Logo

৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

যে ৬ কৌশলে ঘৃণা ও সহিংসতার বীজ বপন করে চরমপন্থিরা

পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীনে জঙ্গি সংগঠনের প্রশিক্ষণ, ছবি: সংগৃহীত

কাভার স্টোরি

উগ্রবাদের নতুন অস্ত্র ভাষা

যে ৬ কৌশলে ঘৃণা ও সহিংসতার বীজ বপন করে চরমপন্থিরা

Icon

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম

চরমপন্থা শুধু অস্ত্রের নল থেকে জন্ম নেয় না, জন্ম নেয় শব্দের মধ্য দিয়েও। একটি শব্দ, একটি বাক্য কিংবা একটি গল্প—কখনও কখনও বন্দুকের গুলির চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। উগ্রবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করে আসছে। তারা জানে, মানুষের মন জয় করতে পারলে অস্ত্র হাতে তুলে দেওয়াও সহজ হয়ে যায়। এই বাস্তবতাকে সামনে এনে ভাষা কীভাবে উগ্রবাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার চার্লস ডারউইন ইউনিভার্সিটির সিনিয়র প্রভাষক এবং গবেষক ডক্টর আউনি এটআউই। তাঁর গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম দ্য কনভারসেশন-এ।সম্প্রতি নিবন্ধটি অনুবাদ করে প্রকাশ করেছে ডিসমিসল্যাব। 
 
গবেষণায় সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক জঙ্গি ও উগ্রবাদী নেতার বক্তব্য, ইশতেহার এবং প্রচারণামূলক লেখার ভাষা বিশ্লেষণ করে এমন ছয়টি ভাষাগত কৌশল শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে অনুসারীদের মধ্যে ঘৃণা, বিভাজন এবং সহিংসতার মানসিকতা তৈরি করা হয়।

বিভাজন তৈরিই প্রথম লক্ষ্য

গবেষণায় বলা হয়েছে, উগ্রবাদী প্রচারণার প্রথম ধাপ হলো সমাজকে দুই ভাগে ভাগ করা—‘আমরা’ এবং ‘তারা’। নিজেদের গোষ্ঠীকে নৈতিক, নিপীড়িত বা ন্যায়ের পক্ষে হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আর অন্যদের দেখানো হয় শত্রু, বিশ্বাসঘাতক কিংবা অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে।

এই বিভাজনের মাধ্যমে অনুসারীদের মধ্যে একটি অভিন্ন পরিচয় ও দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। এরপর ধীরে ধীরে সহিংসতাকে নৈতিক কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলে।

যে ছয় কৌশলে কাজ করে উগ্রবাদী প্রচারণা

গবেষণায় চিহ্নিত ছয়টি প্রধান ভাষাগত কৌশল হলো—
এক. ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন সৃষ্টি: প্রথমেই ভিন্নমত বা বাইরের মানুষকে শুধু আলাদা নয়, বিপজ্জনক ও অমানবিক হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে অনেকের কাছে ন্যায্য বলে মনে হতে শুরু করে।

দুই. ইতিহাস ও বীরত্বের গল্প ব্যবহার: উগ্রবাদীরা অতীতের যুদ্ধ, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বা ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রতীক ব্যবহার করে অনুসারীদের বোঝাতে চায় যে তারা একটি 'মহান ঐতিহাসিক লড়াই'-এর অংশ। এতে সহিংসতাকে বীরত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়।

তিন. ধর্মীয় গ্রন্থের অপব্যাখ্যা: গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় বাণী বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের বক্তব্যকে প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অনুসারীদের কাছে সহিংসতা ধর্মীয় বা নৈতিক কর্তব্য বলে প্রতীয়মান হয়।

চার. ক্ষোভকে সংগঠিত করা: 'অপমান', 'অন্যায়', 'নিপীড়ন', 'সংস্কৃতি ধ্বংস'—এ ধরনের শব্দ বারবার ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে ক্ষোভকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত করা হয়। এতে বাস্তবতার চেয়ে আবেগ বেশি প্রাধান্য পায়।

পাঁচ. আত্মীয়তার ভাষা ও শক্তিশালী রূপক: 'ভাই', 'বোন', 'আমরা', 'আমাদের'—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে অপরিচিত মানুষকেও একই পরিবারের সদস্য হিসেবে ভাবতে শেখানো হয়। একই সঙ্গে শত্রুপক্ষকে অমানবিক বা দূরের কেউ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ফলে সহমর্মিতা কমে যায় এবং সহিংসতার প্রতি মানসিক বাধা দুর্বল হয়ে পড়ে। এবং

ছয়. সহিংসতাকে কর্তব্যে পরিণত করা: সবশেষে সহিংসতাকে শুধু অনুমোদিত নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটিকে আত্মরক্ষা, ধর্মরক্ষা কিংবা জাতি রক্ষার একমাত্র উপায় হিসেবেও প্রচার করা হয়।

অনলাইন ছাড়িয়ে মূলধারায়

গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, উগ্রবাদী ভাষা এখন আর কেবল গোপন জঙ্গি প্রচারণায় সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক বক্তব্য, জনসমাবেশ এমনকি কিছু মূলধারার আন্দোলনের ভাষাতেও এসব কৌশলের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, অভিবাসীবিরোধী প্রচারণা কিংবা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্যে একই ধরনের ভাষাগত কাঠামো ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ

ডক্টর আউনি এটআউই মনে করেন, উগ্রবাদকে শুধু নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি ভাষা, মনস্তত্ত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগেরও একটি বড় বিষয়। তাঁর মতে, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক এবং কমিউনিটি নেতারা যদি এসব ভাষাগত কৌশল আগে থেকেই চিনতে পারেন, তাহলে ঘৃণামূলক প্রচারণা ও উগ্রবাদী প্রভাব মোকাবিলা করা অনেক সহজ হবে। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি গড়ে তোলা, বিভাজনের পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং ঘৃণার ভাষাকে যুক্তি ও মানবিকতার ভাষায় প্রতিস্থাপন করাই হতে পারে উগ্রবাদ প্রতিরোধের কার্যকর উপায়।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

ড. আউনি এটআউইয়ের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, উগ্রবাদী প্রচারণা সাধারণত একটি ধর্মীয়, ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক প্রতীককে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করে। এরপর সেই পরিচয়কে ‘আমরা’ বনাম ‘তারা’ বিভাজনের মধ্যে দাঁড় করানো হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবারের বিশ্বকাপে যখন দীর্ঘদিনের সামাজিক সংস্কৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের ফুটবল দলের পতাকায় সেজে উঠেছে শহর ও গ্রাম, ঠিক সেই সময়ে কোনো সুস্পষ্ট ধর্মীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ব্যানার ছাড়াই একটি গোষ্ঠীর কালেমা-খচিত পতাকা উত্তোলনের আহ্বান, তা বাস্তবায়ন এবং পতাকা শোভাযাত্রার আয়োজন—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি একেবারেই নতুন এবং একই সঙ্গে উদ্বেগের। উদ্বেগের বিষয়টি শুধু ‘কালেমা খচিত’ পতাকা নয়; বরং সেই পতাকাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বয়ান, প্রতীকী বার্তা এবং আচরণ।
বিশেষ করে এর সঙ্গে যখন এমন বার্তা যুক্ত হয় যে ‘এই পতাকা কেউ নামাতে পারবে না’, ‘নামালে পরিণতি ভোগ করতে হবে’ কিংবা ভিন্নমতকে বিশ্বাসঘাতক বা ধর্মবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করা হয় তখন এটি ড. এটআউইয়ের গবেষণায় চিহ্নিত 'আমরা বনাম তারা', 'ধর্মীয় প্রতীকের মাধ্যমে পরিচয় নির্মাণ' এবং 'নৈতিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি'—এই তিনটি ভাষাগত কৌশলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে পারে। এবং এটা আমরা সামজিক মাধ্যমগুলোতে হরহামেশাই দেখতে পাচ্ছি। এখানে মূল উদ্বেগের বিষয় পতাকা নয়, পতাকাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ভাষা, চাপ এবং সামাজিক মেরুকরণ।

আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জিহাদি সংগঠন তাদের প্রচারণায় কালেমা-সংবলিত বিভিন্ন ধরনের পতাকা ব্যবহার করেছে। তবে কালেমা ইসলামের মৌলিক ঈমানি ঘোষণা; এটি কোনো জঙ্গি সংগঠনের একচেটিয়া প্রতীক নয়। তাই কোনো কালেমা-খচিত পতাকা দেখলেই সেটিকে জঙ্গি সংগঠনের পতাকা বলা যাবে না। বরং দেখতে হবে—এর নকশা, ব্যবহার, প্রচারণার ভাষা, উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে সহিংসতা বা উগ্রবাদী মতাদর্শের কোনো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না।

বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ নতুন নয়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশ উগ্রবাদ, ধর্মীয় উসকানি, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযান আমরা লক্ষ্য করেছি। সেই অভিযানগুলো নিয়েও নানা আলোচনা, সমালোচনা ছিল এবং আছে। তা সত্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণামূলক বক্তব্য, গুজব এবং উসকানিমূলক প্রচারণা এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংগঠনগুলোর তৎপরতা আবার ভাবিয়ে তুলেছে।

আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া অনেক সহিংসতারই শুরু অস্ত্রে নয়; ফেসবুক পোস্ট, বিকৃত ছবি, গুজব কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা দিয়ে। রামু (২০১২), নাসিরনগর (২০১৬), রংপুরের ঠাকুরপাড়া (২০১৭), ভোলা (২০১৯), কুমিল্লার দুর্গাপূজা-পরবর্তী সহিংসতা (২০২১) কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাজর-খানকা-বাউলদের উপর হামলা, ভিন্ন মতাবলম্বিদের উপর আক্রমণ ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির ঘটনায় দেখা গেছে, মানুষের আবেগকে উসকে দিতে 'আমরা বনাম তারা', 'ধর্ম বিপন্ন', 'অপমানের প্রতিশোধ' বা 'শত্রুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও'—এ ধরনের ভাষা বারবার ব্যবহার করা হয়েছে।

শুধু ধর্মীয় উগ্রবাদ নয়, রাজনৈতিক মেরুকরণেও একই ধরনের ভাষাগত কৌশল দেখা যায়। প্রতিপক্ষকে 'দেশদ্রোহী', 'শত্রু', 'বিশ্বাসঘাতক' বা 'রাষ্ট্রবিরোধী' হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা সামাজিক বিভাজনকে আরও গভীর করেছে। মতভিন্নতাকে গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিবর্তে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করেছে।

এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, মতাদর্শ বা গোষ্ঠীকে নয়; উগ্রবাদের ভাষাগত কৌশলকে বিশ্লেষণ করেছে। অর্থাৎ, ধর্মীয়, জাতিগত, রাজনৈতিক বা অন্য যেকোনো ধরনের চরমপন্থাই হোক না কেন, ঘৃণা ও সহিংসতা ছড়াতে তারা প্রায় একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করে।

বাংলাদেশের সাংবাদিক, শিক্ষক, নীতিনির্ধারক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য এই গবেষণার থেকে শিক্ষা নিতে পারি যে, কোনো বক্তব্যে যদি বারবার 'আমরা বনাম তারা'র বিভাজন, কোনো গোষ্ঠীকে অমানুষ হিসেবে উপস্থাপন, অতিরঞ্জিত ষড়যন্ত্রের গল্প, ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক বয়ানের অপব্যাখ্যা এবং সহিংসতাকে নৈতিক কর্তব্য হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যায়, তাহলে সেটিকে কেবল মতপ্রকাশ হিসেবে নয়, সম্ভাব্য উগ্রবাদী প্রচারণার সতর্কসংকেত হিসেবেও আমরা বিবেচনা করার অবকাশ রয়েছে। সেদিক থেকে এই গবেষণাটি বাংলাদেশের জন্য শুধু একাডেমিক নয়; সামাজিক সম্প্রীতি, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং সহিংসতা প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

গবেষণার মূল বার্তা হলো—সহিংসতা শুরু হওয়ার অনেক আগেই তার বীজ বপন হয় ভাষায়। তাই শব্দের মধ্যেই যদি ঘৃণার কৌশল শনাক্ত করা যায়, তাহলে সহিংসতা প্রতিরোধের পথও অনেকটাই সুগম হতে পারে।

মন্তব্য করুন

Logo