২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আলোচিত সেই ব্যক্তি—মিশেল এনকুকা এমবোলাডিঙ্গা, ছবি - ইন্টারনেট
ভাইরাল মিশেল এবং কঙ্গোর জেগে ওঠার গল্প
শরীফুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ এএম
বিশ্বকাপে গ্যালারিজুড়ে যখন হাজারো দর্শক লাফিয়ে উঠছেন, পতাকা উড়াচ্ছেন, গান গাইছেন; তখন গ্যালারির এক কোণে একজন মানুষ পুরো ৯০ মিনিট একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো উল্লাস নেই, হতাশার কোনো প্রকাশও নেই। ডান হাতটি আকাশের দিকে উঁচু করে তোলা, চোখ স্থির, অভিব্যক্তিহীন মুখ। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, উনি হয়তো কোনো স্ট্রিট-পারফর্মার। হ্যাঁ পারফর্মার, তবে তার শিল্পের ভাষা ঠিক অভিনয় নয়, স্মৃতির প্রকাশ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আলোচিত সেই ব্যক্তি—মিশেল এনকুকা এমবোলাডিঙ্গা। কেউ তাকে চেনেন ‘লুমুম্বা ভেয়া’ (লুমুম্বা বেঁচে আছেন) নামে, আবার কেউ ডাকেন ‘স্ট্যাচু ম্যান’। কিন্তু তার গল্প কেবল একজন ফুটবল সমর্থকের গল্প নয়; তার চরিত্র ধরা দিয়েছে ইতিহাস, দেশপ্রেম, স্মৃতি ও প্রতিরোধের জীবন্ত প্রতীক হয়ে।
দীর্ঘ বায়ান্ন বছরের খরা কাটিয়ে আফ্রিকার দেশ ডিআর কঙ্গো আবারও ফিরেছে বিশ্বকাপ মঞ্চে। এই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গী হয়েছে কোটি কঙ্গোবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষা, হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন দেখার গল্প। আর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে কঙ্গোর সব মানুষের প্রতিনিধি হয়ে যেন মিশেল এনকুকা এমবোলাডিঙ্গা একাই দাঁড়িয়ে থাকেন, স্থির।
৫২ বছরের অপেক্ষা
কঙ্গোর ফুটবল দল পরিচিত ‘লিওপার্ডস’ নামে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট আর ফুটবলের অব্যবস্থাপনার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল সেই ‘লিওপার্ডস’। ১৯৭৪ সাল এরপর কেটে গেছে অর্ধশতাব্দী।আবার তারা জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপে। কঙ্গো দলের যখন বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হয়, তখন খেলোয়াড়রদের চাইতেও আলোচনায় উঠে আসে একজন দর্শক। তিনিই মিশেল এনকুকা এমবোলাডিঙ্গার।
কেন তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন?
প্রথমে এই প্রশ্নটিই সবার মনে আসে। আর উত্তর? যে কোনো ফুটবল টুর্নামেন্টের চেয়েও অনেক বড়। মিশেল শ্রদ্ধা জানান আফ্রিকার এক কালো মানুষের প্রতি; কঙ্গোর স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা পেট্রিস লুমুম্বাকে। ১৯৬০ সালে বেলজিয়ামের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন পেরিয়ে, স্বাধীনতা অর্জনের পর কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন লুলুম্বা। পরিহাস, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং ১৯৬১ সালে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আর ঠিক এরপর থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন কঙ্গোর স্বাধীনতা, মর্যাদা ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
রাজধানী কিনশাসায় লুমুম্বার একটি ভাস্কর্য রয়েছে, সেখানে তিনি ডান হাত আকাশের দিকে তুলে দাঁড়িয়ে আছেন।
মিশেল সেই ভঙ্গিটিই হুবহু অনুসরণ করেন। রঙিন কোট, টাই, পুরোনো ধাঁচের চশমা, বিশেষ ধরনের চুলের ছাঁট—সবকিছুতেই যেন লুমুম্বার প্রতিচ্ছবি। তার ভাষায়, “এটি শুধু ফুটবল দলকে সমর্থন নয়; এটি একজন দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব পালন।’
কঙ্গোর স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা পেট্রিস লুমুম্বার ভাস্কর্যভাইরাল হওয়ার গল্প
২০১৩ সাল থেকে মিশেল জাতীয় দলের প্রতিটি ম্যাচে একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তবে, আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসেন ২০২৫ সালের আফ্রিকান নেশনস কাপে। টেলিভিশন ক্যামেরা বারবার তার দিকেই ঘুরে যাচ্ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে সেই দৃশ্য। একজন মানুষ, চারপাশে হাজারো মানুষের উল্লাসের মাঝে পাথরের মূর্তির মতো একদম—স্থির।
স্থির থাকারও অনুশীলন লাগে
৯০ মিনিট একভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সহজ নয়। মিশেল নিজেই জানিয়েছেন, প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের আগে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অনুশীলন করেন। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে না নড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি; যাতে ম্যাচের সময় কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়। তার কাছে এটি মোটেও অভিনয় নয়, দেশকে জাগিয়ে তোলার শপথ।
বিশ্বকাপে যেতে বাধা
বিশ্বকাপে কঙ্গোর যাত্রা যেমন নাটকীয় ছিল—প্রথমে আফ্রিকান বাছাইপর্বে প্লে-অফ ম্যাচ, পরে আন্তঃ কনফেডারেশনের প্লে-অফে জয়ী হয়ে বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা পেয়েছিল। তেমনি নাটকীয় ছিল মিশেলের যাত্রাও। প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা জটিলতা এবং কঙ্গোতে ইবোলা প্রাদুর্ভাবজনিত স্বাস্থ্যবিধির কারণে দলের সঙ্গে মিশেলে যাওয়া আটকে যায়। পরে, কঙ্গোর ফুটবল ফেডারেশন এবং খেলোয়াড়দের উদ্যোগে তার যাওয়ার ব্যবস্থা হয়। নিজ অবয়বে উপস্থিত হন বিশ্বকাপ মাঠে। ক্যামেরা আবারও খুঁজে নেয় তাকে; হাজারো দর্শকের মাঝে এক জীবন্ত ভাস্কর্য—স্থির, অবিচল। অথচ সামাজিক মাধ্যমে তাকে নিয়ে উঠেছে উত্তাল ঢেউ। যার নাম—‘লুমুম্বা ভেয়া’।
ফুটবল ছাড়িয়ে ইতিহাসের শিক্ষক
মিশেল মনে করিয়ে দেন, ফুটবল কখনো কখনো ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমও হতে পারে। যে তরুণেরা হয়তো লুমুম্বার নামই জানতেন না, তারাও এখন জানতে চাইছে—কে ছিলেন তিনি? কেন তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল? কেন একজন মানুষ আজও তাঁর স্মৃতিকে বয়ে বেড়াচ্ছেন?
ঠিক তখনই মিশেল এনকুকা এমবোলাডিঙ্গার আর দশজন ফুটবল সমর্থকে ছাপিয়ে হয়ে উঠেন ইতিহাসের শিক্ষক। এমন শিক্ষক কি আমরা কখনো পাবো? যিনি নীরব দাঁড়িয়ে থেকেও কোটি মানুষকে মনে করিয়ে দেবে—একটি জাতির ইতিহাস, তার স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামের অসমাপ্ত লড়াইকে।
মন্তব্য করুন

