ইয়েমেনের যুদ্ধবিরতির পর হুথিরা (ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত)
সুমিত রায়
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
শান্ত বিকেলে এমন একটি সংবাদ কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় বেতার বা দূরদর্শনে ভেসে আসবে, তা হয়তো খোদ সেই দেশের সাধারণ নাগরিকেরাও কল্পনা করতে পারেননি।
সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ তাদের নিজ দেশের সৈন্যদের উদ্দেশে এক কড়া বার্তা পাঠায়। সেই বার্তায় সেনাদের পরিষ্কার বলা হয় - দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনে হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করতে হবে।
কাদের বিরুদ্ধে এই জীবন বাজি রাখার লড়াই? কোনো পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য কি তাদের সীমান্ত ঘিরে ফেলেছে? কোনো পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র কি তাদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র তাক করে রেখেছে?
না। লড়াইটা এমন এক পুরনো এবং জীর্ণ শত্রুর বিরুদ্ধে, যাদের নাম শুনলে সাধারণ মানুষের চোখে ভেসে ওঠে ধুলোবালি মাখা মরুপথ আর পাহাড়ি গিরিখাত। তাদের নাম হুথি।
কিন্তু এই আপাতদৃষ্টিতে দুর্বল বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি সৌদি রাজতন্ত্রকে কাপিয়ে দিয়েছে। সৌদি রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে একের পর এক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। সৌদি আরবের প্রধান রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার সৌদি আরামকোর সুরক্ষিত তেলস্থাপনায় নিখুঁত আঘাত হেনেছে। শুধু কি তাই? তারা প্রকাশ্যে দাবি করেছে, সৌদি বিমানবাহিনীর একটি সর্বাধুনিক এফ-১৫ যুদ্ধবিমান তারা আকাশ থেকে গুলি করে নামিয়েছে - যার একেকটির বাজারমূল্য দশ কোটি ডলারেরও বেশি।
হুতি যোদ্ধাদের দিকে তাকালে পুরো সমীকরণটা কেমন যেন গোলমেলে ঠেকে। এরা এমন এক গোষ্ঠী, যারা পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্ভিক্ষপীড়িত একটি ভূখণ্ড শাসন করে। তাদের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের অসংখ্য কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চেপে বসে আছে। পৃথিবীর কোনো বড় রাষ্ট্র তাদের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকার করে না। তাদের ভাঁড়ারে অর্থের এতই টানাপোড়েন যে, নিজের দলের সাধারণ যোদ্ধাদের নিয়মিত মাসের বেতন দিতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হয়। পায়ে তাদের সাধারণ চটি, গায়ে তেলচিটে কুর্তা, আর চলাফেরা করে পুরোনো টয়োটা পিকআপ ট্রাকে চড়ে।
আর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে সৌদি আরব। গোটা মধ্যপ্রাচ্যে যাদের প্রতিরক্ষা বাজেট সবচেয়ে বড়। প্রতি বছর তারা নিজেদের সামরিক বাহিনীর পেছনে আশি বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ঢালে। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে তারা বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ। তাদের অস্ত্রাগারে সাজানো রয়েছে সর্বাধুনিক এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ইউরোপের তৈরি অত্যাধুনিক ইউরোফাইটার টাইফুন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্যাট্রিয়ট মিসাইল, আর মাটির বুক চিরে ছুটে চলা দুর্ভেদ্য আব্রামস ট্যাংক। আর এসবের পেছনে ছাতার মতো দাঁড়িয়ে আছে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
এবার একটা অদ্ভুত হিসেব মেলানোর চেষ্টা করুন।
একদিকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র, অন্যদিকে পুরোনো পিকআপ ভ্যানে চড়া চটি পরা কিছু পাহাড়ি বন্দুকধারী। এই লড়াইয়ে সৌদি আরবের মুহূর্তেই জিতে যাওয়ার কথা।
অথচ বাস্তবে কী ঘটল? এই বিপুল সমরাস্ত্র নিয়ে রিয়াদ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তাদের হাতের মুঠো থেকে একটি গোটা উপকূলভাগ হারিয়ে বসল। সৌদি টাকায় ও আশ্রয়ে চলা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি যৌথ বাহিনী লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে। হুথিরা কয়েক দিনের এক ঝটিকা অভিযানে ইয়েমেনের সমগ্র লোহিত সাগর উপকূল নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়।
এখানেই চমকের শেষ নয়। ১০ সেপ্টেম্বর যখন হুথিরা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর মোখা দখল করল, ঠিক সেই দিনই তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে বসল। চিঠির সারমর্ম ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং উদ্ধত: এখন থেকে এই জলপথ দিয়ে কোন জাহাজ যাবে আর কোন জাহাজ ঢুকতে পারবে না, তা জাহাজের পতাকার ওপর ভিত্তি করে তারা নির্ধারণ করবে।
সহজ কথায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনি বাব এল-মান্দেব প্রণালীর চাবি এখন হুতিদের হাতে।
বাব এল-মান্দেবের চাবি এবং তেলের বাজারে হাহাকার
অনেকেই ভাবতে পারেন, সুদূর ইয়েমেনের এক পাহাড়ি অঞ্চলের গৃহযুদ্ধ নিয়ে আমাদের এত মাথা ঘামানোর কী দরকার? দূর দেশের কোনো প্রণালীতে কিছু সশস্ত্র মানুষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে বাকি পৃথিবীর কী আসে যায়?
আসলে ব্যাপারটা এত সহজ নয়। একটু তেলের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই পুরো ছবিটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এই বছরের জানুয়ারি মাসেও সৌদি আরব প্রতিদিন বিশ্ববাজারে প্রায় ৭৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করত। কিন্তু সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে সেই রপ্তানির পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে আসে মাত্র ২১ লাখ ব্যারেলে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান দুটি জলপথ এখনো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। কারণ এই খেলায় হুথিরা একা নয়, তাদের সাথে হাত মিলিয়েছে তেহরান।
এই অবস্থায় সবার মনে তিনটি বড় প্রশ্ন-
প্রথমত, হুথিরা ঠিক কোন লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, আর কেনই বা তাদের এই উত্থান পুরো বিশ্বের জন্য এক মহাবিপদের সংকেত?
দ্বিতীয়ত, এত বড় বড় সামরিক শক্তি চারপাশে পাহারা দেওয়া সত্ত্বেও কেউ কেন তাদের রুখতে পারছে না?
এবং তৃতীয়ত, এই পুরো নাটকে সৌদি আরবের আসল ভূমিকা কী? এত অঢেল অর্থ আর দামি দামি যুদ্ধাস্ত্র থাকা সত্ত্বেও তারা কেন এই আপাতদৃষ্টিতে হতদরিদ্র মিলিশিয়া বাহিনীর সামনে অসহায় হয়ে পড়ল?
চলন সেই জটিল এবং চমকপ্রদ রাজনৈতিক অন্ধকারের গল্পটা বোঝার চেষ্টা করি।
গত প্রায় চার বছর ধরে ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্র ছিল একদম শান্ত, নিথর। যেন এক থমথমে যুদ্ধবিরতি। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রাজধানী সানা দখল করে বসে ছিল হুথিরা। আর দক্ষিণাঞ্চল ও বাদবাকি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সরকারপক্ষ। মাঝখানে ছিল ২০২২ সালে আঁকা একটি যুদ্ধবিরতির অদৃশ্য রেখা। চার বছর ধরে সেই রেখা একচুলও নড়েনি।
কিন্তু এই বছরের জুলাই মাসে রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক আকস্মিক বিমান হামলা হলো। হুথিরা আঙুল তুলল রিয়াদের দিকে। ব্যস, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল বহুদিনের সেই যুদ্ধবিরতি।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তেহরানের ছায়াতলে থাকা হুথি বিদ্রোহীরা যেন বুনো হাতির মতো ময়দানে নামল। মারিবের তপ্ত মরুভূমি থেকে শুরু করে তাইজের রুক্ষ পাহাড় পর্যন্ত - পুরো যুদ্ধফ্রন্ট জুড়ে তারা আর্টিলারি শেল, রকেট আর আত্মঘাতী ড্রোনের বৃষ্টি ঝরাতে শুরু করল। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই - সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধ দেয়াল যেকোনো মূল্যে গুঁড়িয়ে দেওয়া।
তবে এই পুরো অভিযানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং ভয়ংকর চালটি কোনো কামানের মুখ থেকে আসেনি। এসেছিল এক সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত প্রযুক্তি থেকে।
হুথিরা এই যুদ্ধে অত্যন্ত চতুরতার সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার করল।
ঘটনাটা একটু খুলে বলা যাক। হুথিরা বেশ কিছুদিন ধরে সরকারি বাহিনীর শীর্ষ সামরিক কর্তাদের টেলিফোন কথোপকথন গোপনে আড়ি পেতে রেকর্ড করছিল। যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মুহূর্তে তারা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারি বাহিনীর অন্যতম প্রধান সেনাপতি জেনারেল তারেক সালেহ -এর কণ্ঠস্বর হুবহু নকল বা ক্লোন করে ফেলল।
তারপর সেই নকল কণ্ঠ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের সাধারণ কমান্ডারদের কাছে সরাসরি বেতার বার্তা পাঠানো হলো - “পিছু হটো! দ্রুত ঘাঁটি ছেড়ে পেছনে চলে এসো!”
যুদ্ধক্ষেত্রের চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে সাধারণ সৈনিকেরা বুঝতেই পারল না এটি তাদের আসল জেনারেলের নির্দেশ নাকি কোনো প্রতারণা। তারা ভেবে নিল নিশ্চিত বড় কোনো বিপদ এসেছে। মুহূর্তের মধ্যে সরকারি সেনাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। তারা নিজেদের সাঁজোয়া যান, ভারী কামান আর স্তূপীকৃত গোলাবারুদ ফেলে রেখে প্রাণভয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করল।
সামনে কোনো প্রতিরোধ না পেয়ে হুথিরা অত্যন্ত সহজে মোখা বন্দর দখল করে নিল এবং বাবল এল-মান্দেব প্রণালীর পুরো ইয়েমেনি উপকূলভাগ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলো।
মনে রাখা দরকার, এই উপকূল কোনো সাধারণ বালুকাময় তীর নয়। যে এই উপকূলের মালিক, সে পুরো পৃথিবীর আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বারের পাহারাদার। সুয়েজ খাল দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে যত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে, তাদের সবাইকে এই সরু পথটি পেরিয়ে যেতে হয়। ফলে ঘটনাটি আর কোনো স্থানীয় গৃহযুদ্ধ রইল না, এটি মুহূর্তে এক আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিল।
পাহাড়ি গিরিখাতের জটিল সমীকরণ এবং ক্যাহবুবের যুদ্ধ
উপকূল দখল করেই কিন্তু হুথিরা হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াই আর বালুকাবেলায় হচ্ছে না। লড়াইটা সরে গেছে পাথুরে পাহাড়ের চূড়ায়। প্রণালী থেকে মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ক্যাহবুব পর্বতমালা-র খাঁজে খাঁজে এখন কান পাতলে শুধু ভারী কামানের গর্জন শোনা যায়।
ইয়েমেন কোনো সমতল সবুজ প্রান্তর নয়। এটি পাহাড় আর গিরিখাতের এক রুক্ষ, জটিল দেশ। এখানকার সরু পাহাড়ি পথগুলো কোনো উন্মুক্ত সামরিক লড়াই দিয়ে জয় করা যায় না। যুদ্ধবিমান দিয়ে উপর থেকে বোমা ফেলে পাহাড়ের দখল নেওয়া অসম্ভব। এখানে জিততে হলে দখল করতে হয় পাহাড়ের সেই সুউচ্চ চূড়াগুলো, যেখান থেকে নিচের উপত্যকা আর সরবরাহ সড়কগুলোর ওপর নজর রাখা যায়। উঁচু জায়গা যার নিয়ন্ত্রণে, পাহাড়ি যুদ্ধের ময়দানও তার। ক্যাহবুব পর্বতমালা হলো সেই চাবিকাঠি।
যদি হুথিরা এই পর্বতমালার চূড়াগুলো নিজেদের কব্জায় ধরে রাখতে পারে, তবে সদ্য জয় করা পুরো উপকূলভাগ তাদের জন্য চিরতরে সুরক্ষিত হয়ে যাবে। একই সাথে তারা চাপ বাড়াতে পারবে ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ-এর ওপর - যে শহরটি ২০১৫ সাল থেকে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। আর এর ফলে সরকারি বাহিনীকে এই পুরো অঞ্চল থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সম্ভব হবে।
সাতটি চালে কিস্তিমাত করার মতো এক নিখুঁত সামরিক ঘুঁটি সাজিয়েছে হুতিরা।
হুথিদের চূড়ান্ত স্বপ্নটা কিন্তু ছোটখাটো কোনো অঞ্চলের মালিক হওয়া নয়। তারা চায় পুরো ইয়েমেনকে নিজেদের পতাকাতলে এনে মধ্যপ্রাচ্যের এক প্রধান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে। আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য লোহিত সাগরই তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
কয়েক বছর আগেও হুথিদের ক্ষমতার দৌড় ছিল সীমিত। তারা মাঝেমধ্যে রিয়াদের দিকে দু-একটি ড্রোন পাঠাত কিংবা সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর রকেট ছুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করত। কিন্তু এখন পুরো উপকূল তাদের হাতে। এখন তারা যেকোনো জায়গা থেকে সরাসরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারছে। তাদের আঘাত হানার ক্ষমতা এবং পরিধি বেড়ে গেছে বহুগুণ।
স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর কোনো দেশ চাইবে না তাদের পণ্যবাহী বা তেলবাহী জাহাজগুলো বাব এল-মান্দেবের মতো ব্যস্ত জলপথে এই চটি পরা বন্দুকধারীদের নিশানায় পরিণত হোক।
কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ার কারণ কেবল এই উপকূল দখল নয়। তারা বলছেন, এটি হুথিদের এক দীর্ঘমেয়াদী এবং ভয়ংকর পরিকল্পনার প্রথম অঙ্ক।
পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর - জোড়া সাঁড়াশির ফাঁদ
উপকূলের এই সুরক্ষিত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে হুথিরা তাদের দ্বিতীয় চালটি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর সেই চালটি হলো - সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোর ওপর এক সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক আঘাত হানা।
ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত বিশেষ করে তাদের মূল নজর সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইয়ানবু বন্দর ও শোধনাগার অঞ্চলের দিকে।
এই ইয়ানবু জিনিসটা সৌদি আরবের জন্য ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা একটু ভালো করে বুঝতে হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের আরেক বিখ্যাত জলপথ হলো হরমুজ প্রণালী। সৌদি আরব তাদের সিংহভাগ তেল পারস্য উপসাগর হয়ে এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্ববাজারে পাঠায়। কিন্তু ইরানের সাথে যুদ্ধ বাধলে যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তবে সৌদি আরবের হাতে বিকল্প একটাই পথ খোলা থাকে - আর তা হলো দেশটির পূর্ব প্রান্ত থেকে মরুভূমির বুক চিরে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পশ্চিম প্রান্তের ইয়ানবু বন্দরে নিয়ে এসে লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানি করা।
সহজ কথায়, হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হলে ইয়ানবুই হলো সৌদি রাজতন্ত্রের একমাত্র বাঁচার উপায়।
এবার পুরো ছবিটা কল্পনা করুন।
যদি হুথিরা তাদের ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এই ইয়ানবু বন্দরকে অচল করে দিতে পারে, তবে তারা আর ইরান মিলে তৈরি করবে ইতিহাসের এক ভয়ংকর সাঁড়াশির ফাঁদ। একদিকে পারস্য উপসাগরে বসে তেহরান চাপ দেবে হরমুজ প্রণালীতে, অন্যদিকে লোহিত সাগরে বসে হুথিরা আঘাত করবে ইয়ানবু আর বাব এল-মান্দেবে। সৌদি তেলের বের হওয়ার দুটি দরজাই একসাথে বন্ধ হয়ে যাবে।
ইদানীং হরমুজ প্রণালীতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে হলেও তা আসলে একটি নীরব মরীচিকা। ইরান আসলে পিছু হটেনি; তারা হয়তো কেবল একটি মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় ঘাপটি মেরে বসে আছে।
এই আসন্ন বিপদের আঁচ পেয়েই কিন্তু ফ্রান্স-এর মতো ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো লোহিত সাগরে নিজেদের যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি বাড়িয়ে দিয়েছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ ইয়ানবু এলাকাকে সুরক্ষিত রাখা যায়।
সামনে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, ঠিক সেই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুহূর্তে ইরান ও তাদের হুথি মিত্ররা যদি এই জোড়া সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে বসে, তবে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এক অবিশ্বাস্য বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তেলের দাম আকাশ স্পর্শ করবে এবং পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক কাঠামোতে তীব্র কম্পন তৈরি হবে।
হুথিরা তাদের এই ভয়ংকর অভিপ্রায়ের কথা গোপন রাখার কোনো চেষ্টাও করছে না। তারা বুক ফুলিয়ে নিজেদের লক্ষ্যের কথা জানান দিচ্ছে।
কিন্তু কীভাবে এমন এক মারাত্মক সংকট দিনের পর দিন চোখের সামনে ডালপালা মেলে বড় হতে পারল? কেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি সেনাবাহিনী এদের গোড়াতেই পিষে ফেলতে পারল না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তার সামরিক নীতিনির্ধারকদের করা এক অবিশ্বাস্য ভুলের দিকে।
মাটির নিচে অস্ত্রশালা এবং নতুন প্রযুক্তির হুথি
সৌদিদের ভুলের গল্পে যাওয়ার আগে হুথিদের ভেতরের রূপান্তরটা বোঝা দরকার। আজকের হুথি আর দশ বছর আগের হুথি এক জিনিস নয়। সময়ের সাথে সাথে এই বাহিনীর খোলস পুরোপুরি বদলে গেছে।
২০২২ সালের সেই যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে তারা ইয়েমেনের বন্দরগুলোর ওপর থেকে বহু আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ শিথিল করিয়ে নিয়েছিল। আর সেই সুযোগের পুরো সদ্ব্যবহার করেছে এই মিলিশিয়া গোষ্ঠী। তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে আধুনিক অস্ত্রের এক গোপন আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন গড়ে তুলেছে।
ইরানি প্রকৌশলীদের প্রত্যক্ষ মদদে পাহাড়ের গভীর গুহায় আর মাটির নিচের সুড়ঙ্গে তারা গড়ে তুলেছে অত্যাধুনিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা। তাদের হয়তো বিমানবাহিনী নেই, কিন্তু তাদের রয়েছে অত্যন্ত নিখুঁত দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল, আত্মঘাতী ড্রোন আর শক্তিশালী কামান। এখন তাদের ছোঁড়া রকেটগুলো আগের মতো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মরুভূমিতে পড়ে থাকে না; সেগুলো আঘাত হানে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর কয়েক মিটারের মধ্যে।
তাদের সামরিক কমান্ডের গঠনও বেশ অদ্ভুত। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কেবল মূল লক্ষ্য ও নীতিমালা ঠিক করে দেয়, কিন্তু ময়দানের ছোট ছোট সামরিক ইউনিটগুলোকে দেওয়া থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। ফলে তাদের প্রধান নেতাদের ওপর বিমান হামলা চালিয়ে এই বাহিনীকে স্তব্ধ করা যায় না; একটি ইউনিট ধ্বংস হলেও আরেকটি ইউনিট নিজের মতো করে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে।
আর সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, প্রযুক্তির প্রতি হুথিদের এই অন্ধ মোহ।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, হুথিরা আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত মডেলগুলোকে কাজে লাগিয়ে তাদের দেশীয় প্রযুক্তির অস্ত্রশস্ত্রকে আরও আধুনিক রূপ দিচ্ছে। তারা নাকি এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র ও গাইডেড রকেট তৈরির কাজ করছে, যার পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। এমনকি শব্দের চেয়ে কয়েকগুণ দ্রুতগামী হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল তৈরির স্বপ্নও তারা দেখছে।
মানুষদের সমাবেশে জমায়েত হচ্ছে যাতে ইয়েমেনের হৌতি বিদ্রোহীদের দ্বারা টায়িজ শহরের উপর বছরের পর বছর ধরে চলা অবরোধ শেষ করার দাবি জানানো হয়, ইয়েমেনে, ২৫ মে। (ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত)চটি পরা যোদ্ধাদের এই রূপান্তর হয়তো তাদের কিছুটা এগিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু প্রতিপক্ষের চরম নির্বুদ্ধিতা না থাকলে তারা কখনোই এত দ্রুত সাফল্য পেত না।
মিত্র যখন চরম শত্রু - হাদরামাউতের গোপন গুপ্তধন
কাগজে-কলমে যাকে ইয়েমেন সরকার বলা হচ্ছিল, তা আসলে ছিল দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী শক্তির এক নড়বড়ে মোর্চা। আর এই দুই শক্তিকে পেছন থেকে পুতুলনাচের মতো নাচাচ্ছিল এমন দুটি দেশ, যারা নিজেদের পরম মিত্র বলে দাবি করলেও বাস্তবে একে অপরকে এক ফোঁটাও বিশ্বাস করে না- সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।
এই মোর্চার দুই প্রধান চরিত্রকে চিনে রাখা ভালো।
প্রথমজন হলেন রশাদ আল-আলিমি। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রধান, এবং তিনি শতভাগ সৌদি আরবের লোক। রিয়াদ তার মাধ্যমে চায় একটি অখণ্ড ইয়েমেন, যা পুরোপুরি সৌদি আধিপত্য মেনে চলবে। এর পেছনে সৌদি আরবের একটি দীর্ঘদিনের স্বপ্ন কাজ করছিল - কোনো প্রণালীর মুখাপেক্ষী না হয়ে ইয়েমেনের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে পাইপলাইন বসিয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগর দিয়ে নিজেদের তেল রপ্তানি করা।
আর দ্বিতীয় চরিত্রটি হলেন আইদারুস আল-জুবেইদি। তিনি হলেন দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদী দল সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের সর্বেসর্বা। তিনি পুরোপুরি সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাতের পুতুল। তার দলের লক্ষ্য ঠিক উল্টো। তারা চায় ইয়েমেনকে ভেঙে আবারও একটি স্বাধীন ‘দক্ষিণ ইয়েমেন’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। কারণ ১৯৯০ সালের আগে এই দক্ষিণ ইয়েমেন এডেন-কে রাজধানী করে সম্পূর্ণ আলাদা একটি দেশ হিসেবে টিকে ছিল।
ভাবুন একবার কী অদ্ভুত পরিস্থিতি! কাগজে-কলমে এই দুই পক্ষ একসাথে উত্তরের হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। অথচ ভেতরে ভেতরে তাদের লক্ষ্য সম্পূর্ণ বিপরীত, আর তাদের পেছনে অর্থ ও অস্ত্র ঢালছে উপসাগরের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজতন্ত্র। এই ধরনের জোট যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, তা তো জানা কথাই ছিল।
সেই বহু প্রতীক্ষিত বিস্ফোরণটি ঘটল ২০২৫ সালের শেষভাগে এসে। যখন ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ হাদরামাউত-এ বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের নতুন খনি আবিষ্কৃত হলো। এই হাদরামাউত মরুভূমি হলো ইয়েমেনের আসল সোনার ডিম পাড়া হাঁস। দেশের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় আশি শতাংশ সম্পদ এই মাটির নিচে লুকিয়ে আছে।
সম্পদের গন্ধ পেয়েই সৌদি সমর্থিত উপজাতীয় মিলিশিয়ারা সেই তেলের খনিগুলো নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে এগিয়ে গেল। ওদিকে আমিরাত সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়; তারা পাল্টা হামলা চালিয়ে সৌদি পক্ষের বাহিনীকে পিটিয়ে তাড়িয়ে দিল।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গোটা তেলসমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চল চলে গেল আমিরাত পন্থীদের দখলে। এডেনের রাজপথে মানুষ নেমে এসে নতুন স্বাধীন দেশের দাবিতে স্লোগান দিতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল, মানচিত্রের বুক চিরে বুঝি আরেকটি নতুন দেশের জন্ম হতে চলেছে।
ঠিক এই চরম মুহূর্তে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এমন এক অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য কাণ্ড করে বসলেন, যা সামরিক ইতিহাসের অন্যতম বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে।
তিনি হুথিদের ভুলে গিয়ে সরাসরি নিজের মিত্রদের ওপর বিমানবাহিনী লেলিয়ে দিলেন।
সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো গিয়ে আবুধাবি সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনীর ওপর নির্মম বোমাবর্ষণ শুরু করল। মুকালা বন্দরে থাকা দুটি আমিরাতি সামরিক জাহাজে আক্রমণ করা হলো। এবং ৩০ ডিসেম্বর তারিখে সৌদি আরব তাদের ঘনিষ্ঠতম মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এক চরমপত্র ধরিয়ে দিল - “চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গোটা ইয়েমেন ছেড়ে পাততাড়ি গুটাও, নয়তো ফল ভালো হবে না।”
বলাই বাহুল্য, অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে আমিরাত তাদের বাহিনী গুটিয়ে ফিরে গেল। কিন্তু এই গৃহবিবাদের ফল কী দাঁড়াল? যে যৌথ সামরিক জোটের হুথিদের ঠেকানোর কথা ছিল, সৌদি আরব নিজের হাতে সেই জোটের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিল। হাজার হাজার দক্ষ সৈন্য ফ্রন্টলাইন ছেড়ে চলে গেল।
আর দক্ষিণের এই তথাকথিত মিত্রদের পাহারা দিতে গিয়ে সৌদি আরব সেই সৈন্যদের সীমান্ত থেকে সরিয়ে দক্ষিণে মোতায়েন করল, যাদের মূল কাজই ছিল লোহিত সাগরে হুথিদের পথ আটকে রাখা। পেছনের দরজা তারা নিজেরাই হাট করে খুলে দিল।
হুথিদের জন্য এর চেয়ে বড় কোনো উপহার আর হতে পারত না। তারা চোখের সামনে দেখল, শত্রু নিজেদের মধ্যে মারামারি করে রক্তাক্ত হয়ে গেছে, আর তাদের সামনে পুরো পথ সম্পূর্ণ ফাঁকা পড়ে আছে। এই ঐতিহাসিক সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে তারা এক মুহূর্তও দেরি করেনি।
গোত্রের রাজনীতি এবং রিয়াদের শূন্য রাজপ্রাসাদ
ইয়েমেনকে বুঝতে হলে এই দেশের গোত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থাকে বুঝতে হবে।
হুথিরা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়। তারা হলো সানা এবং উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের শক্তিশালী পাহাড়ি গোত্রগুলোর এক দুর্ভেদ্য সামাজিক ঐক্য।
সৌদি সমর্থিত সরকারপক্ষের মধ্যেও উপজাতীয় সমীকরণ ছিল। কিন্তু তাদের নেতৃত্বের মধ্যে ছিল লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা এবং একের বিরুদ্ধে অন্যের হিংস্র লড়াই। অন্যদিকে হুথিরা শত কষ্টের মধ্যেও তাদের গোত্রগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতে পেরেছে। তাদের রয়েছে একজন অবিসংবাদিত নেতা, একটি একক তহবিল এবং একটি অভিন্ন সামরিক চেইন অব কমান্ড। এটাই তাদের আসল শক্তি।
আর এই কারণেই সৌদি আরব এখন ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। তারা ভালো করেই জানে, তেহরানের সাথে হুথিদের এই নতুন অক্ষ যদি সত্যিই কার্যকর হয়ে ওঠে, তবে তাদের সামনে অন্ধকার দিন ঘনিয়ে আসছে।
গত কয়েক মাস ধরে সৌদি আরব আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল যাতে ইরান বা হুথিদের সাথে তাদের বড় ধরনের কোনো সংঘাত না বাঁধে। এমনকি যখন হুথিরা মোখা বন্দর আর বাব এল-মান্দেব উপকূলের দিকে বীরদর্পে এগিয়ে যাচ্ছিল, সৌদি আরবের এত শত অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান থাকা সত্ত্বেও তারা উপর থেকে একটি বোমাও ফেলেনি।
কেন ফেলেনি? কারণ তারা আগুনের মধ্যে আর পেট্রোল ঢালতে চায়নি। তারা ভেবেছিল চুপচাপ থাকলে হয়তো বিপদ তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম বড় নির্মম। দুর্বলতা দেখালে বা পিছু হটলে আগ্রাসী শক্তি কখনো থেমে যায় না। সৌদি আরবের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা তাদের নিরাপত্তা দেয়নি, বরং হুথিদের আরও বেশি সাহসী ও বেপরোয়া করে তুলেছে।
যে সাঁড়াশির ফাঁদ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, তা হয়তো এখনো কেবল এক তাত্ত্বিক সম্ভাবনা। কিন্তু ইয়েমেনের মাটিতে গত কয়েক সপ্তাহে যা যা ঘটে গেছে, তাতে সেই সম্ভাবনা এখন আর কোনো অলীক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় প্রহসন হলো, আশি বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট দিয়ে যে দেশটি নিজের সুরক্ষা কিনতে চেয়েছিল, সেই দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় পর্ষদকে আজ নিরীহ তরুণ সেনাদের কাছে হাত জোড় করে বলতে হচ্ছে - দেশের তেলের খনি আর আকাশ বাঁচাতে হাসিমুখে জীবন বিসর্জন দাও।
আধুনিক সমরাস্ত্র, হাজার কোটি টাকার প্রাচুর্য আর অহংকার যে মাটির লড়াইয়ে চটি পরা কিছু সংকল্পবদ্ধ পাহাড়ি মানুষের যুদ্ধকৌশলের সামনে এভাবে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে - ইয়েমেনের ধূসর পর্বতমালা আজ পুরো পৃথিবীকে সেই নির্মম সত্যটাই আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ার জ্বালানি রাজনীতির এই দাবাখেলায় শেষ চালটি কে দেবে, তা হয়তো বলে দেবে অনাগত ভবিষ্যৎ। তবে এই খেলায় যে সৌদি রাজপ্রাসাদের সাজানো ঘুঁটিগুলো একে একে উল্টে পড়তে শুরু করেছে, তা নিয়ে এখন আর সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
মন্তব্য করুন

