Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

মব, রাজনৈতিক সহিংসতা, গ্রেফতার ও সীমান্ত উত্তেজনায় বাড়ছে উদ্বেগ

ফরিদপুরে ‘ডিবির হেফাজতে’ ছাত্রলীগ কর্মী ইশতিয়াকের আটকের মুহূর্তের ভিডিও ফুটেজ, এর পর তার মৃত্যু হয়

কাভার স্টোরি

মানববাধিকার পরিস্থতি প্রতিবেদন

মব, রাজনৈতিক সহিংসতা, গ্রেফতার ও সীমান্ত উত্তেজনায় বাড়ছে উদ্বেগ

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম

গতকাল (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের চেয়ে উন্নতি করেছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তবে ধর্ষণের মামলা অতীতের চেয়ে 'একটু বেশি' হয়েছে উল্লেখ করে এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আগে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন হস্তক্ষেপের কারণে ধর্ষণের ভুক্তভোগীরা মামলা করতে থানায় যেত না বা যেতে পারত না। এখন থানায় গেলেই মামলা রেকর্ড করা হয়। অনলাইনে জিডি, এফআইআর দায়ের করতে পারে। এখানে কোনো হস্তক্ষেপ নেই।

মহান জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য আমাদের আশাবাদি করলেও দেশের প্রধান ২০টি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে করা মনবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন-এমএসএফ-এর জুনের ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং মাসিক প্রতিবেদন’ বলে ভিন্ন কথা। প্রতিবেদনটি বলছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক দিকে মোড় নিয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, অস্বাভাবিক হারে গ্রেফতার, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার, সীমান্তে উত্তেজনা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই মে মাসের তুলনায় অবনতি ঘটেছে। এই বহুমাত্রিক সংকট দেশে আইনের শাসন, নাগরিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সুরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুনে রাজনৈতিক, সামাজিক, আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—সব ক্ষেত্রেই চাপ বেড়েছে। যদিও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ও গ্রেফতার না হওয়া এবং সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি হামলা কিছুটা কমে আসা কিছুটা ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তবে সামগ্রিক চিত্রে তা সংকটকে প্রশমিত করার মতো নয়। 

মব সহিংসতা

জুন মাসেও মব সহিংসতা দেশের অন্যতম বড় উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে।৭৮ টি মব সংহিসতার ঘটনায় মে মাসে ৩২ জন নিহতের বিপরীতে জুনে নিহত হয়েছেন ৩৩ জন। আর আহতের সংখ্যা এক মাসে ৭১ থেকে বেড়ে ১২৬ জনে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি। 

এমএসএফ বলছে, চুরি, ছিনতাই, হত্যা, জমি বিরোধ, মাদক ব্যবসা, এমনকি ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন তাৎক্ষণিক বাকবিতণ্ডাকে কেন্দ্র করে, আর হত্যার অভিযোগে সংঘটিত গণপিটুনিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। সংস্থাটির মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ড কার্যত বিচারবহির্ভূত হত্যার শামিল।

বেড়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা ও গ্রেফতার

জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আহতের সংখ্যা ১৯৩ থেকে বেড়ে ৩০৩ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে দলীয় সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৩ থেকে বেড়ে ৭ জন হয়েছে। অজ্ঞাত ব্যক্তিদের হামলায় নিহতের সংখ্যাও ৩ থেকে ৭-এ উন্নীত হয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ ও পারস্পরিক সংঘর্ষে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে অজ্ঞাত হামলাকারীদের হাতে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনাও বেড়েছে, যা রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন মাত্রা নির্দেশ করছে।

সরকার পতন-পরবর্তী মামলায় গ্রেফতার সাত গুণ

সবচেয়ে আলোচিত সূচকগুলোর একটি হলো ২০২৪ সালের সরকার পতনের পর দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে গ্রেফতারের সংখ্যা। মে মাসে যেখানে এমন মামলায় ৬৫ জন গ্রেফতার হয়েছিলেন, জুনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭৪ জনে। এমএসএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা দমনমূলক ব্যবস্থার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেফতার কমে ৫ থেকে ২ জনে নেমে এসেছে।

হেফাজতে মৃত্যু ও কারাগারের চিত্র উদ্বেগজনক

জুন মাসে প্রথমবারের মতো ডিবি হেফাজতে একজনের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা ৭ থেকে বেড়ে ৯ জন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহতের সংখ্যাও ১ থেকে বেড়ে ৩ জন হয়েছে। যদিও আটক ব্যক্তির সংখ্যা কমেছে, তবুও হতাহতের এই ঊর্ধ্বগতি নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত বহন করে।

অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা
জুন মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মোট ৬৫টি নামীয় ও অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মে মাসে এই সংখ্যা ছিল ৫৩। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে। উদ্ধার হওয়া লাশের অধিকাংশই নদী, সড়ক, রেললাইন, সেতুর নিচ, ফসলি জমি কিংবা পরিত্যক্ত স্থান থেকে পাওয়া গেছে। কিছু মরদেহ গলাকাটা, হাত-পা বাঁধা কিংবা বস্তাবন্দী অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, যা অপরাধ তদন্তের সক্ষমতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি লাশ উদ্ধার হয়েছে ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের।

সীমান্তে আবারও পুশ-ইন
সীমান্তে পুশ ইন চলছেই

সীমান্ত পরিস্থিতিতে একদিকে কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও অন্যদিকে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জুনে সীমান্তে নিহতের সংখ্যা ১০ থেকে কমে ৬ হলেও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে পুশ-ইনের চেষ্টায়। মে মাসে যেখানে এমন কোনো ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি, জুনে অন্তত ৪২৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সময়ে আরাকান আর্মির হাতে অপহরণের ঘটনাও বেড়েছে। সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণ, বিএসএফের গুলিতে হতাহত এবং আরাকান আর্মির তৎপরতা সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়েছে।

বৃদ্ধি পেয়েছে সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও জুনে বেড়েছে। প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ২ থেকে বেড়ে ৫-এ দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে চাঁদপুরে একটি মাজারকেন্দ্রিক সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। এমএসএফের মতে, এসব ঘটনা সামাজিক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহনশীলতার অবনতির ইঙ্গিত দেয়।

বদলেছে সাংবাদিকের উপর চাপের ধরন

সাংবাদিকের ওপর সরাসরি হামলা, নির্যাতন ও হুমকির ঘটনা ৩৪ থেকে কমে ১৯-এ নেমে এসেছে। আইনি হয়রানিও ১৩ থেকে ৬-এ কমেছে। তবে একই সময়ে সাংবাদিক গ্রেফতারের সংখ্যা ১ থেকে বেড়ে ৩ হয়েছে। এমএসএফের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে শারীরিক হামলার পরিবর্তে প্রশাসনিক ও আইনি উপায়ে চাপ প্রয়োগের প্রবণতা বাড়ছে।

ধানমন্ডি ৩২-এ সাংবাদিকদের উপর হামলা করে জামায়েতের কর্মীরা 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাময়িক স্বস্তি

জুন মাসে ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনে কোনো নতুন মামলা, গ্রেফতার বা আসামি হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি। এটিকে ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করলেও এমএসএফ মনে করে, এটি স্থায়ী পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না; ভবিষ্যতেও এ ধরনের আইন প্রয়োগের ঝুঁকি রয়ে গেছে।

প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ

এমএসএফের মূল্যায়নে জুনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি বহুমাত্রিক সংকটে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক সহিংসতার বিস্তার, মব ভায়োলেন্সের ঊর্ধ্বগতি, ব্যাপক গ্রেফতার, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের বৃদ্ধি, সীমান্তে পুশ-ইনের প্রচেষ্টা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা—সব মিলিয়ে নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

সংস্থাটি মনে করে, পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনের শাসন কার্যকর করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহনশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং নাগরিক সচেতনতা জোরদার না হলে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মন্তব্য করুন

Logo