষ্ট পার্থক্য রাখলে দর্শক মানসিকভাবে দৃশ্যের পরিবর্তন আরও গভীরভাবে অনুভব করতে পারবেন।

বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে এর আগেও নাটক হয়েছে। সিকান্দার আবু জাফরের বিখ্যাত নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' বাংলাদেশের থিয়েটারের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তবে সৈয়দ নজরুলের এই প্রযোজনা একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এটি কেবল অতীতের দিকে তাকায় না। ববং তা বর্তমানের দিকেও আঙুল তোলে।

আজকের বাংলাদেশে যখন নানা ধরনের বৈদেশিক বাণিজ্যে মন্দাসহ অর্থনৈতিক এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা বিরাজ করছে ঠিক তখনই এই নাটকটি মঞ্চে আসা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পলাশীর শিক্ষা কেবল ইতিহাসের পাঠ্যক্রমের অংশ নয়- এটি প্রতিটি প্রজন্মের জন্য নতুনভাবে আত্মস্থ করার বিষয়।

নাট্যকার নজরুল সৈয়দ বলেছেন- তিনি দর্শকের সামনে একটি আয়না তুলে ধরতে চেয়েছেন। সেই আয়নায় পলাশীর প্রান্তর এবং আমাদের বর্তমান সময় একে অপরের প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে।এই আয়না তোলার কাজটি তিনি সফলভাবে করেছেন।

ছবি ৫ নাটকের  একটি দৃশ্য

আমি দেখেছি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে সেদিন যে দর্শক বসেছিলেন- তাঁরা কেউই নাটক শেষে নির্লিপ্ত মনে বাড়ি ফিরতে পারেননি। প্রত্যেকের বুকে একটি প্রশ্ন নিয়ে গেছেন- আমরা কি আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেব! নাকি বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করব?

রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা এই মহাকাব্যিক আখ্যানকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলেছেন। তাঁদের গভীর নিষ্ঠা ও প্রত্যয় বাংলাদেশের থিয়েটার আন্দোলনের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। নজরুলের নির্দেশনায় তাঁরা যে নাটক উপস্থাপন করেছেন- তা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মঞ্চ প্রদর্শনী বা পরীক্ষা পাশের সাথে যুক্ত কোনো বিষয় ছিলনা। এটিকে একটি জাতির বিবেককে জাগিয়ে তোলার শিল্পিত প্রয়াস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পলাশীর প্রান্তরে সেদিন যে আলো নিভে গিয়েছিল- ২৬৯ বছর পরে এই নাটক সেই আলোকে নতুনভাবে প্রজ্বালিত করেছে। মঞ্চের আলো-আঁধারিতে সিরাজউদ্দৌলার এই পুনর্জন্ম শুধু একটি নাটকের মঞ্চায়ন নয়- এটি ইতিহাসের কাছে একটি জাতির দায়মোচনের প্রতিশ্রুতি।

এই আলোচনা একজন সাধারণ দর্শকের হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত অনুভূতি ও নাট্য-বিশ্লেষণের ফসল। নাট্যকার ও নির্দেশক নজরুল সৈয়দ এবং রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী-শিল্পীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাই এই অসাধারণ প্রযোজনার জন্য।

মন্তব্য করুন

Logo