Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

‘রইদ’-এ পুড়ছে দর্শক হৃদয়

এবারের ঈদে দর্শক ও বোদ্ধা উভয় শ্রেণিরই মনযোগ আকর্ষন করেছে। ছবি: সংগৃহীত

শিল্প-সংস্কৃতি

‘রইদ’-এ পুড়ছে দর্শক হৃদয়

Icon

জাহিদ হোসেন, শ্রাবন্তী দত্ত ও ফিরোজ আহমেদ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০১:১৬ পিএম

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে সবচেয়ে চর্চিত বিষয় মেসবাউর রহমান সুমন পরিচালিত সিনেমা ‘রইদ’। সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই দর্শক, সমালোচক এবং চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা, পর্যালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর স্টোরিটেলিং, অভিনয়, কারিগরি—সবকিছুই এখন আলোচনার বিষয়। সামাজিক মাধ্যমগুলো পুড়ছে ‘রইদ’ উত্তাপে। নানা বয়স, শ্রেণি, পেশার দর্শক ‘রইদ’ দেখে তুলে ধরছেন তাদের অনুভূতি ও বিশ্লেষণ। নিচে তেমনি তিন ‘রইদ’ দর্শক জাহিদ হোসেন, শ্রাবন্তী দত্ত ও ফিরোজ আহমেদের লেখা পাঠকের জন্য সংকলন করা হলো।
 
তিনটি কারনে ‘রইদ’ দেখা দরকার: জাহিদ হোসেন
 
আসলেই কি 'রইদ' খুব উচ্চমার্গীয়, সাধারণের বোধবুদ্ধির বাইরে? নাকি আমার মত একজন আম-দর্শকও এই সিনেমা দেখে খুশি মনে হল থেকে বের হতে পারবে?  
 
রিভিউগুলোতে দেখলাম অনেকে ইহুদি পুরাণ ও লোককাহিনীর চরিত্র লিলিথ বা ভার্জিন মেরি বা ইভের সাথে সাধুর বউয়ের মিল পেয়েছেন। দর্শকের স্বাধীনতা অসীম। তারা অনেক কিছুর সাথেই অনেক কিছুর মিল পেতে পারেন। কিন্তু আমি যে লিলিথকে জানি, তার সাথে সাধুর বউয়ের মিল নেই। আমার জানা  লিলিথ নিজেকে আদমের সমান মনে করতেন। তাই যৌনমিলনের সময় নিচে শুতে অস্বীকার করেন। প্রতিবাদের এক পর্যায়ে ইডেন গার্ডেন ত্যাগ করে চলে যান এবং পিশাচ ও ডাইনি হয়ে ওঠেন।  
 
‘রইদে’ও সাধুর বউকে যৌনমিলনে অসম্মত দেখা যায় বটে কিন্তু তা সমতার দাবিতে নয়। বস্তুত ঐ রাতে সাধু যেমন তীব্র কামনাকাতর ছিল তাতে বউ ‘বিপরীত বিহার’ করতে চাইলে সে রাজি হতো। সতার মেল শোভেনিজম আহত হতো না। সুতরাং অণ্ডকোষে লাথি মেরে মিলনোদ্যত সাধুকে প্রত্যাখ্যান করার কারণ আর যাই হোক, সমতা প্রতিষ্ঠা নয়। বরং সাধুর প্রতি স্পষ্ট বার্তা, ‘আমার যোনীতে প্রবেশের যোগ্যতা তোমার হয়নি এখনও।‘
 
এছাড়া, সাধুর বউকে কখনই অশুভ আত্মা বা ডাইনি হিসাবেও মনে করার কোন কারণ ঘটে না। চরিত্রটি বরং অজস্র বুলিঙের শিকার নিরীহ ছেলেমানুষীতে ভরা এক দুঃখী নারীর। যে এমনই সরল যে তরকারিতে লবন বেশি হলে নিজের আর স্বামীর উভয়ের খাবারে পানি ঢেলে লবন হালকা করে নেয়, লবন-ঝাল ছাড়া তালের পিঠা বানানো যায় বলে স্বস্তি প্রকাশ করে, ‘আমার মাছেরা পেট ভরে খাবে’ ভেবে সব ফিশফিড একবারে পানিতে ঢেলে দেয়। সুতরাং লিলিথের সাথে সাধুর বউয়ের মিল একটা কষ্টকল্পনা বলেই আমার মনে হয়েছে।    
 
সাধুর সাথে তার যৌনমিলন হয়নি, তাহলে গর্ভের সন্তান কার - এই প্রশ্নের জবাবে সে বলে “আল্লাহ দিয়েছে।” এই কারণেই কেউ কেউ  ভার্জিন মেরি বা মরিয়মের সাথে তার মিল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন একজন ভালনারেবল মেয়ে, স্বামী যাকে ফেলে আসে বারবার, গ্রামের বাচ্চারা যাকে নিত্য ত্যক্ত করে, নারীরা যাকে চোর বলে হেনস্থা করে, লোকে যার ঘরে আগুন দেয়, এমনও তো হতে পারে, তার গর্ভের দায় সে ‘আল্লাহ দিয়েছে’ বলে এই সমাজ এই দেশ আর এই ‘অবিচারের ঈশ্বর-ব্যবস্থা’র উপরেই দিতে চেয়েছে। আমি বরং এখানে সাধুর বউয়ের সাথে হর্ষ দত্তের উপন্যাসের ময়ূরাক্ষীর মিল পাই। বাংলা সাহিত্যে ময়ূরাক্ষী যা করেছে তা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব, বাংলা সিনেমায় সাধুর বউ যা করেছে সেও তার পক্ষেই সম্ভব। স্ফিত তলপেট তার দায় নয়, দ্রোহ।
 
পুরাণ ও লোককথায় ষাঁড় হলো অকৃত্রিম পৌরুষ আর কৃষিপ্রাচুর্যের প্রতীক। ষাঁড়ের পুরুষাঙ্গটি প্রকৃতি ও সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখা ‘প্রাণশক্তি’। সিনেমায় আমরা দেখি ষাঁড়ের শক্ত পুরুষাঙ্গ একটার পর একটা গাভীকে গাভীন করে যায়। সিনেমায় আমরা এও দেখি, পাথরের মত ‘পুরুষালি’ দেহ থাকলেও সাধু নারীর পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে না।  
 
সেই সাধু, তালের পিঠার স্বাদ ভুলতে না পারা সাধু, অবশেষে একটা অজুহাত খুঁজে পায়।  এক বাউল ফকিরকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমি কি গন্ধম খাইছি?’ যেন গন্ধম খাওয়ার ‘পাপ’এর কারণেই তার বউ হারিয়ে গেছে! এই ‘তাল-রূপ গন্ধম’ আসলে তার ‘পাপ’ নয়; আধ্যাত্মিক মোড়কের ধুম্রজাল সরলে দেখা যায়, এ তার দুর্বলতা। নারীর পাশে পুরুষ হিসাবে সমান ভাবে দাঁড়াতে না পারার দুর্বলতা।
 
তাই তালকে গন্ধম নয়; তাল হিসাবেই দেখেছি আমি। এই বাংলায় তাল লোকসংস্কৃতির সাথে  জড়িয়ে থাকা একটি মিথোলজিক্যাল ফল। শ্রীকৃষ্ণের জন্মমাস ভাদ্রে এই দেশে তাল পাকে। তালের বড়া কৃষ্ণের অতি প্রিয়।  জন্মাষ্টমী ও নন্দোৎসবে তালের পিঠা খেয়ে লোকে গায় “… তালের বড়া খাইয়া নন্দ নাচে রে,  কী আনন্দ হলো রে গোকূলে…।” কৃষ্ণের ভাই বলরামের রথের নাম 'তালধ্বজ'। 'তালনবমী' নামে ব্রত ও উৎসব পালিত হয়। তাই তালকে বরং আমি ‘রইদ’ এর থিমথট আর প্রাচ্য সংস্কৃতির অংশভাক হিসাবে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি।  
সিনেমাটিতে ছোটোখাটো কিছু গরমিল চোখে পড়েছে। যেমন বিসর্জনের ঢাকার বাজনাটা ঠিক মনে হয় নি। তালগাছটি যে এঙ্গেলে দাঁড়িয়ে, তাল পড়েছে তার থেকে বেশ দূরে। ছোট কুলসুমের মাথায় সাদা দাগ ছিল না, বড় কুলসুমের মাথায় আছে। নড়াইল অঞ্চলের আঞ্চলিক কথার টোনের সাথে পাহাড়ি লোকেশন ঠিক মানায় নি। কাশবন আসল নয় তা বুঝা গেছে।  
 
সব মিলিয়ে, আমার মনে হচ্ছে, তিনটি কারনে ‘রইদ’ দেখা দরকার। এক, বিনোদনের জন্যে। কারণ, একটা স্বপ্নঘোর লাগা অন্যরকম প্রেম-বাস্তবতা এই ছবিতে আছে। মানুষের চোখ যে বড় দৃশ্যকে ধারণ করার জন্যে তৈরি, তা এই সিনেমায় বুঝতে পারা যায়। ল্যান্ডস্কেপ, মিউজিক, আলো-ছায়ার খেলা আছে এমন সিনেমা চোখের আরাম। মনেরও প্রশান্তি।

দুই, চিন্তার খোরাকের জন্যে সিনেমাটা 'মাস্ট ওয়াচ'। এই সিনেমায় এমন কিছু দৃশ্য আছে, আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, ভুলতে পারবেন না। যেমন কুলসুমের শরীর থেকে ছিলে নেওয়া কালো চামড়ার উপর তার স্তন থেকে গড়িয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা সাদা দুধ বা সাধুর গোগ্রাসে কুলসুমের মাংস ভক্ষণ …বাংলা সিনেমা তো বটেই, বিশ্বসিনেমার কোথাও এমন হৃদয় বিদীর্ণ করা, চরাচর স্তব্ধ করা দৃশ্য আছে বলে মনে হয় না।  
তিন, এই সব ‘অন্যরকম’ সিনেমা যেন চলে, এমন সিনেমা যেন আরো তোলা হয়, তার উৎসাহ দেওয়ার সামাজিক দায়িত্ব হিসাবে সিনেমাটি দেখা দরকার। আপনি আমি না দেখলে, আলোচনা না করলে, বাংলাদেশের সিনেমায় বৈচিত্রের সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে।
জাহিদ হোসেন: মানবাধিকারকর্মী
 
না ইভ, না হাওয়া, না লিলিথ, না পাগলী: শ্রাবন্তী দত্ত

কাল সন্ধ্যায় রইদ দেখলাম। কত ঘন্টা কেটে গেলো, কিন্তু রইদের রেশ তো কাটে না।
রিলিজের বেশ কয়েকদিন পরে দেখেছি, তাই এর মধ্যেই নানাজনের কাছে আদম-হাওয়া, বুক অফ জেনেসিস ইত্যাদি রেফারেন্স শুনেছি, হয়তো বা পরিচালকও সেসব অ্যালেগোরিতেই গল্প লিখেছেন। কিন্তু আমি তো পুরোটা সময়েই বিবাহিত পুরুষ আর নারীকে দেখে গেলাম।
 
না ইভ, না হাওয়া, না লিলিথ, না পাগলী - ‘সাদুর বউ’ তো তার প্রথম দৃশ্য থেকে শেষ পর্যন্ত রক্তমাংসে গড়া নারীর টাইমলেস ক্যারেকটারের জীবন দেখিয়ে গেলো। তার নাম নাই, বা থাকলেও মনে নাই কারণ সে নাম থাকা বা না থাকা নাম-কা-ওয়াস্তেই, কারণ তার আইডেন্টিটি হলো সে কারো মেয়ে বা বউ বা মা। বিয়ের প্রথম দিন থেকেই হাস্যছলে কটুকথা বলে, পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে, অযাচিত ত্যক্ত করে, স্বামীর কান ভারী করে, মিথ্যে অপবাদে দোষী করে ইত্যাদি নানান কায়দায় অবিরাম হ্যারাসমেন্ট, ঢিলটি ছুঁড়ে পাটকেল খেয়ে তারপর দল পাকিয়ে বউকেই শাস্তি দেয়া, চরম অপমানে-অপবাদে দূরে চলে গিয়ে আবার ভালোবাসা-নিরাপত্তা-সংসারের লোভে নিজের সহজাত অভ্যাস-আরাম বদলে-শুধরে বারবার তার ঘরেই ফিরে আসা, নিজের যেটুকু গুণ যেটুকু জাদু সেটুকু দিয়েই বারবার তার মন জয়ের চেষ্টা, গভীর অভিমানে নিজের সবচে'-প্রিয় সম্পদও ভালোবাসার মানুষকে দিয়ে দেয়া, ছাগল-বিড়াল-মাছ জাতীয় অবলাদের জন্য মাত্রাতিরিক্ত মায়া, একজোড়া নতুন জুতোর মতো খুব শখের জিনিস জান দিয়ে আগলে রাখা, নিজের জঠরের সন্তানকে অপার্থিব আশীর্বাদ মনে করে তাকে সকল শক্তি আর মমতা দিয়ে প্রোটেক্ট করা, কোনো সেটব্যাকে ধ্বসে যাওয়া ঘরসংসার নতুন স্বপ্নে আবার তিলে তিলে রিকন্সট্রাক্ট করা – বিবাহিত নারীর জীবনের এইসব গল্প তো রোজকার; গ্রামে বা শহরে বা মহানগরীতে যুগ-যুগের বাস্তবতা। সাদুর বউয়ের গল্পকে বোঝার জন্য আমার কোনো বিবলিক্যাল রেফারেন্স, কোনো মীথ, কোনো অ্যালেগোরি জানতে হয়নি কারণ এই নারীর জীবন আমরা মেয়েরা নিজের হাতের তালুর মতোই চিনি।
 
সাদুও তো অনেকটাই চেনা পুরুষ। ক্লাসিক নয়, তবে একেও চিনি। আশ্রিত, অবহেলিত, অবদমিত, সরল প্রোলেতারিয়েত পুরুষ সে। পরিশ্রমী কিন্তু উচ্চাশাহীন, বলশালী কিন্তু সাহস কম, স্নেহময় কিন্তু বনস্পতি নয়, একটু লোভী কিন্তু আগ্রাসী প্রতারক নয় – এমন এক পুরুষকে এস এম সুলতানের বাংলার দৃশ্যকল্পের ক্যানভাসে এঁকেছেন পরিচালক। সবুজাভ নদী আর বাদামী পাহাড়ের মাঝের গেরুয়া রঙের ধুলোয় ধেনু-চরানো খররোদে পোড়া তামাটে সুঠাম পুরুষ, যার নীরস মেহনতী জীবনে সহজ আনন্দ, কোমল সান্নিধ্য আর পেলব মিষ্টতার জন্য নারীর উপস্থিতি প্রয়োজন, নারী যার নীড়, নারী যার নোনতা জীবনে কাঁঠালপাতায় মোড়া নরম তালক্ষীরের মিষ্টি স্বাদ - যে বেহেশতী স্বাদ সে ‘বাপের জন্মে’ পায়নি, কিন্তু আনফরচুনেটলি বাপের জন্মে সে এই স্বর্গের আশীর্বাদকে ধরে রাখার শিক্ষাও পায়নি। তাই সে বেচারা ইচ্ছা-আকাংক্ষা-প্রেম সত্ত্বেও সেই আশীর্বাদ বারবার হারায়। কেন যে হারায় সে নিজেও জানেনা, কারণ তার স্কীম অফ পার্সেপশনে সে অন্যায় তো কিছু করেনি। কিন্তু সে তো মন চেনে না – “মন ছাড়া কি মনের মানুষ রয়?” এই অজ্ঞানতার ফল প্রেমহীন একাকীত্ব, যা তাকে নিরানন্দ করে, উদাস করে, দিশাহারাও করে। প্রেম-হারানো পুরুষের এই বেদিশা দশা তাকে সাধারণত কোন এক রিপুর দিকে ধাবিত করে – সে হতে পারে ক্রোধ, বা কাম, বা লোভ, অথবা মদ! মিষ্টি তাল হারিয়ে সে হয় বিমূঢ় বেতাল। সর্বহারা সেই বেতাল পুরুষের স্বপ্নঘোরে একরাশ আশীর্বাদের বর্ষণ হয়, ডিভিনিটির অমৃতভান্ড তাকে এগিয়ে দেয় তার আকাংক্ষিত নারী, সেই ঐশ্বরিক উপহারকে পরম ভালোবাসায় ছুঁতে পারলেই সম্পূর্ণ হয় সার্কিট, জ্বলে ওঠে রইদ।    
 
রইদের সার গল্পটা কি, আমি অতটা মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করিনি। হতে পারে গভীর কোন দর্শন বা আদিকাহিনী মেটাফরিক্যালি লুকিয়ে ছিলো। আমি কেবল পুরোটা সময় সাদু আর সাদুর বউয়ের মধ্যে চিরচেনা নারী আর পুরুষ আর তাদের সম্পর্ককে খুব সহজাতভাবেই দেখে গেলাম। আর দেখলাম দুর্দান্ত কিছু ভিজ্যুয়াল। নদী আর পাহাড়ের মাঝের ধুলোওড়া গোচারণভূমির আর দূরপাহাড়ের ব্যাকড্রপে ডিঙ্গি বেয়ে যাওয়া নিস্তরঙ্গ নদীপথের অনেকগুলি লংশটস, বাপের বাড়ি থেকে উমার বিসর্জনপথে বিদায়যাত্রা আর সাদুর বউয়ের শ্বশুরবাড়িতে আগমনযাত্রার ক্রসিং, গোল ঘেরাওয়ের ভেতর পৌরুষের তেজে মত্ত ষাঁড়দের উত্তেজিত অর্জি পার্টির উন্মত্ততা, অবিরাম বর্ষণে কাদামাটিজলের পথে ভেজা চলাচল, সাদা কাশের ফাঁকে উঁকি দেয়া সাদুর হতদরিদ্র ঘরের রোদপোয়ানো অথবা মেঘছায়াঘন চেহারা, গ্রামের মহিলাদের মারামারি-গালাগালির আনফিল্টার্ড কেওস, বিবলিক্যাল মহাপ্লাবনের নৌকো আর বেথেলহেমের নেটিভিটি সীনের একটা ফিউশন দৃশ্যকল্প, ফ্রাস্ট্রেশনের বেদিশা ঘোরে ঘামতে ঘামতে কয়েক কেজি মাংস খাওয়া, বেশুমার তালের গাদায় মিকেল্যাঞ্জেলোর অমর চিত্রের রিইম্যাজিনেশন – এই অপূর্ব সুন্দর ভিজ্যুয়ালগুলো বহুদিন মাথার ভেতর থাকবে।
 
আর থাকবে ইমরান আর তুষির অভিনয়– অভাবনীয় পরিশ্রমে এমনভাবে চরিত্রের সাথে মেশা যায়। এটা গিফট নয়, এটা এফোর্ট। আমার সাথে আমার বাবা ছিলেন মুভিহলে… কয়েকবার বেশ সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন করলেন যে এরা দুজন কি আসলে ভদ্রপরিবারের পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী নাকি হতদরিদ্র গ্রামের কৃষিজীবী পরিবারের মানুষকে শিখিয়ে পড়িয়ে অভিনয় করানো হয়েছে। এতটাই স্বাভাবিক ছিলেন ওরা। এই শর্টকাটের যুগে এই পরিশ্রম ও মনোযোগ এদের অনেকদুর নিয়ে যাবে।
 
হাওয়া-র কৈবর্তজীবন আর বৈরী মাঝসাগরের অজানা অনিশ্চয়তার যে ধু ধু আবহ, সেটা সুমন এমনভাবে তৈরি করেছিলেন যা মাথার ভেতরে অনেকদিন ছিলো – হু হু হাওয়ার হাহাকারী শব্দ পেতাম। সাদুর বউয়ের হাসির আওয়াজে মোড়া, গাঢ় সবুজ, তামাটে বাদামী আর ঘননীলের একটা মিক্সড প্যালেট এর ওয়াশের ভেতর দিয়ে চুঁইয়ে পড়া এই রইদের রেশ কাটতেও সময় লাগবে। ওটিটিতে আসলে আবার দেখবো, কারণ সিনেমাটার একটা ফল্ট ছিলো - অনেক সংলাপ ইনস্ট্যান্টলি বুঝতেই পারিনি। ডায়ালগ ডেলিভারিকে বেশী ন্যাচারাল রাখতে গিয়ে এমনটা হয়েছে নাকি সাউন্ড ক্ল্যারিটিতে কোনো টেকনিক্যাল সমস্যা ছিলো, তা ঠিক শিওর না। তবে ওভারঅল সাউন্ড আর বিজিএম এতোটা ভালো ছিলো যে হল থেকে বেরিয়ে শোয়েবের সাথে দেখা করে 'থ্যাংকস' না জানিয়ে পারিনি।
বাংলা সিনেমা এমনই হোক, যার ভাঁজে ভাঁজে, শিরায় শিরায় এইভাবে আমাদের নিজেদের মানুষের, নিজেদের প্রকৃতির আইডেন্টিটি থাকে, এমনভাবে থাকে যা ইউনিভার্সালি রিলেটেবল। সত্যজিত কিন্তু 'পথের পাঁচালী' নিয়ে ঠিক এই পথেই বিশ্বের পর্দায় বাংলাকে দেখিয়েছিলেন। রইদ দেখে আসুন। এগিয়ে চলুক আমাদের সিনেমা।
শ্রাবন্তী দত্ত: কর্পোরেট কর্মকর্তা
 
বাংলা চলচ্চিত্রের একটা ভালো সময় যাচ্ছে: ফিরোজ আহমেদ
 
রইদ দেখলাম। মুগ্ধ এবং অভিভূত। একটা ঘোর তৈরি করেছে। এককথায় এইটাই সবার আগে বলা উচিত।
বাংলা চলচ্চিত্রের একটা ভালো সময় যাচ্ছে। বহু দশক পর দেখবার মত এতগুলো ছবি এসেছে, আসছে। বিদেশী উৎসবের জন্য বানানো চলচ্চিত্র এগুলো নয়, বাংলাদেশের দর্শকের জন্য, প্রেক্ষাগৃহে "প্রতিযোগিতা" করবার জন্য বানানো ছবি।
 
ধূমকেতুর মত হঠাৎ এক আধজন নির্মাতা এলে সেটাকে ভালো সময় বলা যায় না। বরং এই যে ঝাঁক বেঁধে এসেছেন, সমকালীন—এই বিষয়টাই আমাকে বেশি আলোড়িত করে। গত কয়েক বছরের মাঝে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এই পরিচালকরা। ছবিগুলোর আর একটা বিশেষ দিক হলো, নির্মাতাদের প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় ছবি এগুলো। নির্মাণের মুন্সিয়ানা দিয়ে এর মাঝেই তারা দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন, এবং বলা যায়, সামনের পুরো ভবিষ্যত তাদের জন্য পড়ে আছে!
 
প্রেক্ষাগৃহে দেখবার মত কোন চলচ্চিত্র নাই, এটা আসলে বহু কাল ধরেই কষ্টদায়ক একটা বিষয় ছিল। মানুষ নিজের ভাষায় বিনোদন চায়, ভাবনার গভীরতার উপাদান নিজের সংস্কৃতির উপাদানগুলো থেকে পেতে চায়, নিজের সংকটগুলোকে বুঝতে চায়-- এবং চলচ্চিত্র সেই কাজটা সব চাইতে অসাধারণ ভাবে করে।
 
এই জন্যই চলচ্চিত্র জাতীয় সংস্কৃতির খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান। সেই জায়গাটাতে আমাদের যে এখনও নির্ভর করে থাকতে হয় অন্যদের ওপর, সেটা ভীষণ একটা জাতিগত অপূর্ণতা।  শিল্পে পারস্পরিক লেনদেন খুবই জরুরি, কিন্তু আমরা তো শুধুই ভোক্তা। দুনিয়াকে তো বাদ, নিজেদেরই দেয়ার মত তেমন কিছু ঝুলিতে জমেনি এখনো।
 
কিছু কিছু চলচ্চিত্র গত কয়েক দশকে তৈরি হয়েছে বটে, যার কোন কোনটা বাইরে কিছু আলোচনা পেলেও প্রেক্ষাগৃহে মাঝারি সাফল্যও পায়নি। এই মূহুর্তে মনে পড়ছে লাইভ ফ্রম ঢাকা ছবিটার কথা। এগুলো খুব কম সাড়া পেয়েছে বা বলবার মত করে আদৌ মুক্তি পায়নি। কিছু চলচ্চিত্র সমালোচক ও উৎসাহী দর্শকই তার ভোক্তা ছিলেন।
কারণ  চলচ্চিত্র বিষয়টাই ঢাকার দর্শকদের মাথা থেকেই চলে গিয়েছে। খুব সহজে তা ফেরত আসবে না। কিন্তু দর্শক তৈরি হতে থাকলে এমনকি খানিকটা দুর্বোধ্য ছবিরও দর্শক তৈরি হতে থাকবে।
 
"রইদ" ছবিটা নিয়েও কিছু বলে রাখি। বাথান মালিক বেশি বয়েসে বিয়ে করিয়ে দেয় শৈশব থেকে তার বাড়িতে জন খাটা সাধুকে। কিন্তু কনে ছিটগ্রস্ত। এতিম এই মেয়েটা স্বভাবে ঠিক সাধুর বিপরীত, সে চলে প্রকৃতির ইশারায়, কিংবা নিজের ভেতরের কোন সহজাত শক্তির তাড়নায়। হিত কিংবা অহিত জ্ঞান তার নাই। নিরুপায় হয়ে সাধু তাকে তাকে এমনকি ফেলেও আসে দূর কোন অচেনা জায়গায়।
 
মেয়েটা নিজেও জানে যে, সে পাগল। সুস্থ হবার সংগ্রামও তার আছে।  বৈরি সমাজ শুধু না, নিষ্পাপ শিশুরাও যেন তার বৈরিপক্ষ। এরও বাইরে আছে তুচ্ছ এই মানুষগুলোর হাতের নাগালের বাইরের জাগতিক সব বড় বড় হিসাবনিকাশ, যার ব্যকরণে এরা পোকামাকড়ের চাইতে হয়তো বেশি কিছু নয়। আছে নানান ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, প্রতিযোগিতা, আগুন।
 
সরল ও কোমল সাধুর  একাকী জীবনে এই পাগল মেয়েটা ঘূর্ণিপাকের মত এলো। জীবনের কঠিনতম মানবিক দোলাচলের সামনে সাধুকে ফেলে পরিচালক দর্শককেও সাধ্যাতীত একটা সংকটের সামনে হাজির করেন।
কিন্তু এইটুকু্ আসলে ছবির সবটা তো নয়ই, এমনকি সামান্যটুকুও নয়। অজস্র ইশারা ও ইংগিত মূল কাহিনীর মাঝেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে গল্পটাকে নির্মাণ করেছে, যে আধিমানসিক ও প্রায় আধ্যাত্মিক একটা জগত নির্মাণ করেছে, তার অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যে বেশ কিছু আছে, চলচ্চিত্রে খুব দেখেছি কি?
 
ছবিটার দৃশ্যায়ন দুর্দান্ত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই অপার প্রেক্ষাপটে ছিটগ্রস্ত একটি মেয়ের জীবনের এই করুণ দুর্গতির চিত্রায়ন পরিচালক হয়তো ইচ্ছা করেই করেছেন। বাংলাদেশের পাহাড়ি ও টিলাময় হাওড় এলাকার ভাষা এমন নয়, এমন কথা লিখেছেন কেউ। কিন্তু শিল্প তো একটা নিজস্ব বাস্তবতা নির্মাণ করে, সেই মঞ্চেই আপনাকে গল্পটা উপভোগ করতে পারতে হবে।
 
মাত্র বছর দশেক আগেও শুনতাম, এডিটিং অমুক দেশে। ক্যামেরায় তমুক দেশের অমুক। এই সব আদিখ্যেতাও দূর হয়েছে এবং চমকে দেয়ার মত কাজ দেশেই হচ্ছে— এগুলোও ভরসা দেয়।
মেজবাহ সুমন নিজের চলচ্চিত্রের ভাষা নির্মাণ করে নিচ্ছেন। আমি এই ছবিটা আরও একবার দেখতে চাই।
ফিরোজ আহমেদ: রাজনৈতিককর্মী

মন্তব্য করুন

Logo