Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য: রাশিয়া-ইরান মৈত্রী পাল্টে দিচ্ছে বিশ্ব

রাশিয়া-ইরান মৈত্রী পাল্টে দিচ্ছে বিশ্ব (ছবিঃ প্রথমআলো পত্রিকা থেকে সংগৃহীত)

কাভার স্টোরি

ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য: রাশিয়া-ইরান মৈত্রী পাল্টে দিচ্ছে বিশ্ব

Icon

সুমিত রায়

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ সব সময় অংঙ্কের মত নয়। সেখানে যোগ-বিয়োগের সাধারণ নিয়ম খাটে না। কখনো দুইয়ে দুইয়ে চার হয়, আবার কখনো দেখা যায় বিশাল অঙ্কের হিসাবের পেছনে লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমীকরণ।

সালটা ২০২২। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র তখন বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। সেই সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইরানের আয়াতুল্লাহ সরকার রাশিয়ার হাতে তুলে দিয়েছে তিন লক্ষাধিক কামানের গোলা। শুধু কি তাই? শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার ড্রোন নিয়মিত বিরতিতে উড়ে গেছে মস্কোর ঠিকানায়।

মস্কো থেকে প্রায় সাড়ে নয়শত কিলোমিটার পূর্বে তাতারস্তান নামের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র রয়েছে। রাশিয়ার মানচিত্রে জায়গাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানেই গড়ে উঠেছে আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এটি সমগ্র রাশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। গত কয়েক বছরে এই শান্ত ভূখণ্ডে এমন এক সুবিশাল শিল্প প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে, যা দেখে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার জন্য এই কারখানাটি এখন রুশ বাহিনীর অন্যতম প্রধান ভরসা।

এখানে কী তৈরি হয়? এটি একটি অত্যন্ত আধুনিক ড্রোন কারখানা। দিন নেই, রাত নেই - সপ্তাহের সাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা সেখানে অবিরাম কাজ চলছে। তৈরি হচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে সামরিক ড্রোন। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই বিশাল কারখানাটি গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণভাবে ইরানের প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম, অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে। রাশিয়ার সামরিক বাহিনী যেসব শাহিদ-১৩৬ ড্রোন এবং অন্যান্য মডেল দিয়ে ইউক্রেনের আকাশে আতঙ্ক তৈরি করছে, তার একটি বড় অংশ তৈরি হচ্ছে এই আলাবুগাতেই।

সহজ কথায়, ক্রেমলিন যখন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় কোণঠাসা, তখন তেহরান তাদের জন্য ত্রাতার ভূমিকা নিয়ে সামনে এসেছিল।

এখন যেকোনো সচেতন মানুষের মনে একটি প্রশ্ন জাগতেই পারে। বিনিময়ে ইরান কী পেল? ওপর ওপর দেখলে মনে হবে, এই লেনদেনে ইরান ঠকেছে। তারা পেয়েছে কয়েকটি ব্যবহৃত মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান এবং কিছু বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা, যার মধ্যে কয়েকটি আবার রাশিয়ার তৈরিও নয় - চীনের তৈরি। গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় সামরিক লেনদেন। ইরান তাদের ভাণ্ডারের প্রায় সবকিছু উজাড় করে দিল, আর হাতে পেল সামান্য কিছু উচ্ছিষ্ট? সত্যিই কি তাই? কূটনীতির জগতে কেউ নিজের পকেট খালি করে অন্যকে দান করে না। এই দৃশ্যমান লেনদেনের পেছনে তাহলে অন্যকিছু লুকানো আছে? এমন কিছু, যা খালি চোখে দেখা যায় না, যার কোনো প্রকাশ্য ট্র্যাকিং নম্বর নেই, কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্যে যা যেকোনো প্রচলিত সমরাস্ত্রের চেয়ে বহুগুণ বেশি ধ্বংসাত্মক?

লন্ডনের বিখ্যাত পত্রিকা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ২০২৩ সাল থেকে রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের একটি গোপন দল তেহরানে ঘাঁটি গেড়ে বসে কাজ করছে। তারা সাধারণ কোনো রকেট বানাচ্ছে না। তাদের তৈরি করা এই বিশেষ প্রযুক্তির লক্ষ্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট - পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক ঘাঁটিগুলোকে সরাসরি নিশানা করা। সেই নৌবাহিনীটি অন্য কারও নয়, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত 

বিষয়টি লক্ষ করুন। এতদিন ধরে ইরান রাশিয়াকে অস্ত্র জুগিয়েছে ইউক্রেনকে শায়েস্তা করার জন্য। আর এখন মস্কো সেই ঋণ শোধ করছে এমন এক প্রযুক্তি দিয়ে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হৃৎপিণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে এক ঠান্ডা প্রতিশোধের ছক কষছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে, পরিস্থিতি ক্রমাগত উত্তপ্ত হচ্ছে। ইরানিরা একচুলও পিছু হটছে না। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে চলছে সরাসরি শক্তির মহড়া। হোয়াইট হাউস শত চেষ্টা করেও আয়াতুল্লাহদের বা তাদের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে বশে আনতে পারছে না। উল্টো প্রতি পদে তারা এমন এক প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছে, যার প্রস্তুতি তাদের হিসাবে ছিল না।

এর অন্তর্নিহিত অর্থটি অনুধাবন করা জরুরি। আমেরিকা বছরের পর বছর ধরে ইউক্রেনকে কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে এসেছে। লক্ষ্য ছিল একটাই - একজন মার্কিন সেনার রক্তপাত না ঘটিয়ে রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। এখন মস্কো ঠিক একই চাল উল্টো দিক থেকে চালার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিজের দেশের কোনো সেনাকে ঝুঁকিতে না ফেলে ওয়াশিংটনকে ঘায়েল করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে মোক্ষম যুদ্ধক্ষেত্র আর কী হতে পারে?

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের বাজার। সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম তত বাড়বে। আর তেলের বাড়তি দাম মানেই ক্রেমলিনের রাজকোষে উপচে পড়া বৈদেশিক মুদ্রার ঢল। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই জটিল দাবার তিনটি প্রধান প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক।

প্রথমত, ইউক্রেন যুদ্ধে নিঃশর্ত সমর্থনের বিনিময়ে ইরান প্রকৃতপক্ষে রাশিয়ার কাছ থেকে কী আদায় করে নিচ্ছে?

দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার দেওয়া প্রযুক্তি মার্কিন বাহিনীকে আঘাত করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা কতটা বাড়িয়ে দিতে পারে? এবং সবশেষে, এটি কি নিছক দুই বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সাধারণ সামরিক সহযোগিতা, নাকি পুতিন কোনো রুশ সেনার জীবন বিপন্ন না করেই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানার এক মোক্ষম কৌশল খুঁজে পেয়েছেন?

ইউক্রেন যু্দ্ধে তেহরানের প্রবেশ
ঘড়ির কাঁটা একটু পেছনের দিকে ঘোরানো যাক। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ইউক্রেন আক্রমণ করার সময় মস্কোর জেনারেলরা ভেবেছিলেন, কিয়েভ দখল করা হয়তো কয়েক দিনের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা সব হিসাব ওলটপালট করে দিল। রাশিয়ার রণকৌশল এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে গেল। রুশ বাহিনী বুঝতে পারল, তাদের গোলাবারুদের মজুদ ধারণার চেয়ে অনেক দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী লক্ষ্য অর্জন করতে হলে রুশ বাহিনীকে প্রতিদিন শত শত নিশানায় আঘাত হানতে হচ্ছিল। ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিড, রসদ সরবরাহ কেন্দ্র, সামরিক ব্যারাক, অস্ত্র কারখানা এবং প্রতিরক্ষা ব্যূহ - সবকিছু গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এই কাজগুলো কেবল রাশিয়ার নিজস্ব ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল। প্রতিটি আধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে খরচ হয় দশ লক্ষ ডলারেরও বেশি। তদুপরি, এই দামি ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সরবরাহ ছিল অত্যন্ত সীমিত। রাশিয়ার দরকার ছিল এমন এক অস্ত্র, যা সস্তা, সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং যা দিয়ে আকাশ ছেয়ে ফেলে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা যাবে। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তেই রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করল ইরান।

দশকের পর দশক ধরে কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঘেরাটোপে আটকে থাকা তেহরানের অবস্থা সাধারণ কোনো দেশের মতো ছিল না। তাদের পক্ষে আমেরিকার মতো অত্যাধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বা দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সম্ভব ছিল না। আবার তাদের ধনী আরব প্রতিবেশীদের মতো চেক বই খুলে শত কোটি ডলার দিয়ে আধুনিক অস্ত্র কিনে আনাও সম্ভব ছিল না। তাই ইরানি প্রকৌশলীরা ভিন্ন এক পথ বেছে নিয়েছিলেন। তারা মনোযোগ দিয়েছিলেন তুলনামূলকভাবে সস্তা, সাধারণ উপাদানে তৈরি এবং বিপুল সংখ্যায় উৎপাদন করা যায় - এমন সব মারণাস্ত্র তৈরির ওপর।

রাশিয়ার ঠিক যে জিনিসের তীব্র অভাব ছিল, ইরানের গুদামে তখন তারই প্রাচুর্য। একেই বলে সুযোগের সঠিক মেলবন্ধন। ২০২২ সালের আগস্ট মাসে একটি ইরানি প্রতিনিধি দল গোপনে মস্কো সফর করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ড্রোন প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ে একটি গোপন চুক্তিতে পৌঁছানো। তার ঠিক এক মাস পর, অর্থাৎ ১৩ সেপ্টেম্বর তারিখে, পূর্ব ইউক্রেনের কুপিয়ানস্ক শহরের আকাশে এক নতুন ধরনের উড়ন্ত বস্তুর দেখা মিলল। ইউক্রেনীয় সেনারা একটি ড্রোন ভূপাতিত করে দেখতে পেল, তার গায়ে সিরিলিক হরফে লেখা রয়েছে একটি নাম - গেরান-২। সামরিক বিশ্লেষকদের চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল হলো না যে, এটি রাশিয়ান নামধারী ইরানের সেই বিখ্যাত শাহিদ-১৩৬ ড্রোন।

এটি ছিল কেবল একটি দীর্ঘ ও গভীর অংশীদারত্বের সূচনা। কয়েক মাসের ব্যবধানে এই সহযোগিতা অভাবনীয় গতিতে বৃদ্ধি পেল। ২০২২ সালের শেষের দিকে স্বাক্ষরিত হলো সেই ঐতিহাসিক চুক্তি, যার অধীনে রাশিয়ার মাটিতেই গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হলো সুবিশাল ড্রোন কারখানা - সেই আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে।

কারখানা চালু হওয়ার পর উৎপাদনের গতি জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করল। দিনে বিশ-ত্রিশটি ড্রোন তৈরির হিসাব পেরিয়ে প্রতি মাসে হাজার হাজার ড্রোন তৈরির সক্ষমতা অর্জন করল রাশিয়া। এর ফলে ইরান কেবল অস্ত্র বিক্রেতা হিসেবেই রইল না, তারা রাশিয়ার যুদ্ধের পুরো গতিপথ বদলে দেওয়ার অন্যতম অংশীদারে পরিণত হলো।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এত কিছু দেওয়ার পর ইরান বিনিময়ে কী চেয়েছিল?
প্রাথমিকভাবে তেহরানের ইচ্ছা ছিল বেশ আকাশচুম্বী। তারা ক্রেমলিনের কাছে চেয়েছিল সর্বাধুনিক সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্ভেদ্য দেয়াল এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। কিন্তু মস্কো বারবার সেই দাবি এড়িয়ে গেছে। কারণ খুব সরল - ইউক্রেনের রণাঙ্গনে নিজের আকাশসীমা পাহারা দিতে তাদের নিজেদেরই এই অস্ত্রগুলোর তীব্র প্রয়োজন ছিল। ইরানকে দেওয়ার মতো বাড়তি যুদ্ধবিমান তাদের হাতে ছিল না। ফলে সীমান্ত পেরিয়ে কেবল কিছু পুরনো মডেলের মিগ-২৯ এবং কয়েকটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাই তেহরানের হাতে পৌঁছাল।

কিন্তু এখানেই নাটকের শেষ নয়। সাধারণ মানুষ বা সংবাদমাধ্যম যখন দৃশ্যমান অস্ত্র হস্তান্তরের হিসাবে ব্যস্ত ছিল, তখন বন্ধ দরজার ওপাশে চলছিল অনেক বেশি মূল্যবান এক লেনদেন। রাশিয়া তাদের বন্ধুকে এমন এক বিদ্যা শেখানোর প্রস্তাব দিল, যা যেকোনো তৈরি অস্ত্রের চেয়ে বহুগুণ বেশি কার্যকর। সেই বিদ্যাটি হলো জাহাজ বিধ্বংসী অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গোপন নকশা ও প্রযুক্তি।

সাগরের বুকে নতুন সমীকরণ ও সোভিয়েত ইতিহাস
ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ইরান কিন্তু একেবারেই আনাড়ি নয়। তাদের নিজেদের তৈরি করা হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি কিংবা তেল শোধনাগারে নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষমতা তারা বহু আগেই অর্জন করেছে। মাঝেমধ্যেই তারা তা প্রদর্শনও করে থাকে। কিন্তু সামরিক প্রকৌশলে একটি বিশেষ প্রতিবন্ধকতা ইরানকে কয়েক দশক ধরে আটকে রেখেছিল।

মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশাল কংক্রিটের ঘাঁটিতে ধীরগতির ড্রোন বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করা এক জিনিস। আর উত্তাল সমুদ্রের বুকে ঘণ্টায় ত্রিশ নট বেগে চলমান একটি বিশালাকার মার্কিন বিমানবাহী রণতরীকে নিশানা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। একটি মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ও আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকে। সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করা কোনো সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের পক্ষে সম্ভব নয়।

অথচ আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ক্ষমতার সিংহভাগই প্রদর্শন করে সমুদ্রের এই রণতরীগুলো থেকে। ইরান যদি এই চলমান ভাসমান দুর্গগুলোকে ভয় দেখাতে না পারে, তবে তাদের সমস্ত সামরিক প্রস্তুতি অর্ধেক অকার্যকর থেকে যায়।

ইরানের তাই এমন এক অস্ত্র দরকার ছিল, যা শব্দের চেয়ে কয়েকগুণ দ্রুত গতিতে উড়বে, রাডারের নজর এড়িয়ে সমুদ্রের জল ছুঁয়ে ধেয়ে যাবে এবং যা ধ্বংস করতে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চিন্তাভাবনা করারও সময় পাবে না।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই বিশেষ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে রাশিয়া কয়েক দশক ধরে সারা বিশ্বে অদ্বিতীয়। মস্কোর উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি বিশেষ সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার নাম এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়া। এই প্রতিষ্ঠানটিকে রাশিয়ার সামরিক রকেট বিজ্ঞানের রাজমুকুট বলা চলে। এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় একটি ঘটনা থেকে - ২০২৩ সালে অন্য একটি দেশের শীর্ষ হ্যাকার দল এই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে সাইবার হামলা চালিয়েছিল কেবল তাদের গোপন নকশাগুলো চুরি করার জন্য।

এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র বিজ্ঞানের এক কিংবদন্তি, যার নাম ভ্লাদিমির চেলোমি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণায় যে তিনজন মহারথী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, চেলোমি ছিলেন তাদের একজন। জোসেফ স্তালিনের ভয়ঙ্কর সব রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান থেকে তিনি অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে নিজের জীবন রক্ষা করেছিলেন।

চেলোমির একটি বিশেষ গুণ ছিল - তিনি ক্ষমতার অলিন্দ কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা ভালো করেই জানতেন। নিকিতা ক্রুশ্চেভ যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তখন চেলোমি একটি অভাবনীয় কাজ করলেন। তিনি ক্রুশ্চেভের ছেলে সের্গেই ক্রুশ্চেভকে নিজের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি দিলেন। সোভিয়েত নেতার একমাত্র সন্তান নিজের অফিসে কাজ করছেন এবং তাকে পরম সমাদরে রাখা হচ্ছে - এই একটি কৌশল চেলোমির সামনে সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের সব বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছিল।

ইতিহাসের বিচিত্র পরিহাস দেখুন। ক্রুশ্চেভের সেই ছেলে, যিনি সোভিয়েত আমলে মার্কিন রণতরী ডুবিয়ে দেওয়ার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। শুধু তা-ই নয়, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের বিখ্যাত নেভাল ওয়ার কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মার্কিন নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ অ্যাডমিরাল ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেখানে তিনি তাদের যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসের সোভিয়েত কলাকৌশল শেখাতেন।

যাই হোক, ইতিহাসের পাতা থেকে ফিরে আসা যাক চেলোমির গবেষণাগারে। গত পঞ্চাশ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি সোভিয়েত ও রাশিয়ান নৌবাহিনীর জন্য একের পর এক বিধ্বংসী সুপারসনিক জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র উপহার দিয়েছে। এর মধ্যে বিখ্যাত হলো পি-৭০০ গ্রানিত, পি-৮০০ অনিক্স এবং একবিংশ শতাব্দীর সর্বাধুনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র জিরকন। এই প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের মূল দর্শন একটাই - সমুদ্রপৃষ্ঠের একেবারে গা ঘেঁষে উড়ে যাওয়া, শব্দের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি গতিবেগ অর্জন করা এবং শত্রু জাহাজের সেন্সর কিছু বুঝে ওঠার আগেই আঘাত হানা।

এখন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক সংস্থা রোসোবোরোনএক্সপোর্ট-এর বিশেষ অনুমোদনে এই মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার শীর্ষ বিজ্ঞানীদের একটি গোপন দল উপস্থিত হয়েছে তেহরানে। এই প্রতিষ্ঠানের কোনো বিজ্ঞানীর বিদেশ সফরের সিদ্ধান্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তর বা ক্রেমলিনের সরাসরি সবুজ সংকেত ছাড়া কল্পনাও করা যায় না। অর্থাৎ, পুতিনের নির্দেশেই রাশিয়ার এই মহার্ঘ বিদ্যা তুলে দেওয়া হচ্ছে ইরানিদের হাতে। এই যৌথ প্রকল্পের সামরিক সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছে সি-৪৩০এল।

সি-৪৩০এল এবং একটি ব্যর্থ উড্ডয়ন
২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে রাশিয়ার এই গোপন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি কেবল কাগুজে কোনো চুক্তি ছিল না। রুশ প্রকৌশলীরা তেহরানের ল্যাবরেটরিতে বসে সরাসরি ইরানি বিজ্ঞানীদের সাথে কাজ শুরু করেন।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রুশ নকশার ওপর ভিত্তি করে ইরানিরা তাদের নিজস্ব একটি প্রোটোটাইপ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছিল। কিন্তু রকেট বিজ্ঞান মোটেও সহজ কোনো পাঠ নয়। সমুদ্রের ওপর শব্দের চেয়ে তিন গুণ বেশি গতিতে কোনো ধাতব বস্তুকে স্থিতিশীল রাখা এক জটিল বৈজ্ঞানিক যুদ্ধ।

প্রথম দফা পরীক্ষার দিন ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশে ছোঁড়া হলো। কিন্তু উৎক্ষেপণের এক মিনিট পার হওয়ার আগেই সমস্ত টেলিমেট্রি ডাটা বন্ধ হয়ে গেল। রকেটটি মাঝ আকাশেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ল সমুদ্রে।

ইরানি প্রকৌশলীরা এই ব্যর্থতায় হতাশ হলেন না। তারা পরীক্ষার প্রতি মিলি-সেকেন্ডের সমস্ত টেলিমেট্রি ডাটা, সেন্সর রিডিং এবং যান্ত্রিক পরিমাপের হিসাব দ্রুত মস্কোতে মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়ার বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। রুশ বিশেষজ্ঞরা সেই তথ্য চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কয়েক ডজন প্রযুক্তিগত প্রশ্ন ও সংশোধনী তালিকা ফেরত পাঠালেন। জ্বালানির মিশ্রণে কী ত্রুটি ছিল? দহন কক্ষের ভেতরের বায়ুর চাপ কেমন ছিল? বাতাসের প্রবেশের মুখে কোনো শূন্যতা তৈরি হয়েছিল কি না? নোজলের ধাতব ঘনত্ব ঠিক ছিল কি না? প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় ধরে ধরে ত্রুটিগুলো শুধরে দেওয়া হলো।

এই ঘটনার গভীরতা অনেক বেশি। রাশিয়া এখানে ইরানকে কেবল একটি মাছ উপহার দিচ্ছে না, তারা ইরানকে মাছ ধরার পুরো কৌশলটি হাতে-কলমে শিখিয়ে দিচ্ছে। তারা শেখাচ্ছে কীভাবে এই জটিল সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন তৈরি করতে হয়, কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোর উন্নতি ঘটাতে হয় এবং কীভাবে ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে এর নতুন নতুন সংস্করণ তৈরি করা সম্ভব।
একই সাথে ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তব পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রাশিয়া ইরানকে ব্যবহার করছে এক জীবন্ত গবেষণাগার হিসেবে। ইরানিরা নিজেদের অর্থে পরীক্ষা চালাচ্ছে, আর সেই পরীক্ষার ফলাফল থেকে অর্জিত জ্ঞান সমৃদ্ধ করছে রুশ বিজ্ঞানীদের অভিজ্ঞতাকে।

সাগরের দিগন্তরেখা ও কিল চেইনের সীমাবদ্ধতা
ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির এই সমীকরণটি বুঝতে হলে নৌযুদ্ধের একটি মৌলিক বিজ্ঞান জানা প্রয়োজন। সমুদ্রের বুকে কোনো যুদ্ধজাহাজের রাডার যত শক্তিশালীই হোক না কেন, পৃথিবীর গোলকীয় বক্রতার কারণে তা দিগন্তরেখার ওপারে দেখতে পায় না। জলপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দশ বা পনেরো মিটার ওপর দিয়ে উড়ে আসা একটি অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র যতক্ষণ না দিগন্তরেখা অতিক্রম করে ওপরে উঠছে, ততক্ষণ পর্যন্ত জাহাজের রাডার স্ক্রিনে তার কোনো অস্তিত্ব ধরা পড়ে না। সাধারণ দূরত্বের হিসাবে এই রেখাটি জাহাজ থেকে মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে। সুতরাং, চল্লিশ কিলোমিটার - একটি যুদ্ধজাহাজের আত্মরক্ষার জন্য এটুকুই কেবল সম্বল।

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত 

এখন হিসাবটি গতিবেগের। একটি সাবসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা শব্দের চেয়ে কম গতিতে ওড়ে, তার এই চল্লিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে দুই মিনিটেরও বেশি। দুই মিনিট সামরিক প্রতিরক্ষার জন্য একটি বিশাল সময়। জাহাজের স্বয়ংক্রিয় সেন্সর এই সময়ের মধ্যে হুমকি শনাক্ত করতে পারে, গতিপথ বিশ্লেষণ করতে পারে এবং ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে দিতে পারে।

কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্রটি যদি সুপারসনিক হয়? যদি তা শব্দের তিন গুণ গতিতে ছুটে আসে?

তখন সেই চল্লিশ কিলোমিটার পথ পেরোতে সময় লাগবে চল্লিশ সেকেন্ডেরও কম। এই অবিশ্বাস্য অল্প সময়ের মধ্যে জাহাজের কম্পিউটারকে হাজার হাজার ডাটা প্রক্রিয়া করতে হবে, আকাশ থেকে উড়ে আসা বিভ্রান্তিকর সংকেত বা ডিকয় থেকে আসল ক্ষেপণাস্ত্রটিকে আলাদা করতে হবে, ইন্টারসেপ্টরের দিক নির্ধারণ করতে হবে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে হবে। যদি এই প্রক্রিয়ায় জাহাজের কোনো কর্মকর্তা দ্বিধাগ্রস্ত হন বা মানুষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কয়েক সেকেন্ড নষ্ট হয়, তবে আর কিছুই করার থাকবে না। ততক্ষণে ক্ষেপণাস্ত্রটি জাহাজের ইস্পাতের বুক চিরে ভেতরে প্রবেশ করে বিস্ফোরণ ঘটাবে। তবে মুদ্রার একটি বিপরীত পিঠও রয়েছে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের চেয়ে যত দ্রুতই ছুটুক না কেন, আঘাত হানার আগমুহূর্তে জাহাজের সঠিক অবস্থান কোথায়, তা যদি তার জানা না থাকে, তবে সেই অন্ধ গতি সম্পূর্ণ মূল্যহীন।

খোলা সমুদ্রের বুকে একটি দ্রুতগামী যুদ্ধজাহাজ খুঁজে পাওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়। হাজার মাইল দূর থেকে ছোড়া একটি জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র একা একা শিকার খুঁজে নিতে পারে না। তার প্রয়োজন হয় এমন এক সমন্বিত ব্যবস্থার, যা দিগন্তের ওপারে থাকা শত্রুর জাহাজের গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করবে, গতিপথ ও পরিবর্তনের হিসাব কষবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে সেই তথ্য ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেবে।

সামরিক পরিভাষায় কৃত্রিম উপগ্রহ, দূরপাল্লার নজরদারি রাডার, সামুদ্রিক টহল বিমান, গোয়েন্দা ড্রোন এবং নিরবচ্ছিন্ন ডেটা লিঙ্কের এই অবিচ্ছেদ্য শৃঙ্খলকে বলা হয় কিল চেইন। ইরান ঠিক এই জায়গাতেই ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে ছিল। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ইস্পাত তাদের ছিল, কিন্তু সাগরের দূর সীমানায় চোখ মেলে দেখার সেই আধুনিক ব্যবস্থা তাদের ছিল না। এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে ইয়েমেনের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে। গত পনেরো মাসে লোহিত সাগরে ইরানের মিত্র হুথিরা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কিন্তু মার্কিন নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজেও তারা একটিবারের জন্যও সরাসরি আঘাত হানতে পারেনি। আমেরিকার একের পর এক ডেস্ট্রয়ার অক্ষত অবস্থায় তাদের ইন্টারসেপ্টর দিয়ে সমস্ত ইরানি আক্রমণ প্রতিহত করেছে। কারণ একটাই - হুথিদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, কিন্তু তাদের কাছে কোনো নিখুঁত কিল চেইন ছিল না। তারা অন্ধের মতো অনুমান নির্ভর হয়ে লক্ষ্যবস্তু খুঁজছিল। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ফাঁস হওয়া নথি অনুসারে, রাশিয়া এখন তেহরানকে কেবল দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির নকশাই দিচ্ছে না, তারা ইরানের সেই অন্ধত্ব ঘোচাতে নিজেদের "চোখ" ধার দিচ্ছে।

রুশ মহাকাশ গবেষণা ও সামরিক উপগ্রহগুলো থেকে রিয়েল-টাইম ডাটা সরাসরি ইরানি কমান্ড সেন্টারে শেয়ার করার পরিকল্পনা চলছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর অবস্থান প্রতি মুহূর্তে ইরানের মনিটরে ভেসে উঠবে। কোন পথে ড্রোন পাঠালে জাহাজের রাডার ফাঁকি দেওয়া যাবে, কোন কোণ থেকে আক্রমণ করলে প্রতিরক্ষা ব্যূহ সহজে ভেদ করা সম্ভব - এই সমস্ত সামরিক বুদ্ধিমত্তা মস্কো ভাগ করে নিচ্ছে তেহরানের সাথে। একটি ইরানি মিসাইলের চেয়ে রুশ স্যাটেলাইটের চোখের সাহায্যে পরিচালিত ইরানি মিসাইল যে বহুগুণ বেশি প্রাণঘাতী, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ইতিহাস যখন পুনরাবৃত্তির পথে: ব্রাহ্মস ক্ষেপনাস্ত্রের ইতিহাস
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ইরানের হাতে রাশিয়ার সরাসরি সহায়তায় তৈরি কোনো পূর্ণাঙ্গ কার্যকর সুপারসনিক মিসাইল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মোতায়েন করা হয়নি। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এখনো গবেষণাগার এবং পরীক্ষামূলক ধাপেই রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধরনের একটি উচ্চাভিলাষী সামরিক প্রকল্প সফল হতে ঠিক কতদিন সময় লাগতে পারে? এর উত্তর খুঁজতে আমাদের বেশি দূর তাকাতে হবে না। এই একই রুশ কোম্পানি, এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়া, এর আগে অন্য একটি দেশের সাথে যৌথভাবে ঠিক একই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছিল। সেই ক্ষেপণাস্ত্রটির নাম ব্রাহ্মস।

১৯৯৮ সালের কথা। রাশিয়া এবং ভারত যৌথভাবে একটি প্রতিরক্ষা উদ্যোগ শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার সেই পরীক্ষিত পি-৮০০ অনিক্স ক্ষেপণাস্ত্রের মূল নকশাকে ভিত্তি করে একটি ভয়ানক সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল তৈরি করা। আজ ভারত ও রাশিয়ার তৈরি সেই ব্রাহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ানক ও কার্যকর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হয়।

আজ তেহরানের পরীক্ষাগারে সি-৪৩০এল প্রকল্পের নামে যা ঘটছে, তা মূলত আড়াই দশক আগে শুরু হওয়া সেই ব্রাহ্মস প্রকল্পেরই এক নতুন ও বিপজ্জনক রূপ। আন্তর্জাতিক কূটনীতির খেলায় একটি নতুন অস্ত্রকে কার্যকর হিসেবে প্রমাণ করার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয় তার অস্তিত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা। ইরানকে কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বাস্তবে ডুবিয়ে দিতে হবে না। ওয়াশিংটনের সমরনায়করা যদি কেবল এই বিশ্বাসটুকু করতে বাধ্য হন যে তেহরানের হাতে এখন মার্কিন রণতরীকে নিখুঁতভাবে সাগরে নিমজ্জিত করার মতো রাশিয়ান সুপারসনিক প্রযুক্তি এসে পৌঁছেছে, তবেই খেলার ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায়। পেন্টাগন তখন তাদের রণতরীগুলোকে ইরানের উপকূল থেকে শত শত মাইল দূরে সরিয়ে নিতে বাধ্য হবে। এর মাধ্যমে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে নিজের কোনো ক্ষতি না করেই ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। মস্কোকে তাদের নিজেদের ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত কোনো সমরাস্ত্র কমাতে হলো না, কিন্তু তারা আমেরিকার মাথার ওপর ঝুলিয়ে দিল এক অদৃশ্য তরবারি।

এর সাথে রয়েছে আরও বড় ভূরাজনৈতিক লাভ। মধ্যপ্রাচ্যে যদি একটি দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার পরিবেশ বজায় থাকে, তবে তা ক্রেমলিনের জন্য প্রতিটি ফ্রন্টে লাভজনক ব্যবসা বয়ে আনে।
প্রথম সমীকরণটি অত্যন্ত স্পষ্ট। পারস্য উপসাগরে নিজেদের একটি যুদ্ধজাহাজ রক্ষা করার জন্য মার্কিন নৌবাহিনী যে এসএম-৬ বা স্ট্যান্ডার্ড ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করছে, প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয়ের অর্থ হলো - সেই ক্ষেপণাস্ত্রটি আর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ রক্ষা করার জন্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। আমেরিকার উন্নত এয়ার ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টরের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা সীমিত। মধ্যপ্রাচ্যে যত বেশি মিসাইল খরচ হবে, ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষায় শূন্যতা তত বাড়বে।

আর দ্বিতীয় সমীকরণটি হলো অর্থনীতির। সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে বেড়ে যায়। তেলের দাম প্রতি ব্যারেল দশ ডলার বাড়া মানে রাশিয়ার তেল রপ্তানি থেকে প্রতি সপ্তাহে কোটি কোটি ডলারের অতিরিক্ত রাজস্ব তাদের যুদ্ধকালীন কোষাগারে জমা হওয়া। অর্থাৎ, পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা টিকিয়ে রাখা ক্রেমলিনের যুদ্ধের খরচ জোগানোর সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।

শেষ দৃশ্য: ছায়াযুদ্ধের নতুন ব্যাকরণ
ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ বরফাবৃত সমভূমি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিতে। ইতিহাস অদ্ভুত উপায়ে তার হিসাব মেলায়। আমেরিকা ভেবেছিল ইউক্রেনকে আধুনিক অস্ত্র দিয়ে তারা কোনো আমেরিকান সেনার ক্ষতি না করে মস্কোকে ক্লান্ত ও নিঃস্ব করে দেবে। আজ মস্কো ঠিক সেই একই খেলা শুরু করেছে পারস্য উপসাগরে। ইরান যদি এই রুশ প্রযুক্তির সাহায্যে সফলভাবে জাহাজ বিধ্বংসী সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের নিজস্ব ভাণ্ডার গড়ে তোলে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য চিরতরে বদলে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য মূল্য বহু গুণ বেড়ে যাবে। একসময় যেসব রণতরী পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াত, তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটাতে হবে অতর্কিত ধ্বংসের আশঙ্কায়।

ভ্লাদিমির পুতিন ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে এই এক অদ্ভুত অথচ অত্যন্ত হিসেবি প্রতিশোধের চাল চেলেছেন। কিয়েভকে দূরপাল্লার অস্ত্র সরবরাহ করার যে শাস্তি তিনি আমেরিকাকে দিতে চেয়েছিলেন, তা তিনি কার্যকর করছেন তেহরানের হাত দিয়ে। এই দ্বৈরথে কোনো রুশ সেনাকে ফ্রন্টলাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না, অথচ ওয়াশিংটন প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে রক্তক্ষরণের শিকার হচ্ছে। ইরান, রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিপজ্জনক ছায়া লড়াই ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার মানচিত্রকে কোন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়, তা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

মন্তব্য করুন

Logo