চাইনিজ সাবমেরিন ক্যাবলে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি
যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে ছাড়পত্র আটকে রেখেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
এফ সিদ্দিকী
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৪ এএম
বিনিয়োগকারীদের দাবি, অভিযোগ সঠিক নয়; সিঙ্গাপুর-মিয়ানমার-কক্সবাজার পর্যন্ত ৩,৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সাবমেরিন ক্যাবলে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেম কনসোর্টিয়ামের বিনিয়োগ ২,৫০০ কোটি টাকা।
ব্যান্ডউইথ ব্যবসার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার পর্যন্ত সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করছে চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে মেরিন নেটওয়ার্ক (এইচএমএন)। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের তিন প্রতিষ্ঠান—সিডিনেট, সামিট কমিউনিকেশনস এবং মেটাকোর সাবকম লিমিটেড। স্বরাষ্ট্র ও ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সাবমেরিন ক্যাবল জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এটি চালু হলে বাংলাদেশের তথ্য পাচারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই বাংলাদেশ অংশে কাজের জন্য নিরাপত্তা ছাড়পত্র আটকে রেখেছে সরকার।
মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কারণেই বেসরকারি খাতের এই সাবমেরিন প্রকল্পটি আটকে আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় । তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সমঝোতার আলোকে মিয়ানমার হয়ে আসা এই সাবমেরিন গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী। টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই বিষয়টি ঝুলে আছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না, কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বর্তমান টেলিযোগাযোগমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায়) ফয়েজ আহমেদ তৈয়াব সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “চাইনিজদের এ সাবমেরিন নিয়ে একটি দেশের আপত্তি আছে।” বর্তমান সরকারও কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় বেসরকারি খাতের এই সাবমেরিন প্রকল্পের কাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেটাকোরের পরিচালক এবং আইএসপিএবির সভাপতি এম এ হাকিম। তিনি বলেন, নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি নেই। কারণ, এ সাবমেরিনের অ্যাকটিভ অংশ বা ল্যান্ডিং স্টেশনে মার্কিন ও ইউরোপীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এ জন্য বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেম কনসোর্টিয়াম (তিন কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত) গত ১৪ ডিসেম্বর নকিয়া-ইনফিনেরার সঙ্গে সাবমেরিন লাইন টার্মিনাল ইকুইপমেন্ট (এসএলটিই) চুক্তি করেছে।
তিনি বলেন, চীনা কোম্পানি নিয়ে যদি প্রশ্ন ওঠে, তাহলে বলতে হয় বাংলাদেশের চারটি মোবাইল অপারেটরই হুয়াওয়ের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। সে ক্ষেত্রে সবাই তথ্য ফাঁসের ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহে (জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে) আবারও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। কারণ, এভাবে মাসের পর মাস বসে থাকা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ সাবমেরিন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম হোসেন বলেন, চাইনিজ সাবমেরিন নিয়ে তারাও উদ্বিগ্ন। এ ক্যাবলের নিরাপত্তা নিয়ে তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
জানা গেছে, সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়াবকে ১৪ ডিসেম্বর এসএলটিই চুক্তি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, ওই অনুষ্ঠানে সরকারের কেউ অংশ নেবেন না।
বিদেশি সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ব্যবসা পরিচালনার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) লাইসেন্স দেয়। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল বারী সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেম কনসোর্টিয়ামের চাইনিজ সাবমেরিন ব্যবহারের নিরাপত্তার বিষয়টি স্বরাষ্ট্র ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় দেখছে। এর বেশি কিছু তিনি জানেন না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ অংশে ক্যাবল স্থাপনের জন্য সমুদ্রসীমায় ব্লু নেভিগেশন বা জাহাজ চলাচলের অনুমোদনের বিষয়ে বিটিআরসি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে। এরপরের বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখছে।
চীনা প্রতিষ্ঠান এইচএমএনের এ ক্যাবলের নাম দেওয়া হয়েছে সিগমা। সিঙ্গাপুর থেকে মিয়ানমার হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ৩ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ক্যাবল সাগরের তলদেশ দিয়ে আসবে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ১৬০ কিলোমিটার। এ সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হতে বাংলাদেশের তিন কোম্পানি প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে তিন জোড়া ক্যাবলে মোট ৫০ হাজার জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হুয়াওয়ের এ ক্যাবলের বড় অংশ মিয়ানমারের অর্থনৈতিক অঞ্চলের অগভীর সমুদ্র এলাকায় স্থাপন করা হবে। এতে ক্যাবলটি ঝুঁকির মধ্যে থাকবে এবং যেকোনো মেরামতের জন্য মিয়ানমার সরকারের অনুমতি নিতে হবে।
সরকারি তথ্য-উপাত্তে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিটিআরসির লাইসেন্সের শর্ত পূরণ না করে হুয়াওয়ের সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হলে বাংলাদেশ একটি ‘আনট্রাস্টেড’ ক্যাবল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার, যেমন গুগল, ফেসবুক ও অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিরাপদ সংযোগ স্থাপনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়বে। এর ফলে বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতি উভয়ই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তবে এ বিষয়ে বারবার চেষ্টা করেও স্বরাষ্ট্রসচিব বা অন্য কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র, টেলিযোগাযোগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কয়েক দফা চিঠি চালাচালি হয়েছে। ওই চিঠিগুলোতে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের জলসীমায় জাহাজ চলাচলের বিষয়টি থাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এতে সম্পৃক্ত হয়েছে।
মেটাকোরের পরিচালক এম এ হাকিম বলেন, এখানে জাতীয় নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি নেই। এ বিষয়ে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে এবং তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি উদ্বেগ দূর করতে বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেম কনসোর্টিয়াম সাবমেরিন লাইন টার্মিনাল ইকুইপমেন্ট (এসএলটিই) সরবরাহের কাজ মার্কিন প্রযুক্তিনির্ভর নকিয়া-ইনফিনেরাকে দিচ্ছে, যা আগে হুয়াওয়ের করার কথা ছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ফিনল্যান্ডের কোম্পানি নকিয়া এক ঘোষণায় জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসে-ভিত্তিক কোম্পানি ইনফিনেরাকে পুরোপুরি অধিগ্রহণ করেছে। নকিয়ার ভাষ্য, ইনফিনেরা অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কে উদ্ভাবনী প্রযুক্তির একটি 'পাওয়ারহাউস' এবং ডেটা সেন্টারের প্রযুক্তিগত রূপান্তরে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
টেলিকম ও ডিজিটাল খাতে বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে টেকনোলজিস। ২০১৮-১৯ সাল থেকে জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র কোম্পানিটির ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে।
২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে হুয়াওয়ে তাদের সাবমেরিন ব্যবসা চীনা হ্যাংটং গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরে এর নতুন নাম রাখা হয় এইচএমএন টেকনোলজিস কোম্পানি লিমিটেড। কোম্পানিটির ৮১ শতাংশ শেয়ারের মালিক হ্যাংটং গ্রুপ এবং বাকি ১৯ শতাংশ শেয়ার যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি নিউ সেক্সসনের।
সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল পিএলসি বর্তমানে সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫ ক্যাবলের মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করছে। এ দুটি ক্যাবলের মোট সক্ষমতা ৭ হাজার ২০০ জিবিপিএস, যার মধ্যে বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ২০০ জিবিপিএস।
সরকারি এই কোম্পানি আগামী বছরের মধ্যে আরও একটি সাবমেরিন ক্যাবল—সি-মি-উই-৬-এর সঙ্গে যুক্ত হবে। এ ক্যাবল কক্সবাজার-সিঙ্গাপুর এবং কক্সবাজার-মুম্বাই হয়ে ফ্রান্স পর্যন্ত যাবে। তখন মোট ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বেড়ে হবে ৩০ হাজার জিবিপিএস। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ব্যান্ডউইথের চাহিদা ৫০ হাজার জিবিপিএসে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একটি গাইডলাইনের মাধ্যমে সামিটসহ তিনটি কোম্পানিকে সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া হয়। এ জন্য তাদের কাছ থেকে ১০ কোটি টাকা ফি নেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, এই তিন কোম্পানির সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ততা ছিল। এর মধ্যে সামিট গ্রুপ বিশেষভাবে আলোচিত। এ কারণেই সরকার বিষয়টিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে দেশে একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল পিএলসি বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের সংযোগ পরিচালনা করছে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়নি।
মন্তব্য করুন

