রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার ট্রিয়ানা নয়নতারা হাফিজ
অভিযোগ থেকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা
ট্রিয়ানা নয়নতারা হাফিজের অভিজ্ঞতা, বিজিবির প্রতিক্রিয়া এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন
শরীফুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম
“…বাস্তবতা হলো, এর আগেও একই চেকপোস্টে আমি হয়রানি ও অপমানজনক আচরণের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। তাই এই ঘটনার সময় আমি বিস্মিত হইনি; বরং আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন পূর্বপরিচিত একটি অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি দেখছি। একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী হিসেবে আমি বহুদিন ধরেই বুঝতে শিখেছি যে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বৈষম্য ও অসম আচরণের মুখোমুখি হতে হতে পারে। কিন্তু যখন সেই একই অভিজ্ঞতা বারবার রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের কাছ থেকেই আসে, তখন সেটি আর শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অপমানের ঘটনা থাকে না…”
আবার লিখেছেন, “…এই মুহূর্তটি আমার জন্য ছিল পুরো ঘটনার সবচেয়ে অপমানজনক অংশগুলোর একটি। একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী হিসেবে আমার শরীর, পোশাক এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে জনসমক্ষে এভাবে উপহাসের বিষয় বানানো আমার মর্যাদাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। আমি অনুভব করছিলাম যেন আমাকে একজন মানুষ হিসেবে নয়, বরং বিনোদনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। উপস্থিত অন্য সদস্যরা কোনো মন্তব্য করেননি বা পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করেননি।”
গত ১৮ জুন ‘বাংলাদেশে ফেমিনিস্ট আর্কাইভসে’ ট্রিয়ানা নয়নতারা হাফিজ এভাবেই তুলে ধরেন ১৭ জুন কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা বিজিবি চেকপোস্টে শুধুমাত্র একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী হওয়ায় তার উপর বিজিবি সদস্যদের করা অবমাননাকর অভিজ্ঞতার কথা।
একজন নাগরিক যখন রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ তোলেন, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প থাকে না; সেটি রাষ্ট্র, নাগরিক অধিকার এবং জবাবদিহিতার বিষয়গুলোকে নতুন করে মূল্যায়নের ক্ষেত্র তৈরি করে। আবার একই সঙ্গে যখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে এবং ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করে, তখন সেটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেয়। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভুলের অস্তিত্ব যেমন বাস্তবতা, তেমনি সেই ভুল সংশোধনের সক্ষমতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
ট্রান্সজেন্ডার নারী, অ্যাক্টিভিস্ট ও মডেল ট্রিয়ানা নয়নতারা হাফিজের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সেই বাস্তবতারই একটি আলোচিত উদাহরণ।
১৭ জুন ২০২৬ সালে কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যা বিজিবি চেকপোস্টে তিনি যে অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন, সেখানে উঠে আসে একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী হিসেবে পরিচয়ভিত্তিক জিজ্ঞাসাবাদ, অসম্মানজনক ভাষা, শরীরকেন্দ্রিক কৌতূহল এবং অপমানবোধের বিবরণ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা ছিল না; একই চেকপোস্টে অতীতেও তিনি অনুরূপ আচরণের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ফলে তার কাছে ঘটনাটি ব্যক্তিগত অপমানের চেয়েও বেশি—রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের একটি অংশের মধ্যে বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
এই অভিজ্ঞতার বর্ণনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা। একজন সশস্ত্র নিরাপত্তা সদস্যের সামনে একজন একাকী নাগরিকের ভয়, নিজের পরিচয় ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হওয়ার চাপ এবং জনসমক্ষে মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার অনুভূতি—এসব কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় নয়; মানবাধিকার আলোচনায় এগুলোকে মর্যাদা, সমতা এবং বৈষম্যহীন আচরণের প্রশ্ন হিসেবেই দেখা হয়।
তবে ঘটনাটির আরেকটি দিকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। লেখাটি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসার পর বিজিবির ৩০ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার ট্রিয়ানার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগটি অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করা হয় এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাসও দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। কারণ নাগরিকদের অনেক অভিযোগই তদন্তের পর্যায়ে পৌঁছায় না, আবার অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগকারীরা প্রতিকার পাওয়ার পরিবর্তে আরও হয়রানির শিকার হবেন কি না তা নিয়ে শঙ্কায় থাকেন। সেই বিবেচনায় একটি অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি এবং যদি তা সত্যিই বাস্তবায়িত হয়ে থাকে, তাহলে সেটি ইতিবাচক প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি দিক নির্দেশ করে।
তবে এখানেই আলোচনা শেষ হয়ে যায় না। কারণ প্রশ্নটি কেবল একজন সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নয়; তার চেয়ে বড় প্রশ্ন এমন আচরণ কেন ঘটল। যদি একজন বিজিবি সদস্য একজন ট্রান্সজেন্ডার নাগরিকের সঙ্গে কীভাবে পেশাদার আচরণ করতে হয়, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত সংবেদনশীলতা বা প্রশিক্ষণ না পেয়ে থাকেন, তাহলে এটি ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণেরও একটি ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠী আইনগতভাবে স্বীকৃতি পেলেও বাস্তব জীবনে ট্রান্সজেন্ডার ও জেন্ডার ডাইভার্স মানুষ এখনও কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহন, নিরাপত্তা তল্লাশি এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের সময় বৈষম্যের মুখোমুখি হন। এই বৈষম্য সবসময় সরাসরি প্রকাশ্য সহিংসতার পর্যায়ে ঘটে থাকে ঠিক তা বলা যাবে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি, অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল এবং পরিচয়ভিত্তিক আচরণের মাধ্যমে সেটা প্রকাশ পায়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায়ও দেখা গেছে, ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠী নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের সময় অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ, পরিচয় নিয়ে সন্দেহ এবং অসম্মানজনক আচরণের ঝুঁকিতে থাকেন। ফলে বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের নয়, একই সঙ্গে বৈশ্বিক মানবাধিকার আলোচনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রিয়ানার দ্বিতীয় লেখাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সেখানে তিনি কেবল কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি ঘটনাটিকে একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, জেন্ডার-সংবেদনশীল আচরণবিধি, তল্লাশির মানসম্মত নির্দেশিকা (SOP), নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, কমিউনিটির সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ এবং আচরণগত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মতো কিছু নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরেছেন।
এই সুপারিশগুলো শুধু ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর জন্য নয়; সামগ্রিকভাবে নাগরিকবান্ধব নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও প্রাসঙ্গিক। কারণ, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা প্রদান— রাষ্ট্রের কাছে দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সেটি হলে সমালোচনা এবং সহযোগিতার স্বীকৃতি—দুটিই একসঙ্গে সম্ভব। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভুলের সমালোচনা করা যেমন নাগরিকের অধিকার, তেমনি সেই প্রতিষ্ঠান ভুল সংশোধনের উদ্যোগ নিলে সেটিকে স্বীকৃতি দেওয়াও একটি গঠনমূলক নাগরিক সংস্কৃতির অংশ। ফলে এই ঘটনাটি কেবল বিভেদ, বৈষম্যে গল্প হিসেবে না থেকে, হয়ে উঠেছে সংলাপ, জবাবদিহি এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবেও।
বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের আলোচনা এখনও চলমান। সেই পথে আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রশাসনিক সংস্কৃতি, মাঠপর্যায়ের আচরণ এবং মানবিক সংবেদনশীলতার ইতিবাচক পরিবর্তন। একজন নাগরিকের পরিচয়, লিঙ্গ, ধর্ম, ভাষা কিংবা সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, রাষ্ট্রের প্রতিনিধির সামনে তার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত—তিনি একজন সমমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক।
ট্রিয়ানা নয়নতারা হাফিজের অভিজ্ঞতা এবং তার পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে নিয়ে এসেছে—রাষ্ট্রের শক্তি কি কেবল আইন প্রয়োগে, নাকি ভুল স্বীকার করে আরও ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার সক্ষমতায়ও? সম্ভবত এই ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সেখানেই নিহিত।
মন্তব্য করুন

