বৃষ্টি হলে পানি নামতে পারছে না বলেই জলাবদ্ধতায় ডু্বছে শহর
শুভ্র মিসির
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম
রাজধানীর খিলক্ষেতের বাসিন্দা মশিউর রহমান। কাজ করেন দেশের খ্যাতনামা একটি একটি শিপিং ও মেরিন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে। বনানীতে অফিস বিধায় ৯টার অফিস ধরতে ৪০ মিনিট সময় নিয়ে বের হন প্রতিদিন। কোনো দিন একটু আধটু দেরি হয়ে যায় রাস্তা ও গাড়ির সমস্যায়। চলতি সপ্তাহে প্রথম দিন শনিবার অফিসে আসতে হয়েছিল জরুরী কাজে। ড্রাইভারকে তাই ছুটি দিয়ে সিএনজি অটোরিকশা নিয়েই বের হন। রাত থেকেই বৃষ্টি ছিল। সকালে সেটা ভারি হয়। সরল মনে রওনা দিয়ে মশিউর রহমানের সিনএনজি আর্মি স্টেডিয়াম পার হতেই থামলো। সামনের সব যানবাহন দাঁড়িয়ে। এদিকে বৃষ্টিও বাড়ছিল। মশিউর ভাবলেন কোনো সিগনাল বোধহয়, একটু পরেই ছেড়ে যাবে। কিন্তু বিধিবাম, ৩০ মিনিট পার হলেও সিএনজি নড়লো না এক চুল। পাশ দিয়ে যাওয়া কয়েকজন বলছিল— সামনে রাস্তায় পানি, অনেক গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে, এ জন্যই জ্যাম। দেখলেন অনেকেই বাস ও গাড়ি থেকে নেমে হেঁটেই রওনা দিয়েছেন। মশিউর রহমানও ছাতা আর ব্যাগ হাতে নামলেন। ভাবলেন অল্প কিছুদূর হাঁটলেই তো অফিস। কিন্তু যতই সামনে যাচ্ছেন দেখলেন পানি বাড়ছে। প্রথম ফুটপাথে উঠে ভাবলেন বাঁচা গেল। তারপর সামনে দেখলেন ফুটপাথও ডুবো ডুবো প্রায়। জুতো ভিজিয়ে যতই বনানী সিগনালের দিকে আগাতে লাগলেন পানি পায়ের গোড়ালি ছাড়িয়ে হাঁটুর উপরে ততই উঠতে লাগলো।
মাথায় ছাতা, হাতে ব্যাগ—জরুরি ফাইল ভিজে না যায় এ চিন্তায় এন্তেজার হয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছেন আরো অনেকের সঙ্গে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পের কাছে আসতেই চক্ষু চড়াক গাছ মশিউর রহমানের। পানিতে ডুবো ডুবো হয়ে বিশাল ঢেউ তুলে কোনমতে উপর থেকে নামছে গাড়িগুলো। আশপাশে ছড়িয়ে ছটিয়ে দাঁড়িয়ে কয়েকটি গাড়ি ও বাস। প্রতিদিনের চেনা বনানী সিগনালের সঙ্গে আজকের কিছুই মিলছে না তার। মনে মনে ভাবলেন—ঢাকায় বসে শিপিং কোম্পানিতে কাজ করেন অথচ জাহাজ কিংবা সমুদ্র কিছুই দেখা হয়নি জীবনে। সাতার না জানা মশিউর রহমান ভয় পেলেন। যদি ডুবে যান, যদি মরে যান রাজধানীর রাস্তায় সাগরের ঢেউ তোলা পানিতে তলিয়ে। এতসব ভাবতে ভাবতে খেয়াল করলেন পানি তার হাঁটু ছাড়িয়ে বেশ উপরে উঠে গেছে। বৃষ্টিও কমছে না এদিকে, মশিউর কিছু ভেবে পেলেন না। পানি মাড়িয়ে বনানী সিগনালের আরো কাছাকাছি গেলেন। এ সময় কোথা থেকে একটি বাস গর্জন তুলে পার হয়ে গেল একটু দূর দিয়ে। তাতেই বিশালকায় জলরাশি ধেয়ে এলো তার দিকে। তাল সামলাতে না পেরে মশিউর রহমান পড়ে গেলেন। কোমর সমান পানিকেই তার কাছে মনে হলো অনন্ত জলাধার। হাবুডুবু খেতে অনন্তকাল যেন কাটিয়ে দিয়েছেন যেন। পাশের কয়েকজন তাকে ধরে তুললেন। ময়লা পানিতে কাকভেজা মশিউর রহমানের চোখে তখন আতঙ্ক, মনে হচ্ছিল—একটু হলেই বোধহয় সাধের জীবনের এখানেই হতো সমাপ্তি!
এতক্ষন মশিউর রহমানের করুণ অবস্থার যে বর্ণনা পড়লেন প্রিয় পাঠক, তা গল্পের মতো মনে হলেও আদৌ কোনো গল্প নয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে রাজধানী ঢাকা ডুবে গিয়েছে টানা বর্ষণে। শুধু বনানী নয়—ধানমণ্ডি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল, পল্টন, পুরান ঢাকা, গুলশান, বাড্ডা, নিউ মার্কেট, উত্তরা, তেজগাঁওসহ অনেক স্থানই হয়েছিল পানিতে সয়লাব। কোথাও বেশি, কোথাও একটু বেশি। পরের দিন রবিবার এ অবস্থার উন্নতি হয়নি মোটেও। ঢাকাবাসী এতদিন বন্দর নগরী চট্টগ্রামে বৃষ্টি হলেই কোমরসমান পানি ভেঙে চলাচলের ছবি দেখে অভ্যস্ত। এ যাত্রায় চট্টগ্রাম তো ডুবেছেই, সঙ্গে ডুবেছে অতি সাধের রাজধানী ঢাকাও।
কয়েক বছর আগেও বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা হতো ঢাকা নগরীরর হাতেগোনা কয়েকটি এলাকায়। কিন্তু এখন ডুবে যায় প্রায় গোটা শহর। বলা চলে, বৃষ্টির জল শহরজুড়ে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হয়েছে আরও ৮২ মিলিমিটার। অর্থাৎ ১২ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১৫৮ মিলিমিটার। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ ঘণ্টায় ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টির পর রাজধানীর কিছু সড়ক থেকে ১৫ ঘণ্টায়ও পানি নামেনি। এর আগের বছর এক দিনে ঢাকায় ২৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিও হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৩ ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু এলাকা ডুবে যায়। মতিঝিল, কমলাপুর, গ্রিন রোড ও ঢাকা কলেজ এলাকার পানি ১২ ঘণ্টায়ও সরেনি। এবারের চিত্রও এর ভিন্ন নয়।
সিটি কর্পোরেশনের ভাষ্য হলো—বিদ্যমান ব্যবস্থায় ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি তাৎক্ষণিকভাবে এবং ৩০ থেকে ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টায় সরানো সম্ভব। কিন্তু গত দুই দিনের বৃষ্টির পরিমাণ সেই সক্ষমতার কয়েক গুণ। ফলে পানিতে থমকে যায় শহর। প্রশ্ন হচ্ছে, সমস্যা কি সক্ষমতায় নাকি ব্যবস্থাপনায়। বৃষ্টি প্রকৃতির দান, এর ওপর যখন আমাদের হাত নেই তখন আমাদের জোর দেওয়া উচিত ব্যবস্থাপনায় এবং সক্ষমতা বাড়ানোয়। কিন্তু এ দুটো খাতেই আমরা পিছিয়ে। গত এক দশকে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া হয়েছে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। কিন্তু এসব প্রকল্পের সুফল রাজধানীবাসী লাখো মশিউর রহমানরা পাননি, বরং প্রতি বর্ষায় তারা জলযটে নাকাল হয়েছেন।
ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ এক দশকে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন নালা নির্মাণ ও সংস্কার, খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের অন্যান্য কাজে অন্তত ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা খরচ করেছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এ হিসাব দুই সময়ের। ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০—এই পাঁচ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি নালা নির্মাণ ও সংস্কারে ৬০৫ কোটি ৫৪ লাখ এবং উত্তর সিটি ৭১১ কোটি টাকা খরচ করেছিল। একই সময়ে ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। সব মিলিয়ে ব্যয় হয় প্রায় ১ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার কাছ থেকে পানিনিষ্কাশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরবর্তী চার বছরে দুই সিটি আরও অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করে। দুই সময়ের অঙ্ক যোগ করলে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু এসবেরই ফলাফল শূন্য বৈ কিছু নয়। বরং জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা যে জলেই ভেসে গিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এত এত টাকা যেসব নালা নির্মাণের জন্য ব্যয় করা হয়েছে সেগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। কারণ দুই সিটি গত এপ্রিলে ঢাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ ১৪১টি স্থান চিহ্নিত করেছিল। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ১০৮ এবং দক্ষিণ সিটিতে ছিল ৩৩টি।
বৃষ্টি হলে পানি নামতে পারছে না বলেই জলাবদ্ধতায় ডু্বছে শহর। পানি নামার ব্যবস্থা হিসেব করলে দেখি—ড্রেন হয়ে খাল তারপর নদী। ঢাকার দুই সিটির খালের পরিসংখ্যান হিসেব করলে দেখা যায়—ঢাকার উত্তর সিটিতে খাল রয়েছে ২৯টি। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১০৫ কিলোমিটার। এছাড়াও খোলা ও পাইপ-নালা মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। দক্ষিণ সিটিতে রয়েছে ২৬টি খাল এবং ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি নালা-নর্দমা। কাগজ-কলমে এত এত খাল-নালা থাকলেও পানি নামার পুরো পথ কিন্তু অচলই বলা যায়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যান্ত্রিক বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কোথাও নালার মুখ বর্জ্য ও পলিতে বন্ধ, কোথাও কালভার্ট সরু, আবার কোথাও খালের সঙ্গে নালার সংযোগ বিচ্ছিন্ন। ফলে এত সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে পানি পাম্প পর্যন্ত না পৌঁছানোর কারণেই উচ্চক্ষমতার পাম্পের কার্যকারিতা থাকে না।
অতীতে দেখা গেছে, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে রাজধানীর নালা, ড্রেন, বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করা হলে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে কিছুটা রেহাই পায় নগরবাসী। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যূত্থানের পর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন দুই বছরের বেশি সময় ধরে মেয়রশূন্য। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ও বর্তমান সরকারের আমলে প্রশাসক নিয়োগ করে ঠেকার কাজ চালানো হচ্ছে। যারা জলাবদ্ধতা কিংবা নাগরিক সমস্যায় সমাধানের উপায় খোঁজার চেয়ে বরং আগের সরকারের উদ্যোগের গাফলতিগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টাকে শ্রেয় মনে করছেন।
জনসাধারণের ভাষ্য জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের কোনো উদ্যোগই ফলপ্রসু হচ্ছে না। এ কথা মিথ্যা নয়। কিন্তু নগরের বাসিন্দা হিসেবে আমাদেরও যে কিছু দায়িত্ব রয়েছে, সেটাও যেন ভুলতে বসেছি সবাই। ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে আছে আমাদের তৈরি দৈনন্দিন হাজারো বর্জ্যে। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলতে দ্বিধা নেই কারো। ফুটপাথ-রাস্তা দখল করে দোকান তৈরি করছি, ইট-বালু-রড রাখছি। খালগুলো দখল করে ইমারত তৈরি করছি। আইনত এসব দণ্ডনীয় হলোও আইনকে থোড়াই কেয়ার করি আমরা জনগণ। অল্প অল্প করে নিজেদের তৈরি করা সমস্যায় এখন আমরাই ডুবে যাচ্ছি যেন। শুধু সরকারের ব্যর্থ উদ্যোগ আর দুর্নীতির পরিসংখ্যান দিয়ে এ জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরপণ করা মোটেও সমীচিন হবে না।
দেশের প্রধান শহর ঢাকার জলযট নিয়ে লিখলে অবধারিতভাবে চলে আসে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের কথা। বর্ষায় বৈরি আবহাওয়া আর ভারি বৃষ্টিপাতে প্রতি বছরই ডুবে যায় শহর চট্টলা। চলতি জুলাই মাসের প্রথম ১১ দিনেই চট্টগ্রামে প্রায় বারোশ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এক দিনের ভারী বর্ষণের রেকর্ডও ভেঙেছে। যে কারণে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যভাগ থেকেই প্রায় প্রতিদিনই কোমরসমান পানির নিচে ডুবে ছিল চট্টগ্রাম শহর।
এ মাসেরই বৃষ্টিপাতের কোনো এক সময়ে কথা হচ্ছিল চট্টগ্রামে কর্মরত ঢাকার বড় একটি দৈনিকের সাংবাদিকের সঙ্গে। তিনি জানালেন, বৃষ্টি এলে চট্টগ্রাম ডুববে, সেটা অল্প হোক কিংবা বেশি, নগরবাসী এটা নিয়তি ভেবেই দিন পার করছেন। তিনি হিসেব করে জানালেন, গত চার বছরে অন্তত ৩০ বার ডুবেছে চট্টগ্রাম নগর। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ছয়বার, ২০২৩ সালে ১৪ বার এবং ২০২২ সালে ১০ বার জলাবদ্ধতা দেখা গেছে, যদিও ২০২৫ সালে তুলনামূলক কিছুটা স্বস্তি মিলেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। বরং প্রায় প্রতিদিনই ডুবেছে।
প্রায় ৭৫ লাখ বাসিন্দার চট্টগ্রাম মহানগর প্রাকৃতিকভাবে সমুদ্র, পাহাড়, নদী ও ঢালুভূমির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। কিন্তু শহরটিতে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে পুরোটাই। গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা ৩০ মিনিট থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং পানির গভীরতা অনেক ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৫০ থেকে ১ দশমিক ৬০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। বর্ষা মৌসুমে মাত্র ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই নগরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এলাকা প্লাবিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন ও তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় অল্প সময়ে অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারছে না শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা।
সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে নগরের চকবাজার, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, প্রবর্তক মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো চলে যায় পানির নিচে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে এসব জায়গাসহ অনেক স্থানেই কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমর বা বুকসমান পানিতে ডুবে ছিল সড়ক। চট্টগ্রামের স্থানীয় ওই সাংবাদিক জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক দশক ধরে সিডিএ, চসিক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে মোট ৪টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। যার মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দুটি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। গত মার্চ পর্যন্ত এসব প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। কিন্তু কোনো প্রকল্পই এখনো শতভাগ শেষ হয়নি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প সিডিএর ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’। ২০১৭ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সংশোধন করে প্রকল্প ব্যয় আরও ৩ হাজার ১০ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ১৬৩ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ, ১১৫টি সেতু ও কালভার্ট, ২৭টি সিল্ট ট্র্যাপ, ছয়টি রেগুলেটর নির্মাণ, ২৩ দশমিক ২০ কিলোমিটার নতুন নালা, ৩৬ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার খালের পাশে সড়ক নির্মাণ ও ৯০ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নালা সম্প্রসারণ। ২০১৭ সালে যখন এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় তখন মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২১ সাল। পরবর্তীতে প্রথম দফা দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে তা করা হয় ২০২৩ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফায় আরও দুই বছর বাড়িয়ে করা হয় ২০২৫ সাল পর্যন্ত। এরপর তৃতীয় দফায় মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ পর্যন্ত। কিন্তু তৃতীয় দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ না হওয়ায় আরও এক বছর বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এটি এখন এক দশকের দীর্ঘসূত্রতায় আটকা পড়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ৩৬টি খালের মধ্যে ৩৪টির খনন শেষ। কিন্তু জামাল খান ও হিজরা খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশের কাজ বাকি রয়েছে৷ এর মধ্যে হিজরা খালের ৬০ শতাংশ ও জামালখান খালের ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
এরই মধ্যে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে আরও দুটি নতুন মেগা প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। প্রাথমিকভাবে এই দুই প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। প্রথম প্রকল্পটি হলো চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন মেগা প্রকল্পের আওতাভুক্ত ৩৬টি খালের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ। চলমান এই প্রকল্পের কাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর খালগুলো চসিকের কাছে হস্তান্তর করা হবে। হস্তান্তরের পর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অর্থায়নের অভাবে খালগুলো যাতে আবারও নাব্যতা না হারায়, সেজন্য আগেভাগেই একটি রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ১১০ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালগুলোর পরবর্তী পাঁচ বছরের পলি ও বর্জ্য অপসারণের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩২২ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বছরেই ১১২ কোটি টাকা খরচের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত এই বাজেট পুনর্বিবেচনা করলে ব্যয় কমপক্ষে ১ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিন ধাপের এই পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে পলি ও বর্জ্য অপসারণ; দ্বিতীয় ধাপে কাঠামোগত উন্নয়ন ও নাগরিক পর্যবেক্ষণ এবং তৃতীয় ধাপে ডিজিটাল মনিটরিং, বন্যা পূর্বাভাস ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর বাইরে থাকা বাদ পড়া ২১টি খাল নিয়ে। ৩৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালগুলোর সংস্কার ও দুই পাশে প্রতিরোধ দেয়াল (গাইড ওয়াল) নির্মাণের জন্য ৩ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে মূল কাজের বাইরে জমি অধিগ্রহণে ৫৮ কোটি, টাইডাল রেগুলেটর ও পাম্প স্টেশনে ৫৭ কোটি, সৌন্দর্যবর্ধনে ৭৭ কোটি এবং পরিবেশ ও জিআইএস ব্যবস্থাপনায় ৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রামের পানি নিষ্কাশনে গৃহিত এমন অনেক প্রকল্প ও উদ্যোগের কথা শোনা যায়। কর্তাব্যাক্তিরাও বুক ফুলিয়ে গালভরা নানান আশার কথা শোনান। কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে না কিছুই। বর্তমান সিটি প্রশাসনকে যদিও বেশ আন্তরিক মনে করছেন চট্টগ্রামের ওই সাংবাদকর্মী। কিন্তু সংবাদ ও সম্পর্কের খাতিরে অনেক কথাই হয়তো বলতে বা লিখতে পারেন না চট্টগ্রামের স্থানীয় সাংবাদিকরা। কিন্তু কাজে বেরিয়ে যখন কোমর সমান পানি ভাঙতে হয় তখন সাধারণ জনগণের মতো তারাও বলেন, এত এত প্রকল্পের সুফল আদৌ কি জীবদ্দশায় ভোগ করা যাবে?
মন্তব্য করুন

