১৯৮৭ সালে নূর হোসেন শরীরে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে জন্ম দেন অসাধারণ শ্লোগানের।
স্লোগান থেকে অশ্লীলতা: ভাষার এক বিপন্ন যাত্রা
নিশাত সুলতানা
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা ‘, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ র মতো কালজয়ী শ্লোগানের যখন জন্ম হয়, তখন আমরা পৃথিবীতে আসিনি। ১৯৮৭ সালে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ এর মতো অসাধারণ শ্লোগানের যখন জন্ম হয়, তখন আমরা অনেক ছোট। কিন্তু এই শ্লোগানগুলো কোন মন্ত্রবলে যেন আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গেছে! এই শ্লোগানগুলো যতবার শুনি, রক্তে এক ধরনের অদ্ভূত শিহরণ অনুভব করি।
‘স্লোগান’ কিন্তু শুধু আবেগের প্রকাশ নয়। মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ, স্বপ্ন আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা একসময় স্লোগান হয়েই ঝড় তোলে আর ছড়িয়ে পড়ে শহরে, গ্রামে, পথে-প্রান্তরে। স্লোগানের শক্তি এতো বেশী যে এর প্রতিধ্বনি ইতিহাস বদলে দেয়ার ক্ষমতা রাখে, অশ্রু ভেজা রাতকে পরিণত করতে পারে বিজয়ের প্রভাতে। স্লোগানের কোনো অভিধান নেই, নেই ব্যাকরণ। বিপ্লব থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্লোগানেরা জন্ম নেয়।
পৃথিবীতে সবচেয়ে ক্ষুরধার আর কার্যকর অস্ত্রের নাম ভাষা। ভাষা যেমন যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যমে, একইভাবে কাউকে শোষণ, দমন কিংবা নির্যাতনের মোক্ষম হাতিয়ার ভাষা। ভাষাতে মানবতার জয়, ভাষাতেই পরাজয়। প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে তাই জুড়ি নেই ভাষার। যেকোনো প্রতিবাদে ভাষা যেভাবে মানুষকে উজ্জ্বীবিত করে, অন্য কোনোভাবে সেটি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের ভাষার ইতিহাস। পৃথিবীতে খুব কম জাতি আছে, যারা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য রক্ত দিয়েছে। অনেক দাম দিয়ে কেনা আমাদের এই বাংলাভাষা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে ভাষা আমাদের আত্মপরিচয়, মর্যাদা এবং প্রতিরোধের প্রতীক। সেই উত্তরাধিকার বুকে নিয়েই আমরা দেখেছি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, এমনকী ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। প্রতিটি আন্দোলন স্লোগানের মোড়কে আমাদের উপহার দিয়েছে প্রতিবাদের অনন্য সব ভাষা। সেই ভাষায় ছিল প্রতিবাদ, ছিল সাহস, ছিল ব্যঙ্গ, ছিল শাসকের প্রতি তীব্র প্রত্যাখ্যান; কিন্তু একই সঙ্গে ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক ঔজ্জ্বল্য। এসব স্লোগান কেবল আন্দোলনের মুহূর্তকে উজ্জীবিত করেনি; বরং সে স্লোগানগুলো আমাদের ইতিহাসের গর্বিত অংশ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্য ২০২৪ সালের জুলাই পরবর্তী সময়ে স্লোগানের ভাষায় আমরা আমাদের এতোদিনের সাংস্কৃতিক সেই ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখতে পারিনি। গত দুই বছরে জুলাই আন্দোলনের পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে আমরা যা পেয়েছি, তাতে লজ্জায় আমাদের মাথা নত হয়ে আসে। জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষে যে ভাষার চর্চা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তা আমাদের ভাষার গর্বিত ঐতিহ্যের সঙ্গে নির্মম বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক অবস্থান, মতাদর্শ কিংবা ক্ষমতার প্রশ্নে মানুষ বিভক্ত হতে পারে; এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিকতা কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা যখন ক্রমাগত অশ্লীলতা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, ঘৃণা এবং বিশেষভাবে নারীর প্রতি অবমাননার ওপর ভর করে, তখন সেটি আর শুধু রাজনৈতিক ভাষা থাকে না; সেটি একটি সমাজের নৈতিক স্থলনের দলিল হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে ভাষার এই অবক্ষয়ে কার রাজনৈতিক লাভ হয়েছে কিংবা কে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই হিসাব ইতিহাস নিশ্চয়ই একদিন করবে। কিন্তু আজ নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই সংকটে পরাজিত আর লজ্জিত হয়েছে আমাদের গর্বের বাংলা ভাষা আর পরাজিত হয়েছে ভাষায় নারীর সম্মান। যে ভাষাকে মর্যাদা দিতে একদিন মানুষ প্রাণ দিয়েছিল, সেই ভাষাই আজ বহুক্ষেত্রে ঘৃণা, অপমান ও সহিংসতার বাহক হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, প্রতিপক্ষকে অপমান করার জন্য আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়সহ প্রায় প্রতিটি অভিধানে এখনও সবচেয়ে সহজ এবং সবচেয়ে প্রচলিত অস্ত্র হলো নারী। যেকোনো ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে ছোট করতে নারীর শরীর, যৌনতা কিংবা সম্পর্ককে ব্যবহার করা হয় অবলীলায়। যেন মানুষকে আঘাত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নারীকে অপমান করা। এই প্রবণতা কেবল ভাষার দারিদ্র্যের পরিচয় নয়; এটি আমাদের গভীরভাবে প্রোথিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার নির্মম প্রকাশ।
ভাষা এখন আর কেবল রাজনৈতিক মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কনটেন্ট, মিম, মন্তব্য, এমনকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কথোপকথনেও একই ধরনের শব্দ ও বাক্য স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথাকথিত অ্যালগরিদম উত্তেজনায় পরিপূর্ণ অশ্লীল ভাষাকে যত বেশি ছড়িয়ে দিচ্ছে, ততই সংযত, সুন্দর আর যুক্তির ভাষা জনপরিসর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে নোংরা ভাষা চারিদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে রাজত্ব করছে।
আমি নিশ্চিত, প্রতিবাদের যে ভাষা মানুষকে সম্মান জানাতে পারে না, নারীকে অসম্মানিত ও অবদমিত করে, সে ভাষা নিশ্চিতভাবেই একদিন ইতিহাসের আবর্জনায় স্থান করে নিবে। নোংরা ভাষা কিংবা স্লোগানের প্রতি উত্তর হিসেবে যে নোংরা ভাষার জন্ম হচ্ছে তাও একদিন নিশ্চয়ই আস্তাকূড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। পৃথিবীর ইতিহাস তার সোনালি পাতায় সবসময় সত্য আর সুন্দরকেই স্থান করে দিয়েছে। আর যা কিছু নোংরা আর কদর্য, তাকে ঘৃণার ট্রেডমার্ক হিসেবে ইতিহাসের ময়লাস্তুপে ফেলে দিয়েছে।
ভাষা একটি জাতির সংস্কৃতির আয়না। কিন্তু ভাষা শুধু সংস্কৃতির নয়, নৈতিকতারও আয়না। আমরা যে শব্দ উচ্চারণ করি, যে স্লোগান লিখি, যে মন্তব্য করি সবকিছুই আমাদের মূল্যবোধের পরিচয় বহন করে। তাই ভাষার অবক্ষয় কখনোই কেবল ভাষার সংকট নয়; এটি সমাজের মানবিক চেতনার সংকট। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিবাদ কখনো শুধু ক্রোধের ছিল না; ছিল বিবেকেরও। তাই প্রতিবাদের ভাষা দৃঢ় হতে পারে, তীক্ষ্ণ হতে পারে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন হতে পারে; কিন্তু তা কখনোই মানুষের মার্যাদা কিংবা নারীর মর্যাদা হরণ করে শক্তিশালী হতে পারে না। যে প্রতিবাদ নারীর অসম্মানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সে প্রতিবাদের নৈতিক ভিত্তি হয় দূর্বল। তাই যেকোনো সময় তা ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য।
আমরা যদি সত্যিই আমাদের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাসের উত্তরসূরি হতে চাই, তবে শুধু বাংলা ভাষাকে ভালোবাসলেই চলবে না; ভাষার ভেতরের মানবিকতাকেও রক্ষা করতে হবে। কারণ মাতৃভাষার প্রকৃত সম্মান তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন সেই ভাষায় কোনো মানুষকে, কোনো নারীকে অপমান করা হবে না, যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে নারীর মর্যাদাকে বলি দেওয়া হবে না। প্রতিবাদের ভাষা হতে হবে মানবিকতার ভাষা। যে ভাষার জন্য আমরা জীবন দিয়েছি, সেই ভাষা যেন আর কখনো নারীর মর্যাদা আর মানবিকতাকে কেড়ে নেওয়ার অস্ত্র না হয় এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।
নিশাত সুলতানা
লেখক ও উন্নয়নকর্মী
মন্তব্য করুন

