Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যা মামলা, ঘটনার প্রকৃত অনুসন্ধান এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

কাভার স্টোরি

১০০ হত্যা মামলায় ৩৭টি এফআরটি

জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যা মামলা, ঘটনার প্রকৃত অনুসন্ধান এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

হত্যাকাণ্ড সত্য, কিন্তু খুনি কে?

Icon

শরীফুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

ঢাকার আদালতপাড়ায় সেই মামলার নথি এখনো আছে। আছে এজাহার, সাক্ষ্য, তদন্তের কাগজপত্রও। নথির ভেতরে একটি নাম বারবার ফিরে আসে—মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে যার মৃত্যু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছিল। তার মৃত্যুর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল মুহূর্তেই। অসংখ্য মানুষ সেই দৃশ্য দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। অনেকের কাছে মুগ্ধ হয়ে ওঠেন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীক।

কিন্তু আবেগের সেই প্রবল ঢেউ স্তিমিত হওয়ার পর যখন বিচার বিচার শুরু হলো তখন প্রশ্ন এলো— কীভাবে তিনি নিহত হলেন, কার গুলিতে মৃত্যু, ঘটনাস্থলে কারা ছিল, কে নির্দেশ দিয়েছিল? ইত্যাদি, ইত্যাদি।

অপরাধীকে খুঁজে বের করা বড় চ্যালেঞ্জ

একটি গণআন্দোলনের উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে এসব প্রশ্নের উত্তর সহজ মনে হলেও আদালতের কাঠগড়ায় উত্তর খুঁজে পাওয়া অনেক কঠিন। কারণ আদালত জনমতের ওপর নয়, প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত দেয়। মুগ্ধের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোকের গল্প নয়; এটি জুলাই অভ্যুত্থানের বিচারপ্রক্রিয়ার সামগ্রিক বাস্তবতার প্রতীক। একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে দেশের শত শত মামলায়। নিহতের পরিচয় স্পষ্ট, কিন্তু হত্যাকারীকে শনাক্ত করা কঠিন। কোথাও ঘটনার ভিডিও আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও অপরাধীকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। কোথাও আবার এত বেশি মানুষকে আসামি করা হয়েছে যে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করাই তদন্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ৭৯৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ১০০টির। ৬৩টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ৩৭টি মামলায় তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে এফআরটি বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। অর্থাৎ তদন্তে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অস্বীকার করা হয়নি; কিন্তু এজাহারে যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ মেলেনি। এই একটি পরিসংখ্যানই জুলাই অভ্যুত্থানের বিচার নিয়ে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে। হত্যাকাণ্ড যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে প্রকৃত হত্যাকারীরা কোথায়?

অভিযোগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার

প্রশ্নটি শুধু ৩৭টি মামলার নয়, পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার। সরকার পরিবর্তনের পর দায়ের হওয়া বহু মামলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র, আইনজীবী এবং আদালতের কার্যক্রম থেকে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে দেখা যায়—অনেক মামলায় অসংখ্য ব্যক্তিকে একসঙ্গে আসামি করা হয়েছে। কোথাও একই সময়ে ভিন্ন স্থানে সংঘটিত ঘটনায় একই ব্যক্তির নাম এসেছে। কোথাও স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ, কোথাও ব্যক্তিগত শত্রুতা, আবার কোথাও কেবল দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। আবার, ভিন্ন কোনো ঘটনায় নিহতকেও জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত দেখানো হয়েছে।  
ফলে তদন্তের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করার বদলে নিরপরাধ ব্যক্তিদের আলাদা করতে। তদন্ত চলাকালে হাজার হাজার আসামির নাম বাদ পড়েছে। আইনের দৃষ্টিতে এটি যেমন তদন্তের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তেমনি এটি একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাও সামনে আনে—প্রাথমিক অভিযোগের কতটা ছিল তথ্যভিত্তিক, আর কতটা ছিল আবেগ, প্রতিশোধ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিফলন?
এই কারণেই ৩৭টি এফআরটি কেবল একটি তদন্ত-পরিসংখ্যান নয়। এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে একাধিক মৌলিক প্রশ্ন। বিচার কি কেবল অভিযুক্তের সংখ্যা বাড়ানোর নাম, নাকি প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করার প্রক্রিয়া? নিরপরাধ মানুষকে মামলায় জড়িয়ে ফেললে কি শেষ পর্যন্ত প্রকৃত হত্যাকারীরাই আড়ালে থেকে যায় না? আর সবচেয়ে বড় কথা, যেসব পরিবার আজও তাদের স্বজন হারানোর বিচার চায়, তারা কি শেষ পর্যন্ত সত্যিই ন্যায়বিচার পাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই জুলাই অভ্যুত্থানের বিচারপ্রক্রিয়াকে নতুন করে দেখা দরকার।

নিহতের সংখ্যা: কোন হিসাব ধরা হবে?

জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। সরকারি গেজেটে ৮৩৪ জনকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে সামগ্রিক সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই দুই সংখ্যাকে সরাসরি এক করে দেখানো ঠিক হবে না। জাতিসংঘের হিসাবের মধ্যে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যসহ বিভিন্ন পক্ষের নিহত ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে বিচারাধীন হত্যা মামলাগুলোর পরিধি আলাদা। ফলে সরকারি গেজেট, পুলিশি তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান ভিন্ন কাঠামোর ভিত্তিতে প্রস্তুত হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং আইনের শাসনের পরীক্ষা

একটি হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে মৌলিক সত্য হলো—কেউ নিহত হয়েছে, আর কেউ তাকে হত্যা করেছে। রাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কাজ সেই অপরাধীকে শনাক্ত করা, অপরাধ প্রমাণ করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন রাষ্ট্র নিজেই বলে, ‘হত্যা হয়েছে, কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি’, তখন প্রশ্ন ওঠে—তাহলে প্রকৃত হত্যাকারী কে?

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ এখন ঠিক এই প্রশ্নের মুখোমুখি। ৭৯৯টি হত্যা মামলার মধ্যে পুলিশের ১০০টি তদন্তের ৩৭টিতেই এফআরটি বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে। আইনের ভাষায় এর অর্থ, হত্যাকাণ্ডের ঘটনটি সত্য, কিন্তু এজাহারে যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরিসংখ্যানের বিচারে এটি হত্যা মামলার একটি বড় অংশ এবং মামলাগুলোকে বিতর্কিত করার জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এর বিশাল গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, জুলাই অভ্যুত্থানের বিচার কেবল কয়েকটি ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তির বিষয় নয়; এটি জুলাই অভ্যুত্থানের যথার্থতা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি, তদন্তের মান এবং আইনের শাসনের পরীক্ষাও বটে।

মামলার পাহাড়, আসামির সুনামি

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সারা দেশে মোট ১ হাজার ৮৬২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৯৯টি হত্যা এবং ১ হাজার ৬৩টি হত্যাচেষ্টা ও অন্যান্য অপরাধের মামলা। এই মামলাগুলোতে এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ১ লাখ ৫৪ হাজারেরও বেশি। অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা সাড়ে চার লাখের কাছাকাছি। অর্থাৎ গড় হিসাবে প্রতিটি মামলায় কয়েকশ মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

সরকার পরিবর্তনের পর দায়ের হওয়া বহু মামলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, কোনো কোনো এজাহারে এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে, যাদের ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার প্রমাণ মেলেনি। এমনকি একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে সংঘটিত ঘটনায় একই ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার মতো অসংগতিও কয়েকটি মামলায় সামনে এসেছে।

ফলে তদন্তের বড় একটি অংশ ব্যয় হয়েছে প্রকৃত অভিযুক্তদের শনাক্ত করার কাজে। তদন্ত চলাকালে ৮৩৯টি হত্যা ও অন্যান্য মামলা থেকে ৫ হাজার ২১৮ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এটি দেখায় যে প্রাথমিক অভিযোগ ও পরবর্তী তদন্তের ফলাফলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল।


তদন্তের সবচেয়ে বড় শত্রু—দুর্বল এজাহার

ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় একটি প্রবাদ আছে—‘ভালো তদন্তের শুরু হয় ভালো এজাহার থেকে।’ অর্থাৎ অপরাধের পর প্রথম যে নথিটি তৈরি হয়, সেটি যত নির্ভুল হবে, পরবর্তী তদন্তও তত সহজ হবে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বহু মামলার ক্ষেত্রে সেই ভিত্তিটিই দুর্বল ছিল বলে এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সরকার পরিবর্তনের পর দেশে যে রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয়, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে বিচার পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই আবেগের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিশোধের প্রবণতাও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মামলায় এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যাদের ঘটনাস্থলে উপস্থিতি নিয়েই পরে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, আবার কোথাও দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাম সংযোজনের অভিযোগ তদন্তে সামনে এসেছে।

তদন্তকারীরা পরে যখন মোবাইল ফোনের অবস্থান, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য কিংবা অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখেছেন, তখন অনেক অভিযোগ টেকেনি। আর এতেই হাজার হাজার ব্যক্তির নাম তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে বাদ পড়েছে। সেই সময় মামলাগুলো সতর্কতার সঙ্গে করা হলে আজ হত্যা মামলার আসামী করা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখী হতে হতো না। তদন্তও দ্রুত এবং কার্যকর হতে পারত। 

গণআসামির সংস্কৃতি

বাংলাদেশে রাজনৈতিক মামলায় গণআসামি করার সংস্কৃতি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বড় রাজনৈতিক ঘটনার পর শত শত মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যাও কয়েক হাজারে পৌঁছেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের মামলাগুলো সেই প্রবণতাকে আরও বড় পরিসরে সামনে এনেছে।

একটি হত্যাকাণ্ডে যদি ৩০০, ৫০০ বা ৮০০ জনকে আসামি করা হয়, তাহলে তদন্ত কর্মকর্তার প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়ায় কে অপরাধী তা প্রমাণ করা নয়; বরং কে অপরাধী নন, সেটি আলাদা করা। এতে তদন্তের সময় বাড়ে, প্রকৃত অপরাধী শনাক্তের প্রক্রিয়া জটিল হয় এবং আদালতের ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ভুক্তভোগী পরিবারের। তারা দ্রুত বিচার আশা করলেও তদন্ত বছরের পর বছর দীর্ঘায়িত হয়।

যে প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি

জুলাই অভ্যুত্থানের বহু মৃত্যু নিয়ে এখনো নানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। কোনো কোনো ঘটনায় গুলির উৎস নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোথাও ভিডিও ফুটেজ অসম্পূর্ণ। কোথাও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। কোথাও আবার অভিযোগ উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংরক্ষণ করা যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্নাইপারের ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য, বিশ্লেষণ ও অভিযোগ সামনে এলেও এখন পর্যন্ত এমন কোনো চূড়ান্ত বিচারিক বা বৈজ্ঞানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি, যা এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দেয়। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এনে স্বাধীন ফরেনসিক ও বিচারিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে পরিষ্কার করা জরুরি। কারণ সত্য প্রতিষ্ঠা না হলে গুজবই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের জায়গা দখল করে নেয়।

শুধু দণ্ড নয়, বিশ্বাসযোগ্যতাও জরুরি

বিচারব্যবস্থার সাফল্য নিবর্ভর করে মানুষ বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখতে পারছে কি না তার উপর। যদি নিরপরাধ মানুষ বছরের পর বছর আসামি হয়ে থাকেন, তাহলে বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আবার যদি প্রকৃত হত্যাকারী প্রমাণের অভাবে আইনের বাইরে থেকে যান, তাহলেও বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অর্থাৎ বিচারব্যবস্থার সামনে দুটি সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত ও শাস্তি দেওয়া, অন্যদিকে নিরপরাধ ব্যক্তিকে বিচারিক হয়রানি থেকে রক্ষা করা। আইনের শাসন এই দুইয়ের ভারসাম্যের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।

যা শেখার, এখনই শেখা দরকার

জুলাই অভ্যুত্থানের মামলাগুলো বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সামনে কয়েকটি কঠিন শিক্ষা রেখে গেছে। প্রথমত, রাজনৈতিক আবেগের মুহূর্তে করা মামলাকে পরবর্তী সময়ে টেকসই করতে হলে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তি শক্ত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তদন্তকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। সিসিটিভি, মোবাইল ডেটা, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং বৈজ্ঞানিক আলামত সংগ্রহকে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করতে হবে। তৃতীয়ত, সাক্ষী সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের সংবেদনশীল মামলায় নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়। চতুর্থত, রাজনৈতিক সহিংসতার মামলায় নির্বিচারে গণআসামি করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ এই সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত প্রকৃত অপরাধীকেও আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করে।

অস্বস্তিকর প্রশ্ন, উত্তর কোথায়?

জুলাই অভ্যুত্থানের ৩৭টি হত্যা মামলায় এফআরটি জমা পড়া একদিকে একটি আইনি ঘটনা, অন্যদিকে এটি রাষ্ট্রের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে একাধিক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। যদি এসব মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সত্যিই নির্দোষ হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়াই ছিল অন্যায়। আর যদি প্রকৃত হত্যাকারীরা এখনো শনাক্ত না হয়ে থাকেন, তাহলে সেটিও সমান বড় অন্যায়। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা।
জুলাই অভ্যুত্থানের বিচারকে তাই প্রতিশোধের ভাষায় নয়, ন্যায়বিচারের ভাষায় দেখতে হবে। বিচার যেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেটানোর হাতিয়ার না হয়, আবার প্রভাবশালীদের রক্ষাকবচও না হয়ে ওঠে। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ই মনে রাখে—রাষ্ট্র কি সত্য উদ্ঘাটনের সাহস দেখিয়েছিল, নাকি সুবিধাজনক নীরবতার আড়ালে প্রকৃত অপরাধীদের হারিয়ে যেতে দিয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত অধ্যায়ের বিচার সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিবে। 

মন্তব্য করুন

Logo