Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

মস্তিস্কের রহস্য নিয়ে গবেষনার স্বীকৃতি মিলল চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল জিতে

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

কাভার স্টোরি

মস্তিস্কের রহস্য নিয়ে গবেষনার স্বীকৃতি মিলল চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল জিতে

ড. লুবনা ফেরদৌসী

ড. লুবনা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম

আপনার আশেপাশে যখন কেউ এমন কিছুতে ভয় পেয়ে বলে “আমার খুব ভয় করছে”, কিন্তু আপনার কাছে স্বাভাবিক বিষয়, আপনি হয়তো বললেন, “ভয় পাওয়ার কী আছে?” 
একইভাবে হতাশাগ্রস্থ কেউ বললেন, “কিছুতেই আর আনন্দ পাইনা।” আপনি সফল-সুখী মানুষ বলে দিলেন, “এত কিছু পেয়েও?” 

এই যে মানুষগুলো নিজের মনের সঙ্গে প্রতিদিন লড়ছেন, আর আমরা বাইরে থেকে তাঁদের ইচ্ছাশক্তির নম্বর দিচ্ছি।অথচ যে মস্তিষ্ক দিয়ে আমরা অন্যের কষ্টের বিচার করছি, সেই মস্তিষ্কের কাজ আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। 

২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার সেই বোঝার পথে এক অসাধারণ আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

কার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল পুরস্কার পেয়েছেন আলো দিয়ে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি, অপটোজেনেটিক্সের ভিত্তি গড়ে দেওয়ার জন্য। এর সাহায্যে জীবন্ত মস্তিষ্কে স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুকোষের ভূমিকা পরীক্ষা করা যায়।  আলো দিয়ে মস্তিষ্কের কাজ নিয়ন্ত্রণ! শুনলে মনে হতে পারে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি। তবে এই গল্পের শুরু কিন্তু মানুষের মস্তিষ্কে নয়, এককোষী শৈবালে।

বিজ্ঞানী হেগেমান ও নাগেল যৌথ গবেষণায় শৈবালে এমন এক প্রোটিন আবিষ্কার করেন, যা আলো পেলে কোষের গায়ে থাকা অতি ক্ষুদ্র দরজার মতো খুলে যায়। এর নাম চ্যানেলরোডপসিন। সেই দরজা দিয়ে বৈদ্যুতিক আধান বহনকারী কণা চলাচল করতে পারে। 

ডাইসেরথ ও তাঁর সহকর্মীরা এই আলোকসংবেদনশীল প্রোটিনকে স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে রূপ দেন। শৈবালের একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে মস্তিষ্ককে বোঝার নতুন চাবি। 
সহজ করে বলি বিষয়টা, একটি বিশাল অর্কেস্ট্রায় হাজারো বাদ্যযন্ত্র একসঙ্গে বাজছে। আপনি সুর শুনতে পাচ্ছেন, কিন্তু কোন যন্ত্রটির কী ভূমিকা, তা আলাদা করা কঠিন। এখন যদি নির্দিষ্ট একটি যন্ত্রকে কিছুক্ষণের জন্য থামানো যায়, অথবা ঠিক নির্দিষ্ট মুহূর্তে বাজানো যায়, তাহলে পুরো সুরে তার অবদান অনেক স্পষ্ট হবে।

মস্তিষ্কেও অসংখ্য স্নায়ুকোষ পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অপটোজেনেটিক্সে জিনগত কৌশল ব্যবহার করে নির্বাচিত কোষে আলোকসংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি করা হয়। এরপর উপযুক্ত আলো দিয়ে সেই কোষগুলোর কার্যকলাপ বাড়ানো বা দমন করা যায়। এজন্য বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। মাথায় সাধারণ আলো ফেললে এমন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না। 
কোনো প্রাণী ভয় পাওয়ার সময় মস্তিষ্কের একটি অংশ সক্রিয় হলো, এটুকু দেখলে বোঝা যায়, দুটির মধ্যে সম্পর্ক আছে। কিন্তু সেই অংশের নির্বাচিত কোষ সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করলে ভয়-সংক্রান্ত আচরণ বদলায় কি না, তা পরীক্ষা করলে তাদের কার্যকর ভূমিকা সম্পর্কে আরও শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়। কোথায় কী ঘটছে থেকে কীভাবে ঘটছে, সেই প্রশ্নের দিকে এগোনো। 

তবে মানুষের একটা অনুভূতি মানে একটাই সুইচ না। ভালোবাসা, শোক, ভয় বা বিষণ্নতাকে একটি কোষের মধ্যে আটকে ফেলা যায় না। স্নায়ুকোষ কাজ করে জটিল যোগাযোগের মধ্যে। মানুষের জীবনও গড়ে ওঠে শরীর, অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক ও সামাজিক পরিবেশের মিথস্ক্রিয়ায়। 

এই গবেষণা তাই পার্কিনসন্স, মৃগীরোগ, বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত ব্যাধি ও আসক্তি বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। অপটোজেনেটিক্সের সাহায্যে গবেষকেরা পরীক্ষা করছেন, চলাফেরা, ভয়, আনন্দ বা পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুপথগুলো কীভাবে কাজ করে, আর কোথায় তাদের কার্যকলাপ বদলে যায়। বিশেষত প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের ভূমিকা যাচাই করে ভবিষ্যতের চিকিৎসার লক্ষ্য খোঁজা হচ্ছে।

ট্রমার গবেষণাতেও প্রশ্ন উঠছে। একটি ভয়াবহ ঘটনা অতীত হয়ে যাওয়ার পরও তার স্মৃতি কেন শরীরকে বারবার বিপদের সংকেত দেয়? প্রাণীর ওপর গবেষণায় অপটোজেনেটিক্স ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা দেখছেন, কোন স্নায়ুকোষ ভয়-সংক্রান্ত স্মৃতির প্রকাশ বাড়ায়, আর কোনগুলো তা দমন করতে সাহায্য করে। এই বোঝাপড়া ট্রমা-পরবর্তী মানসিক চাপ বা PTSD এর চিকিৎসা গবেষণাকে এগিয়ে নিতে পারে। তবে মানুষের মস্তিষ্ক থেকে ট্রমা বা নেতিবাচক অনুভূতি ডিলিট করার চিকিৎসা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। স্মৃতি থাকলেও তার ভয় যেন জীবনকে বন্দী করে না রাখে, আশাটি সেখানেই। 

এই আবিষ্কারের মানবিক দিকটি আমার কাছে বিশেষ অর্থবহ। চিকিৎসাশিক্ষার সময় মনোরোগের ক্লিনিকে কাজ করতে গিয়ে ডাইসেরথ রোগীদের যন্ত্রণা এবং সাহায্যের প্রয়োজন গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জন্মেছিল, একেক মানুষের মস্তিষ্ক এত ভিন্নভাবে কাজ করে কেন? নোবেল পাওয়ার পরও তাঁর লক্ষ্য মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও বোঝাপড়া বাড়ানো। খুব সাধারণ একটা নৈতিক উপলব্ধি যেমন মানুষটি কষ্ট পাচ্ছেন, তাঁকে বোঝা প্রয়োজন সেখান থেকেও বিজ্ঞানের শুরু হয়।আমরা প্রায়ই মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে এই জায়গাটি এড়িয়ে যাই। 

“মন শক্ত করো”, “বেশি ভাবো না”, “নিজেকে ব্যস্ত রাখো”পরামর্শগুলো দিতে আমাদের কয়েক সেকেন্ড লাগে। যিনি শুনছেন, তাঁর কাছে বিছানা ছেড়ে ওঠাটাই হয়তো সেদিনের সবচেয়ে কঠিন কাজ।
মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা সেই সহজ বিচারগুলোকে প্রশ্ন করতে শেখায় আমাদেরকে। কারও কষ্ট বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না বলে তা কম বাস্তব হয়ে যায় না। আবার মস্তিষ্কের জৈবিক প্রক্রিয়া বোঝার প্রয়োজন আছে বলেই তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, নিঃসঙ্গতা, সহিংসতা বা অনিশ্চয়তার গুরুত্ব কমে না। মানুষকে বোঝার জন্য তার কোষের দিকে তাকাতে হয়, কথাও শুনতে হয়।

এই বোঝার বিষয়টা, চিকিৎসায় পদ্ধতিগত ভাবে কতটা এগিয়েছে? যেমন একটা উদাহরণ পাওয়া যায় দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর গবেষণায়। ২০২১ সালে প্রকাশিত গবেষণায় রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসায় দৃষ্টিশক্তি হারানো এক ব্যক্তি পরীক্ষামূলক অপটোজেনেটিক চিকিৎসার পর বিশেষ চশমার সাহায্যে কিছু বস্তু শনাক্ত করতে, গুনতে ও স্পর্শ করতে পেরেছিলেন, আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন।

ফলটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু পুরোপুরি এখনই দাবি করা যাচ্ছে না যে আলো দিয়ে সম্পূর্ণভাবে বিষণ্নতা সারানো বা স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে কিনা। গবেষণা চলতে থাকুক ডাইসেরথদের।
আরও একটি জরুরি কথা এই নোবেল মনে করিয়ে দেয়। শৈবাল কীভাবে আলোয় সাড়া দেয়, এমন প্রশ্নকে আমরা সহজেই বলতে পারি, “এতে মানুষের কী লাভ?” অথচ সেই কৌতূহলের অনুসরণই এখন মানুষের মস্তিষ্ক বোঝার পথ খুলেছে। গবেষণার মূল্য সবসময় তার শুরুর দিনেই হিসাব করা যায় না।

এই নোবেলে আলো স্নায়ুকোষের কাজ বোঝার হাতিয়ার হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বোঝাপড়ার শুরু হতে পারে আরও ছোট একটি পরিবর্তন দিয়ে। কেউ যদি বলেন , “আমার কষ্ট হচ্ছে।” এবার না হয় বললেন, “বলুন, আমি শুনছি….”
কার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেলকে আন্তরিক অভিনন্দন। মস্তিষ্কের রহস্যে আপনাদের আলো মানুষের জীবনেও আশার আলো হয়ে উঠুক!

মন্তব্য করুন

Logo