Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

এক পুতুল বুড়োর গল্প

মুস্তাফা মনোয়ার (১৯৩৫–২০২৬)

কাভার স্টোরি

এক পুতুল বুড়োর গল্প

Icon

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০১:০৫ এএম

মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবির দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে খেয়াল করলেন শিশুদের ভয়ার্ত মলিন চেহারা। শিশুদের সেই চেহারা ব্যথিত করল তাকে। তিনি শিশুদের ভয়ার্ত মলিন মুখে হাসি ফোটাতে সেখানে আয়োজন করলেন জীবনের প্রথম পাপেট শো। শরণার্থী শিবিরে পাপেট শোর আয়োজন করা সেই ব্যক্তিটিই শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সেই লুব্ধক তারাটি খসে পড়লো। ২৯ জুন সকাল সাড়ে ৮ টায় পারি দিলেন ‘অন্য কোথাও অন্য কোনোখানে’।  মুস্তাফা মনোয়ারের এই চলে যাওয়া বাংলাদেশের চারুকলা, টেলিভিশন, নাটক, পাপেট শিল্প এবং শিশু-কিশোর সংস্কৃতির অঙ্গনের গৌরবময় একটা অধ্যায়ের যবনি টানলো। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, টেলিভিশনের দূরদর্শী নির্মাতা, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক সংগঠক, পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ, শিশুদের অকৃত্রিম বন্ধু এবং সর্বোপরি একজন নির্মোহ সংস্কৃতিসাধক। তাঁর প্রতিটি পরিচয় যেন আরেকটি পরিচয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় রচনা করেছে।

বাংলাদেশে অনেক গুণী চিত্রশিল্পী জন্মেছেন। অসংখ্য গুণী নাট্যব্যক্তিত্বও ছিলেন। টেলিভিশনের দক্ষ প্রযোজকও কম আসেননি। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাঁদের জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়—একজন মানুষ যেন একাই একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সেই বিরল মানুষের একজন।


বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে কয়েকটি পরিবার আছে, যাদের ভেতর দিয়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার প্রবাহিত হয়েছে। মুস্তাফা মনোয়ার সেই উত্তরাধিকারেরই সন্তান। জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর, যশোরে। বাবা কবি গোলাম মুস্তাফা ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। বাংলা সাহিত্যে ইসলামী ধারার বিকাশে গোলাম মুস্তাফার অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু পিতার সেই পরিচয় কখনো পুত্রের ওপর ছায়া হয়ে থাকেনি; হয়ে ছিল প্রেরণা। সাহিত্য, সংগীত, শিল্প ও নন্দনচর্চার পরিবেশে বড় হওয় মুস্তাফা মনোয়ার ছোটবেলা থেকেই বুঝে গিয়েছিলেন—শিল্প মানুষের আত্মপরিচয়ের ভাষা।

সম্ভবত এ কারণেই তাঁর শিল্পচর্চা কখনো নিছক নান্দনিকতায় আটকে থাকেনি। তিনি রঙ ব্যবহার করেছেন মানুষের গল্প বলায়, রেখা টেনেছেন ইতিহাস আঁকতে, আর তার পুতুল হয়েছে সমাজ বদলের চরিত্র।
ছবিতো অনেকেই আঁকেন, কিন্তু মানুষের ভেতরের শিশুটিকে চিনতে পারেন কয়জন। মুস্তাফা মনোয়ার সেটা পেরেছিলেন এবং সারাজীবন থেকেছেন শিশুর মনের মানুষ হয়ে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক জন্মদিনে শিল্পী বলেছিলেন—“জন্মদিন মানেই তো আরেকটা বছর বড় হয়ে যাওয়া। ছোটবেলায় খুব ভালো লাগত। পরে বুঝলাম, বড় হওয়া ভালো না; ছোট থাকাই ভালো।”
কথাটি মোটেও রসিকতা ছিল না। এটি ছিল তাঁর সারাজীবনের শিল্পদর্শনের সারাংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুর মতো বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে শিল্পও মরে যায়। কৌতূহল, প্রশ্ন, স্বপ্ন এবং মানবিকতা একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তি অধিকাংশ সৃষ্টির কেন্দ্রে ছিল মানুষ, বিশেষ করে শিশু।


ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়, মুস্তফা মনোয়ার নবম শ্রেণির ছাত্র। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্ররা আন্দোলন করছে, রক্তে ভিজছে রাজপথ। ভাষা আন্দোলনের সেই অভিঘাত তাঁর শিল্পমনে গভীর ছাপ ফেলে। ভাষার প্রশ্ন তাঁর কাছে কেবল রাজনীতির বিষয় ছিল না; এটি ছিল সংস্কৃতির অস্তিত্বের প্রশ্ন। পরে, চারুকলায় পড়তে শুরু করলে তাঁর শিল্পীসত্তায় তা বিকশিত হতে শুরু করে। কলকাতা গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটে পড়তে যাওয়া ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেখানে তিনি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করেননি; উপমহাদেশের শিল্পঐতিহ্য, লোকনন্দন এবং আধুনিক শিল্পচর্চার বহুমাত্রিক জগতের সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁর রেখা ছিল সংযত, তবু প্রাণবন্ত; রঙ ছিল মাটির গন্ধমাখা, কিন্তু সুগভীর; বিষয়বস্তু সাধারণ মানুষের জীবন, অথচ সেখানে লুকিয়ে থাকত অসাধারণ মানবিকতা। বাংলার নদী, মাঠ, কৃষক, গৃহস্থালি, লোকজ সংস্কৃতি—এসবই তাঁর ছবিতে ফিরে ফিরে এসেছে। সেখানে তিনি কখনো পাশ্চাত্যের অনুকরণে শিল্প নির্মাণ করতে চাননি; আবার সংকীর্ণ লোকজ আবেগেও আটকে থাকেননি। তিনি আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছেন, নিজের মাটির রূপ রসের মধ্য দিয়ে।

১৯৬৪ সালে ঢাকায় টেলিভিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। নতুন এই মাধ্যমটি তখনও অনেকের কাছে রহস্যময়, অজানা। কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ার বুঝতে পেরেছিলেন—ভবিষ্যতে সবচেয়ে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক মাধ্যম হতে যাচ্ছে টেলিভিশন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে তিনি যোগ দেন তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে। তার এই সিদ্ধান্ত সেই সময় অনেকের কাছে বিস্ময়কর ঠেকেছে। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, শ্রেণিকক্ষে কয়েকশ শিক্ষার্থীকে হয়তো শেখানো যায়; টেলিভিশনের পর্দায় পৌঁছে যাওয়া যায় লাখো মানুষের ঘরে। এই দূরদর্শিতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে টেলিভিশনও হয়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের একটি মঞ্চ। সেই সময় তাঁর নির্দেশনায় প্রচারিত হয়েছিল ‘সংগ্রাম, সংগ্রাম, সংগ্রাম’—শিরোনামে গণসংগীত। গানটির সুর ও পরিবেশনা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, অল্পকয়েকজন শিল্পীর কণ্ঠও দর্শকের কাছে মনে হয়েছিল যেন লাখো মানুষ কোরাস গাইছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রশ্নে তিনি জানতেন, শিল্প কখনো বন্দুকের বিকল্প নয়; কিন্তু শিল্প মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পারে। একটি গানও কখনো কখনো একটি জাতির মনোবল বহুগুণ জাগিয়ে দিতে পারে। তিনে সেই মনোবল জাগানোর কাজটিই করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর একটি বিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে দাঁড়াতে হয়েছিল। ভেঙে যাওয়া রাষ্ট্রের সঙ্গে ভেঙে গিয়েছিল সাংস্কৃতিক কাঠামোরও অনেক কিছু। সেই পুনর্গঠনের সময় মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন শিল্পী হিসেবে কাজ করেননি; তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাংস্কৃতিক স্থপতি।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের নতুন পথচলায় তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে মহাপরিচালক হিসেবেও তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন—রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের কাজ কেবল বিনোদন দেওয়া নয়; একটি জাতির সাংস্কৃতিক রুচি নির্মাণ করাও তার দায়িত্ব। আজ যখন টেলিভিশনের পর্দা প্রায়শই বাজারের চাপে নতজানু, তখন মুস্তাফা মনোয়ারের সময়ের দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়—তিনি কেবল অনুষ্ঠান নির্মাণ করেননি; তিনি দর্শকও নির্মাণ করেছিলেন। আর সেই নির্মাণের ভিত ছিল নন্দনবোধ, মানবিকতা এবং সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা।



একজন শিল্পীকে চিনতে তাঁর সৃষ্টির চাইতেও বড় বিষয় তাঁর স্বপ্নকে বোঝা। সৃষ্টি সময়ের সন্তান হলেও স্বপ্ন সময়কে অতিক্রম করে। মুস্তাফা মনোয়ারের জীবনের দিকে তাকালে সবচেয়ে বিস্ময় জাগে এই জায়গাটিতেই। তিনি শুধু ছবি আঁকা, নাটক নির্মাণ কিংবা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান পরিচালনা করেননি। তিনি আসলে একটি জাতির সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল শিশুরা। তাঁর বিশ্বাস ছিল—যে জাতি তার শিশুদের কল্পনাশক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সেই জাতির সংস্কৃতি কখনো নিঃশেষ হয় না।

এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও প্রভাবশালী শিশু-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলোর একটি—‘নতুন কুঁড়ি’। ১৯৭২ সাল। সদ্য স্বাধীন দেশ। চারদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতা। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, অবকাঠামো ধ্বংস, মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা। এ সময় অনেকেই ভেবেছে, গান, নাচ কিংবা শিশুদের অনুষ্ঠান বিলাসিতা। কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ার ভেবেছিলেন অন্য কথা। তিনি বুঝেছিলেন, যুদ্ধের পরে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানো। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘নতুন কুঁড়ি’।

আজকের ভাষায় যাকে রিয়েলিটি শো বলা হয়, তার বহু আগেই তিনি শিশুদের প্রতিভা খুঁজে বের করার একটি জাতীয় মঞ্চ তৈরি করেছিলেন। গান, আবৃত্তি, নৃত্য, অভিনয়—বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসতে থাকে অগণিত শিশু। অনেকেই পরে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ হয়েছেন। অনুষ্ঠানটির সূচনা সংগীত—“আমরা নতুন, আমরা কুঁড়ি, নিখিল বন নন্দনে…”—শুধু গান ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের সংগীত। আজও বহু মানুষ সেই সুর শুনলে ফিরে যান তাঁদের শৈশবে। এটাই মুস্তাফা মনোয়ারের সাফল্য। তিনি শুধু অনুষ্ঠান বানাননি; তিনি প্রজন্মের মানসপটে স্থায়ী রেখা এঁকেছিলেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাস লিখতে গেলে কয়েকটি নাটকের নাম কখনো বাদ দেওয়া যাবে না। তার মধ্যে অন্যতম ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ এবং ‘রক্তকরবী’।
ছোট্ট স্টুডিও, সীমিত আলো, কয়েকটা ক্যামেরা, সামান্য প্রযুক্তি—বর্তমান সময়ে যা অনেকে কল্পনাও করতে পারবেন না। কিন্তু সেই সময় এতো সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নাটক হতো। মুস্তাফা মনোয়ার কখনো সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রাখেননি, তিনি সীমাবদ্ধতাকেই শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন।

শেক্সপিয়ারের ‘দ্য টেমিং অব দ্য শ্রু’-এর বাংলা রূপান্তর ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নির্মাণের সময় তিনি প্রমাণ করেছিলেন—মঞ্চভাবনা, আলোকসম্পাত, অভিনেতা পরিচালনা এবং ক্যামেরা ভাষার সমন্বয়ে টেলিভিশনও বিশ্বমানের নাটক নির্মাণ করতে পারে।

এরপর এলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’। বাং লাদেশে টেলিভিশনের ইতিহাসে এটি কেবল একটি নাটক নয়; এটি ছিল শিল্পের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার নাম। ১৯৭৭ সালে শুরু হওয়া কাজ শেষ হতে লেগেছিল প্রায় তিন বছর। বিশাল সেট, অসংখ্য মহড়া, ত্রিমাত্রিক আলোক পরিকল্পনা, চরিত্র নির্মাণ—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক বিশাল শিল্পযজ্ঞ। দিলশাদ খানম, গোলাম মুস্তাফা, হাসান ইমাম, আফজাল হোসেন, সাইদুল আনাম টুটুল—অসংখ্য গুণী শিল্পীর অভিনয়ে নির্মিত এই নাটক ১৯৮০ সালে প্রচারিত হওয়ার পর দুই বাংলাতেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। হয়ে যায় মাইলফলক।
মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পদর্শনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য—তিনি কখনো জনপ্রিয়তার জন্য শিল্পকে ছোট করেননি; বরং শিল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে জনপ্রিয় মাধ্যমকে বড় করেছেন। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় শুরু হয় অন্য এক মাধ্যমে। সেটি ক্যানভাস নয়, মঞ্চও নয়— পুতুল। বাংলাদেশে আধুনিক পাপেট থিয়েটারের ইতিহাস লিখতে গেলে প্রথম যে নামটি উচ্চারণ করতে হয়, সেটি মুস্তাফা মনোয়ার। একটি ছোট্ট কাঠের মুখ, কিছু সুতো, আর একজন শিল্পীর অসীম কল্পনাশক্তি, কী কণ্ডটাই না করেছেন তিনি!


হুগলি, বাঁকুড়া, কলকাতায় পাপেট দেখে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—এই শিল্পমাধ্যমের সম্ভাবনা অপরিসীম। কিন্তু  বিদেশি পুতুলের অনুকরণ সেটা করেননি। তিনি ফিরে এসেছিলেন বাংলার লোককথায়। সেখানে তিনি খুঁজে পান ‘সাত ভাই চম্পা’র পারুলকে। লোককথার পারুল যেমন ঘুমন্ত ভাইদের জাগিয়ে তোলে, তেমনি মুস্তাফা মনোয়ারের পারুলও জাগিয়ে তুলতে তৎপর ছিল কুসংস্কারে ঘুমিয়ে থাকা সমাজকে।

এটি কেবল একটি চরিত্র ছিল না, ছিল দর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি আসে সংস্কৃতি থেকে। আর সেই সংস্কৃতি সবচেয়ে সহজে শিশুদের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া যায় পুতুলের মাধ্যমে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর নির্মিত পাপেট অনুষ্ঠান ‘ক’, ‘খ’ এবং শিক্ষামূলক পাপেট নাটক আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসিত হয়। ইউনিসেফের কর্মকর্তা র‍্যাচেল কার্নেগি তাঁর পাপেট ‘পারুল’ দেখে মুগ্ধ হোন। তিনি বুঝতে পারেন, একটি পুতুলও সমাজ বদলের ভাষা হতে পারে। 

এই ধারণা থেকেই নব্বইয়ের দশকে শুরু হয় দক্ষিণ এশিয়ার কন্যাশিশুদের অধিকার নিয়ে বিস্তর কর্মসূচি। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন যার অন্যতম প্রধান পরিকল্পক। লোককথা থেকে নিয়ে আশা তাঁর পারুল সেখানে নতুন রূপ পায়; নতুন নাম নেয় ‘মীনা’। পরে ভারতীয় অ্যানিমেশন গুরু রাম মোহন এবং আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন দলের কারিগরি দক্ষতায় সেই চরিত্র পূর্ণতা লাভ করে।

কিন্তু মীনার আত্মা? সেটি ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের ভাবনা— একটি মেয়ে শিশুও সমাজকে বদলে দিতে পারে। এই বিশ্বাসে আজ দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি শিশু মীনাকে চেনে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, তার শেকড় বাংলাদেশের এক শিল্পীর কল্পনায় প্রোথিত। এক অর্থে বলা যায়, পারুলের হাত ধরেই মীনার জন্ম। আর সেই জন্মের ধাত্রী ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

শুধু পাপেট নয়, বিশালাকৃতির চলমান ভাস্কর্য-পাপেট তৈরিতেও তিনি ছিলেন অগ্রদূত। ১৯৮৫ সালের সাফ গেমস উপলক্ষে তাঁর নির্মিত বিশাল হরিণ পাপেট ‘মিশুক’ জাতীয় স্টেডিয়ামে হাজির হওয়ার পর হাজারো দর্শক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলেন। সেটি ছিল শিল্প, লোকঐতিহ্য এবং আধুনিক প্রদর্শন প্রযুক্তির এক অপূর্ব সমন্বয়।

আমাদের সমাজে অনেক শিল্পী খ্যাতি অর্জন করেন। কিন্তু খুব কম শিল্পী আছেন, যাঁদের সৃষ্টি মানুষ তার অজান্তেই মানুষের জীবনের অংশ করে নেয়। আজ বাংলাদেশের অনেকে হয়তো জানেনই না, তাঁদের শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় অনুষ্ঠান, প্রিয় পুতুল, প্রিয় বাহন, কিংবা সবচেয়ে প্রিয় নাটকের পেছনে একই মানুষ ছিলেন। সেই মানুষটি—মুস্তাফা মনোয়ার। যিনি আলোয় দাঁড়াতে চাননি, আলো তৈরি করতে চেয়েছিলেন। 

মুস্তাফা মনোয়ারকে নিয়ে কথা বলতে গেলে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে আসে—তাঁর বিনয়। এত বড় শিল্পী, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব—কিন্তু কখনো তাঁকে আত্মম্ভরিতায় ভোগায়নি। ছিলেন শিশুর মতো সরল। ২০১৯ সালে জন্মদিন তিনি বলেছিলেন—"ছোট থাকাই ভালো।" এই ‘ছোট’ শব্দটির মধ্যে ছিল তাঁর সমগ্র জীবনদর্শন। শিশুর মতো কৌতূহলী থাকা। নতুন কিছু শেখার আগ্রহ না হারানো। অহংকারে বড় না হয়ে হৃদয়ে বড় হয়ে থাকা। একজন সত্যিকারের শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় জীবনদর্শন আর কী হতে পারে?

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, দুঃখ হয় হে দুঃখের কূপ; তোমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ, নিজের পানে চাই।”—একজন প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যুতে সব কিছু শেষ হয়ে যায় না। তিনি রয়ে যান তাঁর সৃষ্টি, দর্শন এবং তাঁর স্পর্শে বদলে যাওয়া মানুষের ভেতর। আজ যখন কোনো শিশুর হাতে একটি পুতুল প্রাণ পায়, যখন কোনো তরুণ শিল্পী মাটির রঙে বাংলাকে আঁকতে চায়, যখন কোনো নাট্যনির্মাতা সীমিত সামর্থ্য নিয়েও বড় স্বপ্ন দেখেন, যখন কোনো শিক্ষক ভাবেন—শিক্ষা আনন্দেরও হতে পারে, তখন অদৃশ্যভাবে মুস্তাফা মনোয়ার সেখানে উপস্থিত থাকেন। সেখানে তাঁর জন্য কোনো বিদায়ের দরজা নেই। আছে দীর্ঘ, অনন্ত, আলোকিত এক যাত্রা।

শ্রদ্ধা, শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার।


মন্তব্য করুন

Logo